কাকাই-বিকাশ দাস

0
28

অনেকদিনের ঘটনা। প্রায় চোদ্দ বছরের বেশি হবে। এখনও মনে পড়লে শরীর শিউরে যায়। আমি তখন কলেজের সেকন্ড ইয়ারে সাইন্স নিয়ে পড়ি। মোহনা উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছে। মোহনা আমাদের কয়েটা বাড়ির পরেই থাকতো। দুই পরিবারের মধ্যে বেশ যাওয়া আসা ছিলো। পুজো পার্বণে দুই পরিবার মিলে বেশ হইহুল্লোর করতাম। আমার বাবা আর মোহনার বাবা একই অফিসে চাকরি করতো। মোহনা আর আমার মধ্যে যে একটা আলাদা সম্পর্ক ছিলো সেটা কেউ জানতো না। শুধু আমার মেজো কাকা একটু আধটু আঁচ করতে পেরেছিলো। আমরা সবাই মেজো কাকাকে কাকাই বলে ডাকতাম। বিয়ে থা করেনি। আমাদের সঙ্গেই থাকতো। সব সময় নিজের পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। খুব মেধাবী ছাত্র ছিলো। অঙ্ক নিয়ে মাস্টার ডিগ্রি। গোল্ড মেডিলিস্ট। কাকাই বাবাকে যমের মতো ভয় পেতো। আমার বাবাই অভাবের মধ্যে কাকাইকে এতদূর নিয়ে এসেছিলো।
কাকাই আমাদের কলেজে অঙ্ক পড়াতো। ওর ক্লাস কেউ কোন দিন মিস করতাম না। খুব গুছিয়ে পড়াতো। অঙ্কের ট্রিক্স গুলো খুব সহজে বুঝিয়ে দিতো পারতো। কাকাই কলেজে খুব পোপুলার ছিলো। কাকাইকে সবাই এক কথায় চিনতো।

আমার আর মোহনার প্রেমের ব্যাপারে কাকাই বুঝতে পেরেছিলো বলে মাঝে মধ্যে আমাদের এক সাথে দেখলে টুকটাক ইয়ার্কি করতো। কাকাই সকলের সঙ্গে খুব সহজে মিশে যেতো। ছোটো বড় সবাই মেজো কাকাকে কাকাই বলে ডাকতো। আমার মেজো কাকা সকলের ‘কাকাই’ বলে পরিচিত ছিলো। সকলের সাথে একবারে বন্ধুর মতো ব্যবহার করতো। কারোর কিছু জানার থাকলে কলেজের স্টুডেন্টস হোক, পাড়ার কেউ হোক নিঃসঙ্কোচে কাকাইর কাছে চলে আসতো। কাকাই বাড়িতে থাকলে ছেলে মেয়েদের এক ছোটো খাটো ভিড় লেগেই থাকতো। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলো। এই সুযোগে মোহনা আমাদের বাড়িতে রোজই আসতো। আমারও মোহনার সাথে দেখা হয়ে যেতো। ফাঁকে ফাঁকে কথাবার্তা হতো। আমার মা মোহনাকে খুব স্নেহ করতেন। মোহনার মা ও আমাকে খুব পছন্দ করতেন।

আমাদের বাড়ি থেকে গঙ্গা খুব একটা দূরে ছিলোনা বলে আমি আর মোহনা সন্ধ্যের দিকে প্রায় গঙ্গার ধারে বেড়াতে চলে আসতাম। গঙ্গার পারে বসে আগে কি করবো এইসব নিয়ে আমাদের মধ্যে কথাবার্তা হতো। সমস্যা ছিলো আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে, বিয়ে করার ব্যাপারে কথাগুলো কি করে একদু’জনের ঘরে জানায়। মোহনা প্রায় বলতো চলো কাকাইকে জানায়। উনি নিশ্চয় কোন না কোন উপায় বার করে দেবেন। আমরা দু’জনেই কাকাইকে খুব ভরসা করতাম। মনের কথা খুলে বলতে দ্বিধা হতোনা। বাড়িতে আমার যতো আবদার কাকাইর উপরেই ছিল। বলতে গেলে আমাদের পরিবারের বেশির ভাগ খরচটা কাকাই বহন করতো। বাবাকে খুব সম্মান করতো। বাবা কাকাইর কাছে ঈশ্বরের মতো ছিলো। বাবার মুখের উপর একটাও কথা বলতে পারতোনা। আমার মা কাকাই যা যা খেতে ভালোবাসতো সেই পদ গুলো বেশি করে রান্না করতেন। কাকাইকে যত্ন করে খাওয়াতেন।

ইতিমধ্যে একদিন কাকাই আমাদের হাতেনাতে ধরে ফেলে। আমরা গঙ্গার পাড়ে বসে হাতে হাত রেখে প্রেম করছি। কাকাই পেছন থেকে আমাদের কাঁধে হাত রেখে একটু ঝাঁকিয়ে বলে কি ভাইপো প্রেম করছো? করো করো । এইতো প্রেমের বয়স। পরে হয়তো আর সুযোগ পাওয়া যাবে না। চালিয়ে যাও। কিন্তু মনে রেখো পড়াশোনায় কোন গাফিলতি রাখবেনা।
আমরাতো ভয়ে জবুথবু। কাকাই তুমি এখানে? না কাকাই । আমারা গল্প করছিলাম। তুমি কি যে বলো?
কাকাই হেসে বলে গল্পতো ঘরেও করতে পারো। সত্যি করে বলতো তোমাদের আল্টিমেট কি ইচ্ছে। বিয়ে থা করে সংসার করবে না বন্ধুর মতো থেকে যাবে। না আমার মতো চিরকুমার থেকে যাবি?
আমরা চুপ করে ছিলাম। কিছু বলতে পারছিলাম না।
কাকাই বলে,দ্যাখো বাবু তোমাদের প্রেম যদি সত্যি হয় তাহলে আমি হেল্প করতে পারি। বড়দা বৌদিকে বলে ম্যানেজ করতে পারি। আগে তোমরা ঠিক করে নাও কি করবে।
আমি খুব সাহস করে বললাম কাকাই মাকে বলে আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে দাওনা। বাবা বোধহয় মানবেনা। তোমাকেই সব ব্যবস্থা করতে হবে।
কাকাইর সাথে আমাদের প্রেমের কথা শেয়ার করে মন অনেকটা হালকা হলো। জানি কিছু করতে পারলে কাকাই করতে পারবে। কাকাইর লোকবল আছে।
কাকাই আমাদের অভয় দিয়ে বলে ঠিক আছে দেখি কি করা যায়। এখন আর বেশি মেলামেশা করিস না। তোরা কিছুদিন একলা থাক।
আমরা বেশ কিছুদিন আলাদা আলাদা ছিলাম। এক দু’জনের সাথে দেখা করতাম না । কাকাই যেমন বলেছিলো।

আমি ইতিমধ্যে সিএ কমপ্লিট করলাম। মুম্বাইতে এক মাল্টিনাশান্যাল কোম্পানিতে চাকরিও পেয়ে গেলাম। আমাকে কিছুদিনের মধ্যে মুম্বাই চলে আসতে হবে জেনে মার খুব মন খারাপ। মার তো কিছুতেই ইচ্ছে নেই যে আমি মুম্বাই চলে আসি। এদিকে মোহনা খুব খুশি। বিয়ে থা করে মুম্বাইতে সেটল হবে।
কাকাই আমাকে চুপ করে বলে এবার চিন্তা নেই। যখন তোর চাকরির হিল্লে হয়ে গেলো। তোদের বিয়েটা ও হয়ে যাবে।
আমি বয়স থাকতে বিয়ে করলাম না । কেউ আমায় জোরও করলো না। বিয়ে সাদি করলে আজ মোহনার মতো আমার মেয়ে হতো। আমার কথা থাক।
পিঙ্কু, তুই এখন নিশ্চিন্ত থাকতে পারিস। শুধু মন দিয়ে চাকরি কর। আমি তো আছি। মোহনার খেয়াল রাখবো। সব ঠিক করেই উপরে যাবো।
আমি বললাম, উপরে যাবো মানে?
উপরে কারা যায় তুমি জানোনা? আরে আমার বয়স হচ্ছে তো? ষাট পার করতে আর কতদিন বল। দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

কাকাইর তত্তাবধোনে বছর খানেক পর আমার মোহনার বিয়ে হয়ে গেলো মন্দিরে গিয়ে। চুপ করে এর আগে আমাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়ে যায়। সবকিছু কাকাই ব্যবস্থা করে দেয়। কাক পক্ষি ও টের পায়নি। অনেক বাধা বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিলো কাকাইকে। কাউকে তোয়াক্কা না করে প্রেম পবিত্র বন্ধন জেনে আমাদের দু’জনকে এক করে দিয়েছিলো। কাকাই না থাকলে আমি হয়তো মোহনাকে পেতাম না। একলা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার মতো আমার বুকের পাটাও ছিলোনা। যতো টুকু সাহস পেয়েছি কাকাইর কাছ থেকে পেয়েছি। এর জন্য কাকাইকে শতকোটি সশ্রদ্ধ প্রণাম। কাকাইকে অনেক খড়খুটো পোড়াতে হয়েছিলো আমাদের বিয়েটা সম্পন্ন করতে। অনেক কিছু সহ্য করতে হয়েছিলো। আমার বাবার চোখে খারাপ হয়ে গিয়েছিলো। এই ঘটনার পর আমার বাবা কাকাইর সাথে কোন সম্পর্ক রাখতো না। একেবারে ত্যাজ্য করে দিয়েছিলো। এসব ভাবলে আমাদের খুব কষ্ট হতো।

আমাদের বিয়ে দু’বাড়ির থেকে কেউ মেনে নিতে পারেনি। বিশেষ করে আমার বাবা আর মোহনার বাবা। আমার মা আর মোহনার মা যদিও মনে মনে আমাদের বিয়ে মেনে নিয়েছিলেন।
বিয়ের পর সবার আড়ালে আমরা দুই মায়ের আশীর্বাদ নিয়ে আমি মোহনাকে নিয়ে মুম্বাই চলে আসি। আমি আর মোহনা মুম্বাইতে আছি কুড়ি বছর ধরে। চাকরি জয়েন করার পর কাকাইর পরামর্শ দেয় আগে মুম্বাইতে একটা ফ্ল্যাট কিনে নে । কিছু টাকা আমি দেবো বাকিটা ব্যাঙ্ক থেকে লোন পেয়ে যাবি। তাই কাকাইর কথা মতো মুম্বাইতে এসে ছোটো একটা ফ্ল্যাট বুক করে নিয়েছিলাম। বেশ কিছু মোটা টাকা কাউকে না জানিয়ে কাকাই আমাকে দিয়েছিলো। কাউকে বলতে বারণ করেছিলো। কাকাই বুঝতে পেরেছিলো। আমাদের সম্পর্ক আমার বাবা কিছুতেই মেনে নেবে না। তাই বিয়ের পর আমি মোহনাকে নিয়ে মুম্বাই চলে আসতে পারি আর স্বচ্ছন্দে ঘর করতে পারি। কাকাই আমাদের সব কিছুর অঙ্ক সহজে সোজা করে দিয়েছিলো। কাকাই আর মা মাঝে মাঝে আমাদের ফোন করতো। কিছুদিন ধরে কাকাইর সাথে আমাদের খুব একটা বিশেষ যোগাযোগ করা হতোনা।
আমাদের বিয়ে দু’বছর পর আমাদের প্রথম সন্তান ‘সোহম’ এলো। নামটা মোহনা রেখেছিলো। আমি জিজ্ঞেস করলাম তুমি সোহম নামটা রাখলে কেন?
মোহনা উত্তরে বললো, আমি রাখিনি কাকাই নামটা দিয়েছে। যায় বলো নামটা বেশ সুন্দর হয়েছে। তুমি কি বলো?
মোহনা আমাকে বুঝিয়ে বললো। জানো। আমি কাকাইকে জিজ্ঞেস করে ছিলাম এই নামটা রাখার কারণ। কি বললেন উনি উত্তরে জানো। মোহনা, পিঙ্কু মানে তোমার বরের ভালো নাম ‘সোমাদ্রি’ আর সোমাদ্রির প্রথম অক্ষর ‘সো’ আর তোমার নামের প্রথম অক্ষর মোহনার ‘ম’ আর তোমাদের কাকাই নামের হরিৎ র প্রথম অক্ষর ‘হ’। তাহলে কি দাঁড়ালো। সোহম।
আমার ছেলের অন্নপ্রাশন মুম্বাইতে দিয়েছিলাম । বাবা মা এসেছিলেন । বাবা একেবারে চুপচাপ ছিলো। তিন বছর বিয়ে হওয়ার পরেও। কাকাই বাদে সবাই এসেছিলো। কাকাইর কোন কথা উঠলে বাবা অন্য দিকে চলে যেতেন। না শোনার ভাণ করতেন। মনে মনে বিরক্তবোধ করতেন। বাবা মার সোহম নামটা খুব পছন্দ হয়েছিলো।
একদিন সকাল সকাল ফোন।
কিরে তোরা সব কেমন আছিস ?
আমি বললাম কাকাই কোথা থেকে বলছো? এতদিন পর । তুমি এখন কোথায় আছো?
কাকাইর উত্তরঃ স্বর্গে আছি।
তোমার হেঁয়ালি করার স্বভাব গেলোনা।
না রে। সত্যি বলছি। এবার স্বর্গে উঠবো। আর আধ ঘণ্টা বাকি।
মানে?
মাই ডিয়ার এয়ারপোর্টে আছি।
কাকাইর সোজা বক্তব্য ওসব কথা ছাড়। আগে বল তুই, মোহনা আর আমাদের সোহম মাস্টার কেমন আছে? সোহম বোধহয় হাঁটতে শিখে গেছে। খুব দুষ্টু হয়েছে? নারে! ওকে দেখার জন্য মন ছটপট করছে।
আমি বললাম এসেই দেখে যাও। মা বলছিলো তুমি নাকি বাড়ি ছেড়ে কলেজের কাছা কাছি বাড়ি ভাড়া করে আছো।
কেন?
নারে তুই ওসব বুঝবি না। এখনও তুই বাচ্চা আছিস। আর একটু বড় হয়ে যা সব বুঝতে পারবি।
ওদিক থেকে জবাবঃ পিঙ্কু। মোহনাকে বলে দিস আমি আসছি। এখন আমি কলকাতা এয়ারপোর্টে। বেলা দশটার আগে মুম্বাই ঢুকে যাবো। তুই তোর বাড়ির ঠিকানা হোয়াটশপ করে দে আমাকে। বাকিটা আমি দেখে নেবো।
আমি বললামঃ আমি এয়ারপোর্টে আসছি তোমাকে রিসিভ করতে।
না কোন দরকার নেই। তুমি তোমার অফিস যাও। মোহনাকে ফোনটা দে।
আর দুপুরে কি মাছ খাবে বলো।
ওসব না হয় মোহনাকে বলবো।
