(০১)
হাসির হেলিকপ্টার
-বিচিত্র কুমার
বড়দিঘি গ্রামের নাম শুনলেই কেউ কেউ হেসে ওঠে। কারণ এই গ্রামে আছেন এক মহা ব্যতিক্রমী মানুষ—পেঁচান মাস্টার। যাঁর মাথায় সারাবছরই পেঁচানো পাগড়ি থাকে, হাতে থাকে বাঁশের ছড়ি, আর মুখে থাকে এমন সব গবেষণার খবর, শুনলেই মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়ে। পেঁচান মাস্টার দাবি করেন, তিনি “গ্রামের বিজ্ঞানী”, যাঁর আবিষ্কারে একদিন গোটা দুনিয়া কাঁপবে।
একদিন বাজারে দাঁড়িয়ে তিনি ঘোষণা দিলেন, “আমি আবিষ্কার করতেছি হেলিকপ্টার! তবে তা হবে পরিবেশবান্ধব, গোবরচালিত!”
এই ঘোষণায় বাজার গরম। পানখেকো বুড়ো থেকে শুরু করে স্কুলফেরত খোকা পর্যন্ত সবাই হেসে গড়াগড়ি খায়। গ্রামের গোপাল চাচা তো এক কাঠি সরেস—উনি বললেন, “মাস্টার, হেলিকপ্টার তো গোবরে চলে না, গাভী কিন্তু হেলিকপ্টার তাড়া দেবে!”
তবে পেঁচান মাস্টার নাছোড়বান্দা। পরদিনই উনার উঠানে বসে সবাই দেখে এক আজব যন্ত্র—পুরোনো সাইকেলের হ্যান্ডেল, হারিকেনের পাখা, ছেঁড়া ছাতা, পুরনো ফ্যানের মোটর আর তিন কেজি গোবরের মিশেলে বানানো এক অদ্ভুত বাহন। পেছনে দড়ি দিয়ে বাঁধা ছাতার মতো পাখা, সামনে একটা পুরোনো হ্যান্ডমাইকের বোতাম, আর নিচে একটা চাকার বদলে নারকেলের খোল। নাম দিয়েছেন “পেঁচাকপ্টার”।
পরীক্ষা-উড়ান দেখতে মাঠে জমে গেল অর্ধগ্রাম। কেউ লুঙ্গি তুলে হাঁ করে তাকিয়ে আছে, কেউ আবার কোলের বাচ্চাকে মাথায় বসিয়ে রাখছে যেন ভালো করে দেখতে পায়। পেঁচান মাস্টার সবার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, “এই যন্ত্র একবার স্টার্ট দিলে আমি আকাশে উড়বো, আর গ্রামের মাথার ওপর দিয়ে চক্কর দিব।”
মাস্টারের মুখে পরিপাটি হাসি, মাথায় নারকেলের খোল দিয়ে বানানো হেলমেট, পেছনে বাঁধা হেলিকপ্টারের মতো গোল পাখা। গলায় শালপাতার মালা, চোখে রোদচশমা।
গণনা শুরু হলো—তিন… দুই… এক!
পেঁচান মাস্টার পেছনের বোতাম চাপ দিলেন।
একটা বিশাল শব্দ হলো—“ফুঁউউউউউট্ট!”
সঙ্গে সঙ্গে গোবরের কুন্ডলি উঠে মাঠে বসে থাকা প্রথম সারির দর্শকদের গায়ে ছিটকে পড়লো। কেউ চিৎকার করছে, কেউ মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে। হেলিকপ্টার কিছুটা দুলে উঠলো ঠিকই, কিন্তু উড়লো না। বরং মাস্টার নিজে পেছনে লাট খেয়ে পড়লেন খালে গিয়ে।
তারপর…?
পরদিন সকালে পেঁচান মাস্টারকে নিয়ে সংবাদ ছড়ালো—“হাসির হেলিকপ্টার খালে নামলো!” পাখিরাও প্রতিবাদে মুখ খুললো। শালিক ফোঁটা পেয়েছে, কাকের ঠ্যাং পুড়েছে—এমন প্রতিবেদন ছাপা হলো স্কুলের দেয়ালে। গ্রামের ছেলেমেয়েরা সিদ্ধান্ত নিলো, পেঁচান মাস্টারের এই যন্ত্র দিয়ে আর হেলিকপ্টার ওড়ানো যাবে না, তবে হেসে মারা যাবে ঠিকই।
তাই পেঁচান মাস্টার হয়ে গেলেন “গ্রামের হাসির হেলিকপ্টার”। উনি এখন আর যন্ত্র নিয়ে উড়তে চান না, তবে তার গল্প শুনলেই মানুষ আকাশে উড়ে যায়—হাসতে হাসতে। কেউ মন খারাপ করে থাকলে তাকে বলা হয়, “চলো পেঁচান মাস্টারের পেঁচাকপ্টারের কাহিনি শুনি, পেট ব্যথা করে হাসবো!”
এভাবেই পেঁচান মাস্টার তার গোবরচালিত হেলিকপ্টার না ওড়াতে পারলেও, হাসির হাওয়ায় সবার মন উড়িয়ে নিয়ে যান এখনো। বড়দিঘির পাখি আর মানুষ সবাই একবাক্যে বলে—
“হাসির হেলিকপ্টার মানেই পেঁচান মাস্টার!”
(০২)
হাফ প্যান্টের হিরো
-বিচিত্র কুমার
চরকলাগাছি গ্রামের মানুষজনকে কখনো কেউ বোরিং বলতে পারেনি। আর এই গ্রামের সবচেয়ে বড় বিনোদনের উৎস হলো একজন—সবাই যার নাম দিয়েছে “হাফ প্যান্টের হিরো”। তার আসল নাম কী, সেটা কেউ জানে না। তিনি নিজেই এতবার বলেছিলেন “আমি হাফ প্যান্টের হিরো”, যে গ্রামের সবাই সেই নামেই চেনে।
এই হিরোর জীবনে একটাই নীতিবাক্য—“প্যান্ট ফুল হলে সাহস ঘুল হয়ে যায়।” আর এই নীতির উপর ভিত্তি করেই তিনি বছরের ৩৬৫ দিন হাফ প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ান। বর্ষায় প্যান্ট ভিজে শরীর ঠান্ডা হলেও তাতে তার কিছু যায় আসে না। শীতে ঠান্ডায় দাঁত কিড়মিড় করলেও গায়ে একটা পুরনো সোয়েটার আর হাফ প্যান্ট—এই তাঁর ফ্যাশন।
তবে শুধু প্যান্ট পরেই নয়, তার আচরণেও ছিল চরম নাটকীয়তা। প্রতিদিন ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে একটা পুরনো ক্যাসেট প্লেয়ার কাঁধে ঝুলিয়ে বাজারে ঢুকে পড়ত। ক্যাসেটে বাজতো—“বীর পুরুষ আমি, হাফ প্যান্ট পরি… আমি দেশ গড়ি হাফ প্যান্ট পরে!” গান বাজতে বাজতেই তিনি ঘোষণা করতেন, “আমি হাফ প্যান্টের হিরো! হ্যালো চরকলাগাছি!”
গ্রামের বাচ্চারা তাকে দেখে দৌঁড়ে পালাত, কেউ আবার দৌঁড়ে কাছে এসে ছবি তুলতে চাইত। তবে সবচেয়ে মজা হতো যখন তিনি ‘হাফ প্যান্ট সমিতি’ গঠনের ঘোষণা দিলেন।
গ্রামের মোড়ে দাঁড়িয়ে বললেন, “যারা হাফ প্যান্ট পরে, তারাই হলো আসল মানুষ। বাকিদের মানসিকভাবে ফুলপ্যান্টেড।”
একবার তিনি ঘোষণা দিলেন, “রবিবার আমি হাফ প্যান্ট পরে হ্যান্ডস ফ্রি বাইসাইকেল চালিয়ে খাল পার হবো। যদি পড়ে যাই, তাহলে সবার জন্য শিঙাড়া!”
গ্রাম জুড়ে হইচই পড়ে গেল। রবিবার সবাই ভোর থেকে খালের ধারে ভিড় করল। হিরো এলেন গলা পর্যন্ত উঠে আসা গাঢ় হলুদ হাফ প্যান্ট পরে। বাইসাইকেলের সামনে বড় করে লেখা—“আমি হাফ প্যান্টে দেশ বানাই।”
সবার চোখের সামনে হিরো উঠলেন বাইসাইকেলে। দু’হাত ছেড়ে হাঁটু দিয়ে হ্যান্ডেল ধরলেন। লোকজন উল্লাসে হাততালি দিতে দিতে হেসে কাত! হিরো কিছুদূর যেতেই হাঁচি এলো। এমন জোরে হাঁচি দিলেন যে হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে পুকুরে পড়লেন।
আর সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা তখনই ঘটল—পানির তীব্র টানে হিরোর প্যান্ট খুলে এক ঢেউয়ের সঙ্গে চলে গেল খালের উজানে। হিরো তখন হাঁটু পানিতে দাঁড়িয়ে, গলা ছেঁচে বলছেন, “শিঙাড়ার অর্ডার বন্ধ! প্যান্ট খুঁজে দাও আগে!”
গ্রামের হাসির ঠেলায় খালপাড়ের মাছও নাকি তখন পানির নিচে হেসে বুদবুদ ছাড়ছিল। কেউ কেউ মোবাইলে ভিডিও তুলতে তুলতে বলছিল, “ইহাই আমাদের হাফ প্যান্টের স্বাধীনতা আন্দোলন!”
পরে হিরো একটা বড় গামছা দিয়ে নিজেকে মুড়ে বাড়ি ফিরে গেলেন। কিন্তু পরের দিনই তিনি গ্রামে নতুনভাবে এলেন—এইবার আর হাফ প্যান্টে নয়, একেবারে গিট্টু মারা লুঙ্গিতে।
গ্রামের ছেলেরা তখন বলছিল, “হিরো বদলেছে, কিন্তু হিরোগিরি ছাড়েনি!”
তারপর থেকে আর কেউ তাকে হাফ প্যান্টে দেখেনি। তবে লোকমুখে এখনো চালু আছে একটা কথা—
“যে হাফ প্যান্টে হিরো, সে প্যান্ট হারালে রাজা কমেডির!”
চরকলাগাছির মানুষ এখনো গল্প করে—
“বাচ্চা কান্না থামায় না? দেখাও হাফ প্যান্টের হিরোর ভিডিও, সঙ্গে সঙ্গে চুপ!”
এভাবেই প্যান্ট হারিয়ে হিরো হয়ে গেল এক চলন্ত কিংবদন্তি, যার নাম শুনলেই এখনো মানুষ হেসে গড়াগড়ি খায়।
নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ
মোবাইলঃ 01739872753
https://www.facebook.com/profile.php?id=100014642137028&mibextid=ZbWKwL