হে সিন্ধু,​​ হে বন্ধু মোর

হে মোর বিদ্রোহী!

 ​​​​ রহি’ রহি’

কোন্‌ বেদনায়

তরঙ্গ-বিভঙ্গে মাতো উদ্দাম লীলায়!

 ​​​​ হে উন্মত্ত,​​ কেন এ নর্তন?

নিষ্ফল আক্রোশে কেন কর আস্ফালন

 ​​​​ বেলাভূমে পড়োআছাড়িয়া!

সর্বগ্রাসী! গ্রাসিতেছ মৃত্যু-ক্ষুধা নিয়া

 ​​​​ ধরণীরেতিলে-তিলে!

হে অস্থির! স্থির নাহি হ’তে দিলে

 ​​​​ পৃথিবীরে! ওগোনৃত্য-ভোলা,

ধরারে দোলায় শূন্যে তোমার হিন্দোলা!

 ​​​​ হে চঞ্চল,

বারে বারে টানিতেছ দিগন্তিকা-বন্ধুর অঞ্চল!

কৌতুকী গো! তোমারএ-কৌতুকের অন্ত যেন নাই।-

 ​​​​ কী যেন বৃথাই

 ​​​​ খুঁজিতেছ কূলে কূলে

কারযেন পদরেখা!-কে নিশীথেএসেছিল ভুলে

 ​​​​ তব তীরে,​​ গর্বিতা সে নারী,

যতবারি আছে চোখে তব

 ​​​​ সব দিলে পদে তার ঢালি’,

 ​​​​ সে শুধু হাসিল উপক্ষায়!

তুমি গেলে করিতে চুম্বন,​​ সে ফিরালো কঙ্কণের ঘায়!

​​ গেল চ’লেনারী!

সন্ধান করিয়া ফের,​​ হে সন্ধানী,​​ তারি

 ​​​​ দিকে দিকে তরণীর দুরাশালইয়া,

গর্জনে গর্জনে কাঁদ–“পিয়া,​​ মোর পিয়া!’’

 ​​​​ 

 ​​​​ বলো বন্ধু,​​ বুকে তব কেন এত বেগ,​​ এত জ্বালা?

 ​​​​ কে দিল না প্রতিদিন?​​ কে ছিঁড়িলমালা?

 ​​​​ কে সে গরবিনী বালা?​​ কার এত রূপ এত প্রাণ,

 ​​​​ হে সাগর,​​ করিল তোমারঅপমান!

 ​​​​ হে মজনু,​​ কোন্‌ সে লায়লীর

 ​​​​ প্রণয়ে উন্মাদতুমি?-বিরহ-অথির

 ​​​​ করিয়াছে বিদ্রোহ ঘোষণা,​​ সিন্ধুরাজ,

কোন্‌ রাজকুমারীরলাগি’?​​ কারে আজ

 ​​​​ পরাজিত করি’ রণে,​​ তব প্রিয়া রাজ-দুহিতারে

 ​​​​ আনিবে হরণকরি?-সারে সারে

 ​​​​ দলে দলে চলে তব তরঙ্গের সেনা,

 ​​​​ উষ্ণীষ তাদের শিরে শোভেশুভ্র ফেনা!

ঝটিকা তোমার সেনাপতি

আদেশ হানিয়া চলে উর্ধ্বেঅগ্রগতি।

উড়ে চলে মেঘের বেলুন,

মাইন্‌’ তোমার চোরা পর্বতনিপুণ!

হাঙ্গর কুম্ভীর তিমি চলে ‘সাবমেরিন’,

নৌ-সেনা চলিছে নীচেমীন!

সিন্ধু-ঘোটকেতে চড়ি’ চলিয়াছ বীর

 ​​​​ উদ্দাম অস্থির!

 

কখন আনিবে জয় করি’-কবে সে আসিবে তব প্রিয়া,

সেই আশা নিয়া

 ​​​​ মুক্তা-বুকে মালারচি’ নীচে!

তোমার হেরেম্‌-বাঁদী শত শুক্তি-বধূ অপেক্ষিছে।

 ​​​​ প্রবাল গাঁথিছে রক্ত-হার-

হে সিন্ধু,​​ হে বন্ধু মোর-তোমার প্রিয়ার!

 ​​​​ বধূ তবদীপাম্বীতা আসিবে কখন?

