(০১)
ভুল ক্যালেন্ডার
-বিচিত্র কুমার
নতুন বছরের প্রথম সকাল। পাড়া জুড়ে আতশবাজির গন্ধ, ফেসবুকে “হ্যাপি নিউ ইয়ার” লেখা স্ট্যাটাসের ঢল, আর চায়ের দোকানে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের বদলে আজ কেবল ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার হইচই। ঠিক এই দিনেই ঘটল এক ঐতিহাসিক কাণ্ড—ভুল ক্যালেন্ডারের কাণ্ড।
শম্ভু কাকু খুব নিয়মপরায়ণ মানুষ। ঘড়ি পাঁচ মিনিট এগিয়ে রাখেন, যাতে দেরি না হয়। নতুন বছরের আগের রাতে তিনি দেয়াল থেকে পুরোনো ক্যালেন্ডার খুলে যত্ন করে ভাঁজ করে রাখলেন। তারপর আলমারি থেকে নতুন ক্যালেন্ডার বের করে টান টান করে ঝুলিয়ে দিলেন। সমস্যা একটাই—তিনি ভুল করে গত বছরের ক্যালেন্ডারই আবার ঝুলিয়ে দিয়েছেন। ক্যালেন্ডার দেখতে নতুনের মতোই ছিল, কারণ শম্ভু কাকু সেটি কিনে রেখেছিলেন “আগামী বছরের জন্য” বলে, কিন্তু সেই আগামী বছর যে আগেই চলে গেছে, তা খেয়াল করেননি।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যালেন্ডার দেখে শম্ভু কাকু ঘোষণা দিলেন, আজ নাকি এখনো পুরোনো বছর। তিনি স্ত্রীকে বললেন, নতুন বছরের পিঠা বানাতে হবে না, আজ সাধারণ ভাত-ডালই চলবে। স্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, পাড়া জুড়ে তো সবাই নতুন বছরের শুভেচ্ছা দিচ্ছে। শম্ভু কাকু ক্যালেন্ডার দেখিয়ে বললেন, ক্যালেন্ডার কখনো মিথ্যে বলে না, মানুষই ভুল করে।
এই খবর মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ল। পাড়ার মাস্টারমশাই এলেন ক্যালেন্ডার দেখতে। তিনি তারিখ মিলিয়ে মাথা চুলকালেন। মুদি দোকানের হারু বলল, তাহলে আজকের বকেয়া কালকে দেব। কলেজপড়ুয়া টুকু খুশি হয়ে বলল, তাহলে পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য এক বছর বোনাস সময় পাওয়া গেল। সবাই যার যার সুবিধামতো ভুল ক্যালেন্ডারকে সত্য ধরে নিতে লাগল।
সবচেয়ে বিপদে পড়লেন পাড়ার চেয়ারম্যান। তিনি নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানাতে মাইকিং করছিলেন। শম্ভু কাকুর ক্যালেন্ডারের কথা শুনে তিনি থেমে গেলেন। ভাবলেন, যদি সত্যিই নতুন বছর না হয়ে থাকে, তাহলে তাঁর শুভেচ্ছা বক্তৃতা সময়ের আগেই হয়ে যাবে। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, পরিস্থিতি পরিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো শুভেচ্ছা নয়।
শেষ পর্যন্ত স্কুলের ছোট্ট রিমি মোবাইলে তারিখ দেখিয়ে বলল, কাকু, আপনার ক্যালেন্ডারটা ভুল। আজ সত্যিই নতুন বছর। শম্ভু কাকু ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর হেসে বললেন, আচ্ছা, নতুন বছরই যদি হয়, তাহলে পুরোনো ভুলগুলো আজ থেকেই ফেলে দিই। সবাই হেসে উঠল। পিঠা ভাজা হলো, চেয়ারম্যান আবার মাইক ধরলেন, আর শম্ভু কাকু সেই ভুল ক্যালেন্ডারটা রেখে দিলেন—পরের বছর যেন আবার হাসির খোরাক জোটে।
(০২)
চায়ের সাথে হাসির গল্প
-বিচিত্র কুমার
শীতকাল এলেই আমাদের পাড়ায় সবচেয়ে আগে হাজির হয় কুয়াশা আর চা। কুয়াশা না থাকলেও চলত, কিন্তু চা না হলে শীতের সকালটা যেন অসম্পূর্ণ। সেই শীতের এক সকালে কুয়াশার ভেতর দিয়ে চা বানানোর যুদ্ধ শুরু করলেন আমাদের পাড়ার বিখ্যাত কাকু ননী গোপাল। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি বিশ্বাস করেন শীতের একমাত্র চিকিৎসা হলো গরম চা, আর চা যত গরম হবে মানুষ তত বুদ্ধিমান হবে।