আমি মোহনাকে ফোন দিয়ে দিলাম। দ্যাখো কার ফোন। ওদের দু’জনের মধ্যে অনেকক্ষণ কথা হলো। ফোন ছেড়ে
মোহনা আমাকে বললঃ কাকাই আসছে উনার জন্য পাবদা মাছ নিয়ে এসো দুপুরের জন্য। দুধে কালো জিরে বাটা দিয়ে রান্না করবো । তোমার মায়ের মুখে শুনেছি কাকাই নাকি সরসে বাটার ঝালের বদলে কালোজিরে বাটা দিয়ে পাবদা মাছের ঝোল খেতে খুব ভালোবাসে।
আমি পাবদা মাছ এনে দিয়ে সোজা অফিস চলে গেলাম। কাকাইর আসতে আসতে বেলা বারোটার উপর হয়ে যাবে যদি ফ্লাইট লেট না করে।
আমি অফিসে পৌঁছে মোহনাকে ফোন করে বলে রাখলাম। কাকাই এলেই যেন আমাকে ফোন করে তাহলে আমি এসে যাবো। এক সাথেই লাঞ্চ করবো।
কাকাইর ফোন ঠিক বেলা এগারোটায়।
পিঙ্কু তোর শহরে এসে গেছি। উবের বুক করে নিয়েছি আর এক দেড় ঘন্টার মধ্যে তোর বাড়ি এসে হাজির হয়ে যাবো। এর আগে অনেকবার মুম্বাই এসেছি। প্রায় দশ বছর পর আবার মুম্বাই এলাম সব যেন পাল্টে গেছে। তুই পারলে চলে আসিস। জমিয়ে পাবদা মাছের ঝোল আর গরম গরম ভাত খাওয়া যাবে। আমি কিন্তু মোহনাকে বলে রেখেছি উসনো চালের ভাত রাঁধতে। আমার আবার আতপ চাল চলে না।
আমি হাফ ডে অফিস করে ঠিক সময়ে বাড়ি চলে এলাম।
কাকাই আর আমরা সবাই মিলে বেশ জম্পেশ করে লাঞ্চ করলাম। অনেক গল্প হলো।
আমি কাকাইকে বললাম। কাকাই এবার তুমি একটু রেস্ট নাও। শুয়ে পড়ো। তোমার অনেকটা ধকল গেছে। বিকেলে কথা হবে।
কাকাইর সোজা জবাবঃ কি বলিস রে রেস্ট। এতদিন পর তোদের সাথে দেখা সাক্ষাত হলো। তোর বাবাতো আমার সাথে কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ রাখে না । অবশ্য তোর মা মাঝে মাঝে আমাকে ডেকে পাঠায় যখন তোর বাবা ঘরে থাকে না। একটু খেতে ভালোবাসি তাই ভালোমন্দ রান্না করে আমাকে যত্ন করে খাওয়ায়। বৌদির হাতের রান্না তুলোনা হয়না। তোর মোহনা বৌদির সব গুনগুলো পেয়েছে। বুঝলি? ভাগ্য করে বৌ পেয়েছিস। নাও উ র হ্যাপ্পি। কদিন বেশ ভালমন্দ খেয়ে দেয়ে সোজা কোলকাতা হয়ে দেশের বাড়ি মালদা। পরশু বিকেলের ফ্লাইট কোলকাতা ফেরার টিকিট করা আছে।
আমি বললাম মালদা মানে?
