Skip to content

গান্ধর্ব বিবাহ – করুণাকর প্রধান

মনুস্মৃতি সহ ধর্মশাস্ত্রে সনাতন ধর্মে বিবাহের আট প্রকারের উল্লেখ আছে। ব্রহ্ম, দৈব, অর্সা, প্রজাপত্য, অসুর, গান্ধর্ব, রাক্ষস ও পৈসাচ। পুরাকাল থেকে হিন্দু সমাজে প্রজাপত্য মতে বিবাহ অনুষ্টিত হয়ে চলেছে । ধীরে ধীরে বর্ত্তমানে সব সমাজে গান্ধর্ব বিবাহই বেড়ে চলেছে। এই বিবাহ প্রেমের মাধ্যমে ছেলে মেয়ে নিজেরা বিবাহ করে।
মহাভারতেও গান্ধর্ব বিবাহও দেখা যায়। রাজা দুষ্মন্ত ও শকুন্তলা পরস্পরের প্রেমে আবদ্ধ হয়ে, কণ্ব মুনির আশ্রমে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।ঋষি বিশ্বামিত্রের ঔরসে অপ্সরা মেনকার গর্ভে শকুন্তলার জন্ম হয়। পুরু রাজবংশের রাজা দুষ্মন্তের দেখা হয় তপস্বী শকুন্তলার সাথে, যেখানে তারা প্রথম দর্শনেই একে অপরের প্রেমে পড়েন।শকুন্তলা ও দুষ্মন্তের মধ্যে “গন্ধর্ব” নামে একটি অনুষ্ঠানে, প্রকৃতির সাক্ষী হিসেবে পারস্পরিক সম্মতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়। দেবরাজ ইন্দ্র বিশ্বামিত্রের তপস্যা ভঙ্গ করতে অপ্সরা মেনকাকে তার নিকট প্রেরণ করেন।তার রূপ ও লাবণ্যের মোহে বিশ্বামিত্র বিচলিত হন। সংযম হারিয়ে তিনি মেনকার সাথে মিলিত হন । দীর্ঘকাল এইভাবে মিলনের ফলে বিশ্বামিত্রর ঔরসে মেনকা গর্ভে একটি শিশুকন্যার জন্ম হয়। তপস্যার্জিত পুণ্যফল ক্ষয়ের জন্য ক্রদ্ধ হয়ে বিশ্বামিত্র মেনকা ও তার কন্যাকে পরিত্যাগ করে হিমালয়ে চলে যান। এরপর মেনকাও তার শিশুকন্যাকে মালনী নদীর তীরে পরিত্যাগ করে স্বর্গে ফিরে যান।
ঋষি কণ্ব সেই কন্যাটিকে পক্ষীপরিবৃত অবস্থায় উদ্ধার করেন। তিনি মেয়েটির নামকরণ করেন শকুন্তলা। এরপর শকুন্তলাকে নিজ আশ্রমে এনে লালন পালন করতে থাকেন। রাজা দুষ্মন্ত মৃগয়ায় এসে একটি হরিণকে তাড়া করতে করতে কণ্বের তপোবনে এসে উপস্থিত হন। এখানেই শকুন্তলার সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয়। তারা পরস্পরের প্রেমে পড়েন ও আশ্রমেই তাদের গান্ধর্ব বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই বিবাহের পরিণতি কি দুঃসহ হয়েছিল তা সকলেই জানেন।
এরপর দুষ্মন্ত রাজধানীতে ফিরে যান। যাওয়ার আগে দুষ্মন্ত শকুন্তলাকে একটি রাজকীয় অঙ্গুরীয় দিয়ে যান এবং কথা দেন যে আবার ফিরে আসবেন। দিনের পর মাস যায় দুষ্মন্ত আর আশ্রম মুখো হন নি। শকুন্তলা ইতিমধ্যে এক পুত্রসন্তানের জননী হয়েছেন। অপেক্ষা করতে করতে চোখের জল শুকিয়ে যায়। শকুন্তলা দুষ্মন্তের রাজপ্রাসাদে যাওয়ার স্থির করেন। যাওয়ার সময় রাজার দেওয়া অঙ্গুরীয় হারিয়ে যায়। রাজার কাছে গেলে তিনি বদনামের ভয়ে মা ছেলেকে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিলেন। চোখের জলে ভাসতে ভাসতে শকুন্তলা প্রাসাদ থেকে পথে নামেন। কেউ কি বিশ্বাস করবে, রাজা এই কয় বছরে এত বড় ঘটনা ভুলে গেলেন ?
