Skip to content

ক্ষেত্রজ সন্তান – করুণাকর প্রধান

এখন একটা নুতন ধরনের গল্প নিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়েছি। এটা মহাভারতের গল্প হলেও গল্প নয়। তৎকালীন সমাজে এই প্রথা নিশ্চয় স্বীকৃত ছিল কারণ কাব্যে সমাজের প্রতিফলন হয়। সব সমাজে সেই প্রথা চলে আসচ্ছে।
আপনারা নিশ্চয় মহাভারতের বিখ্যাত চরিত্রের নাম শুনেছেন। ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু, যুধিষ্টির, ভীম, অর্জুন, নকুল, সহদেব ও ইরাবান ইত্যাদি । কিন্তু এদের জন্ম রহস্য অনেকে না জেনে থাকতে পারেন। এরা সকলেই ক্ষেত্রজ সন্তান ছিলেন।
ক্ষেত্রজ সন্তান হলো এমন একজন যে কোনো নারীর তার স্বামী ছাড়া অন্য পুরুষের দ্বারা গর্ভধারণের ফলে জন্মায়। অন্যভাবে বলতে গেলে, নিজ স্ত্রীর গর্ভে, কিন্তু অন্য পুরুষের ঔরসজাত সন্তানকে ক্ষেত্রজ পুত্র বলা হয়। মনুসংহিতায় এই নিয়োগ প্রথার অনুমোদন আছে।
আমি যে গল্প বলতে চলেছি তা গল্প হলেও সত্যি। পশ্চিমবঙ্গে এক গ্রামের নাম বল্লভপুর। এই গ্রামে জীবনাদিত্য রায় নামে প্রতাপশালী জমিদার ছিলেন। এঁর ঠাকুরদাদা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আমলে জমিদারী লাভ করে ছিলেন। স্বাধীনতার পর জমিদারী প্রথা বিলুপ্ত হয় কিন্তু তাঁর বাবার আমলের প্রাসাদ সম বাড়ী ও প্রচুর সোনাদানা ও সম্পতি ছিল। এইসব থেকে যে আয় হতো তাতে তিনি বিলাসবহুল জীবন যাপন করতেন। তাঁর বাড়ীতে দুজন লোক, তিনি ও তাঁর স্ত্রী ,রমা,। কিন্তু দাস দাসী চাকর বাকর নিয়ে বিরাট সংসার। জমিদারী গেলেও জমিদারীর ঠাটবাট বজায় ছিল। তাঁর বাড়ীতে উৎসব অনুষ্টান লেগেই থাকতো। মহা ধুমধাম করে দূর্গাপুজা ও কালীপূজা তাঁর বাবার আমল থেকে হয়ে আসছে। তিনি এক নুতন পূজো শুরু করেছেন, কার্ত্তিক পূজা। এই পূজা করার পিছনে এক ইতিহাস আছে।
বাবা অনেক অনুসন্ধান করে ছেলের বিয়ে ধুমধাম করে দিয়েছিলেন। মেয়ের বাবা ততটা বর্ধিষ্ণু নয় কিন্তু মেয়ে ছিল সুন্দরী, দুধে আলতা রং, লম্বা, ছিপছিপে , ভদ্র, নম্র ও বুদ্ধিমতী। বিয়ের চার বছর পর জীবনাদিত্যের বাবা মারা যান। তাঁর একটি ইচ্ছা অপূর্ণ থেকে যায়। তিনি নাতি নাতনির মুখ দেখে যেতে পারেন নি। তিনি পুত্রার্থে কার্ত্তিক পূজা শুরু করেছিলেন। জীবনাদিত্য ছিলেন সাধাসিধে, অমায়িক ও পরোপকারী। তিনি অঞ্চলের উন্নতিতে সদা ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর দুজন দেহরক্ষী ছিল তপন ও প্রনব। এরা দুজন যুবক, কর্মঠ ও বিশ্বাসী। এরা জমিদারের জমিজমা চাষবাস দেখাশুনা করতো ও ফাইফরমাস মতো কাজ করতো। তাই তাদের অন্দরমহলে অবাধ যাতায়াত ছিল। জমিদারের মনে একটা দুঃখ কাঁটার মতো বিঁধে থাকতো। বিয়ে প্রায় দশ বছর হয়ে গেল, কিন্তু তাঁর কোনো সন্তান হলো না। ওই সময় বংশরক্ষায় প্রত্যেক পরিবারই সন্তানের কামনা করতো। পরিবারের কর্তা ও গিন্নির মনে এই ইচ্ছা বদ্ধমূল থাকতো ওখান থেকে বেরিয়ে আসা দুরুহ ছিল। পুত্র পিতার নাম এবং পরিবারের ঐতিহ্য বহন করে, যা বংশের ধারা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
এই পরিস্থিতিতে একরাতে তাঁর স্ত্রী, রমা, বললো “ শুন না, আমাদের কোনো ছেলেপুলে হলো না। হয়তো তার জন্য আমিই দায়ী। এক অপরাধবোধ আমার মধ্যে সব সময় জেগে থাকে “
“ আরে, এসব চিন্তা কর না। সন্তান না হলে কি মানুষ বাঁচে না ?”
