Skip to content

সন্ধ্যাদি- করুণাকর প্রধান

আমি সদ্য ইঞ্জিনীয়ারিং পাশ করে চাকরী পেয়েছি এবং পোস্টিং হলো কলকাতায়। আমি গ্রাম বাংলার ছেলে এবং দক্ষিণের কলেজে পড়াশুনা করেছি। কলকাতায় পড়তে পারতাম কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা কলকাতার কলেজে ইউনিয়ন বাজি ও রেগিং খুব বেশী হয়। কয়েকজন ছাত্র মারা গেছে ও ছাত্রীরা প্রায় নির্যাতিত হয়ে চলেছে। আইন শৃঙ্খলার অবস্থা খুবই খারাপ। মা কিছুতেই কলকাতায় পড়তে দিতে রাজী হলেন না। বললেন “ দেখ বাবা আমরা তোকে কষ্ট করে পড়িয়েছি আর অদম্য চেষ্টা করে এই জায়গায় এসেছিস্ । এখানে বাংলা মাধ্যমে পড়াশুনা করা কত অসুবিধা তুই তো জানিস্। যোগ্য শিক্ষক নেই। সব আধা পণ্ডিতরা দাদা ধরে চাকরী পাওয়া। কোনো কোনো স্কুলে শিক্ষকই নেই। আমি সব বৃথা হতে দেব না। তারপর তোর কোনো বন্ধু এ রাজ্যে পড়ছে ? এখানে আসন সব ফাঁকা পড়ে থাকে”। তাই দক্ষিনের নামকরা কলেজে পড়াশুনা করে ক্যামপাশে নির্বাচিত হয়ে কলকাতায় পোষ্টিং পেলাম। ভাগ্যের পরিহাস দেখুন যে কলকাতার জন্য এতকিছু সেখানেই আসতে হলো।
প্রথমে চাকরীতে যোগ দিয়ে এক হোটেলে থেকে ঘর খুঁজতে আরম্ভ করলাম। আমার অফিস ছিল রাজারহাটে তাই রাজারহাটে ভাড়া পেলে ভালো হয়। দালাল ছাড়াতো ঘর পাওয়া অসম্ভব। একজন দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘর দেখাতে বললাম। সে এক রবিবারে নিয়ে গেল এক কমপ্লেক্সে। একটা দু কামরার ঘর দেখালো। আমি বললাম কমপ্লেক্সটা ঘুরে দেখাতে। দেখলাম কমপ্লেক্সটা ভালো, পরিষ্কার পরিছন্ন, সব রকম সুবিধা আছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার ওখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই ভালো। নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে নজর ছিল কারণ আমি শুনে ছিলাম ঐ রাজারহাটে এক বড় কমপ্লেক্সে সন্ত্রাসবাদীরা আস্তনা গেড়েছিল এবং পুলিশের সঙ্গে গুলির লড়াই হয়েছিল। আমি স্থির ঐ ঘরটা নিয়ে নেব। পরের রবিবার থেকে থাকা শুরু করলাম। আমি কিছুদিন পাশে একটা ছোট হোটেলে খেতাম এবং গেটের দারোয়ানকে বলছিলাম একটার লোক দেখে দিতে। একদিন রবিবার সকালে এক ভদ্রমহিলাকে নিয়ে এল।
ভদ্রমহিলাকে বললাম বসুন কথা বলে নি। দারোয়ান চলে গেল। ভদ্রমহিলাকে দেখে ভালোই মনে হলো। বয়স পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ হবে, আমার চেয়ে দশ এগারো রছরের বড় হবেন। গায়ের রঙ খুব ফর্সা কিন্তু অযত্নে ও অবহেলায় রঙে সে ছটা নেই। শরীরে দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। একটা কম দামের সালোয়ার কামিজ পরে আছেন কিন্তু সেটা ময়লা নয়। শান্ত নম্র। মুখটা মায়ায় ভরা। এককালে রূপসী ছিলেন তা পরিষ্কার বোঝা যায়। আমি জিজ্ঞাসা করলাম “আপনি কোথা থেকে আসেন ?” তিনি মুখ না তুলে বললেন “ আমি পাশাপাশি এক গ্রাম থেকে আসি।“
“পাশাপাশি মানে ?”
