কিছু একটা পুড়ছে – নবারুণ ভট্টাচার্য

কিছু একটা পুড়ছে
আড়ালে, বেরেতে, তোষকের তলায়, শ্মশানে
কিছু একটা পুড়েছেই
আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি
বিড়ি ধরিয়েছে কেউ
কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে
কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে
আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু
ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি
কোথাও গ্যাসের সিলিণ্ডার ফেটেছে
কোথাও কয়লাখনিতে, বাজির কারখানায় আগুন
কিছু একটা পুড়ছে
চার কোনা ধরে গেছে
জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে
কিছু একটা পুড়ছে
ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা
ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক
পুড়ছে কামনার শরীর, তুষ, মবিলে ভেজানো তুলো
কিছু একটা পুড়ছেই
হল্‌কা এসে লাগছে আঁচের
ইমারত, মূল্যবোধ, টাঙানো বিশাল ছবি
প্রতিশ্রুতি, টেলিভিশন, দুপ্তপ্রাপ্য বই
কিছু একটা পুড়ছে
আমি হাতড়ে হাতড়ে দেখছি কী পুড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে
কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়ছে
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে জ্বলে উঠবে
কিছু একটা পুড়ছে বলছি
দমকলের গাড়ি, নাভিকুণ্ডল, সূর্য
কিছু একটা পুড়ছে
প্রকাশ্যে, চোখের ওপর
মানুষের মধ্যে
স্বদেশ!

জন্ম : ১৯৪৮-এ, বহরমপুরে | বিজন ভট্টাচার্য ও মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র সন্তান নবারুন ভট্টাচার্য | পড়াশোনা করেছেন কলকতার বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলে এবং আশুতোষ কলেজে প্রথমে ভূতত্ত্ব নিয়ে ও পরে সিটি কলেজে ইংরেজী নিয়ে | ১৯৭৩-এ বিদেশি সংস্থায় যোগদান করে ১৯৯১ পর্যন্ত সেখানে চাকরি করেন |কিছুদিন বিষ্ণু দে-র ‘সাহিত্যপত্র’ সম্পাদনা করেন এবং ২০০৩ থেকে চালাচ্ছেন ‘ভাষাবন্ধন’ পত্রিকাটি | এর আগে দীর্ঘদিন ‘নবান্ন’ নাট্যগোষ্ঠীর পরিচালনা করেছেন | ১৯৬৮-তে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রথম ছোটগল্প ‘ভাসান’ | প্রথম কবিতার বই ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ ১৯৭২ এবং প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ (পত্রিকায়প্রকাশ: ১৯৯২)| প্রথম উপন্যাস ‘হারবার্ট’ এর জন্য নবারুন নরসিংহ দাস (১৯৯৪), বঙ্কিম(১৯৯৬) ও সাহিত্য আকাদেমি(১৯৯৭) পুরুস্কার পেয়েছেন | কাঙাল মালসাট, অটো ও ভোগী, হালাল ঝান্ডা ও অন্যান্য, মহাজানের অন্য, ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচক, মসোলিয়ম, রাতের সার্কাস, খেলনানগর, ইত্যাদি । ১লা আগস্ট ২০১৪ এই মহান আজীবন বামপন্থী কবি মাত্র ৬৬ বছর বয়সে পরলোক গমন করেন । অগ্নাশ্যয়ের ক্যান্সারে ভুগছিলেন তিনি ।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন