প্রথম ভালোবাসা চল্লিশ বছর-বিকাশ দাস

0
44

যার চাহনি উঠতে বসতে বারবার মনে পড়ে যদিও এখন সে অন্য ঘরে অন্যের সাথে বাস করে। অতীতের সব আলোরবাতি নিঃসঙ্কোচে নিভিয়ে আসন্ন দিনের সদর দরজায় নতুন দোসর ধরে। তখন চন্দ্রিমা যৌবন সম্পন্না যুবতী নারী। আমি তখন কিশোর বেলা সবে উৎরে যৌবনের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে তার আদুরী হাত ধরে । আমার বেড়ে ওঠার অর্থময় অলিন্দ পেরিয়ে গাছের ডালপালায় আমি তার ভালোবাসার বিহঙ্গ। কারণে অকারণে একান্ত আপন তপ্ত দুপুরের ছাদে কখনও লুকিয়ে চুরিয়ে অন্ধকারে এক দু’জনার শরীর স্পর্শ করে , হঠাৎ বিশেষ পরীক্ষার পড়ার অজুহাতে নিমগ্ন প্রেম চোখের পর্দা ভিজিয়ে ঘরে।
খেলতে খেলতে খেলার শৃঙ্খলা নিয়ম ভেঙে ভালোলাগার দাগ কখনযে তার গায়ে আমার গায়ে লেগে ছিলো। কে কাকে প্রথম ভালোবেসেছিলো আজও প্রশ্ন এক দু’জনের কাছে। সাজানো অক্ষরে আমার পড়ার বইয়ের সব পাতা হয়ে উঠলো তার কোমল স্নিগ্ধ স্বভাব যেন আমার দর্শন বিজ্ঞান অঙ্ক ভূগোল ইতিহাস নিংড়ে এক আলাদা নিজস্ব সাহিত্য। বুকের ভেতর কচি মন শিশিরের জলে মনের কানন শরীরের স্বাদ ধরে রাখার প্রত্যয় । যদিও জ্বালার আরাম এক তরফা একরোখা আমার ভালোবাসা হৃদয়ের দিগন্ত ছড়িয়ে কুয়াশার হিমে সরাসরি সম্মতির অপেক্ষা চোখবুজে লতায় পাতায় জড়িয়ে নিলাম পাখিদের মতো ঘরের ভেতর সমস্ত আকাশ । তার গন্ধ রূপসী চুলের মনকাড়া বিন্যাস আমাকে তাড়িয়ে বেড়াতো । আমার মনের মধ্যে জেদ বেড়ে উঠলো দ্রুত বড়ো হওয়ার ইচ্ছে । সকাল সন্ধ্যে তার বাড়িতে আমার হাজিরা দেওয়া হয়ে উঠলো আমার রোজকার কাজ । একদিন কামাই মানে হাজার জেরার পর পেতাম মুক্তি । নির্জনে ভেসে যেতাম ছোটো ছোটো দুষ্টুমির ভালোলাগার স্রোতে ।

তার স্কুল আমার কলেজ কাছাকাছি আলাদা আলাদা শহরে। সময় ধরে ট্রেন ধরা । ভিড়ের মধ্যে গায়ে গা লাগিয়ে বিভিন্ন সাংকেতিক ভাষায় চলতো আমাদের কথা। রাগ অভিমান । ইচ্ছে করে বৃষ্টিতে ভেজা চড়া রোদে লম্বা পথ হেঁটে যাওয়া বয়সিনী মেয়ের মতো আমাকে কড়া শাসনে বলা আগে পড়াশোনা আমার ভবিষ্যৎ তারপর সব কিছু। চেষ্টার তিমিরে ছুটতে লাগলাম কখন আমি বড়ো হবো তার সোহাগের আলো হবো। মেঘ দুপুরে নিরিবিলি গাছের নীচে দু’হাতের নগ্নতায় আমরা দু’জন আকাশের অন্ধকারে খুঁজে নিতাম প্রেমের সাহস এঁকে আগামী দিনের সংসার ভাগ করে নিতাম তার কাজ আমার কাজ নিজেদের দোষগুণ শুধরে নেওয়ার শপথ। অন্যথা কথার খেলাপ হলেই আড়ির ভয় দেখানো । তার কথা ঠিকমতো শুনলে আমাকে আরো বিশেষ কিছু দেওয়ার প্রলোভন।
সরস্বতী পুজো মানেই বাঁধন ছাড়া প্রেম। নিজের পাড়া ছেড়ে দূরের পাড়ায় ছুটে যাওয়া ভেসে ভেসে পথের বাতাসে খবরের কাগজ বিছিয়ে প্রান্তরের ঘাসে বসে ঘাস ছিঁড়ে হাল্কা আলোর উচ্ছ্বাসে সারাদিন সুরের বীথিতে তার দু’চোখের বিভায় খুঁজে নিতাম আমার পৃথিবীর সংসার ভরা আঙিনা । শরীরের গন্ধে আমাদের প্রেম ঘাসে ঘাসে ছড়িয়ে বুকের উপর হাত রেখে মাথার বিথানে সাজিয়ে নিতাম নিজেদের অন্তহীন নভোনীল আকাশ ।

শুরু হলো বয়সের সামঞ্জস্য মানিয়ে তার ফ্রক ছেড়ে শাড়ি পড়া । বয়স থাকতে কন্যের বিয়ের বাঁধনে বেঁধে দিতে মায়ের শাসন কড়া । যখন তার ষোলো আমার কুড়ি । আমাদের এ’চুপ প্রেম ছড়িয়ে পড়লো স্কুল বাড়ির উঠোন থেকে পরিচিতির ঘরে সেখান থেকে শুরু আগুন লাগার মতো দু’জনের পরিবারে ঘি ঢালার মতো করে । আমার ছুটে আসা তার বাড়ি; তার ছুটে আসা আমার বাড়ি, হলো বারণ কথায় কথায় দেখান হলো হাত পা ভেঙে দেওয়ার ভয় । সবাইকে জানিয়ে দিয়ে একঘর করার মতো । শুধু পড়ে থাকলো জানালার উঁকিতে এক দু’জন কে দেখার সময় এড়িয়ে পরস্পরের ঘর বাড়ির চোখ । দৃষ্টির তেষ্টার আদানপ্রদান নিয়মকরে নানান পরিকল্পনার ছক কষে মেখে নিতাম সান্ত্বনার বিলাস তার অতল চোখের চাওয়ায় । তার রূপের অরণ্য লন্ঠনের আলোয় জ্যোৎস্নার ঝিলিক তুলে কলমে কলমে লিখে ফেলতাম অজস্র অবুঝ কবিতা আমার একান্ত তৃষিত চোখে । তার বহুবর্ণ সোহাগ উত্তেজনার শরিকে জিরিয়ে নিতাম আমি নিজেকে ।

আমি ভাঙলেও আমার ইচ্ছের তোলপাড় কিছু করার আবেগ দিশেহারায় কি ভাবে তাকে তুলে পালিয়ে যাওয়া । যদিও আমার ভাবনার ভেতর সাহস ছিলো মৃত নিরুপায় । আর কিছু না হোক অগোচরে প্রেমের বিনিময়ে নিজের রক্ত বিলিয়ে দিতাম । তার কতোটা কষ্ট কতোটা জীবন নষ্ট আমার কতোটা কষ্ট কতোটা জীবন নষ্ট এক দু’জনের চোখে চোখ রেখে গুছিয়ে নিতাম ভালোবাসার বাগান বাড়ি ।
অগত্যা তার কৈশোর যৌবন আমার কৈশোর যৌবন কোন সওয়াল জবাব না করে নিজের নিজের অরণ্যে বোবা থেকে গেলাম । দু’জনের ভালোবাসার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বুক ফাটিয়ে বলতে পারলাম না আমি তার ভাত কাপড়ের দায়িত্ব নিচ্ছি । সেও মুখ খুলে জেহাদ করলো না আমি বিমলদাকে ভালোবাসি । ঘর করলে তার সাথেই করবো । আমাকে জোর করোনা । জীবন দিয়ে দেবো বলে ভয় দেখালে হয়তো দু’টো জীবনকে আলাদা করতে পারতো না তার পরিবার । তার ঘরের মানুষ নিশ্চয় অপেক্ষা করতেন । যদিও আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে সাংসারিক সম্পর্ক ছিলো । বিশেষ আদর আপ্যায়ন ছিলো ।

সেও সব নিয়তি মেনে নিশ্চুপ ভাগ্য জেনে নজর বন্দী ঘরে দু’জনের একাকী জীবন প্রেম গড়তে পারে প্রেম ভাঙতে পারে অর্চনার চুড়ায় বিসর্জন দিয়ে নিজেকে।
আজ মনে হয় কেন সেদিন পালিয়ে গেলাম না। প্রথম প্রথম হয়তো অনেক ঝুঁকি সামলাতে হতো। একটু একটু করে সামলে নিতাম । ততদিনে আমরা দু’জনে আইনের ধারায় বিয়ের বয়স পেরোয়নি। অন্যদিকে পুলিশের ঝুঠঝামেলা । সে সময় আর বিধাতা দিলোনা ।
যদিও আমার বাড়ি আমার মতামতের উপর আমাকে একা ছেড়ে দিয়েছিলো । আর তার বাড়ি তার ইচ্ছের মতামতের দরজায় কঠিন খিল দিয়েছিলো । একটু সাহস নিয়ে খোলা আকাশের নীচে এসে দু’হাত খুলে নিত্য দিনের সংসার বেঁধে নিতাম অন্ধকারের বিদ্যুত সরিয়ে অজস্র আলোর কুচি ছড়িয়ে দু’জনে । যদি দু’জনের নার্ভে সাহসবোধ থাকতো । আঘাত আসবে বলে মনের নিসর্গ ছেড়ে দেবো সহজে এতো হতে পারেনা ।

আমি তখন উপার্জনের অনেক দূরে দাঁড়িয়ে ছিলাম। দু’হাতের শ্রম বেচে সংসার করার মতো জোর না থাকার মতো।
দিন যেতে যেতে সে ক্রমশ স্বাভাবিক হয়ে উঠলো পিছুটান হারাতে লাগলাম বুকের পাঁজরে হৃদয় ভেঙে এক দু’জনের অনেক দূরে সরে গেলাম জীবিকার উদ্দেশ্যে। পেটের দায়ে । কথা দিয়েছিলাম তার ঠোঁটে হাত রেখে আমি আছি। আমি আসবো । ভালো টাকার চাকরি নিয়ে। শুধু তাকে বলেছিলাম একটু অপেক্ষা করো। ঘরকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে একটু সময় চেয়ে নিও। ততদিনে তুমি বড়ো হয়ে উঠবে মানে আইনত বিবাহ যোগ্যা যুবতী।

আমি কোলকাতা ছেড়ে সোজা বাঙ্গালরে । সামান্য চাকরি সঙ্গে পড়াশোনা কেননা তাকে আমার হাসিল করতে হবে । এ সর্পিল সময়ের মধ্যে সব কিছু তাড়াতাড়ি সেরে নিতে হবে । পৌঁছে নিয়মিত আমি তার খোঁজ নিতাম সেও আমার খোঁজ নিতো ডাক পোস্টকার্ড মারফৎ । মাঝে মাঝে অন্তর্দেশীয় আঠা বন্ধ খামে। ধীরে ধীরে ক্রমশ চিঠি লেখা লেখি কম হতে লাগলো । কাজের চাপে হাঁপিয়ে উঠতাম তবু জোর হারাতাম না । তখন বিদেশে নিজের দেশ বলতে শুধু তার এক কপি ছবি লুকানো আমার পার্সে ।

একদিন হঠাৎ বেজে উঠলো সানাই শঙ্খ উলুধ্বনির স্তুতির উপস্থনায় তাকে বিয়ের বাধনে বেঁধে দেওয়ার তোড়জোড় ।
চোখের থেকে পানপাতায় লজ্জা সরিয়ে হোমের আগুনে কুলোভর্তি খই ছড়িয়ে বিধিলগ্ন সম্মত সাতপাক নিঃশব্দে উত্তীর্ণ করে ঘরের পছন্দ মানুষের সঙ্গে জোড় বেঁধে নির্ভয়ে ঘরের তিন মুঠো চাল ঘরের আঁচলে ফিরিয়ে দিয়ে এক সত্যির বন্ধন ছিঁড়ে আর এক সত্যির যাপনে আলতা পায়ে আজ সে গিঁঠ বাঁধা নিজের সংসারে । সিঁথির সিঁদুরে নতুন ঘর আলো করে ।

কি তার নিষ্ঠুর অভিমান । তার একবার আমাকে জানানোর প্রয়োজন বোধ হলো না । আমার জীবনের কাঠ জ্বালিয়ে তার জীবনের মৌতাতে বুঁদ নতুন উদ্দাম উল্লাস রাঙা করে তার যৌবন কুসুম এক নতুন পরিচয়ের বহ্নিতাপে । পাগলের মতো খুঁজতে লাগলাম হৃদয় খুঁড়ে যতো দূর যাওয়া যায় ।
এই পৃথিবীর সব কাঠামো নিজের হাতে ভেঙে চুড়ে এক নিজের মাটি দলে ঘর বানিয়ে তার বসতি সাজাই নতুন উৎসুকে । এক দু’জনের চোখের মাদকাতায় বেঁচে থাকি বাকি জীবন । স্বর্গ থাক পৃথিবীর বেড়ায় পৃথিবীর নিজস্ব মাপ কাঠে । হাজার প্রশ্ন তার কাছে ছুঁড়ে কেন এমন করলে ? শুধু কি শোবার ঘর দিতে পারলাম না বলে কিন্তু দু’বেলা দু’মুঠো দিব্যি খেতে দিতে পারতাম । আমার বুকের বিছানায় চোখের মশারিতে তোমাকে নিশ্চয় সুখে রাখতাম।

বেঁচে থাকার তাগিতে ছুটলাম ঘরের আরো অনেক দূরে পড়াশোনার ধার ভেঙে অন্ন সংস্থানের খাতিরে ক্রমশ হারিয়ে অন্য সৃষ্টির গোচরে সবার মধ্যে থেকেও একা হয়ে আছি একদা আমাদের ছোটো বয়সের ছোটো ছোটো কথা তুই তোকারি সবার আড়ালে অভিমান দিব্যি কাটা লুকিয়ে দেখা পড়ার বইয়ের পাতায় কাগজের টুকরো ভাঁজ করে রাখা ইশারায় বলা একবার দেখে নিস , বিকেলে মানু পিসির ফাঁকা পুকুরে আসিস সূর্য ডোবার আগে , ওই রঙের ফ্রকটা পড়িস , কাল অবশ্য সেই শাড়ীটা পড়ে আসিস, একটা চুমু ইত্যাদি মাঝে মাঝে বকাঝকা তাকে, ইশারায় বলা তোর ব্রা ঠিক কর, ফিতে দেখা যাচ্ছে । সে আমার সূর্যোদয় সে আমার সূর্যাস্ত বিছানার চাদরে । প্রথম অন্তিম প্রতিমান । মদির আলোর তাপ তার গায়ের অল্প স্পর্শ প্রতিদিনের জীবন আচমন নদীর ঢেউ এ সাগর মন্থন ।
যেন পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ আমাদের চোখে মুখে এক অপরের সঙ্গের ঘোরে টুক টাক শব্দের কবিতা উজিয়ে ।
আমরা পৃথিবীর কদম্বতলায় প্রেমের কাহিনী । রোজ তাকে দেখা চাই একদিন বাদ পড়লে যেন মনে হতো পৃথিবী দূরে সরে যাচ্ছে আমরা তলিয়ে যাচ্ছি মাটির গর্ভে ।

একসাথে টুকটাক কেনা বাজার করা , আমার পছন্দের চুড়ি ফিতে কেনা সঙ্গে খাতা পত্র । সেই পাহাড় বেড়িয়ে আসা পুজো পার্বণ উৎসবের দিন দেরি করে বাড়ি ফেরা । আমাদের বাড়ির লোক ঘরের মতো আমাদের দু’জনকে ভালোবাসতো বলে বেশ ঢিল ছিলো । এক দু’জনকে নির্বিকারে দেখা । সুযোগ বুঝে অল্প বিস্তর জড়িয়ে পোশাকের তলায় হাত রেখে দুর্বোধ আদর উদ্দাম দুরন্ত শান্তি খুঁজে অবাঞ্চিত নিঃশ্বাসের সুরভিতে । তার কপালের টিপে আকাশের চাঁদবাতি দেখা । সর্বদা এই ভাবে কাছে থেকো বলে কথার উপর কথা রাখা । অস্থির চোখ একদিন দেখা না পেলে মনে হতো রক্তাত সংশয় অজুহাত খুঁজে তার বাড়ি ছুটে যাওয়া । কাকা কাকিমা দিদি বোন সবাই বলতো তোদের বিয়ে ধুমধাম করে দেবো । তবু তার আর আমার ভীতি ছিলো যদি আমাদের সম্পর্ক মেনে নিতে তাদের পরিবার নারাজ । সে যেন আমার জীবিত থাকার অক্সিজেন আমি যেন তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে ।
যখন হৃদয় ক্লান্ত প্রাণ দুর্বল, এক মাত্র ঈশ্বর সহায় । সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবেন । তার জীবন দান তার কারণ যতদিন সুখ দেবেন কষ্ট দেবেন । ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে আলাদা রাখবেন বা কাছে রাখবেন । তিনি জানেন । যদিও ভালোবাসার যুদ্ধে জেতার সালিসি বড় নয় কৌশল সাজানোটা বড় ।

আমিও আজ চাকরি বাকরির পাট চুকিয়ে সুখদুঃখের ষাট পেরিয়ে সহধর্মিণীর সাথে এক ছেলে নিয়ে ব্যস্ত নিজের সংসারে ।
তিন যুগ কেটে গেছে তার মুখ অক্ষরে অক্ষরে দৃষ্টি ভরে পাড়া শহর কাল সব বদলে অন্য জ্যামিতির কাটাকাটি ধরে জন্ম মৃত্যু বিবাহ প্রেম তলিয়ে দেখার অঙ্ক কষার যুক্তি ধরে অনুভূতির একছিটে কালির উষ্ণ উৎসার সাজানো যাদুঘরে আমার হৃদয়। প্রত্নবিৎ।

এতদিন কেউ কারো খোঁজ রাখিনি নিজের নিজের দুনিয়ায় নজর বন্দী ছিলাম। যেখানে সব শেষ সব ভাঙা সময় আবার জুড়ে নিজের কষ্ট টা বাড়িয়ে আর কি হবে । আমি সুখে আছি সে সুখে থাক এর চেয়ে আর কি প্রার্থনা থাকতে পারে।

হালফিলে খোঁজ পেয়েছি সে এ শহরের খুব কাছাকাছি আছে। যোগাযোগ করে কথা বলেছি। উত্তর পেয়েছি। এখন জন্মের মূল্য নেই। দিন যাপনের দাম দিতে হবে নিজের নিজের সংসারে। সে তার মেয়ের বিয়ে দিয়েছে। আমার ছেলের ও বিয়ে দিতে হবে। কখন-সখন
দু’জনের সংসারের খবর রাখি অপরিচিতির মতো। স্মৃতির দুয়ারে অভিমান।

তার শিশুসুলভ স্পর্শ আমার আয়নায় জীবন্ত দৃশ্যের মতো তার হৃদয় আমার শরীরের মন্দিরে রোজ সূর্য ওঠার মতো শুভ সকাল আলোর আড়ালে সূর্য ডোবার মতো শুভ রাত্রি স্বপ্নের নীবিড়ে।
শুধু আমরা এক দু’জনের দূরে আছি কেউ কারো ঘর ভাঙিনি । সময়ের বালুচরে এই ব্যথা এই প্রেম মাটির গল্প মাঠের গল্পের কৈশোর যৌবন মৃত্যুর মতো শুয়ে হৃদয়ের নির্দেশে দ্বিপাতীত পৃথিবীর পালঙ্কে । হৃদয়ের জোগান শুধু হৃদয় দিতে পারে । হৃদয়ের কথা হৃদয় বোঝে বলে হৃদয় হাতড়ে হৃদয় খোঁজে।

অনিদ্রা চোখে তাকে প্রশ্ন করলাম , ছোটবেলার প্রেম ছোটো বলে কোনদিন দীর্ঘ হবে না বলে মাঝ পথেই হাত ছেড়ে দিলে ? পরে জেনেছিলাম সে আমাকে তার শ্রদ্ধার আতরে ডুবিয়ে রেখেছিলো , ভালোবাসতো না। তার বিশেষ বান্ধবীর কাছে শোনার পর আমার জীবনের সমস্ত কোলাহল অকস্মাৎ থেমে গিয়েছিলো । মন মানতে বা বিশ্বাস করতে পারছিলোনা।
কিন্তু সেই তার সোহাগের গান নাগাল ছাড়িয়ে আমার হৃদয়ের স্পন্দনে মিলেমিশে একাকার মন যার খোঁজে না প্রমাণ স্বাক্ষর । কবন্ধের মতো তার সেই চোখের চাওয়ায় কথার গভীর অর্ণব , স্পর্শের শিহরণ কি করে ভুলে যাই ।

জানি, তবু ফেলে দিতে পারিনা তার ভালোবাসা । অস্বীকার করতে পারিনা তার স্পর্শের স্বাক্ষর আমার হৃদয় জুড়ে । আমার জীবনে তার বর্ণনীয় উৎসাহ, আমার মাথা ছুঁয়ে দিব্যি রেখে বেশ কিছু সংকল্প , তার ভালোবাসার অক্ষুণ্ণ সংস্কার আমার উপলব্ধির প্রেরণা। পরস্পরের ভালোবাসায় স্নিগ্ধ দু’জনের না দেখার চঞ্চলতা। কথার ঝংকারে দু’জনের চোখ নির্বিকার , ভিজে ওঠা ঠোঁটের পাতা । এ নিছক ভুল ভ্রান্তি হতে পারেনা । নিরন্তর পদ্ম পাতার জলের আবেগ নিয়ে দিন ফুরোলে হারাবে সরোবর । রাতের তারার মতো সে দিনের আলোয় আমার আকাশে সর্বক্ষণ আছে ঝিলমিল সত্যির মতো। মুক্তোর মতো আমার হৃদয়ের ঝিনুকে জীবনের অতল সাগরে। সে অনন্ত প্রেম নিয়ে সময়ের অন্ত্যনিলে নিস্তব্ধতা ভেঙে আমার জীবনের চরাচরে ।

আজ হয়তো চল্লিশ বছর পর তার চোখে ঘুম আসে ওষুধের মাত্রায় বিছানায় শুয়ে বলে পাশের প্রিয়কে এখন কতো রাত । হৃদয় সুস্থ রাখার দায়ে জলের উচ্ছ্বাসে দু’চোখের পাতা ভিজিয়ে নিতে অস্থির । নক্ষত্রের আলোয় খুঁজে নিতে কতোটা বিক্ষত জর্জর হৃদয় ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়ে । কাদের নোঙর ফেরেনি এখনও ঘাটে । কারা ভালোবেসে রোজ বসন্তের রাত খুঁজে নিয়েছে হৃদয়ের বন্দরে। কারা ভালোবাসার শিশির ছুঁয়ে কুড়িয়ে নিয়েছে সমুজ্জ্বল সকাল। কারা শিউলি ফুলে দু’হাত ভিজিয়ে ছোটো বেলার শিশু সুলভ ভালোবাসা কৈশোর যৌবনের দুয়ার ডিঙ্গিয়ে বার্ধক্যের শরীরে মেখে আজও শতাব্দীর নীলে লীন ।

তার অল্পবয়সী স্পর্শে উচ্ছলিত আমার যৌবন আজও সঙ্গোপনে মজিয়ে আমার বার্ধক্য । কবির কলমের ধারে কবিতার মতো। স্মৃতিমগ্ন সংক্রামক রোগের মতো। রক্তের কণায় নিদ্রালুপ্ত জীবাণুর মতো। দু’হাতের তালুতে ঈশ্বরের প্রসাদের মতো। বিস্তীর্ণ উল্লাস মোমের আলোয় অদূরের আকাশে চাঁদের নিস্তব্দ রাত্রি অভিন্ন সম্পর্কের অনুমেয় অনুরাগে কোলে মাথা রেখে যেন মরিবার সাধ । সময়ের স্রোতে নিশ্চুপ অশ্রু ফোঁটার মতো আমার দুচোখের শরিক । জানি, ভালোবাসা নদীর ছন্দ নিশ্চুপ হাওয়ার স্রোতে পাথরের সোহাগে সংগীত হয়ে ওঠে পৃথিবীর বাসরে ।
বেপরওয়া হাওয়া হতাশ পায়ে খুঁজে বেড়ায় আমার স্মৃতির ঘায়ে শরীরের রোমে রোমে ভালোবেসে যার স্থিতি গেঁথে রেখেছি নিজের হাতে নিরুপায় নিশ্বাসের সুতোর ফাঁসে । যদিও ইদানীং দু’জনে নিজের নিজের আগামী প্রজন্ম নিয়ে ব্যস্ত সংসারের কোঠা বেঁধে সংসারের সৌরভে।