শকুন্তলা পুত্র, ভরতকে নিয়ে গভীর বনে বাস করতে থাকেন। এদিকে রাজা দুষ্মন্তের কোনো সন্তান না থাকায় তিনি তাঁর কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে থাকেন। আবার শিকারে গিয়ে ভরতকে দেখতে পান ও শকুন্তলা ও পুত্র, ভরতকে রাজপ্রাসাদে ফিরিয়ে আনেন।
আমি যে ঘটনা বলতে চলেছি সেও এক প্রেম ঘটিত গোপনে বিয়ের কাহিনি। গ্রামের নাম বারোবাটি। বড় গ্রাম, ধনী দরিদ্র ব্যবসায়ী চাকুরে সব রকম লোকের বাস। এই গ্রামে একটি ছোট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল। ছোট এই চিকিৎসালয়টি দুভাগে বিভক্ত, একভাগে রোগী দেখা হয় আর একভাগ ডাক্তার থাকার জন্য। যারা নুতন নুতন ডাক্তারী পাস করেন, তারাই ছয় মাস বড়জোর একবছর সময়কাল অতিবাহিত করে ফিরে যান। বেশীর ভাগ সময় ডাক্তারই খাকেন না। গ্রামের এক প্রৌঢ়া এই কেন্দ্রের নার্স আয়া সব। ডাক্তার না থাকলে এই মালাদিদিই প্রাথমিক চিকিংসাও করতেন। ভদ্রমহিলা সকাল আটটা থেকে দুপুর পর্যন্ত কেন্দ্রে বসে থাকেন। প্রায় সময় ডাক্তার না থাকায় লোকেরা সরকারের উপর অসন্তষ্টু ছিল। গণ্যমান্যরা সরকারের কাছে দরবারও করতেন। প্রায় ছয় মাস ডাক্তার নেই। এইসময় একদিন মালাদি এক রোগীর সঙ্গে কথা বলছিলেন, পোষ্ট পিওন একটি খাম দিয়ে গেল। মালাদি দেখলেন চিঠিটি সরকার থেকে এসেছে। তিনি চিঠিটি খুললেন। তাঁর খুব বেশী একটা ইংরাজীতে দখল ছিল না। শুধু বুঝলেন নুতন ডাক্তার আসচ্ছে। মালাদি মনে মনে ভাবলেন “ কয়দিন থাকে দেখি। কাউকে ধরে ঘরটা পরিষ্কার করে দিতে হবে।“
দিন তিনেক পরে কোনো এক সোমবার ডাক্তার এসে স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হাজির হলেন। বাস রাস্তা থেকে প্রায় দু মাইল হেঁটে আসতে হয় তাই ডাক্তার ঘেমে নেয়ে একসা। মালাদিকে বললেন “ মাসি, এক গ্লাস জল দেবে।“
মালাদি তাড়াতাড়ি জল দিল।
ডাক্তারের বয়স ছাব্বিশ সাতাশ হবে। খানিকটা ননীর পুতুল। আদর যত্নে বড় হয়েছেন বলে মনে হয়। মাঝারি গড়ন। গায়ের রঙ অতি ফরসা ও দেখতে সুদর্শন। ভদ্র, নম্র, বুদ্বিদীপ্ত চোখ মুখ এবং অন্যকে সম্মান করেন। মনে হয় গ্রামাঞ্চলে আসায় কিছুটা অসন্তুষ্ট।
“ আমি কোথায় থাকবো ?”
