Skip to content

ফিরে আসে অনিমেষ — চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী

ধীরে ধীরে রাত বাড়তে থাকে। অনিমেষের মাথা থেকে ঠিক তখনই যেন এক নিমেষে এত বছর ধরে বয়ে নিয়ে চলা বিষাদের গাঢ় বোঝা নেমে যায়…

অনিমেষের বেশ মনে আছে আজ ডিসেম্বরের ৪ তারিখ। এটি অগ্রহায়ণ পূর্ণিমার রাত। এবং বছরের শেষ পূর্ণিমাও বটে। দূর থেকে ভেসে আসছে ট্রেনের হুইসিল মাঝেমাঝে, কানে আসে মাঝে মাঝে অদূরের রাস্তা দিয়ে দ্রুত চলে যাওয়া বাইকের ভুটভুট শব্দ। দূরে কোথাও অনেকগুলো পথকুকুর একটানা ডেকে চলেছে। এরপর থাকতে না পেরে অনিমেষ দ্রুত ওর শোবার ঘর ছেড়ে ছাদে উঠে আসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রাণভরে দেখে নেয় রাতের পূর্ণচন্দ্রটিকে। সে পুব আকাশ থেকে উঠতে উঠতে এখন মাঝ আকাশে। রাত যত বাড়বে মনে হয় এই শীতের শুক্লা পূর্ণিমার প্রশস্ত চাঁদও ক্রমশ হেলবে তত পশ্চিম আকাশে। অনিমেষ এরমধ্যে পাঁজিতে দেখে নিয়েছে পূর্ণিমা শেষ হচ্ছে ভোররাত চারটে তেতাল্লিশ মিনিটে। এই শীতে যেন চাঁদেরও খুব ঢেকেঢুকে থাকতে ইচ্ছা হয়। সেও যেন সংকুচিত হয়ে থাকে, পুরোটা মেলতে পারে না ঠান্ডার তোড়ে। নাকি এসব অনিমেষেরই মনের ভুল। সে ঠিক বুঝতে পারে না। ডিসেম্বরে এখনো এখানে তো সেভাবে শীত পড়েনি, একথা জানলেও অনিমেষ এখন যেন ঠান্ডা বেশ ভালোই অনুভব করছে ভেতরে ভেতরে।

এক অদ্ভুত ধূসর শান্ত পরিবেশ চারিদিকে। আকাশে সুস্পষ্ট দুটি নক্ষত্রও চোখে পড়ল অনিমেষের। তারাও নিজে নিজে প্রোজ্জ্বল এই রাতে। অনিমেষ ভাবে এত এতগুলো বছর চলে গেল, তবু সে কেন ভুলতে পারেনা আজও শ্রেয়সীকে! পূর্ণিমার রাত এলে তার যেন আরো বেশি করে পুরনো স্মৃতিগুলো উথলে ওঠে। পূর্ণিমা রাতের অকাতর জ্যোৎস্নাতেই তারা দুজনে দুজনকে নির্জনে আবিষ্কার করেছিল একসময়, আবার এই এক অভিশপ্ত পূর্ণিমার রাতেই শ্রেয়সী তাকে আবেগহীন কণ্ঠে জানিয়েছিল তার আলাদা হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা।

অনিমেষ অনেকবার ভেবেছে, শ্রেয়সীকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করবে, কেন সে এরকম করল! সে তো শ্রেয়সীর জন্য দুঃসাধ্য হেন কাজ নেই, যা করেনি! তাও কেন সে তার ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র মনে রাখল না, হারিয়ে গেল ধূমকেতুর মতো তার জীবনে হঠাৎ এসে হাজির হওয়া বয়সে বেশ ছোটো ঋকের সঙ্গে। কিন্তু পারেনি। বিপন্ন অবস্থাতেও শেষমেশ নিজেকে কোথাও যেন গুটিয়ে নিয়েছে। নিজের ইগোর কাছে, নিজের আত্মসম্মানের কাছে একেবারে হেরে গিয়ে শেষ হয়ে যেতে পারেনি অনিমেষ। পরিবর্তে ঘরে জানলা দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদেছে অনেকক্ষণ। তারপর শান্ত হয়েছে। হয়ে উঠেছে বিষণ্ন ও উদাস। কিন্তু বাইরের কাউকে সচরাচর কিছু বুঝতে দেয়নি।

অনিমেষ তাকিয়ে দেখে শুক্লা পঞ্চমীর এই পূর্ণিমার আলোয় মোটামুটি চারদিক উদ্ভাসিত এখন। এখানে সেভাবে শীত জাঁকিয়ে পড়েনি এখনো, কুয়াশায় ছেয়ে যায়নি পরিবেশ। আশেপাশের গাছপালা জঙ্গল সামনে কালো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটুকু শীত, একটু রুক্ষতা, কিছু বিষণ্নতা সহ্য করে নিতে পারলে প্রকৃতি যে বড় অকৃপণ এখানে।

এই অনবদ্য পরিবেশের সামনে দাঁড়িয়ে অনিমেষ প্রথমবারের জন্য বুঝে নেয় পূর্ণিমা প্রতিটি মানুষের জীবনেই বার বার আসে। পূর্ণিমা কোনোকিছু শেষ হয়ে যাওয়ার চূড়ান্ত ঘোষণা করেনা কখনোই।অগ্রহায়ণের এই ঠান্ডা পূর্ণিমার রাতে অনিমেষ কী যেন নতুন করে আবিষ্কার করে সেখানে। বেশ বোঝা যায় শীতের এই ধূসর চন্দ্রলোকিত রাতের মধ্যে নেই বিচ্ছেদের করুণ আলোর কোনো রোশনাই। বরং সে যেন এখানে প্রথমবারের জন্য খুঁজে পায় চাঁদের মিষ্টি সাদা আলোয় উদ্ভাসিত একটি প্রান্তর, যেখানে অজস্র না-ফোটা ফুলের কুঁড়িগুলো শীতল হাওয়ায় মাথা দোলায়, বিকশিত হওয়ার জন্য সাগ্রহে অপেক্ষমান থাকে।

দূরে কোথাও হচ্ছে বিয়ের অনুষ্ঠান। ভেসে আসছে সুললিত সানাই। ছাদে দাঁড়িয়ে মৃদু ঠান্ডা বাতাসে আকাশের দিকে মুখ উঁচু করে ভালোলাগায় দ্রুত চোখ বুজে নেয় অনিমেষ। আজ রাতটি সে হারিয়ে ফেলতে চায়না। এই শীতার্ত চন্দ্রিল রাত আর মোটেও মন্দ না!

চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী। রাত দুটো।
০৫/১২/২০২৫। শ্রীরামপুর

মন্তব্য করুন