“ এখান থেকে বাসে উত্তরে আধ ঘন্টা মতো বাসে গিয়ে এক মাইল হাঁটতে হয়।“
“ বাবা সে তো অনেক দুর। প্রত্যেক দিন সময় মতো আসতে পারবেন তো ? আমার এখানে সাড়ে সাতটার মধ্যে এলে হবে। এক বেলাই রান্না করলেই হবে। আমি রাতে ঐটা থেকে খেয়ে নেব।“
তিনি মুখ না তুলেই বললেন “ আসতে তো হবে।“
“ এই কমপ্লেক্সে আর কোনো ফ্ল্যাটে কাজ করেন ?”
“ ঐ বিল্ডিং এ তিন তলায় এক বাড়ীতে আঠ দশ বছর কাজ করছি।“
“ আর কোনো বাড়ীতে কাজ করেন নি ?”
“ করেছি কিন্তু টিকতে পারি নি। ওরা প্রচণ্ড ঘাটায় ও বাজে ভাবে বকাবকি করে।“
“ আপনাকে মাসে কত দিতে হবে ?”
তিনি যা বললেন তাতে আমি অবাক হলাম। আমি এত কম আশা করি নি।
আমি বললাম “ঠিক আছে, কাল থেকে আসুন।“ তিনি চলে যাওয়ার পর আমি চিন্তা করলাম এরা এত কম মাইনায় কাজ করে। আমরা যে চাকরি করি বা কাজ করি তার প্রথম কারণ খিদে মেটানো। যে খাদ্য প্রস্তুত করে মুখের সামনে তুলে দেয়, তার কোনো দাম নেই। এক একজন সিকারেট ও মদে প্রত্যেকদিন পাঁচশ থেকে হাজার টাকা খরচ করে। আবার কারো গাড়ী দরকার তার কুড়ি পঁচিশ লাখ টাকার গাড়ী হলে হয়ে যায় সে কিন্তু এক কোটির গাড়ী কিনবে আবার যার গাড়ীর দরকার নেই সে ও একটি দামী গাড়ী গ্যারেজে দাঁড় করে রাখে। মানুষ এখন দেখানোর জন্য বহু টাকা খরচ করে কিন্তু ওদের মাসে দুশ টাকা দিতে বুক ফেটে যায়। সমাজে ওদের অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। ওরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে পারে না কারণ ওরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। কারোর সঙ্গে কারো তেমন পরিচয় থাকে না। উপরন্তু ওরা অবহেলিত ও দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসেন। প্রতিবাদ করলে যদি কাজ চলে যায় তাই ভয়ে ভয়ে থাকেন।
পরের দিন থেকে তিনি নিয়মিত সকালে আসেন। প্রথম ক’দিন শুধু নীরবে রান্না করে যেতেন। আমি খেয়াল করতাম, তিনি কাজ করার সময় খুব কম কথা বলেন। নিজের কাজ সুষ্ঠভাবে করে নিস্তব্ধে চলে যেতেন। তাঁর রান্না ভালো, আমার তো ভালো লাগে। তাঁর কাজ পরিছন্ন। সপ্তাহ খানিক পরে একদিন তিনি ডালে তাড়াহুড়োয় লবণ বেশি দিয়েছিলেন। পরের দিন আসতে আমি বললাম “কাল ডালে নুন একটু বেশি হয়েছিল।”শুনেই তিনি থমকে গেলেন। মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। ধরা গলায় চোখ নামিয়ে বললেন“ আমি খেয়াল করি নি বাবু। আর হবে না।” তাঁর এই অমায়িক ব্যবহারে অবাক হলাম। সেদিন রাতে আমার মনে হচ্ছিল এই ভদ্রমহিলার জীবনটা হয়তো অজানা অন্ধকারে ঢাকা! আমি ঠিক করলাম আসছে রবিবার ওঁকে তাঁর অতীত ও বর্তমান জীবনের কথা জানবো।
রবিবারে তিনি আসতে আমি জিজ্ঞাসা করলাম “ দিদি, আপনার নাম কি ?” তিনি লাজুক মুখে আস্তে করে বললেন “সন্ধ্যা” আমি ভাবছি যার গায়ের রঙ ফর্সা তার নাম সন্ধ্যা।
আমি বললাম “ আপনাকে আমি সন্ধ্যাদি বলে ডাকবো।“ তিনি কোনো জবাব দিলেন না। “ “ আপনার বাড়ীতে কে কে আছেন ?”
তিনি বললেন “ আমার স্বামী অসুস্থ, স্ট্রোকে বাঁ পাশ অসাড় হয়ে গেছে, কাজকর্ম করতে পারেন না। আর আমাদের একটি ছেলে আছে, সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে।“
আমি বললাম “ সন্ধ্যাদি একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো। তিনি চুপ করে থাকলেন।
আমি জ্ঞিজ্ঞাসা করলাম “ এই সামান্য টাকায় সংসার চালান ?।
তিনি কিছুক্ষণ পরে বললেন “ চালাতে হয়,টানাটানি আছে। তবে আমি আর এক বাড়ীতে করি, তাঁর ছেলে মাসে যে টাকা দেন তার চেয়ে বেশী টাকা ওঁর বাবা দেন। এছাড়া দরকার পড়লে সাহায্য ও করেন।“
আমি ভাবলাম এখনোও মানবিক মুখ আছে। ওঁর সঙ্গে সহজ হবার জ্ন্য আমি বললাম “ “সন্ধ্যাদি, একদিন আপনার বাড়ী যাব।“
তিনি একটু ভয়ে ভয়ে খুব আস্তে আস্তে বললেন “ বাবু, আমরা খুব গরীব, আপনাকে বসতে দেওয়ার ও জায়গা নেই ।“
আমি বললাম “সন্ধ্যাদি, আমাকে বাবু বাবু না বলে নাম ধরে ডাকবেন”। সন্ধ্যাদি কিছু না বলে অন্য ঘরে কাজে চলে গেলেন। ক্রমে তাঁর জড়তা কাটছে।
পরের রবিবার আমি আত্মীয়ের মতো বললাম “ সন্ধ্যাদি, তোমার বর ভালো আছে?
সপ্তাহে অন্য দিনগুলোতে আমি ব্যস্ত্য থাকায় তেমন কথাবার্ত্তা হয় না। তাই রবিবারে একটু গল্প বলি একাকিত্ব ও একঘেয়েমি কাটে। সন্ধ্যাদি কাজ করতে করতে বললো “ ঐ রকমই আছে।“ কোনো দুর্ঘটনার জন্য দুশ্চিন্তা করতে একটা নির্লিপ্ততা চলে আসে বোঝা গেল তার সেইটাই হয়েছে। আমি একটু রসিকতার ছলে বললাম “ তোমার বিয়ের কথা মনে আছে ? ও বললো “ আমাদের আবার বিয়ে:”
“ কেন কি হলো ?”
“ আমার তখন সতের আঠারো বয়স। আমার ঠাকরদা সঙ্গতিসম্পন্ন ছিলেন। বাবা ছিলেন বড়লোকের বকাটে ছেলে। ঠাকুরদা মারা যাওয়া পর বাবা সম্পদ বিক্রি করে ঠাঁটবাদ বজায় রাখতে গিয়ে অচিরে হতদরিদ্র গেলেন। আমার মা ছিলেন ভালো ঘরের মেয়ে, দুধেআলতা গায়ের রঙ ও যথেষ্ঠ সুন্দরী। ঠাকুরদাই দেখেশুনে বিয়ে করিয়ে ছিলেন। বলেই সন্ধ্যাদি চুপ করে রান্না করতে থাকলো। সম্ভবত জীবনের দুঃখ ও দুর্ভাগ্যকে হজম করার চেষ্টা করছিল। আমি বললাম “ তারপর?”
সন্ধ্যাদি নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে আবার শুরু করলো- “ আমার যখন সতের কি আঠের হবে, সবে মাধ্যমিক পাশ করেছি বাবা সন্ধ্যায় বাড়ী ফিরে মাকে বললেন একটি পাত্রের সন্ধান পেয়েছি। পাত্র একটা কারখানায় কাজ করে, নিজেদের বাড়ী আছে, তার বাবা কাল সন্ধ্যায় মেয়েকে দেখতে আসবে, পছন্দ হলে কোনো দাবী দেওয়া নেই। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে আবার বেরিয়ে গেল। কি জানতো-গরীব ও নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরে মেয়ে বড় হলে যেকোনোভাবে ঘাড় থেকে নামাতে চায়, একটা পেটের যাবতীয় খরচা বেঁচে যায়। পরের দিন ওর বাব মা এলো দেখে পছন্দ হয়ে গেল। মেয়ে পছন্দের দুটি দিক আছে- হয় সুন্দরী হতে হবে, না হয় দাবী বেশী দিতে হবে। এখন নুতন সংযোজন মেয়ে ভালো চাকরী করে। আমি সুন্দরী ছিলাম তাই বিয়ে হয়ে গেল। ভাগ্যকে মেনে নিতে হয়। আমাদের হাতে কিছু করার নেই শুধু মেনে নেওয়া ছাড়া। “
আমি ভাবলাম – যে লড়াই করতে করতে ক্লান্ত হয়ে যায় সে ভাগ্যকে মেনে নেয়। আমার কৌতুহল বাড়চ্ছে তাই বললাম “তারপর”
“তারপর বছর পাঁচেক কোনরকম সুখ দুঃখে কেটে গেয়েছিল। তারপর ছেলেটা জন্মালো। হঠাৎ ওর কারখানা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা অকুল সাগরে পড়লাম। এক বছরের মধ্যে শশুর শাশুড়ী মারা গেলেন। যখন ঝড় আসে চারদিক থেকে আসে। ওর মনকে হতাশা গ্রাস করে এবং মদ খেতে আরম্ভ করলো। নেই কাজ তো খই ভাজ। সেকি কষ্ট। ছেলেটাকে বাঁচাবার আপ্রাণ চেষ্টা। বাড়ীতে দৈনন্দিন অশান্তি। ও মদ খেয়ে রাতে মারধর করতো। আমি সহ্য করে নিতাম। একজন পুরুষ মানুষ যদি আয় না করতে তার মনের যন্ত্রনা কি ভয়ানক তা আমি বুঝি। আমি শুধু ঠাকুরকে ডাকতাম। এক একবার মনে হয়েছে আত্মহত্যা করি কিন্তু ছেলেটার জন্য পারি নি। একদিন আমাার গ্রামের এক দিদি ঐ কাকুর বাড়ীতে কাজের ব্যবস্থা করে দেন। এরপর ওর স্ট্রোক হয় তবে এই কাকু অনেক সাহায্য করেন। “ এই বলে সন্ধ্যাদি কাকুর বাড়ীতে কাজে গেলেন। ঐ সপ্তাহে একদিন সন্ধ্যাদি র।ন্না করছিল, আমি ওর সততা পরীক্ষার জন্য একটি পাঁচশ টাকার নোট বেরোনোর দরজার কাছে ফেলে রেখে স্নান করতে চলে যাই। বেরিয়ে দেখি সন্ধ্যাদি চলে গেছে এবং টাকাটা টেবিলে চাপা দিয়ে গেছে। তার এই টুকু মনের মধ্যে এত বিষ ও অমূত লুকিয়ে আছে তাকে মন্থন না করলে বোঝা যায় না।
প্রায় তিন মাসের পর একদিন অফিস থেকে এসে রাত থেকে প্রচণ্ড জ্বর। রাতে কিছু না খেয়ে শুয়ে রইলাম। ওটাই যাচ্ছে না এত দুর্বল হয়ে গেছি, মাথা প্রচণ্ড ভারী। এর মধ্যে কোনো রকম উঠে দুবার বমি করলাম। এখন শুধু মায়ের কথা মনে পড়ছে। আপনা আপনি চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়েছে। একা থাকার সময় অসুখ বিসুখ করলে মনের অবস্থা যে এত খারাপ হয়ে যায় আগে কখনো বুঝতে পার নি। প্রায় অচেতনের মতো সয়ম কেটে গেল। সকালে ঠিক সাড়ে সাতটার সময় ঘরের বেল বাজলো। আমি উঠতেই পারছি না। কোনোরকম দেওয়াল ধরে ধরে দরজা খুলে ঐখানে বসে পড়লাম। সন্ধ্যাদি ঘরে ঢুকে আমাকে দেখে ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেলেন। আমি ঝাপসা চোখে দেখছি আমার মা আমার সামনে দাঁডিয়ে। আমার বুকে একটু বল এল।
সন্ধ্যাদি আমার গায়ে হাত দিয়ে বললো “ জ্বরে গা পুড়ে যচ্ছে। আমি এসে গেছি, যা করার আমি করবো। তুমি ভয় পেও না।“
সে আমাকে ধরে বাথরুমে নিয়ে মাথায় বেশ করে জল ঢাললো এবং মাথা মুছিয়ে দিয়ে জল পট্টি দেয়ে দিল। তারপর বললো ‘ আমি ঔষধ দোকানে, বলে কিছু ঔষধ নিয়ে আসি।“ আমি ভাবচ্ছি ঔষধ দোকান আবার চিকিৎসা করে নাকি ? আমার মনে হলো শহরাঙ্গলে বিশেষত কলকাতায় ডাক্তার দেখানো একসব দারিদ্র পীড়িত মানুষদের পক্ষে খুবই কষ্টসাধ্য। একে তো ডাক্তারদের ফি আকাশছোঁয়া। এইরকম নুন আনতে পান্তা ফুরায় অভাগাদের পক্ষে দেওয়া অসাধ্য। ডাক্তারদের দেখাতে এক সপ্তাহ আগে বুক করা, চেম্বারে গিয়ে চার পাঁচ ঘন্টা বসে থাকা, ডাক্তার আসার সময়ের কোনো ঠিক না থাক। ভগবানকে সহজে পাওয়া যায় কিন্তু ডাক্তারদের পাওয়া মুসকিল। ডাক্তাররা ঔষধ কোম্পানীদের খুশি রাখতেই দীর্ঘ অপ্রয়োজনীয় ঔষধের লিস্ট ধরিয়ে দেন। এছাড়া প্রচুর রকমের টেস্ট করতে বলেন কারণ ওখান থেকে কিছু শতাংশ আয় আসে। কিছু কিছু মুহানুভব ডাক্তার আছে বলে চিকিৎসা ব্যবস্থাট চলছে। তবুও প্রচুর লোক দক্ষিণের রাজ্যে ছোটেন চিকিৎসা করাতে।এই পরিস্থিতিতে ঔষধ দোকানই ওদের একমাত্র ভরষা। সন্ধ্যাদি ফিরে এল। ঔষধের সঙ্গে মুড়ি, ওটস্ এবং ওআরএস নিয়ে এসেছে। এসেই আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ঔষধ ও আনুষঙ্গিক সেবায় আমার সাড়ে দশটার দিকে জ্বর ছেড়ে ও একটু সুস্থ মনে হলো। সন্ধ্যাদি বললো ও অন্য বাড়ীতে আজ আর কাজে যাবে না এবং বাড়ী সেই রাতে ফিরবে।
আমি জিজ্ঞাসা করলাম “ তোমার মোবাইল আছে?”
সন্ধ্যাদি বললো “না‘।
আমি বললাম “ তুমি বরং এখন চলে যাও। সন্ধ্যের দিকে ঘুরে যাবে। তুমি না ফিরলে বাড়ী লোক চিন্তা করবে। খাওয়ার তৈরী করে দিয়েছ।“ সে আমার কথাই মেনে নিল। সুস্থ হয়ে দুতিনের মধ্যে হয়ে সন্ধ্যাদির জন্য দুটি মোবইল কিনে দিলাম ও মাইনাও বাড়িয়ে দিলাম।
এরমধ্যে সন্ধ্যাদি আমাকে বললো সে আর এক বাড়ীতে কাজ পেয়েছে। দুমাস চলে গেছে। একদিন সন্ধ্যাদি বললো “ ঐ নুতন বাড়ীতে কাজ করা যাবে না”
আমি জানতে চাইলাম “কেন ,কি হলো ?”
