ফল্গুনদীর ধারা – ২য় পর্ব – স্বপন চক্রবর্তী

হেডস্যার ভিজে ছাতাটা বাইরে রেখে ঘরে ঢুকে খাটে বসলেন। কেমন যেন উস্কোখুস্ক চেহারা। ধূতি আর কোটটাও একটু আধটু ভিজে গেছে । মা স্যারকে একটা শুকনো গামছা দিলেন গা হাত পা ভাল করে মোছার জন্য। সেইসাথে এই রকম আবহাওয়ায় এতটা রাস্তা ভেঙে এই রাত্রে একাকী আমাদের বাড়িতে আসার জন্য একটু অনুযোগও করলেন। বলা বাহুল্যই হেডস্যারের সাথে আমাদের পরিবারের একটা আত্মিক সম্পর্ক ছিল। হেডস্যার মায়ের কথায় কেবল হাসলেন। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন – স্যার, আপনার কি শরীর খারাপ ! স্যার বললেন – না না, এতটা পথ হেঁটে এসেছি ত’ ! তারপর ঝিরঝিরে বৃষ্টি ত’ পড়েই চলেছে । সবমিলিয়ে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। সেজন্যই এরকম লাগছে । ইতিমধ্যে মা স্যারের জন্য জল আর মিষ্টি নিয়ে এসেছেন। সঙ্গে এক কাপ গরম চা। একটা মিষ্টি তুলে নিয়ে স্যার বললেন – বিশেষ দরকারেই এত রাত্রে আসতে হল! কাল সকালে আর সময় পাব না। স্যারের কথায় আমরা কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। বলতে ভুলে গেছি স্যারের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে ছিল।অত রাতে কোন গাড়ী পাবার উপায় ছিল না। তাই এতটা পথ হেঁটে আসা ছাড়া ত’ তাঁর কাছে আর কোন গত্যন্তর ছিল না। কিন্তু কেন ! আমাদের সাথে তাঁর কি জরুরী কাজ আছে যা কাল সকালে করা যেত না ! এই ঘন অন্ধকার, বৃষ্টি,তারপর যুদ্ধের আবহ-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ত’ বিশেষ প্রতিকূলই ছিল।তা সত্বেও স্যার কেন সবকিছু অগ্রাহ্য করে এই রাত্রে আমাদের বাড়ী ছুটে এলেন – বুঝে উঠতে পারলাম না।

সাত পাঁচ ভাবছি । এমন সময় স্যার কোটের পকেট থেকে দুটি খাতা বের করলেন।বুঝলাম পরীক্ষার খাতা। মুড়েঝুড়ে পকেটে করে নিয়ে এসেছেন। খাতাদুটি দেখেই আমার ভয়ে বুক কেঁপে উঠল। এ ত’ মনে হচ্ছে আমার হাতের লেখা। এবার তিনি চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে আমাকে ডাকলেন – স্বপন, আমার পাশে এসে বোস। আমি দুরুদুরু বক্ষে তাঁর পাশে গিয়ে বসলাম।তিনি আমার পিঠ চাপড়ে বললেন – স্বপন, তুই খুব ভাল লিখেছিস। তোদের ক্লাসে সবথেকে বেশী নম্বর তুইই পেয়েছিস। কেবল দুচারটে ছোটখাট ব্যাকরণগত ত্রুটি আছে আর কয়েকটি জায়গায় ইংরাজী ভাষার আরও কিছু উন্নততর প্রয়োগ করা যেত। এই বলে তিনি প্রান্জল ভাষায় আমায় সবকিছু বুঝিয়ে দিলেন। খাতায় কিছু কিছু মন্তব্যও লিখে দিলেন লাল কালিতে। আমি দেখলাম প্রথম পত্রে ৮৭ আর দ্বিতীয় পত্রে ৮৯ পেয়েছি। তিনি আমাকে বললেন – দেখ বাবা, এখানে থেমে থাকলে চলবে না, আসছে বছর দশম শ্রেণীতে নয়ের ঘরে নম্বর তুলতেই হবে ইংরেজীতে। আমরা সবাই অর্থাৎ আমি , দাদা, দিদিরা আর বাবা, মা তাঁর কথার যাদুতে যেন একরকম বিমোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎই স্যার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন – এই রে, রাত দশটা বেজে গেছে। বৃষ্টি আর হচ্ছে না বোধ হয়। আমি চললাম। সে রাত্রিটি আমাদের বাড়ীতে থেকে যাবার জন্য আমরা সবাই তাঁকে অনুনয় করলাম। কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজী হলেন না। বললেন – না না, তা হয় না, আমার জন্য সবাই অপেক্ষা করে আছে । এই বলে খাতাদুটি যেমন করে এনেছিলেন, তেমন করেই কোটের পকেটে রেখে ঝড়ের গতিতে ছাতাটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলেন। রাত্রিটা আমাদের সবারই প্রায় নিদ্রাহীন ভাবে কেটে গেল। একটা চিন্তাই কেবল মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। হেডস্যারের বাড়ী ফিরতে কোন অসুবিধা হয়নি ত’ !

পরের দিন সকালবেলা।যেন এক বিষণ্ণ সকাল। বৃষ্টি না হলেও এক ধূসর মেঘে সারা আকাশটা আচ্ছন্ন। আর প্রকৃতির সেই বিষণ্ণতার ছোঁয়া যেন আমাদের মনকেও ভারাক্রান্ত করেছিল । তখন সকাল আটটার আশেপাশে হবে হয়ত। হঠাৎ দেখি আমার বন্ধু সত্য, যার বাডী আমাদের বাড়ীর খুব কাছেই ছিল, সে খুব হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বাড়ী আসছে । আমি বাইরের ঘরে বসেছিলাম। দেখলাম সে খুব হাঁফাচ্ছে। সেই সময় মা আমাকে চা দিতে আসছিলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন-কি হয়েছে রে সত্য ! তুই হাঁফাচ্ছিস কেন ! এত সকালে এই ঠান্ডা আর বর্ষা , তারমধ্যেও কি তুই ছোটাছুটি করছিলিস নাকি রে ! আসলে আমার এই বন্ধুটি রোজ সকালে উঠে বাড়ীর পাশের
মাঠে দৌড়ত। তাই মা এই প্রশ্নটি করেছিলেন। উত্তরে সত্য যা বলল তাতে আমাদের চোখ কপালে ওঠার যোগাড়। সে বললে – না পিসীমা, আমি গিয়েছিলাম হেডস্যারের বাড়ি। কাল রাত্রি পৌনে নটা নাগাদ হেডস্যার হঠাৎই বুকের যন্ত্রণায় মারা গেছেন। মারা যাবার সময় স্যার নাকি ক্লাস নাইনের খাতা দেখছিলেন । আর যদিও ঠাণ্ডার সময়, তাহলেও স্যারের মরদেহ সারারাত বরফে ঢাকা ছিল।মা বললেন-সে কি ! তিনি বুঝি আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু কি ভেবে যেন হঠাৎই থেমে গেলেন। আমাকেও ইশারায় কিছু বলতে নিষেধ করলেন। আর তাঁর হাতে যে চায়ের কাপটি ছিল সেটি মেঝেতে পড়ে একেবারে সশব্দে ভেঙে চুরমার। কিছুটা চা সত্যর পায়েও ছিটকে গেল। বাবা, দাদা, দিদিরা সবাই সেই শব্দ শুনে বাইরের ঘরে এসে হাজির। সবার একটাই প্রশ্ন-কি হল, হঠাৎ কাপটা কি করে পড়ে গেল ! সত্য কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু মা তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন- সত্য, তুই এখন বাড়ি যা। গিয়ে পাদুটো পরিস্কার করে নে। আমি তোর কথা সবাইকে বলে দিচ্ছি। সত্য একটু অবাক হলেও নিজের পায়ের অবস্থা দেখে আর কিছু না বলে এক ছুটেই প্রায় চলে গেল।তবে যাবার সময় বলে গেল-হ্যাঁ পিসীমা, আপনিঠিকই বলেছেন,আমি চললাম।একটু পরেই স্যারের মরদেহ স্কুলে নিয়ে আসবে। বাবু যেন অবশ্যই যায়। বলা বাহুল্য আমারই ডাক নাম বাবু।

সত্য ত’ চলে গেল, কিন্তু মায়ের মাথাাটা যেন হঠাৎই ঘুরে গেল। সবার হতবাক দৃষ্টির সামনে মা কাঁপতে কাঁপতে সামনের আরাম কেদারায় বসে পড়লেন। এতক্ষণ অনেক কষ্টে মা নিজেকে সামলে রেখেছিলেন, কিন্তু আর বুঝি পারলেন না। দিদিরা তাড়াতাড়ি জলের ছিটে দিলে মায়ের চোখেমুখে। একটু ধাতস্থ হবার পরে মায়ের আর আমার মুখে গতরাত্রি পৌনে নটায় হেডস্যারের দেহান্তের খবর শুনে সবারই বিহ্বলকর অবস্থা। স্যার যদি গতকাল রাত ৮টা ৪৫এ মারা গিয়ে থাকেন, তাহলে গতরাত্রি ৯টায় আমাদের বাড়ী কে এসেছিলেন ! এখনও যে রান্নাঘরে সেই কাপ, ডিস আর গ্লাস রাখা আছে যেগুলি থেকে তিনি মিষ্টি, জল আর চা খেয়েছিলেন ! আর আমাকে পাশে বসিয়ে তিনি যে প্রায় একঘণ্টা ধরে অত কিছু বুঝিয়ে গেলেন ! সবই কি আমাদের চোখ আর মনের ভুল ! না , না , সেটা কিছুতেই হতে পারে না। কিন্তু সত্যর কথা যদি বিশ্বাস করতে হয়, তাহলে গতকাল রাত্রির ঘটনার কি ব্যাখ্যা দেব আমরা !
যাই হোক্ কিছুটা অবিশ্বাসী মন নিয়েই আমরা কিছুক্ষণ পরে সকলে বিদ্যালয়ে গেলাম । দেখলাম, সত্যিই সেখানে হেডস্যারের মৃতদেহ শায়িত আছে। মনে হল আমাদের দেখে তাঁর মুখে একটা হাসির ঝিলিক খেলে গেল। আমরা যেন নিজেদের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না। সবার মুখেই শুনলাম যে স্যার গতকাল পৌনে নটা নাগাদই শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেছেন । কিন্ত স্যারের যদি গতকাল রাত্রি নটার আগেই দেহাবসান ঘটে থাকে তাহলে রাত্রি নটার সময় আমাদের বাড়ী কি ভাবে এলেন ! কিছুতেই যে অঙ্কটা মেলানো যাচ্ছিল না। তবে কি স্যার আমাকে এতটাই ভালবাসতেন যে মৃত্যুর পরেও আমাকে সঠিক পথনির্দেশের মাধ্যমে সেই স্নেহের পরিচয় রেখে গেলেন। অশ্রুর বন্যায় বুঝি ভেসে গেলাম।