রচিতেছে নব নব দ্বীপ তারিপ্রমোদ-কানন।

 ​​​​ বক্ষে তব চলে সিন্ধু-পোত

ওরা তব যেন পোষাকপোতী-কপোত।

নাচায়ে আদর করে পাখীরে তোমার

ঢেউ-এর দোলায়,​​ ওগো কোমলদুর্বার!

 ​​​​ উচ্ছ্বাসে তোমার জল উলসিয়া উঠে,

 ​​​​ ও বুঝি চুম্বন তব তার চঞ্চুপুটে?

আশা তব ওড়ে লুব্ধ সাগর-শকুন,

তটভূমি টেনে চলে তবআশা-তারকার গুণ!

উড়ে যায় নাম-নাহি-জানা কত পাখী,

ও যেন স্বপন তব!-কী তুমি একাকী

ভাব কভু আনমনে যেন,

 ​​​​ সহসা লুকাতে চাও আপনারেকেন!

 

ফিরে চলো ভাঁটি-টানে কোন্‌ অন্তরালে,

যেন তুমি বেঁচে যাওনিজেরে লুকালে!-

 ​​​​ শ্রান্ত মাঝি গাহে গান ভাটিয়ালী সুরে,

ভেসে যেতেচায় প্রাণ দূরে-আরো দূরে।

 ​​​​ সীমাহীন নিরুদ্দেশ পথে,

মাঝি ভাসে,​​ তুমিভাস,​​ আমি ভাসি স্রোতে।

 ​​​​ 

নিরুদ্দেশ! শুনে কোন্‌ আড়ালীরডাক

ভাটিয়ালী পথে চলো একাকী নির্বাক?

 ​​​​ অন্তরের তলা হ’তে শোন কিআহবান?

কোন্‌ অন্তরিকা কাঁদে অন্তরালে থাকি’ যেন,

চাহে তবপ্রাণ!

বাহিরে না পেয়ে তারে ফের তুমি অন্তরেরপানে

 ​​​​ 

 ​​​​ লজ্জায়-ব্যথায়-অপমানে!

 ​​ ​​ ​​​​ তারপর,​​ বিরাট পুরুষ! বোঝা নিজভুল

 ​​ ​​ ​​​​ জোয়ারে উচ্ছ্বসি’ ওঠো,​​ ভেঙে চল কূল

 ​​​​ দিকে দিকে প্লাবনের বাজায়েবিষাণ

বলো, ‘​​ প্রেম করে না দুর্বল ওরে করে মহীয়ান্‌!’

বারণী সাকীরে কহ, ‘​​ আনো সখি সুরার পেয়ালা!’

আনন্দে নাচিয়া ওঠো দুখের নেশায় বীর,​​ ভোল সবজ্বালা!

 

 ​​​​ অন্তরের নিষ্পেষিত ব্যথার ক্রন্দন

 ​​​​ ফেনা হ’য়ে ওঠে মুখে বিষরমতন।

হে শিব,​​ পাগল!

তব কন্ঠে ধরি’ রাখো সেই জ্বালা-সেই হলাহল!

হে বন্ধু,​​ হে সখা,

এতদিনে দেখা হল,​​ মোরা দুই বন্ধু পলাতকা।

 ​​​​ 

কত কথা আছে-কত গান আছে শোনাবার,

কত ব্যথা জানাবার আছে-সিন্ধু,​​ বন্ধু গোআমার!

 ​​​​ এসো বন্ধু,​​ মুখোমুখি বসি,

অথবা টানিয়া লহ তরঙ্গের আলিঙ্গন দিয়া,​​ দুঁহু পশি

 ​​​​ ঢেউ নাই যেথা-শুধু নিতল সুনীল!-

 ​​ ​​ ​​​​ তিমির কহিয়া দাও-সে যেন খোলে নাখিল

 ​​​​ থাকে দ্বারে বসি’,

সেইখানে ক’ব কথা। যেন রবি-শশী

 ​​​​ নাহি পশেসেথা।

তুমি র’বে-আমি র’ব-আর র’বে ব্যথা!

সেথা শুধু ডুবে র’বে কথা নাহিকহি’,-

 ​​​​ যদি কই,-

 ​​ ​​ ​​​​ নাই সেথা দু’টি কথা বই,

আমিও বিরহী,​​ বন্ধু,​​ তুমিও বিরহী!’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।