এখন আমি মালদায় থাকি। জানিস না ? ও তোদেরকে তো বলেনি। এখন আমি গ্রামের ছেলে মেয়ে পড়িয়ে আমার দিন দিব্যি কেটে যায়। একবার তোরা আয় ওখানে। তোর ঠাকুমা চলে যাবার পর তোরা কেউ ওখানে আসিস নি। তাও নাই নাই করে বারো বছরতো হবে। আমি থাকতে থাকতে একবার বৌমা কে নিয়ে চলে আয়। আমি আজ আছি কাল নেই। কে বলতে পারে বল।
কাকাই আজে বাজে কথা ছাড়োতো। তোমার এমন কি বয়স হয়েছে বলতো? কাকাই যা যা খেতে ভালোবাসে সেটা মোহনা অনেকটা জানতো। সেই মতো ঘরে রানবান্না হতো। কাকাই হামেশার মতো গল্প জমিয়ে দিতে পারে। কাকাইর মতো জুরি মেলা ভার।
কাকাই দুদিন ছিলো । সোহমকে বুকে আটকে রাখতো। সোহমও কাকাইর ন্যাওটা হয়ে উঠেছিলো। কাকাই ফিরে যাবার পর সোহমের খুব মন খারাপ। সব সময় কাকাইকে ঘরের আনাচে কানাচে খুঁজে বেড়াতো। আমাদের হাজার প্রশ্ন করে সোহম বিরক্ত করতো। ওই দাদুটা কোথায় গেলো। আবার কবে আসবে। ওকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমাদের শান্ত করতে হতো।
মোহনার সাথে মায়ের মাঝে সাঝে কথা হতো। মা নাতির খবর নিতো। কাকাই মুম্বাই ছেড়ে চলে যাবার পর আমাদের খুব খারাপ লাগতো। মনে হতো ঘর ফাঁকা। সোহম আর আমরা কদিন বেশ আনন্দের মধ্যে ছিলাম।
মাকে ফোন করে কাকাই এখানে এসেছিলো জানালাম। মা তো শুনেই অবাক।
কি বলছিস খোকা! তোর কাকাই তো এক সপ্তাহ হলো মারা গেছে। মাস খানেক আগে আমাকে বলে ছিলো। বৌদি আর এখানে ভালো লাগছে না। দেশের বাড়ি চলে যায়। ভাঙা ঘর ঠিক ঠাক করে ওখানে ছেলে মেয়ে পড়াবো। বুঝেছি । তোমার দাদার উপর রাগ করে চলে যাচ্ছ?
না না বৌদি সত্যি এখানে একদম ভালো লাগছে না। জানি বৌদি। দাদার একদিন না একদিন রাগ পড়বে আর আমাকে ঠিক ডাকবে। দেখে নিও। পিঙ্কু তো আমার ছেলের চেয়ে কম নয়। বুকে পিঠে করে মানুষ করেছি। ওর কি আমি ক্ষতি চাইতে পারি? দাদা যেন আমাকে ক্ষমা করে দেন।
কি বলছো মা! গত দু’দিন আগে কাকাই আমাদের সঙ্গে এখানে ছিলো। হঠাৎ ফোন করে বলে আমি আসছি। সোহমকে দেখতে।
কাকাই আমাকেও বলছিলো আর শহর ভালো লাগছেনা। দেশের বাড়ি গিয়ে ছেলে মেয়ে পড়াবো। বাকি জীবন এই ভাবেই কাটিয়ে দেবো। বছরে একবার করে তোদের এখানে এসে ঘুরে যাবো।
মার কাছ থেকে কাকাইর মৃত্যুর খবর জেনে মনটা খুব ভারি হয়ে গেলো। মোহনাকে জানালাম। মোহনা যেন ভয় পেয়ে গেলো। আমরা মাঝে মাঝে কাকাইকে ঘরের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে দেখতে পেতাম । যেমন ভয় লাগতো। বুক কেঁপেও উঠতো। মনে মনে আমি আর মোহনা ভাবতাম তাহলে কি কাকাই উপরে যাওয়ার আগে ওর আত্মা আমাদের এখানে এসেছিলো আমাদের সংসার দেখতে । আমরা কেমন আছি। সোহম কে আশীর্বাদ করতে। মাঝে মধ্যে ভালোও লাগতো জেনে কাকাই আমাদের মধ্যে এখনও বেঁচে আছে।
এসব কথা জানার পর মা বললেন তোরা যতো তাড়াতাড়ি পারিস তোর কাকাইর পিণ্ডদান করে আয় তবেই অশুভ কাটবে। কিছু দিন পর আমি মোহনা আর সোহম কে নিয়ে গয়ায় গিয়ে কাকাইর পিণ্ডদান করে এলাম।