“ লক্ষীটি রাগ করো না। সন্তান না থাকলে বংশরক্ষা হয় না। সন্তান না থাকলে মুখাগ্নি, শ্রাদ্ধশান্তি করবে কে? শেষ কথা শেষ বয়সে কে দেখবে ? আমি একটি কথা বলি শোন। তুমি আর একটি বিয়ে কর। দেখ আমার তো বয়স আঠাশ ঊনত্রিশ হলো। আমার মা হওয়া আর হবে না।“
“ ঠিক আছে, পরে দেখা যাবে। এখন শুয়ে পড় তো।“
সপ্তাহ খানেক পরে আবার একেই কথা।
“ আমি একেবারে রাগ করবো না সোনা। আমার আরও আনন্দ হবে। তোমার সন্তান তো আমারই সন্তান। আমি কিন্তু ঘটকদের বলে দিয়েছি মেয়ে খুঁজতে। তুমি আবার না বল না।“
“ তোমার যা ইচ্ছা তাই কর। এখন শুয়ে পড় তো।“
স্বাধীনতার পর পর হিন্দুদের বহুবিবাহে কোনো বাধা ছিল না।
মেয়েও পাওয়া গেল। জমিদারের চেয়ে কুড়ি বছরের ছোটো। বাপের বাড়ী ততটা অবস্থাপন্ন নয় কিন্তু মেয়ে ফরসা, রূপসী, পরীর মতো দেখতে। বাপের বাড়ী জমিদারী দেখে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজী হয়েছিল।
যাইহোক ভালোয় ভালোয় বিয়েটা হয়ে গেল। জমিদার অল্প বয়স্কা বউ পেয়ে মজে গেলেন। বড়বৌর ঘরে বড় একটা যেতেন না। বড়বৌর মন ভালো কিন্তু বরকে কে অন্যের হাতে ছেড়ে দিতে চায় ?
বিয়ের বছর পাঁচ কেটে গেছে ছোট বৌ এর থেকে কোনো খবর নেই। বড়বৌ বুঝতে পারলো কর্তারই দোষ আছে। বড়বৌ এখন সময় কাটানোর জন্য পূজাপাঠ করেন, রামায়ণ মহাভারত পড়েন। মহাভারতে হয়তো ক্ষেত্রজ সন্তান সমন্ধে পড়ে থাকবেন।
পরাজিত ও নিহত হন। বিচিত্রবীর্য তখন নিতান্ত বালক। বিচিত্রবীর্যের নামে রাজত্ব চললো ঠিকই কিন্তু তার পেছনে রয়েছেন রাজমাতা যোজনগন্ধা। যথাকালে বিচিত্রবীর্য যুবক হলে তাঁর বি মহাভারতের সময় বংশরক্ষার জন্য নিয়োগ প্রথার প্রচলন ছিল। কোনও গুণবান ব্রাহ্মণকে নিয়োগ করে বিধবা বা স্বামী সন্তান উৎপাদনে অসমর্থ নারীর গর্ভে সন্তান ধারন করা যেত। এই ভাবে জাত পুত্রকে বলা হয় ‘ক্ষেত্রজ’ সন্তান। সত্যবতী-শান্তনুর জ্যেষ্ঠ পুত্র চিত্রাঙ্গদ খুব অল্প বয়সে বলশালী বীর হয়ে ওঠেন। যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী চিত্রাঙ্গদ গন্ধর্ব চিত্রাঙ্গদের হাতে বাহ হয় কাশীরাজকন্যা অম্বিকা ও অম্বালিকার সঙ্গে। বিবাহের মাত্র সাত বছর পরে তিনি পরলোকগমন করেন। হস্তিনার রাজপ্রাসাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে লাগলেন বিধবা রাজমাতা সত্যবতী, তাঁর দুই বিধবা পুত্রবধূ আর ব্রহ্মচারী ভীষ্ম। ভীষ্ম ছাড়া কুরুবংশে জীবিত কোনও পুরুষ নেই। পরবর্তী সময়ে রাজ্য শাসন কিভাবে হবে ? রাজমাতা