ননী গোপাল কাকু শাল জড়িয়ে চুলায় কেটলি বসালেন। কিন্তু শীতের কামড়ে তাঁর হাত এমন কাঁপছিল যে চিনি ফেলতে গিয়ে আধা কাপ চিনি পড়ল মেঝেতে, আর চায়ের কাপে গেল মাত্র দুই দানা। কাকু ভাবলেন, শীতের দিনে কম চিনি খাওয়া স্বাস্থ্যকর। এই ভেবে তিনি নিজেকেই বাহবা দিলেন।
চা ফুটতে ফুটতে এমন আওয়াজ করছিল যেন কেটলি নিজেই ঠান্ডায় কাঁপছে। ঠিক তখনই পাড়ার একমাত্র অলস মানুষ ভোলা হাজির। ভোলা এসে বলল, কাকু চা হয়েছে? কাকু গম্ভীর মুখে বললেন, চা হয়নি, শীতের সাথে যুদ্ধ চলছে। ভোলা শুনে মনে মনে ভাবল, যুদ্ধ হলে বসে বসে ফল ভোগ করাই ভালো।
চা নামানোর সময় আসল বিপদ ঘটল। কাকু ভুল করে লবণের বাটির পাশে রাখা চিনির কৌটা না নিয়ে লবণের কৌটা তুলে নিলেন। শীতের সকালে চোখ ঠিকমতো খুলে না, এই সুযোগেই লবণ চায়ে ঢুকে পড়ল। কিন্তু কাকু কিছুই টের পেলেন না। চা ঢেলে ভোলাকে দিলেন আর নিজেও এক চুমুক দিলেন।
প্রথম চুমুকেই কাকুর চোখ কপালে। তিনি ভাবলেন শীতের কারণে জিভ বুঝি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। ভোলা এক ঢোক খেয়েই মুখ কুঁচকে বলল, কাকু আজকের চা একটু… আলাদা স্বাদের। কাকু বললেন, এটা বিশেষ শীতকালীন ফর্মুলা। শরীর গরম হবে, মাথাও গরম হবে।
ভোলা দ্বিতীয় চুমুক দিতে সাহস পেল না। কিন্তু কাকু জেদ করে পুরো কাপ শেষ করলেন। শেষে বুঝলেন, চায়ের সাথে আজ হাসিও মিশে গেছে। লবণ-চা খেয়ে কাকু এমন মুখ করছিলেন যে শীতের কুয়াশাও লজ্জা পেয়ে সরে গেল।
সেই দিন থেকে পাড়ায় একটা কথা চালু হয়ে গেল, শীতে শুধু চা খেলেই হবে না, চায়ের সাথে একটু হাসিও দরকার। আর ননী গোপাল কাকু এখন চা বানানোর আগে দু’বার দেখে নেন, হাতে চিনি না শীতের লবণ।
(০৩)
হাসির রেসিপি
-বিচিত্র কুমার
গ্রামের নাম ছিল গোমড়াপুর। সেখানে একজন বিখ্যাত মানুষ ছিলেন—নাম কুদ্দুস মিয়া। তিনি নিজেকে গ্রামের একমাত্র “হাসির ডাক্তার” বলে পরিচয় দিতেন। তার দাবি ছিল, যেকোনো দুঃখ, রাগ, গ্যাস, বদহজম—সব কিছুর একটাই ওষুধ, আর সেটা হলো হাসি। কিন্তু সমস্যাটা ছিল, কুদ্দুস মিয়া নিজে মোটেও হাসতে পারতেন না। হাসি বানাতেন, কিন্তু মুখে আনতে গেলেই তার মুখ এমন গম্ভীর হয়ে যেত যেন লেবু কামড়ে ধরেছেন।
একদিন গ্রামের বাজারে মাইকিং হলো—“আজ বিকেলে কুদ্দুস মিয়া প্রকাশ করবেন হাসির রেসিপি। দুঃখী, রাগী, বউয়ে-পেটানো, স্বামী-ঠকানো সবাই আসুন।” এই ঘোষণা শুনে পুরো গ্রাম নড়েচড়ে বসল। কেউ ভাবল, রেসিপি মানে নিশ্চয়ই খাওয়ার কিছু। কেউ আবার ভাবল, হয়তো কোনো গুপ্ত মন্ত্র।
বিকেলে মাঠে মাদুর পেতে সবাই বসেছে। কুদ্দুস মিয়া এলেন হাতে একটা খাতা আর মুখে এমন ভাব, যেন তিনি টক দইয়ের সাথে মরিচ মিশিয়ে ফেলেছেন। তিনি খাতা খুলে গম্ভীর গলায় বলতে লাগলেন, “হাসির রেসিপি বানাতে প্রথমে দরকার এক বাটি ধৈর্য, দুই চামচ ভুল বোঝাবুঝি, আধা কাপ পারিবারিক ঝামেলা আর এক চিমটি প্রতিবেশীর হিংসা।”
লোকজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে ফেলল। কুদ্দুস মিয়া থামলেন না। বললেন, “এই সব একসাথে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখটা দেখবেন। দেখেই যদি ভয় পান, তাহলে বুঝবেন রেসিপি ঠিক হয়েছে।”
এই কথা শুনে সামনের সারিতে বসা মতি চাচা এমন জোরে হেসে উঠলেন যে তার দাঁতের পাটি ঢিলে হয়ে গেল। পেছন থেকে কেউ বলল, “এই রেসিপি তো আমরা সারা জীবন রান্না করছি, শুধু নামটা জানতাম না।”
হঠাৎ কুদ্দুস মিয়ার নিজের মুখে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি দেখা দিল। তিনি আর কথা ধরে রাখতে পারলেন না। নিজের বলা কথাই শুনে তিনি নিজেই হেসে ফেললেন—প্রথমে চাপা, তারপর ফেটে পড়া হাসি। সেই হাসি দেখে পুরো মাঠে এমন হাসির ঢেউ উঠল যে পাশের গাছের কাক পর্যন্ত ডেকে উঠল, যেন তারাও অংশ নিচ্ছে।
সেদিনের পর গোমড়াপুরে কেউ আর হাসির রেসিপি খুঁজতে যায় না। কারণ সবাই বুঝে গেছে, হাসির রেসিপি আসলে কোনো খাতায় লেখা থাকে না, সেটা লুকিয়ে থাকে আমাদের দৈনন্দিন গোমড়ামুখের ভেতরেই। শুধু মাঝে মাঝে একটু নাড়াচাড়া করলেই যথেষ্ট।
(০৪)
দাদুর ভুল চশমা
-বিচিত্র কুমার
গ্রামের দাদু শম্ভুনাথ বাবুর সবচেয়ে বড় গর্ব ছিল তাঁর চশমা। চশমা ছাড়া নাকি তিনি মানুষ চিনতে পারেন না, মুরগি আর হাঁসের তফাৎও বোঝেন না। তাই ঘুম থেকে উঠে প্রথম কাজ—চশমা খোঁজা। এক সকালে উঠে দাদু চশমা চোখে দিয়েই চেঁচিয়ে উঠলেন, “আরে, আমাদের উঠোনে এত বড় একটা কুকুর কে বেঁধে রেখেছে!” সবাই দৌড়ে এসে দেখে, উঠোনে কুকুর নয়, দাদুর নিজের নাতি রিকু মাটিতে বসে খেলছে। দাদু চোখ কুঁচকে আবার তাকিয়ে বললেন, “ওহ! কুকুরটা কথা বলছে নাকি!” তখনই বোঝা গেল, আজ দাদুর চশমা ঠিক নেই।
আসলে চশমাটা ছিল ভুল। দাদুর চশমার পাশে রাখা ছিল দিদার পুরোনো সানগ্লাস, আর দাদু তাড়াহুড়োয় সেটাই পরে ফেলেছেন। সানগ্লাস পরে সবকিছু কালচে আর ঝাপসা দেখাচ্ছিল। দাদু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ভাবলেন চা বুঝি পুড়ে গেছে, এত কালো কেন। এক চুমুক দিতেই চিৎকার, “আরে রে! এটা চা না, সরিষার তেল!” সবাই হেসে কুটিকুটি, কারণ দাদু আসলে চায়ের বদলে তেলের বোতল ধরেননি, শুধু সানগ্লাসের কারণে কাপটাকে বোতল মনে হয়েছিল।
তারপর দাদু হাঁটতে বেরোলেন। রাস্তার মোড়ে মুরগি দেখে ভাবলেন ছোট ছাগল। দোকানদারকে বললেন, “এই ছাগলটা কত?” দোকানদার অবাক হয়ে বলল, “দাদু, এটা তো মুরগি!” দাদু রেগে গিয়ে বললেন, “মুরগি হলে এত পালক কেন?” দোকানদার হেসে হেসে বলল, “ছাগলের পালক কোথায় দেখেছেন?” দাদু তখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না, কারণ ভুল চশমায় তাঁর চোখে সবই উলটপালট।
সবচেয়ে মজার কাণ্ড হলো বাড়ি ফিরে দাদু দিদাকে ডাকলেন, “এই যে, তুমি কখন থেকে এত লম্বা হয়ে গেলে?” দিদা তখন খাটে বসে সেলাই করছিলেন। দাদু কাছে গিয়ে বুঝলেন, তিনি আসলে দিদাকে নয়, আলমারিতে ঝোলানো লম্বা কোটকে মানুষ ভেবেছেন। তখন দিদা হেসে বললেন, “তোমার চোখে আজ কী হয়েছে?” দাদু চশমা খুলে তাকাতেই সব পরিষ্কার। তিনি বুঝলেন, ভুল চশমাই আজ সব গণ্ডগোল করেছে।
দাদু লজ্জা পেয়ে বললেন, “এই চশমা আর কোনোদিন না দেখে পরব না।” কিন্তু সন্ধ্যায় আবার তাঁকে দেখা গেল চশমা পরে বসে আছেন। রিকু জিজ্ঞেস করল, “দাদু, আবার চশমা?” দাদু মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ রে, তবে আজ ঠিকটা। ভুল চশমা হলে তো তোমাকেই কুকুর বানিয়ে ফেলব!” সবাই আবার হেসে উঠল, আর দাদুর ভুল চশমার গল্প সেদিন থেকেই গ্রামে বিখ্যাত হয়ে গেল।
নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ
মোবাইলঃ 01739872753
https://www.facebook.com/profile.php?id=100014642137028&mibextid=ZbWKwL