এই শহরে ফুলকন্যাদের কোন ছায়া পড়ে না – সিয়াম ওয়াহিদ

গত কয়েকদিন আগে যখন সারা দেশ গরমে অতিষ্ঠ তখন হঠাৎ এক বন্ধু কল করে বললো,-“চল, চন্দ্রিমা উদ্দ্যানে যাই।” ঢাকায় আসার পর থেকে অনেকের কাছ থেকেই চন্দ্রিমা উদ্যানের নাম শুনেছি। সেই থেকে জায়গাটা সম্পর্কে আমার ধারণা খুব একটা ভালো না। শুনেছি সেখানে গেলে নাকি চরিত্রের উপর প্রশ্ন চলে আসে।
তবুও সেদিন বিকেলে সেখানে গেলাম। গিয়ে এক কথায় মুগ্ধ হয়ে গেলাম, পরিবেশ দেখে। সামনে ক্রিসেন্ট লেক, পেছনে শুধু সবুজ আর সবুজ। ঢাকার মধ্যে যেন ছোট এক স্বপ্নের পৃথিবী। সেই থেকে ঢাকার মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা “চন্দ্রিমা উদ্দ্যান”।
আজ তারাবির পর হঠাৎ ইচ্ছা হলো, উদ্দ্যান থেকে ঘুরে আসি। পকেটে সামনের মাসের খরচের পুরো টাকা, গতকাল আব্বু পাঠিয়েছে। ঢাকা শহরে আমার কোন জায়গায় যেতে ইচ্ছা করে না রিকশা ভাড়ার কথা ভেবে। একবার রিকশায় উঠলে একদিনের খরচ শেষ!
কিন্তু আজকে সেই চিন্তা নেই। পকেট গরম।
রিকশা নিয়ে চলে গেলাম উদ্দ্যানে। টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজছে শহর। আমি বসে আছি লেকের পাড়ে। আমার কাছে এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। গান গাইছি-“এক যে ছিল সোনার কন্যা, মেঘবরণ কেশ; ভাটি অঞ্চলে ছিল সেই কন্যার দেশ”
এমন সময় মনে হলো, আমার পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি একটা মেয়ে!
মেয়েটা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো,-“ফুল লাগবে?”
আমি বললাম,-“আমি ফুল দিয়ে কী করবো?”
এই কথা শুনে সে কিছু বললো না। কিছুক্ষণ চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থেকে উল্টো হাঁটা শুরু করলো।
যেতে যেতে বললো,-“নয়তো এতো রাতে এখানে কী!”
তখনই লক্ষ্য করলাম। তার হাতে কোন ফুল নেই। তাহলে আমি ফুল কিনতে রাজি হলে সে আমার কাছে কী বিক্রি করতো?
কৌতূহল থেকেই তার পিছনে হাঁটা শুরু করলাম। কাছকাছি যেতেই সে বলে উঠলো-“এখন আবার কী চান?”
আমি বললাম,-“ফুল নিবো। দাম কত?”
উত্তর পেলাম,-“কই নিয়া যাবেন, কতক্ষণ রাখবেন তার উপ্রে দামের হিসাব হইব।”
আমি বললাম,-“আজ সারারাত আমার। ফুলের দাম কত?”
সে বললো,-“এক হাজার। কই যাইতে হইবো”
আমি বললাম,-” আমি যেখানে নিয়ে যাবো। হেঁটে যেতে হবে।”
এতে সে কিছুটা অবাক হলেও বললো যে, তার কোন সমস্যা নাই।
আমরা পাশাপাশি হাঁটা শুরু করলাম। লালমাটিয়া সিগন্যালের কাছে আসতেই ছোট একটা মেয়ে হাতে কয়েকটা বেলী ফুলের মালা নিয়ে এসে বললো,-“ভাই, ফুল নিবেন?”
আরেকবার এই প্রশ্ন শুনে ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেলাম। নিজেকে সামলে নিয়ে জানতে চাইলাম দাম কত। মেয়েটা বললো, প্রতি জোড়া ১০ টাকা।
আমার একটা মালা হলেই চলবে। তাই ২০ টাকা দিয়ে একটা মালা নিলাম।
সে বললো,-“আমি ভিক্ষা করি না। ১৫ ট্যাঁকা ফিরত লন।”
আমি জানি, এই ফুলকন্যারা খুব অভিমানী হয়। হয়তো সে এখন আমার মুখের উপর টাকা ছুড়ে মারবে।
তাকে এই সুযোগ না দিয়েই আমরা আবার হাঁটা শুরু করলাম।
সাইন্সল্যাব ওভারব্রিজে উঠে আমি সেই প্রথম ফুলকন্যার মুখোমুখি দাঁড়ালাম।
সে এইবার বললো,-“সারারাত কি হেঁটেই পার করবেন?”
আমি বললাম,-“আমার যা ইচ্ছা তা-ই করবো। তোমার তাতে কোন সমস্যা?”
উত্তরে সে কিছু বললো না।
আমরা দুজনেই চুপ। বৃষ্টি বাড়ছে।
একসময় আমি দুই হাজার টাকা আর বেলী ফুলের মালাটা তার হাতে দিয়ে বললাম,-“এখন বাড়ি যাও। আজ রাতের জন্য আর ফুল বিক্রি কোরো না। আর আবার যে রাতে এমন ঝুম বৃষ্টি নামবে সেই রাতের ফুলটাও আমি কিনে নিলাম। ”
এই বলে বাসার পথে হাঁটা শুরু করলাম। আমি জানি, এক জোড়া অবাক চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো ধাক্কা কাটলে সে-ও ছুটে এসে বলবে,-“আমি ভিক্ষা করি না। ট্যাঁকা ফিরত লন।”
তাকে এই সুযোগ দেওয়া যাবে না। হাঁটার গতি বাড়িয়ে দিলাম। রিকশা নেওয়া যাবে না। যা টাকা আছে তাতে আসছে মাসের পনের দিনও চলবে কিনা সন্দেহ।
আমিতো আব্বু অথবা এই ফুলকন্যাদের বুঝাতে পারি না যে,- আমি ফুল কতটা ভালবাসি। আমি ফুলের দামে ফুলকন্যাদের একটু হাসি কিনতে ভালবাসি।”
এখন হাঁটতে হাঁটতে গাইছি,-“দুই চোখে তার আহারে কী মায়া! নদীর জলে পড়লো কন্যার ছায়া।”
আমার পেছনে ফেলে আসা সেই কন্যারা তাদের মায়াভরা চোখে দেখে শুধুই নির্মম পৃথিবী।
মনে হয়, গানের কথায় ভুল আছে। কিছু সংশোধন দরকার