“ এই পাশের ঘরটা আপনার থাকার ঘর, স্যার।“ মালা দি বললেন।
“ আমাকে স্যার বলবেন না। আপনার চেয়ে অনেক ছোটো। আমার নাম ধরে ডাকবেন। আমার নাম অর্নিবান, অর্নিবান দও। আমার খাওয়ার কি ব্যবস্থা আছে ?”
“ আপনার রান্নার করার লোক আমি দেখে রেখেছি। আজ সন্ধ্যা থেকে আসবে। আপনি বিশ্রাম নেয়। “ এই বলে তাঁর ঘরে নিয়ে গেলেন।
মালাদি বাড়ী ফেরার সময় প্রতিমার বাড়ী গেলেন। প্রতিমাদেবীই ডাক্তারের রান্না করবেন। প্রতিমাদেবীর স্বামী নিখিল দাসের বাড়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছেই । নিখিল দাস এক সামান্য চাষী। বিঘা খানেক জমি ও জন মজুরী করে কোনোরকম সংসার চলে। সংসারে অভাব লেগেই থাকে। তাই প্রতিমাদেবী যে কাজ পান তাই করেন। আগের কয়েকজন ডাক্তারের জন্য রান্নাও করেছন। ওঁর দুই মেয়ে। বড় মেয়ের বছর তিনেক আগে বিয়ে হয়েছে তাই কিছু ধারদেনা শোধ করতে এখনোও বাকী আছে। ছোটো মেয়ে দেবযানী। মেয়ে পড়াশুনায় খুব ভালো । বাবার সামর্থ না থাকলেও সে কোনোক্রমে পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রামেই উচ্চ মাধ্য্যমিক স্কুল। সে এবারে উচ্চ মাধ্য্যমিক পরীক্ষা দেবে। তার বয়স সতের কি আঠারো হবে। এমনি দেখতে ভালো ছিল। কুঁড়ি থেকে ফুল যেমন প্রস্ফুটিত হয়,যৌবনে পদার্পন করার তার রূপ ও রঙ ফুটে বেরচ্ছে। চোখ দুটি ডাগর ডাগর সমুদ্রের মতো গভীর, মুখ খানি চাঁদের মতো স্নিগ্ধ ও গোল। একঢাল কালো চুল গোটা পিঠ ঢেকে থাকে। হাতের আঙ্গুলগুলো লম্বা ও পেলব। স্বভাবে লাজুক নম্র,বিনয়ী কিন্তু বুদ্ধিমতী। মা অন্য কাজে থাকলে রান্না ঘরদোর গোছানো প্রভৃতি কাজ করে। ও ঘরেই থাকতে পছন্দ করে। বাইরে খুব একটা বেরোয় না। স্কুলের দিন স্কুলে যায় ও ছুটি হলেই বাড়ীতে চলে আসে। বন্ধুবান্ধব খুব একটা নেই।
প্রতিমাদেবী রান্নার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। সকালে বিকালে রান্না করে খাবার থালায় সাজিয়ে শোয়ার ঘরে টেবিলে রেখে ঢাকা দিয়ে চলে আসেন। এই ভাবে প্রায় মাস দুই গেছে।
ডাক্তারের এই জায়গা মোটেই ভালো লাগছে না। বন্ধুবান্ধব নেই। বই পড়া আর রোগী দেখা। একাকীত্ব ক্রমে গ্রাস করছে। চিঠি ছাড়া যোগাযোগের আর কোনো উপায় নেই। তিনি এম ডি পড়ার ব্যবস্থা করছেন।
একদিন প্রতিমাদেবী মাঠ থেকে গরু নিয়ে আসার সময় পড়ে গিয়ে কোমরে খুব ব্যথা পেয়েছেন। হাঁটতে বড়ই কষ্ট হচ্ছে। তিনি শুয়ে শুয়ে মেয়েকে বললেন:
“ কি হবে রে দেবী, ডাক্তারের রান্নার কি হবে ? ছেলেটা কি উপোস করে থাকবে?
