কাল সারারাত – অমিতাভ দাশগুপ্ত

0
207

কাল সারারাত
একটা ছেলেকে ফলো করতে করতে
আমার স্বপ্ন ক্লান্ত হয়ে গেছে।
গোড়ালি-ছেঁড়া পাজাম
আর মভ্ রঙের পাঞ্জাবি পরা
সেই ছেলেটির মুখ কখনো দেখা যায় নি।
স্রেফ ঐটুকু জায়গা
সে ছায়া দিয়ে সব সময় চেপে রেখেছিল।
আর, আমরা তো সকলেই জানি,
কারো মুখ না দেখতে পেলে
তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল
তবে
.       ঐ ছেলেটির ব্যাপার-স্যাপারই আলাদা।
তার ঠোঁটে গুনগুন করছিল
আমার একটির পর একটি
.                  প্রিয় রবীন্দ্রনাথ, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত।
আবার
.        তারই গলার লী লী আগুন ঝলসে উঠছিল—
‘অব মছল উঠা হ্যায় দরিয়া হা’,
‘ভাই সাবধান বড়ি আ তুফান’,
‘ওরা আমাদের গান গাইতে দেয় না
নিগ্রো ভাই আমার, পল রোবসন।’
ওর শরীরের ওপর দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল
মেঘ, পাখি আর লোহার গরাদের ছায়া।
একটির পর একটি ফ্রেম ভাঙতে ভাঙতে
শিকারী কুকুরের কালো দিগন্তরেখা পেরিয়ে
কি অবলীলায় চলে যাচ্ছিল ছেলেটি।

গাঢ় জঙ্গলের বুকচেরা পথে
গোয়েন্দার টর্চের মত তার পিছনে ছুটতে ছুটতে
একসময় চিত্কার করে উঠলাম
—হল্ট!
সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড ব্লাস্টিং-এর শব্দ,
বারুদের ধোঁয়ায় ঢেকে গেল চারপাশ,
পাহাড়ের কলজে-ফাটানো গলায় সে গর্জে উঠলো—
আমি আসছি।

অথচ কাল সারা স্বপ্ন চেষ্টা করেও
তার মুখ দেখতে পাইনি আমি।
আর আপনারা তো সকলেই জানেন
কারো মুখ দেখতে না পেলে
তাকে নিয়ে কবিতা লেখা কতখানি মুশকিল।

কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন 

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন