ট্রেন – শুভ দাশগুপ্ত

1
791

চার বুড়ো মানুষ
রোজ বিকেলে আগরপাড়া স্টেশনের
চার নম্বর প্ল্যাটফর্মে
অলস বসে থাকে, গল্প করে,
একদিন যখন বয়স কম ছিল, কাজ ছিল
তখনকার গল্প, স্মৃতি।
ট্রেন আসে, ট্রেন যায়
ভিড় ঠাসা ট্রেন হাজার মানুষ বুকে নিয়ে
চলে যায় রাণাঘাট, শান্তিপুর, নৈহাটি, কৃষ্ণনগর॥

প্রথম বুড়ো ভাবেঃ
একদিন বয়স ছিল। রোজ সকালে ধরতাম
আটটা বিয়াল্লিশ। ট্রেনের কামরায়
ডেলি প্যাসেঞ্জারির আড্ডা। তাস, রাজনীতি
মাঝে মধ্যে সদলে বিয়ে বাড়ি অথবা পিকনিক
আজো আটটা বিয়াল্লিশ আসে যায়।
আমারই নাম নেই আর॥

দ্রিতীয় বুড়ো ভাবেঃ
পূজোর সময় তখন কেমন যেতুম প্রতি বছর বেড়াতে।
বউ বাচ্চা নিয়ে পুরী, জয়পুর, আগ্রা, মথুরা।
কতকাল আর যাইনা কোথাও। যাওয়া হয় না॥

তৃতীয় বুড়ো ভাবেঃ
ভালই আছি। ছেলে আর ছেলের বউ যত্ন-আত্তি করে।
তবু ছেলের মায়ের ছবির সামনে দাঁড়ালেই মনে পড়ে
বড়দিনের সময় বেশ কবার নিয়ে গিয়েছিলাম ওকে
কলকাতার সাহেবপাড়ায়। ট্যাক্সি করে ঘুরিয়েছিলাম
পার্ক স্ট্রিট। চৌরঙ্গী—
কতকাল কলকাতা দেখি না। বাতের ব্যথাটাো বেড়েছে॥

চতুর্থ বুড়ো ভাবেঃ
কয়লার ইঞ্জিন ছিল। ট্রেনের জানালা দিয়ে বাইরে চোখ
রাখলে চোখে কয়লার গুঁড়ো ঢুকত। তবে, ভারি
সুন্দর ছিল সেই আওয়াজ—ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক
কোথায় যে গেল সেই সব দিন॥

চার বুড়ো বিকেলের নিভে আসা আলোর নীচে
চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে
প্রতিদিন ভাবে—
প্রতিদিন ট্রেন যায়, ট্রেন আসে॥

কাল দেখলাম তিন বুড়ো
সত্যিকারের ট্রেন এক বুড়োকে নিয়ে গেছে
অচেনা
ইস্টিশানের দিকে।
তিন বুড়োর কানে বাজছে
ঝিক ঝিক…

কবি শুভ দাশগুপ্ত – এই সময়কালের এক জনপ্রিয় কবি। শুধু কবি হিসেবে নয়, আবৃত্তির জন্য কবিতা এবং না-কবিতা রচনা, গীত রচনা ও সুরকার হিসেবেও তিনি প্রতিষ্ঠিত। বিভিন্ন বৃহৎ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সংগঠনে, রেকর্ডি এবং ছাপামাধ্যমের জগতেও তাঁর অবাধ বিচরণ।সম্ভবত ইনিই প্রথম কবি যাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটেছে রেকর্ড-মিডিয়ার মাধ্যমে, কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে নয়। ব্রততী বন্দ্যোপাধ্যায়েরর মতো প্রথম সারির আবৃত্তিশিল্পীরা তাঁর কবিতা পৌঁছে দিয়েছেন মানুষের কাছে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। আবৃত্তিকার হিসেবে তিনিও সুখ্যাতি অর্জন করেছেন।তীক্ষ্ম শ্লেষ, ক্ষুরধার ব্যঙ্গ, হৃদয়স্পর্শী রচনাশৈলী তাঁর কবিতাগুলিকে মনোগ্রাহী করে তুলেছে। তাঁর কবিতার বিষয় বস্তু উঠে আসে অতি সাধারণ মধ্যবিত্তের দুঃখ, দুর্দশা, অধোঃপতন, দ্বিধা-দ্বন্দের মধ্য থেকে, যা পাঠকে নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার সুযোগ করে দেয়। তিনি এক জায়গায় বলেছেন যে এই সব কবিতার রসদের জন্যেই তিনি মফস্বল ছেড়ে কলকাতায় এসে থাকার কথা ভাবেন নি। কর্ম জীবনের প্রতি দিনই কলকাতা থেকে ৮০ কিলেমিটার ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করেন।

1 মন্তব্য

  1. কবিতা ককটেল…
    দারুন সুন্দর এই পেজটি…আমি কৃতজ্ঞ এই পেজটির সদস্য হতে পেরে….ভীষন ভালো লাগা জড়িয়ে থাকে এই পেজটি ঘিরে…ধন্যবাদ এ্যাডমিন

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন