নিদ্রাহীন ঢাকা শহর,
প্রসববেদনা ও একরাশ উৎকণ্ঠায় রাত পার করে জন্ম দিতে যাচ্ছে
স্বাধীনতা নামক একটি নবজাতক কন্যা শিশু।
পাঁচই আগস্ট, দুই হাজার চব্বিশ।
ঢাকার আকাশে আজ কোনো সূর্য ওঠেনি।
সকাল থেকে রাজপথে নিস্তব্ধতার ঘন আঁধার।
ঢাকার আবহাওয়ায় ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস।
যেমন কালবৈশাখী ঝড় আসার পূর্বে গাছের একটি পাতাও নড়ে না—
প্রকৃতি কেমন বোবা হয়ে থাকে,
তেমন বুকে কাঁপন ধরানো নীরবতা নেমে আসে
ঢাকা শহরের বুকে।
ঢাকা শহরের গুমোট বাতাস বয়ে আনে মৃত্যুর ঘ্রাণ,
পোড়া টায়ারের বিদঘুটে গন্ধ,
কালো ধোঁয়া আর শহীদের তাজা রক্তের লাল-সবুজ সুগন্ধি।
প্রশস্ত রাজপথে কেবল বুটের শব্দ,
পুলিশ-র্যাব-বিডিআর আর সেনাবাহিনীর
আর্মাড ভ্যানের গর্জন—
জনশূন্য নগরীর শিরা-ধমনীতেই চাপা এক বিস্ফোরণের প্রতীক্ষা।
দিনের আলো আরেকটু ফুটলেই ভূমিষ্ঠ হবে
দীর্ঘ বন্ধ্যার পর আরেকটি নবজাতক।
এখনও কেঁদে ওঠেনি শিশুটি,
তবু মা জানে—বুকে দুধ ফুলে উঠেছে।
ফজরে যে উত্তরা স্তব্ধ ছিল,
আলো ফুটতেই তা জেগে উঠে—
যাত্রাবাড়ী থেকে শাহবাগ,
শনিরআখড়া থেকে কুড়িল—
সব জায়গা থেকে ভেসে আসছে মিছিলের ঢল।
৩৬ দিনের সন্তান হারানো মায়ের চোখের জল,
সহপাঠী হারানোর খণ্ড খণ্ড ক্ষোভ,
শহীদদের লাল-সবুজ রক্ত—
আজ একাকার হয়ে ফুলে ফেঁপে উঠেছে ঢাকামুখী জনসমুদ্রে।
শত সহস্র কণ্ঠে একটাই ধ্বনি—
“স্বৈরাচার, তোকে আজই যেতে হবে।”
ঢাকা আজ এক আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত—
ঢাকা আজ এক মিছিলের শহর।
—
পাঁচই আগস্ট, দুই হাজার চব্বিশের সকালটা
আর আট-দশটা সকালের মতো ছিল না।
সেই রাতটা ছিল অন্যরকম—
মায়ের প্রসববেদনার মতো দীর্ঘ, রক্তাক্ত,
আর প্রতীক্ষায় ভরা।
ঢাকার আকাশ নিঃশ্বাস নিচ্ছিল খুব কষ্টে।
সূর্য উঠল না ঠিকমতো।
ধূসর এক আকাশ কুয়াশায় নয়,
বরং ধোঁয়াশার মতো অনিশ্চয়তার ক্লান্তি নিয়ে
ছড়িয়ে পড়েছে সারা শহরে।
রাতভর পুড়েছে টায়ার,
রাস্তার মোড়ে মোড়ে আগুনের রক্তিম ছায়া নাচছে।
একেকটি ছায়া যেন একেকটি শহীদ তরুণ,
যাদের মুখ ঢাকা সফেদ লোহিত কাফনে,
কিন্তু তাদের চোখে জ্বলছে দ্রোহ—
“আর কত প্রাণ?”
ফজরে, যখন আযানের ধ্বনি ঢাকায় মিশে যায়,
তখনও কোথাও কোথাও শোনা যায় গুলির আওয়াজ।
তবু থামে না মানুষের জোয়ার।
একেকটা গলিপথ থেকে বেরিয়ে আসে একেকটা গণস্রোত।
কারও হাতে লাল-সবুজ পতাকা,
কারও হাতে তার শহীদ ভাইয়ের ছবি,
কেউবা ব্যানার–প্ল্যাকার্ডে তুলে ধরে
ছাত্রজনতার এক দফা দাবি।
সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া ভেহিকেল ছুটে চলে
দানবের মতো হ্রেষা দিতে দিতে।
পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও বিশেষায়িত বাহিনীর চোখে ঘুম নেই—
তবে তাদের চোখে সাহস নেই,
কেবল ভয়।
কেননা তারা জানে—
এই যে হাজারো ছাত্র, শ্রমিক, বেকার যুবক,
আর সন্তান হারানো মা-বাবা, অভিভাবক—
আজ গুলি চালানো মানে
ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম কালো অধ্যায়ে লিপিবদ্ধ করা।
৩৬ দিনের খণ্ড খণ্ড মিছিল
আজ মিলেছে এক বিশাল মিছিলে,
ঢাকার রাজপথ গুলো আজ যেনো বাংলাদেশের
প্রধান নদ-নদী, প্রবল বানে আজ সকলে ছুটে
চলেছে গণভবনের দিকে।
উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, ফার্মগেট, নিউমার্কেট,
মতিঝিল, শাহবাগ—
সব জায়গা যেন একেকটি সমুদ্রের ধারা,
সবগুলো ঢেউ আজ মিলেছে মানিক মিয়া এভিনিউর মোহনাতে।
এটি আর কোনো রাজনৈতিক মিছিল নয়—
এটি জনগণের অস্তিত্বের চিৎকার।
শত সহস্র কণ্ঠে একসাথে উচ্চারিত—
“স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক।”
বৃদ্ধ সেই মুক্তিযোদ্ধা,
লাঠিতে ভর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন,
যার চোখে এখনো ১৯৭১ সালের আগুন জ্বলছে।
তার পেছনে তার নাতি,
হাতে একটি প্ল্যাকার্ড—
“দফা এক দাবি এক, খুনি হাসিনার পদত্যাগ।”
একটি মেয়ে—তার চোখে বিষাদ,
হাতে লাল-সবুজ পতাকা।
বুকের ভেতর জ্বলছে তার শহীদ ভাইটির ছবি।
সে জানে—এই পতাকা শুধু স্বাধীনতার প্রতীক নয়,
এটি তার ভাইয়ের কাফনও।
“ঢাকা আজ মিছিলের শহর।”
এটি এমন একটি শহর,
যেখানে তার প্রতিটি গলির মূঢ় দেয়ালে
বুলেটের চিহ্ন আজ কালের স্বাক্ষী হয়ে আছে।
প্রতিটি বাসার জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসে
একেকটি স্বাধীনতার গান।
ঢাকা,
আজ তুমি আর শুধু রাজধানী নও—
তুমি ইতিহাস।
তুমি সেই রক্তাক্ত পাতায় লেখা,
যেখানে কেউ লিখেছিল—
“এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”