Skip to content

মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে – শুভ রাম

আজ যে শহরটাকে আমি দেখলাম তা আর সেই পরিচিত শহর নয়
এটা যেন ক্লান্ত মানুষের লাশের ওপর দাঁড়ানো
ধোঁয়াটে কোনো যন্ত্রদানব।
যার চোখে লাল আলো, যার কান্না নেই, ক্ষমা নেই,
শুধু গিলে খাওয়ার ক্ষুধা আছে।
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ দেখি একটা পোড়া গন্ধ ভাসছে, আর তার নিচে একটা কালো দাগ;
যেন কেউ আর মানুষ থাকার চেষ্টাই করেনি
মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছে সহজ পথ ভেবে।
আমি থেমে দাঁড়ালাম। দুই সেকেন্ড পরে বুঝলাম
দাগটা কোনো আগুনের না, দাগটা মানুষের অবহেলার।
এই অবহেলাই সবচেয়ে বড় খুনি।
যে মা হাসপাতালের সামনে বসে আছে
সারাদিন ধরে,
যার হাতে প্রেসক্রিপশন আর মৃত সন্তানের ছবি,
আমি তাকে দেখে অনুভব করলাম
আমার বুকের ভেতরও একটা মরা পাখি ছটফট করছে।
এ শহর এত কোলাহলমুখর তবু এত নীরব কেন?
এখানে সাইরেন বাজে, গাড়ির হর্ণ বাজে, শুধু বিবেকটা বাজে না।
আমি তো পাগল হয়ে যাচ্ছি। এখনো দেখি
অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর ভিডিও করে,
লাইক চায়, ভিউ চায়, খ্যাতি চায় কিন্তু?
কিন্তু ন্যায়ের জন্য একবারও গলা তুলতে চায় না।
আমি সবাইকে ঘৃণা করি, হ্যাঁ, প্রকাশ্যেই করি;
যে দালাল রা-ষ্ট্রযন্ত্রের সামনে মাথা নত করে,
যে নিজের ভয়ে নিজের প্রতিবাদ লুকায়,
যে অত্যাচারের সামনে মুচকি হেসে বলে—
“এটা রাজনীতি, এগুলোতে না যাওয়াই ভালো।”
আমি তাকে ঘৃণা করি কারণ সে মানুষ না,
সে শুধু একটা নিরাপত্তাহীন মুখোশ।
আজ মনে হচ্ছে যে কবিতা কেবল প্রেম নিয়ে লিখবে,
শিশির-বৃষ্টি নিয়ে লিখবে তার উচিত প্রথমেই চলে যাওয়া এই শহরের বাইরে।
কেননা এই সময় কবিতা কেবল গদ্যের মতো নরম হতে পারে না,
কবিতাকে হাতে অস্ত্র ধরতে হবে শব্দের ধারালো দাঁ নিয়ে আলো ভেদ করতে হবে।
আমি চাই—
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি চত্বরে; কারখানার প্রতিটি ক্যান্টিনে; গ্রামের প্রতিটি পাটক্ষেতে;
একটা করে মঞ্চ উঠুক! আর সেই মঞ্চ থেকে
কেউ একজন জোরে চিৎকার করে বলুক—
“এ দেশ কার?
যার রক্তে গড়া, তারই দেশ।
যে ভয় পায়, সে অযোগ্য।
যে হাঁটতে পারে না, সে মানুষ নয়।
যে নীরব থাকে, সে খুনি।”
আমি চাই—
এই ভয়ংকর সময়ের সামনে হাজার হাজার কিশোর দাঁড়াক আগুনের মতো,
যারা জানবে মৃত্যুর থেকেও বড় বিষয় আছে।
আর তা হলো মানুষের মুখ তুলে দাঁড়ানোর অধিকার।
তোমরা যদি আমাকে ধরো বন্দী করো,
অন্ধকারের ঘরে রাখো, আমাকে চূর্ণ করতে চাও
তবু পারবে না। কারণ মানুষের শরীর ধরা যায়,
কিন্তু মানুষের অবস্থান ভাঙা যায় না।
আমি যদি মরে যাই আমার রক্ত নদীর সাথে মিশে
নতুন বন্যা হবে,
শুকনো খালে শিরশির শব্দ তুলবে।
আমি যদি মাটি হই;
আমার খুলির ভেতর থেকে ঘাস গজাবে,
আর সেই ঘাসে দাঁড়িয়ে একদিন নতুন দেশের শিশুরা বলবে—
“এখানে এক বিদ্রোহী ঘুমিয়ে আছে,
যে মরে গিয়েও দেশকে ভাঙতে দেয়নি।”
আমি যদি আগুন হই;
জ্বালাবো সেই ঘরগুলো যেখানে সত্য বন্দী থাকে,
যেখানে গণতন্ত্রকে খাঁচায় ঢুকিয়ে‌ মৃতদেহের মতো প্রদর্শন করা হয়।
আমি যদি বাতাস হই;
ছড়িয়ে দেব প্রতিটি তরুণের রক্তে একটা প্রশ্ন—
“তুমি কি ভয় পেয়ে জন্মেছো?”
আমি যদি কিছুই না হই;
আমি তখনো থাকব এই মাটি, এই বাতাস, এই নদীর শব্দে।
কারণ একটা দেশকে ভালোবাসা যায়
দুইভাবে—
নরমভাবে, অথবা তীব্রভাবে।
আমি দ্বিতীয় পথ বেছে নিয়েছি।
এই মৃত্যু উপত্যকা যদি কখনো আবার হত্যার উল্লাসমঞ্চ হয়ে ওঠে। আমি শপথ করে বলছি—
তখনো বারবার, নির্ভয়ে, এই মাটির বুকেই দাঁড়াব
ইনকিলাবের লাল পতাকা নিয়ে।
কারণ এ দেশ আমার। এ দেশ আমরা হারাতে পারি না। এ দেশকে কেবল ভালোবাসার জন্য নয়,
প্রতিরোধের জন্যও বাঁচাতে হয়।
আমি থাকব যতদিন বাংলার আকাশে
এক ফোটা রক্তও শুকায়নি।

মন্তব্য করুন