“ ঐ বাড়ীর ভদ্রমহিলা বড়ই অমানবিক। মাইনা ঠিক মতো দেন না। এবং তাঁর কথা মতো কথা মতো কাজ না করলে শাসান পুলিশে দিয়ে দেবেন। ভদ্রলোক তাঁর উপর টুঁ শব্দ করতে পারেন না।“
আমি বললাম “ ছেড়ে দাও “।
এর চার পাঁচ দিন পর যখন আমি অফিসে আছি সন্ধ্যাদি ফোন করে বললো “আমাকে পুলিশ ধরে নি্য়ে যাচ্ছে। ঐ ভদ্রমহিলা পুলিশকে বলেছে আমি নাকি সোনা চুরি করেছ।“ বলেই হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো।
আমি বললাম “ ঠিক আছে, এখনি থানায় যাচ্ছি “ আমি থানায় পৌছে দেখি সন্ধ্যাদি থানায় লকআপে গুম মেরে বসে আছে। আমার মধ্যে প্রচন্ড ক্ষোভ হচ্ছে। হে ঈশ্বর, তোমার একি অবিচার: ভালো মানুষকে এত কষ্ট দাও কেন ? সন্ধ্যাদির চোখে এক অসহায় দৃষ্টি। আমি বড়বাবুর সঙ্গে দেখা করে বললাম “ আমার দিদিকে ধরে এনেছেন কেন”
তিনি বললেন “ ওর নামে অভিযোগ আছে।“
আমি বললাম “ অভিযোগ সত্যি না মিথ্যা প্রমান হওয়ার আগে ধরে নিয়ে চলে এলেন ?” উনি বললেন এটা আমাদের আইন।“ আমার একটি প্রবাদ বাক্য মনে পড়লো “ পুলিশ ছুঁলে আঠারো ঘা “ আমি বাইরে কোনো দালাল বা উকিলের খোঁজ করলাম। আমি জানতাম থানার পাশাপাশি ওরা থাকে। একজনকে পেয়েও গেলাম। ওকে সব কথা বলতে ও আমাকে অপেক্ষা করতে বলে থানার ভিতরে গেল ও ফিরে এসে বললো “ দশ হাজার টাকা দিলে এখনি ছেড়ে দেবে।“ আমি বিনা প্রতিবাদে ওর ফোনে টাকা পাঠিয়ে দিলাম ও সন্ধ্যাদিকে ছাড়িয়ে বাড়ী পাঠিয়ে দিলাম। সেদিন তার চোখে যে কৃতজ্ঞতার আভাস দেখে ছিলাম তাতে আমার বুক ভরে গেল
এরপর সন্ধ্যাদির সঙ্গে দিদি ভাই এর সম্পর্ক আরোও গাঢ় হলো। দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে গেল। সন্ধ্যাদির বর একটু করে ভালো হচ্ছে এবং ছেলে খুব ভালো পড়াশুনা করছে। ইতিমধ্যে আমি বেঙ্গালুরুতে ভালো চাকরী পেয়ে গেলাম। সন্ধ্যাদির মনে কি দুঃখ। বলে “অভাগা যে দিকে চায় সাগর শুকিয়ে যায়।“
আমি বললাম “ সন্ধ্যাদি, তুমি চিন্তা কর না। আমি তো আছি, ফোন নম্বর থাকলো। আমরা যোগাযোগ রাখবো। তুমি বরের চিকিৎসা করাও এবং ছেলে পড়াও। ছেলে তোমার অনেক বড় হবে, তোমার দুঃখ দুর করবে। আমি তোমাকে মাসে যে টাকা সেই টাকা প্রতি মাসে পাঠাবো। আমি যেদিন বেঙ্গালুরুতে রওনা দিচ্ছি, , সন্ধ্যাদি ব্লকের সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে,তার চোখ ছল ছল। আমার গাড়ী বেশ খানিক এগিয়ে গেছে পিছন ফিরে দেখি সন্ধ্যাদি গাড়ীর দিকে ছুটে আসছে। গাড়ীর জানালার কাছে এসে বললো “ সময় মতো খেও, শরীরের প্রতি যত্ন নিও”। গাড়ীতে যেতে যেতে ভাবছি “ সন্ধ্যাদি,জীবনে প্রথম চলার পথে তোমার কাছ থেকে যে মানবিকতার শিক্ষা পেলাম তা চিরদিন মনে থাকবে। শুধু জন্ম দিলে মা হয় না, রক্তের সম্পর্কের বাইরেও মমতার দ্বারা মায়ের সম্পর্ক গড়ে উঠতে পারে।।

********************

মন্তব্য করুন