Skip to content

নরক দর্শন – করুণাকর প্রধান

মহাভারতে, যুধিষ্ঠিরের সশরীরে নরক দর্শন একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর, যুধিষ্ঠির স্বর্গে আরোহণ করার সময় কিছু সময়ের জন্য নরক দর্শন করেছিলেন। এটি ছিল ধর্মরাজ যুধিষ্ঠিরের সত্যবাদিতা এবং ধর্মের প্রতি নিষ্ঠার এক কঠিন পরীক্ষা। তিনি দ্রৌপদী এবং ভাইদের সাথে স্বর্গারোহণের জন্য গমন করেন। পথে দ্রৌপদী এবং ভাইরা একে একে ক্লান্ত হয়ে পতিত হন এবং মৃত্যুবরন করেন কিন্তু যুধিষ্ঠির সশরীরে স্বর্গে প্রবেশ বা স্বর্গারোহণ করেন। কুকুর ছাড়া তিনি স্বর্গে প্রবেশ করবেন না বললে ধর্ম কুকুরের রূপ পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরকে স্বর্গে যেতে অনুরোধ করেন। যুধিষ্ঠির তার ভাইদের দেখতে চান। দেবদূতরা তাঁকে নরকে নিয়ে যান। নরকের ভয়াবহ দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত হন। যেখানে তিনি তার ভাইদেরও দেখতে পান। যুধিষ্ঠির আজীবন ধার্মিক ও সত্যবাদী ছিলেন কিন্তু অর্ধসত্য বলার জন্য তাঁকে নরক দর্শন করতে হয় । অশ্বত্থামার মৃত্যুর সমন্ধে যুধিষ্ঠির দ্রোণাচার্যকে বলেছিলেন, যা ছিল তার “সাদা মিথ্যা”। দ্রোনাচার্য যুধিষ্ঠিরের কাছে তাঁর পুত্র, অশ্বত্থামার মৃত্যু রটনা সত্যটা জানতে চান। যুধিষ্ঠির বলেন “অশ্বত্থামা হত ইতি গজ”। ইতি গজ কধাটি এত আস্তে বলেছিলেন কথাটি দ্রোণাচার্য শুনতেই পেলেন না। অস্ত্রগুরুকে এই প্রতারনার কারণেই তাকে নরক দর্শন করতে হয়েছিল। নরকে তিনি তার ভাইদের সাথে কিছু সময়ের জন্য ছিলেন এবং পরে তাদের সাথে স্বর্গে ফিরে যান। নরকের দৃশ্য এতই বীভৎস্ ও ভীতিপ্রদ যে দেখলে মারাত্মক অসহনীয় মানসিক প্রতিক্রয়া হয়।। ইতালীর কবি ও দার্শিনিক দান্তে আলিঘিয়েরি রচিত “The Divine Comedy” কাব্যগ্রন্থের প্রথম ভাগ “Inferno” (নরক)। এটি খ্রিস্টীয় পাপতত্ত্ব ও মধ্যযুগীয় কল্পনার এক শক্তিশালী চিত্র।
হিন্দুধর্ম, খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামেও নরকের উল্লেখ আছে। হিন্দু ধর্মে “যমরাজের নরক” আছে, যেখানে যমদূতরা পাপীদের নির্দিষ্ট শাস্তি দেন I ইসলামে “জাহান্নাম” ভয়ানক আগুনের স্থান, যা পাপীদের জন্য প্রস্তুত। খ্রিস্টধর্মে নরক হচ্ছে চিরন্তন আগুন ও ঈশ্বরহীন এক শূন্যতা। সাহিত্য, কাব্য, পুরাণে নরককে ভয়ঙ্করভাবে আঁকা হয়েছে যাতে পাঠক তীব্রভাবে অনুভব করতে পারেন পাপে শাস্তির ব্যাপকতা। দান্তের “ডিভাইন কমেডি”-তে নরক ৯টি স্তরে বিভক্ত, প্রতিটি স্তরে আলাদা আলাদা শাস্তির জন্য নির্দিষ্ট।
অনেক পুরাণ অনুযায়ী নরক হলো অন্ধকার, রক্তাক্ত, কর্কশ চিৎকারে পূর্ণ, যেখানে সময় থেমে থাকে না—যন্ত্রণাও শেষ হয় না।
নরক হচ্ছে পাপীদের শাস্তি ভোগ করার স্থান। এটি মৃত্যুর দেবতা যমের আবাসস্থল। বিভিন্ন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অনুসারে নরকের সংখ্যা ২৮ টি। নরক মহাবিশ্বের দক্ষিণে পাতালে পিতৃলোকে অবস্থিত I দেবীভাগবত পুরাণে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নরক হল মহাবিশ্বের দক্ষিণাঞ্চল, পৃথিবীর নিচে কিন্তু পাতালের উপরে অবস্থিত। মৃত্যুর দেবতা, যম, যমদূত নিয়োগ করেন, যারা বিচারের জন্য যমের কাছে সমস্ত জীবের আত্মাকে নিয়ে যায়। যমকে তাঁর মন্ত্রী চিত্রগুপ্ত সহায়তা করেন I ভাগবত পুরাণে ২৮ টি নরকের উল্লেখ আছে: তামিস্র, অন্ধতামিস্র, রৌরব, মহারৌরব, কুম্ভীপাক, কালসূত্র, অসিপত্রবন, সূকরমুখ, অন্ধকূপ, কৃমিভোজন, সন্দংশ, তপ্তসূর্মি, বজ্রকণ্ট-শাল্মলী, বৈতরণী, পূয়োদ, প্রাণরোধ, বিশসন, লালাভক্ষ, সারমেয়াদন, অবীচিমৎ, অয়ঃপান, ক্ষারকর্দম, রক্ষোগণ ভোজন, শূলপ্রোত, দন্দশূক, অবটনিরোধন, পর্যাবর্তন ও সূচীমুখ। বিভিন্ন পাপের জন্য বিভিন্ন নরকে শাস্তি দেওয়া হয়।
কথিত আছে নরকে যমদুতরা পাপীদের নানান ভয়ানক শাস্তি দেয়। পাপীকে দড়িতে বেঁধে নৃশংস প্রহার করে। খারার ও জল না দিয়ে দিনের পর দিন ফেলে রাখে। আগুন সলাকা দিয়ে দুচোখ অন্ধ করে দেয়। পাপীদের দেহের মাংস খুবলে নেয়। ফুটন্ত তেল কড়াইতে ফেলে সিদ্ধ করে । তপ্ত তামার টাটে ফেলে রাখা হয়। তরবারি দিয়ে অঙ্গ চেদন করা হয়। কিছু কিছু পাপীকে কলে পিষতেও থাকে। কিছু পাপীকে অন্ধকার ঘরে বন্দি করে রাখ হয় । কোনো কোনো পাপীদের পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া হয় । পাপীদের শুলেও চড়ানো হয় বা সুচ দিয়ে সেলাই করা হয়। এই ভয়ানক শাস্তির জন্য চারিদিক আর্তচিৎকার ও আকুল কান্নায় বিদীর্ণ থাকে।
কবির কথায় স্বর্গ, ও নরক, এই পৃথিবীতে আছে মানুষের মাঝে স্বর্গ-নরক, মানুষই দেবতা ও অসুর। বিজ্ঞান স্বর্গ বা নরকের উপস্থিতি প্রমান করতে পারে নি।
স্বর্গ ও নরক এই পৃথিবীতেই আছে। যদি কেউ চোখ খুলে রাখেন, নিত্যদিন দেখতে পাবেন নরকের মতো বীভৎস্যতা। কাউকে এসিড দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার যন্ত্রনা। দুর্ঘটনায় অঙ্গপ্রতঙ্গ কাটা যাচ্ছে। কেউ অন্ধ হয়ে বেঁচে আছে। কারো কারো খাদ্য নেই আশ্রয় নেই। কেউ কেউ রোগেয় অসহ্য যন্ত্রনায় ভুগছে। ছেলে মায়েদের অপহরন করে নিয়ে পঙ্গু করে ভিক্ষা করানো হচ্ছে। অপারেশানের পর সুচ দিয়ে সেলাই করা হচ্ছে। ক্ষুধার্ত ভিক্ষাশ্রয়ী মানুষ স্টেশনে বা রাস্তার ধারে দিন কাটাচ্ছে। আগুনে জ্যন্ত মানুষ পুড়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, হিংস্রতা, দারিদ্র দুর্যোগের কারণে মানুষের চরম দুর্ভোগে পড়ে আর্তচিৎকার করছে । পৃথিবীর এই সকল দুর্ঘটনার সঙ্গে নরকের শাস্তির সাদৃশ আছে। তাই পৃথিবীর মধ্যে নরক আছে বলা যায়। কথিত আছে যারা পাপ করে, তাদেরকে শাস্তি পেতেই হয়।
গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন “ ত্রিবিধং নরকস্যেদং দ্বারং নাশনমাত্মনঃ৷
কামঃ ক্রোধস্তথা লোভস্তস্মাদেতত্ত্রয়ং ত্যজেত্৷৷॥“
“ কাম, ক্রোধ এবং লোভ এই তিনটি নরকের দ্বার স্বরুপ। অতএব উত্তম ব্যক্তিরা এই তিনটি পরিত্যাগ করেন কারণ এগুলি আত্মাকে অধঃগামী করে। যে সকল ব্যক্তি এইগুলোর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কাজ করেন তাদের নরকে গিয়ে শাস্তি পেতে হয়।“
হয়তো সব ধর্মের দার্শনিকরা অধর্মীয় ও অনৈতিক কাজ থেকে বিরত করার জন্য নরকের উপস্থাপন করেছেন। ষড়রিপু অর্থাৎ কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য ইত্যাদির দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যেসব কাজ করা হয় তাহাই পাপ।

পৃথিবীতে মানুষরা অহরহ নানা যন্ত্রনার দৃশ্য দেখছেন কিন্তু বেশীর ভাগ মানুষের মনে কোনো আঁচড় কাটে না। অনেক মানুষের মন গভীর, অনুভূতিপ্রবণ ও সংবেদনশীল। অন্যের দুঃখ-যন্ত্রণা কিছুটা তাদের হৃদয় বিগলিত করে। ফলে নিজের জীবন ভালো থাকলেও, চারপাশের দুঃখকষ্ট দেখেই কিছুটা ব্যথিত ও সুহানুভূতিশীল হন। এই ঘটনাকে নরক দর্শন বলে না। যার মনে আতঙ্ক, ভয়ের অনুভূতি অবিরাম চলতে থাকে ও নানা ভয়ঙ্কর দৃশ্য মানস পটে উদয় হয় ও তাকে আতঙ্কগ্রস্থ করে তুলে এই মানসিক পরিস্থিতিকে নরক দর্শন বলা যেতেই পারে। সে সব সময় এতই আতঙ্কিত থাকে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। পৃথিবীকে নরক মনে হয়। পৃথিবীর স্বর্গীয় রূপ তার চোখে দেখা যায় না। হয়তো ভাইদের ও দৌপদীর মৃত্যুই যুধিষ্টিরকে বিষাদগ্রস্থ করেছিল। তাই তিনি কিছুদিন মানসিক বিপর্যস্ত ও হতাসগ্রস্থ হয়েছিলেন। এখনো এই ঘটনা ঘটে, সেই কথাই বলবো।
অনিল এক গ্রামের ছেলে। ওর বাবা ছিলেন এক দরিদ্র চাষী। ওরা দুই ভাই এবং অনিল বড়। অনিল ছোটো থেকে বাবার সঙ্গে চাষের কাজ করতো ও পড়াশুনাও করতো। সে ছিল পরিশ্রমী ও কর্মঠ। কাজের পাশাপাশি তার পড়শুনা ও চলতে থাকে। সে মেধার জন্য কম পড়ে ভালো ফল করতো। প্রতিবন্ধতা সত্বেও অনিল পড়াশুনা চালিয়ে যায়। এইভাবে সে উচ্চ মাধ্যমিক ভালোভাবে পাশ করে। অনিলের আরও পড়াশুনা করার স্বপ্ন ছিল। তাই সে তার বাবাকে বললো “ বাবা, আমি আরও পড়াশুনা করতে চাই।“
বাবা বললেন “ দেখ বাবা, আমাদের আর্থিক অবস্থা তুই জানিস। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। বামন হয়ে চাঁদের দিকে হাত বাড়ানো বোকামী। তারপর ধারধোর করে আর কিছুটা পড়ে চাকরী যে পাবি তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। বেকার হয়ে গেলে দুকুলই যাবে, না চাকরী পাবি না চাষের কাজে পরিশ্রম করতে পারবি।“
অনিল চুপ করে থাকল। সে কলকাতায় যাওয়ার চেষ্ঠা করতে থাকে। সে জানতো তার গ্রামের এক দাদা কলকাতায় ছোটখাটো কাজ করতো। দাদা বাড়ী এলে অনিল তার সঙ্গে দেখা করে বলে “ তুমি আমাকে কলকাতায় নিতে যেতে পারবে ? আমি ওখানে পড়াশুনা করতে চাই।“
“ দেখ অনিল, আমি কলকাতায় খুব কষ্ট করে থাকি। ফুটপাতে শুই ও সস্তা হোটলে খাই। তুই যদি এইভাবে থাকতে পারবি তো চল।“
“ আমার কষ্ট করতে তো হবে। আমি তোমার সঙ্গে যাব।“
অনিল মায়ের কাছ থেকে তাঁর এতদিনের জমানো একশ টাকা নিয়ে কলকাতায় গেল।
অনিল দাদার সঙ্গে কলকাতায় সন্ধ্যের পরপরই এসে পৌঁচালো। অনিল দেখলো দাদা যেখানে থাকে সেখানকার রাস্তা খুব বেশী চওড়া নয়। দুপাশে ফুটপাথ বলে কিছু নেই । সার সার দোতলা বাড়ীর সামনে কিছুটা উঁচু জায়গা বা বাড়ী বারান্দা। এই রকম এক গাড়ী বারান্দার নীচেই আস্তনা গ্রামের দাদার। দাদা বললো “ যা, এই যে রাস্তার কলে যে জল পড়ছে, হাত পা ধুয়ে আয়। কিছুক্ষণ পরে জল চলে যাবে আর এই দুটো বোতল নিয়ে যা ভরে নিয়ে আসবি, খেতে হবে তো।“
বাড়ী থেকে মুড়ি এনেছিল তাই খেয়ে তারা শুয়ে পড়লো। অনিলের নুতন জায়গায় ও খোলা আকাশের নীচে ঠিক মতো ঘুম হলো না। সকালে উঠে দাদা চান করে বেরিয়ে গেল। অনিলকে বলে গেল সামনে বাঁদিকে গলিতে একটি সস্তা হোটেল আছে ওখানে খেয়ে নিতে। দাদা চলে গেলে অনিল কাছাকাছি জায়গা ঘুরে দেখলো। এই রাস্তায় কোনো ভীড় নেই। দু একজন হেঁটে যাওয়া আসা করছে। রাতে দাদা ফিরতে তারা রুটি খেয়ে শুয়ে পড়লো। সকালে দাদা বেরিয়ে যাওয়ার পর দোকানে গিয়ে চা খেয়ে এলো। তারপর কি আর করবে তাই উচ্চ মাধ্যমিকের ইংরাজী গ্রামার বইটা নিয়ে এসেছিল সেটা পড়তে লাগলো। সে ইংরাজীতে দুর্বল ছিল। শুধু সে নয়, গ্রামাঙ্গলে অধিকাংশ ছাত্র ইংরাজীতে কাঁচা। শিক্ষা ব্যবস্থা এর জন্য সম্পুর্ণ দায়ী। ইংরাজী আয়ত্ত করার জন্য এইটা সঙ্গে নিয়ে এসেছে। হঠাৎ শুনতে পেল কেউ যেন বলছে “ খোকা কি বই পড়ছো ?” একটু ভীত হয়ে চোখ তুলে দেখলো একজন পৌঢ় ভদ্রলোক সামনে দাঁড়িয়ে। অনিল আমতা আমতা করে বললো “ স্যার, ইংরাজী গ্রামার।“
“ কোন ক্লাসের ? দেখি বইটা।“
অনিল বইটা দেখালো। ভদ্রলোক বইটা হাতে নিয়ে উল্টে পালটে দেখলেন এবং বললেন “ এতো একাদশ-দ্বাদশের বই। তুমি কতদুর পড়াশুনা করেছছ?”
“ আমি স্যার. উচ্চ মাধ্যমিক প্রথম বিভাগে এই বছর পাশ করেছি “।
“ এখানে কিরছ ?”
“ স্যার, আমার গ্রামের এক দাদা এখানে থাকে। আমি ওর সঙ্গে এসেছি কলেজে ভর্তি হব বলে। আমরা স্যার প্রচন্ড গরীব। তাই কলকাতায় এসেছি কিছু কাজ করবো ও পড়াশুনা করবো।“
“ এখানে তো অমর থাকে “
“ হ্যাঁ স্যার, উনি আমার গ্রামের ছেলে “।
“ আচ্ছা, তুমি আজ রাতে নয়টার পরে আমার বাড়ীতে অমরকে নিয়ে এসো। ঐযে দোতলা সাদা বাড়ী দেখছো, এটা আমার বাড়ী “। বলেই তিনি হনহন করে হেঁটে চলে গেলেন। রাতে অমর আসতে সে তাকে সব কথা বললো। অমর বললো “ ওটা তো সামন্তবাবুর বাড়ী। খুব ভালো লোক। ঠিক আছে যাওয়া যাবে।“
তারা যেতে সামন্তবাবু তাদের নীচে বৈঠকখানায় বসালেন।
তিনি অমরকে জিজ্ঞাসা করলেন “ এই ছেলেটা তোমার সঙ্গে এসেছে ?”
“ ও পড়াশুনা করবে বলে এসেছে। ও আমাদের গ্রামের সকলের চেয়ে পড়াশুনায় ভালো।“
“ ঐ ফুটপাতে কি পড়াশুনা করা যায় ?”
“ আমি স্যার, এতকিছু চিন্তা করি নি। ও আমার সঙ্গে আসবে বললো আর আমি নিয়ে চলে এলাম।“
“ দেখ অমর, ওখানে পড়াশুনা করা যায় না। আমার গ্যারেজের পাশে একটা ছোট্ট ঘর আছে। তোমরা দুজনে ঐ ঘরে থাক। ঐ ছেলেটা আমার ফাইলপত্র অফিসে দিয়ে আসবে আর নিয়ে আসবে। আমি মাসে মাসে কিছু দেব যাতে ও পড়াশুনা করতে পারে।“
অনিল উঠে সামন্তবাবুকে প্রনাম করলো।

ওরা সামন্তবাবুর বাড়ীতে থাকতে আরম্ভ করে। অনিল কলেজে ভর্তি হয়। মন দিয়ে পড়াশুনা করতো ও সামন্তবাবুর ফাইফরমাশি করে দিত। এইভাবে দিন এগিয়ে যেতে গাগলো। তার সততা,, বিশ্বস্ততা ও অমায়িক ব্যবহারের জন্য সামন্তবাবুর বাড়ীর সকলে ভালোবাসতো। সে প্রত্যেকদিন রাতে ঘুমানোর সময় বলতো “ ঠাকুর, তুমি আমার পড়ার ব্যবস্থা সহজে করে দিয়েছ তাতে আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ।“ সে বি এ অনার্স পাস করে বিভিন্ন চাকরীর পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতির সঙ্গে সঙ্গে টিউশানও করতে শুরু করলো। এই ভাবে বছর দুয়েক পর সে একটি সরকারী চাকরীও পেয়ে গেল।

কিছুদিন পর অনিল দেশের বাড়ী গেছে। বাবা মা খুব খুশি। দু তিন দিন পর মা বললেন “ বাবু, তোর তো বিয়ের বয়স হয়ে গেছে। আর তুই কতদিন নিজে রান্না করে খাবি।“
“ থাকার কোনো স্থান নেই মা। বিয়ে করে কোথায় রাখবো ?”
“ কতদিন লোকের ঘরে থাকবি ?”
“ ঠিক আছে, ফিরে গিয়ে ঘর খুঁজবো।“
অনিল একটি ঘর ভাড়ায় ঠিক করলো। একটি ঘর ও রান্নাঘরটি বড়, রান্নার জায়গা বাদ দিলেও শোয়ার জন্য একটি খাট পাতা যাবে।

মাস পাঁচের মধ্যে তার বিয়েও হয়ে যায়। বৌকে নিয়ে এসে ঐ ঘরে থাকতে আরম্ভ করলো। বছর দুয়েক মধ্যে তার ছেলের জন্ম হয়। দিন এগোতে থাকে। ছেলে গোড়া থেকে পড়াশুনায় খুব ভালো। ক্লাসে প্রত্যেক বারই প্রথম হয়। যখন ছেলে দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ে অনিলের ম্যালেরিয়া হয় এবং খুব কাহিল হয়ে পড়ে। এর কিছুদিন পর ছেলে জয়েন্টে ভালো ফল করে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয়। এর মাস দুয়েক পরে এক রাতে হঠাৎ ছেলের স্বাসকষ্ট হয়। অনিল প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায়। পরদিন থেকে ছেলেকে ডাক্তার দেখানো চ্ললো। তিনজন ডাক্তার পরীক্ষা করে কোনো রোগের সন্ধান পেলেন শুধুমাত্র ডাক্তারের কাছে গেলে প্রেশারটা বেড়ে যাওয়া ছাড়া কিন্তু অনিল ঐ রাতে হঠাৎ সাংঘাতিক ভয় পাওয়ার জন্য তার মানসিক অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। যে ছিল উৎসাহী, কর্মশক্তিতে ভরপুর, উদ্যোমী ও অনলস কিন্তু তারই মনে হঠাৎ ভয় আতঙ্ক খেলা করতে থাকে। দিনে দিনে অবস্থা খারাপ হতে থাকে। রাতে ঘুম হয় না, কোনো কাজে আগ্রহ নেই, সব সময় ঝিমুনি ভাব। এইসব উপসর্গগুলো দিনে দিনে বাড়তে থাকে। তার পৃথিবীটাকে নরক মনে হতে লাগলো। সকলে যেন এখানে নরক যন্ত্রনা ভোগ করছে। চোখের সামনে দেখতে পেত কেউ আগুনে পুড়ে গেছে, আরো পা বা হাত কেটে গেছে, কাউকে অন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, কেউ ক্ষিদের জ্বালায় অর্ধমৃত, কেউ কেউ আবার রোগ যন্ত্রনায় ছটপট করছে। এইসব বীভৎস দৃশ্য তার মনে দেখা দিত এবং মনে আতঙ্ক লেগে থাকতো। কিছুতেই এইসব দৃশ্য মন থেকে তাড়াতে পারতো না। এ নরক সম পৃথিবী থেকে পালিয়ে যেতে চাইতো। তার মনে হতো তার কোনো পাপের জন্য সে নরক দর্শন করছে। হিন্দু শাস্ত্র বলে যেজন কম পাপ করে তাকে প্রথম নরক দর্শন করতে হয়। তার “ একার্ট টোলে” এর বিখ্যাত বই “ দা পাওয়ার অফ নাউ” পড়া ছিল। লেখকেরও এই রকম মানসিক অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়েছিল কিন্তু তিনি এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে স্বর্গের সন্ধান পেয়েছিলেন। তাঁর মনে এক স্বর্গীয় শান্তি উপলব্ধি করেছিলেন। ঈশ্বরের খেলা কে বুছতে পারে ? এই বইটা পড়লে ঐশ্বরিক ক্ষমতা কতখানি বোঝা যাবে। অনিল ভাবতো তারও এই রকম হতে পারে। এইটুকু আশাআলো অসহনীয় মানসিক কষ্টতেও তাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। এই অবস্থায় সে সর্বদা ঠাকুরের নাম জপ করে যেত। এই ভাবে মাস তিনেক যায়। একদিক তার বাড়ীর পাশে ঔষধ দোকানে গেছে ঔষধ কিনতে। এই দোকানে এক বয়স্ক ভাক্তার বসতেন। তাঁর সঙ্গে অনিলের ভালো পরিচয় ছিল। অনিল যখন দোকানে যায় ডাক্তার তখন দোকানের বাইরে দাঁড়য়ে ছিলেন । অনিলকে দেখে বললেন “ কি হে অনিল, কেমন আছ? তোমাকে কেমন শুকনো শুকনো লাগছে ?” সে তাঁকে তার অসুবিধাগুলো বলে। অনিলের মনে হলো ধর্ম ডাক্তার রূপে তার সামনে এসেছেন। ডাক্তার বললেন “ আমি তোমাকে একটি ঔষধ লিখে দিচ্ছি, তুমি প্রত্যেকদিন সন্ধ্যার সময় খেয়ে নেবে। হঠাৎ খুব ভয় বা অশুভ খরব শুনলে কারো কারো মাথায় সেরোটোনিন হর্মোনের মাত্রা কমে যায়। যার ফলে এইসব অসুবিধা হয়ে থাকে।“ অনিল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে। তার মন আধ্যাত্মিকতার দিকে অগ্রসর হয়। তার মনে এক স্বর্গীয় শান্তি বিরাজ করতে থাকে। তার মনে হলো সে স্বর্গে আছে।

***********************

মন্তব্য করুন