“ তুমি এই অবস্থায় কোথাও যাবে না। ডাক্তার খাবার ঠিক জোড়াড় করে নেবে।“
“ নারে মা, ও নুতন এয়েছে। এমন করা উচিত নয়। আমি কোনো রকম যাই।“
“ না, তুমি যাবে না। ঠিক আছে, আমি যাই রান্নাটা করে দিয়ে আসি। আচ্ছা মা, ডাক্তার রান্নাঘরে ঢোকে ?”
“ না, উনি আসেন না।“ তুই যদি যাস্, খাবারটা টেবিলে ঢাকা দিয়ে আসবি।“
দেবযানী রান্না করে টেবিলে রেখে চলে আসে। ডাক্তারকে দেখারও চেষ্টা করে নি।
ডাক্তার রাতে খাওয়ায় সময় ভাবছে এ রান্না তো প্রতিমা মাসির নয় পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। এ তরকারীর স্বাদ অপূর্ব । কাল দেখবেন কে রান্না করতে আসচ্ছে।
পরেরদিন সকালে চেম্বার থেকে উঠে ডাক্তার রান্না ঘরে ঢোকেন। দেবী কে ঢুকলো দেখতে গেলে চার চোখ এক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তার স্পষ্টই অনুভব করলেন এক উজ্জ্বল তরঙ্গ সামনের মেয়ের চোখ থেকে বেরিয়ে তাঁর চোখে প্রবেশ করে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। তিনি সম্বিত হারিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন। দেবী কিন্তু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। ডাক্তারের বিহ্বলতা কেটে গেলে তিনি চেম্বারে ফিরে যান। মালা মসিকে জিজ্ঞাসা করেনন: “ প্রতিমা মাসিমা আসছে না ?”
“ না, ও পড়ে গিয়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছে তাই তার মেয়ে আসচ্ছে”
ডাক্তার আর কিছু জানতে চায় না কারন একটি মেয়ের সম্বন্ধে বেশী জানতে চাওয়া অশোভন। কিন্তু মেয়েটার চিন্তা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারছেন না। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রাম নিতে নিতে ব্যাপার কি হলো ভাবতে থাকেন। তিনি ডাক্তারী পড়ার সময় অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিতন্ত্র ও মনস্তত্ত্ব পড়েছেন। প্রেম সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ জ্ঞান আছে। প্রেম শারীরিক মিলনের আহ্বান মাত্র। প্রেম একটি প্র্বল আকর্ষণ যা যৌন আবেদন থেকে উৎপত্তি হয় । বিপরীত লিঙ্গের প্রতি জৈবিক আকর্ষণও প্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। শারীরিক ও মানসিক জৈবিক চাহিদা সম্পর্কের মাধ্যমে মানুষ একে অপরের প্রতি আকৃষ্ট হয়.। বংশবৃদ্ধি করা জীবের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট। বংশবূদ্ধির জন্য অপত্য দরকার। অপত্যের জন্য বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে শারীরিক মিলন অপরিহার্য । প্রকৃতির নিয়মে যৌবন সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মাতোয়ারা হয়।
যৌবনের প্রারম্ভ থেকে সারা যৌবনকাল এই প্রেমের আকর্ষণ বজায় থাকে। যৌবন প্রজননের সময়। আমাদের প্রজননের প্রয়োজনে প্রেম ভালোবাসা প্রকূতি নিয়মে জীবনে আসে এটা অন্যান্য মৌলিক চাহিদার মতোই। প্রেমের সাথে যৌন আনন্দ এবং তৃপ্তির আকাঙ্ক্ষা জড়িত থাকে । প্রেম না থাকলে শারীরিক মিলনের আহ্বান থাকে না। বিবাহ শারীরিক মিলনের সামাজিক স্বীকৃতি। প্রেমেতে মিলনের আকুতি থাকে প্রবল তাই মিলন হয় চরম আনন্দময় ও তৃপ্তিদায়ী। প্রেম প্রেমিক প্রেমিকাকে স্বর্গের নন্দন কাননে নিয়ে যায়। প্রেম এক আশ্চর্য অনুভূতি যা দুর্দমনীয়। না পাওয়া পর্যন্ত এর আকর্ষণ ও দহন জ্বালা প্রশমিত হয় না। মিলনেই এর শান্তি ও তৃপ্তি। তাই প্রেম প্রাকৃতিক ও সর্বত্রগামী। কামই প্রেমের ছদ্মবেশে নিজ ইচ্ছা পুরন করে। তাই প্রেম এক মত্ত অবস্থা। দুজনে এতটা উন্মত্ত ও অন্ধ হয়ে থাকে, তাদের বুদ্ধিবৃত্তি লোপ পায়। পৃথিবীর ইতিহাসে এর জন্য কত যুদ্ধবিগ্রহ, সংঘাত, হত্যা, ষড়যন্ত্র ও আত্মহত্যা ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই। সমস্ত কাব্যে ও সাহিত্যে প্রেম এক উজ্জ্বল স্থান করে নিয়েছে। প্রেম চিরকালীন ও শাশ্বত।
পূর্বরাগ দিয়ে প্রেমের প্রস্তুতি শুরু হয় । প্রেমের সময় ডোপামিন এবং নোরএপিনেফ্রিন নামক হরমোন সক্রিয় হয়, যা মানুষকে অন্যজনের প্রতি গভীর আকর্ষণ অনুভব করতে সাহায্য করে। কামনা জাগ্রত হয় সেক্স হরমোন টেসটোসটেরন ও ইসট্রোজেনের মাধ্যমে। আকর্ষণ তৈরি হয় মস্তিষ্কের ডোপামিন ও নোরিপাইন এবং আসক্তি তৈরি হয় অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রোসিনের মাধ্যমে যা একান্ত আপন স্বর্গীয় অনুভূতি ও চরমানন্দ দান করে। হাইপোথ্যালামাস প্রেমে পড়ার এই দিকটিতে ব্যাপকভাবে জড়িত। হাইপোথ্যালামাস পুরুষ জননতন্ত্র এবং ডিম্বাশয়কে যৌন হরমোন টেস্টোস্টেরন এবং ইস্ট্রোজেন নিঃসরণে উদ্দীপিত করে। উভয়ই আবেগ এবং কামনার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে ভূমিকা পালন করে।

ডাক্তারের মনে হয় পৃথিবীতে এই মেয়েটি একমাত্র মহিলা আর সব সবাই পুরুষ । জীবনে কত মেয়েকে দেখেছেন ও মিশেছেন কিন্তু এমন অমোঘ আকর্ষণ ও স্বর্গীয় অনুভূতি কখনো আগে পান নি। ডাক্তার তার চেম্বারে গেলেন। হঠাৎ এই স্থানটা ভালো লাগতে আরম্ভ করেছে। চেম্বারে দক্ষিণ দিকের জানালা দিয়ে ফুরফুরে হাওয়া দেহে মনে শিহরণ দিচ্ছে। নানা পাখির মধুর গান শুনতে পাচ্ছে। বাইরে গাছে গাছে নানা রঙের বাহারি ফুল ফুটে আছে, এতদিন তাঁর চোখেই পড়েনি। মনে রঙ ধরলে পৃথিবী রঙিন হয়ে ওঠে। মেয়েটার ভাবনা কিছুতেই মন থেকে তাড়াতে পারচ্ছেন না। তবে প্রেম কি একটি মানসিক রোগ ? অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (OCD) । ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না।
আজ চেম্বারে রোগী নেই। সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে। মেয়েটা সন্ধ্যায় আসে কিনা দেখার জন্য তিনি চেম্বারের বাইরে পাইচারি করতে লাগলেন। দুর থেকে ডাক্তার দেখলেন দেবযানী আসছে। দেখা মাত্র ডাক্তারের হৃদয়ে এক শিহরণ উঠে মিলিয়ে গেল। দেবযানী কাছে আসতে আবার চারচোখের মিলন। আবার সেই তরঙ্গ এসে সারা শরীরে খেলে গেল। দেবযানী সেকেন্ডের মধ্যে চোখ নামিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল। দেবযানী রান্না করে চলে গেছে। ডাক্তার রান্নাঘরে যাওয়ার সাহস করেন নি। সেদিন আকাশে চাঁদ উঠেছে। জোৎস্নায় চারদিক ভেসে যাচ্ছে। ডাক্তার এমন চাঁদ প্রথম দেখলেন। শহরে চাঁদের সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় না। ডাক্তার এখনো পাইচারি করছেন। তিনি ভাবছেন এই তরঙ্গের কথা। চিন্তার একটি তরঙ্গ আছে। মানুষের চিন্তা যা তরঙ্গ তৈরী হয় এবং নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সিতে কম্পন সৃষ্টি করে, যা অন্য মানুষের মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে। চিন্তার গভীরতা ও একমুখীতার জন্য এই তরঙ্গ শক্তিশালী হয় যা অপরকে আঘাত করে। একে টেলিপ্যাথি বলা হয়।
ডাক্তার খেয়ে শুয়ে পড়লেন। ঘুম কিছুতেই আসছে না, চিন্তাটা মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছেন। সকালে উঠে প্রাতরাশ করে চেম্বারে যান। মনে মনে অপেক্ষা করে আছেন দেবযানী কখন আসবে। আসার ইঙ্গিত পেতেই স্বপ্নাবিষ্টের মতো রান্নাঘরে হাজির।
“ তোমার মা কেমন আছেন ?”
কম্পিত কণ্ঠে মৃদু স্বরে উত্তর এলো “ একটু ভালো “
“ তোমার নাম কি ?”
“ দেবযানী “
“ পড়াশুনা করছো ?”
“ উচ্চ মাধ্যমিক এই বছর দেব।“
“ বিকালে তোমার মাকে দেখতে যাব। না যাওয়া পর্যন্ত বেরোবে না।“
দেবযানী মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো।
দুপুরের পর দেবযানীর বুকের ভিতরে কে যেন হাতুড়ি মারছে। ক্রমাগত বুকটা ঢিপ ঢিপ করছে। বারে বারে ডাক্তারের আসার পথের দিকে চোখ চলে যাচ্ছে। সময় কিছুতে কাটতে চাইছে না। সন্ধ্যা হতে যাচ্ছে। হঠাৎ দেবযানী দেখলো ডাক্তার আসচ্ছে। দেবযানীর বুকে বড় একটা ঘা পড়লো। বুকের ঢিপঢিপানিটা বেড়ে গেল। দেবযানী আজ ডাক্তারকে ভালো করে দেখচ্ছে। বাঃ, বেশ সুদর্শন, ব্যক্তিত্বসম্পন্ন। ডাক্তার এসে প্রতিমাদেবীকে পরীক্ষা করলেন।
“ না, সে রকম কিছু হয় নি। এটা পেশীর ব্যথা। একটি কাঁচের বোতলে উষ্ণ জল ভরে তিন চারবার সেঁক দাও, সেরে যাবে। কাল একবার এসে দেখে যাব। এক গ্লাস খাওয়ার জল দাও তো।
দেবযানী গ্লাসে জল নিয়ে আসচ্ছে কিন্তু হাতটা কাঁপচ্ছে। জল ধরাতে গিয়ে যেই আঙ্গুলে আঙ্গুল স্পর্শ হওয়ায় হাতটা জোরে কাঁপায় গ্লাস মাটিতে পড়লো।
“ দেবী, কি যে করিস্ ?”
“ না, না, আমি ঠিক ধরতে পারি নি।“
দেবী আর গ্লাস জল এনে একটা টুলে রাখলো।
প্রতিমাদেবী বলেন “ রাতে যাই হোক কিছু খেয়ে যান।। রাত হয়ে গেছে, দেবী আবার যাবে।“
ডাক্তার চুপ করে থাকলেন।
ডাক্তার খাওয়ার সময় জিজ্ঞাসা করলেন “ তোমার কোন বিষয় ভালো লাগে ?”
“ ইংরেজি “
“ ইংরেজি অনার্স নিয়ে পড়বে ?”
“ যদি সুযোগ পাই তাহলে পড়বো।“
দেবী এর মধ্যে কিছুটা সাহস পেয়ে গেছে তাই জানতে চাইলো: “ আমার রান্না খেতে পারছেন ?”
“ অসাধারন”
“ আপনি বাড়িয়ে বলছেন”
“ না না, সত্যি ভালো “
ডাক্তার খাওয়ার পর বাসায় ফিরলেন।
পরদিনও এলেন। এইভাবে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলো। ডাক্তার বেশীর ভাগ রাতে দেবীর বাড়ীতে খেয়ে ফিরেন। তিনি দেবীকে যতই দেখছেন তাঁর মুগ্ধতা ততই বাড়ছে। দেবী লাজুক, ধৈর্যশীল, সত্যবাদী, কোমল হৃদয়, দায়িত্বশীল, চটপটে, মুখে হাসি লেগেই থাকে, বুদ্ধিমতী, আত্মবিশ্বাসী । সে শাড়ী পরলে আরও মিষ্টি লাগে। হয়তো প্রেমিকের চোখ বলে রূপ গুণ বেশী দেখা যায়।
এইভাবে মাস পাঁচেক গেল। দেবী উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় ভালোভাবে পাশ করেছে। ইংরাজীতে লেটার পেয়েছে। ও ইংরাজীতে অনার্স নিয়ে ভর্ত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ওরা মন্দিরে মালা বদল করে গান্বর্ব মতে বিয়ে করে এবং ডাক্তারের কোয়াটারে স্বামী স্ত্রী থাকতে লাগলো ।
প্রায় মাস খানেক পর ডাক্তার জানতে পারলেন তাঁর এম ডি পড়ার ব্যবস্থা হয়ে গেছে। তাঁকে যেতে হবে শুধু সরকারী আ্দেশনামা আসতে বাকী। দেবী বললো:
“ তোমার সঙ্গে আমাকেও যেতে হবে।“
“ আমি বাড়ীতে এখনোও কিছু বলি নি। আমি গিয়ে সমস্ত ব্যবস্থা করে তোমাকে নিয়ে যাব। তুমি কিছুদিন বাপের বাড়ীতে থাক।“
দেবীর মন বিষাদে ভরে গেল কিন্তু মুখে কিছু বললো না। ডাক্তার চলে গেলেন। মাস দুই চলে গেল। ডাক্তারের কোনো খবর নেই। এদিকে জানা গেল দেবী অন্তঃসত্ত্বা। পরিবারের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। তারা কি করবে বুঝতে পারলো না। দেবী হাওড়ার ডাক্তারের বাড়ীর ঠিকানা জানতো। সে একটি চিঠি লিখলো। মাসের পর মাস চলে গেল। কোনো উত্তর নেই। দেবী আবার চিঠি দিল।
ইতিমধ্যে দেবীর একটি ফুটফুটে ছেলে হয়েছে। খবরটা চিঠিতে দেবী ডাক্তারকে জানলো। আরও মাস ছয়েক চলে গেল। ডাক্তারের কোনো খবর নেই। দেবীর বাবা মা ও আত্মীয় স্বজন ঠিক করলো ডাক্তারের বাড়ী যাওয়ার। সেই মতো দেবী গ্রামের এক অভিজ্ঞ বয়স্কলোককে নিয়ে হাওড়া যাত্রা করলো। দুপুরের দিকে তারা ডাক্তারের বাড়ীর সামনে পোঁচালো। ছিমছাম দোতলা বাড়ী। সামনে সুন্দর এক বাগান। দেবীর বুকের ভিতর সেই ঢিপঢিপানি শুরু হলো। ওরা গেট খুলে ভিতরে ঢুকলো। দরজার সামনে নেমপ্লেটে লেখা “ প্রদীপ কুমার দত্ত, এল এল বি, এডভোকেট।“ ওরা বেল দিল। কিছুক্ষণ পর এক পৌঢ়া দরজা খুললেন। আভিজাত্যপূর্ণ চেহেরা, দামী কাপড় পরিহিত, চোখে সোনালী ফ্রেমের দামী চশমা। গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব । বললেন “ কাকে চাই ?”ভদ্রলোক বললেন “ অনির্বান বাবু আছেন ?”
“ কেন, কি দরকার ? ওতো দিল্লীতে এম ডি পড়ছে।“
ভদ্রলোক ঘটনাটা সবিস্তারে বললেন।
“ কি বিয়ে করছে ? ওতো আমাকে কিছু বলে নি। ধাপ্পা দেওয়ার জায়গা পেলেন না ?”
একটা গেঁয়ো মেয়েকে বিয়ে করেছে? বললেই আমরা মেনে নেব ? সাজিয়ে গুজিয়ে একটা গল্প
ফেঁদে নিয়ে চলে এসেছেন। কি প্রমান আছে যে ও বিয়ে করেছে ?”
“ আমরা গ্রামের সকলে জানি। মন্দিরের দুজন পুরোহিত সাক্ষী। আমি ডাক্তার বাবুর বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাই।“
“ উনি নেই, কোটে গেছেন। আমি স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, এই গল্প বলে এখানে কোনো সুবিধা হবে না। আপনারা যে পথে এসেছেন, সেই পথে ফিরে যান।“ বলেই মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দিলেন।
দেবী প্রথম থেকে কেঁদেই চলেছে। ভদ্রলোক বললেন চল মা, বাড়ী ফিরি। এত তাড়াতাড়ী ভেঙে পড়লে চলবে ? জীবন একটা যুদ্ধক্ষেত্র, শেষ পর্যন্ত লড়তে হবে। ডাক্তার ফিরুক। আমি তোমার সাথে আছি। পড়াটা ভালো করে চালিয়ে যাও। নিজের যোগ্যতা প্রমান কর। সময় কথা বলবে। ধৈর্য ধর।“
দেবী বুক বেঁধে বাড়ী ফিরে এলো। ভালো মত পড়ায় মন দিল। বাড়ীতে কোচিং ক্লাস করে নিজের খরচ চালালো।এই ভাবে বছর কাটলো। ডাক্তার পড়া শেষ করে বাড়ীতে এসেছে। দুই তিন পর মা বললেন “ খোকা, তোর কয়েকটা চিঠি এসেছিল। তোর ঘরে কোথাও রেখেছি, দেখতো।“ ডাক্তার চিঠিগুলো পড়ে অস্থির হয়ে উঠলো। মাকে তিনি চেনেন তাই ভয়ে কিছু বলেন নি। বাবা অমায়িক ও সদাশিব কিন্তু বিচক্ষন মানুষ। রাতে বাবাকে সব ঘটনা খুলে বললেন। বাবা বললেন “ তুই অন্যায় করছিস্ বাবা। কাল সকালে গিয়ে ক্ষমা চেয়ে বৌমা ও দাদুভাইকে নিয়ে আয়। মাও কথাটা শুনলেন কিন্তু ছেলে ও তার বাবার উপর কোনো কথা বলতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন এক্ষেত্রে মানিয়ে নেওয়াই মঙ্গল।
**************

মন্তব্য করুন