সত্যবতী বড় চিন্তায় পড়লেন। সেই সময় তাঁর মনে পড়ে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যাসদেবের কথা, যাঁকে তিনি পরাশরের ঔরসে জন্ম দিয়েছিলেন। ব্যাসদেবকে ডেকে দুই বিধবা বধূর গর্ভ উৎপন্ন করতে বলেন। তার ফলে ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু এবং শূদ্রা এক দাসীর গর্ভে বিদুরের জন্ম হয়।
পাণ্ডু রাজাকে কিমিন্দম মুনি অভিশাপ দিয়ে ছিলেন যে, কোনো নারীর সঙ্গে মিলিত হলে তিনি মারা যাবেন।। তাই তিনি স্ত্রী মিলন থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। যাইহোক তিনি পুত্র উৎপাদনে অসমর্থ ছিলেন। তাঁর দুই স্ত্রী, কুন্তি ও মাদ্রী। মুনি দুর্বাসা কুন্তির সেবায় প্রসন্ন হয়ে তাঁকে এক মন্ত্র দান করেন যার প্রভাবে তিনি যে কোনো দেবোপম প্রিয় পুরুষকে বসে আনতে পারতেন। পাণ্ডুর অক্ষমতার জন্য কুন্তি ধর্ম, পবন ও ইন্দ্রের সাথে মিলিত হয়ে যুধিষ্ঠির, ভীম ও অর্জুনের জন্ম দেন এবং মাদ্রীকে মন্ত্রটা শিখিয়ে দেন। মাদ্রী এইভাবে দুই পুত্র নকুল ও সহদেবের জননী হয়। এরা পাণ্ডুপুত্র বলে পরিচিত হলেও এঁরা ক্ষেত্রজ সন্তান ছিলেন।
জমিদারের বড়বৌ ভাবলেন এই নিময় তো হিন্দুধর্মে স্বীকৃত। তাছাড়া তিনিতো বংশ রক্ষার জন্য করছেন। তাহলে পাপ কিসের ? বেশ কিছুদিন ধরে চিন্তা করে স্থির করেন বংশের জন্য এটা করতেই হবে। কে আর জানবে?
কিছুদিন পর তাঁর নিজস্ব দাসীকে বললেন “তোমাকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে কিন্তু কাক পক্ষী যেন টের না পায়। কাজ করে দিতে পারলে মোটা বকশিস পাবে আর যদি জানাজানি হয় তাহলে তোমার চাকরী তো যাবেই আরও তোমার সমুহ ক্ষতি হতে পারে।“
“ তুমি বল মা, আমি মরে গেলেও কাউকে বলবো না।“
“ তুমি তপনকে জান, আমদের বাড়ীতে কাজ করে।“
“ হ্যাঁ মা, খুব ভালো ছেলে।“
“ ওকে রাতে আমার ঘরে আনতে হবে। একদিন তপন পরের দিন প্রনব রাতে বাড়ীতে থেকে পাহারা দেয়। কৃষ্ণপক্ষে ঘোর অন্ধকার রাতে তাকে আমার ঘরে নিয়ে আসবে আর তুমি ঘরের দরজায় পাহারা দেবে। ও বেরোলে তাকে ওর জায়গায় পৌঁচে দেবে। পারবে ?”
বৃদ্ধা দাসী কিছুটা ভয়ে ও কিছু লোভে রাজী হোলো। কথা মতো অন্ধকার নিশুতি রাতে বৃদ্ধা তপনকে বড়বৌ এর ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজায় পাহারা দিল। বড়বৌ তপনকে বললেন “ দেখ তপন, তুমি আমাদের পরিবারের বিশ্বাসী লোক। তাই আমাদের পরিবারের মঙ্গলের জন্য তুমি এ কাজটা করছ। এই কাজের জন্য তোমার অভাব মিটে যাবে কিন্তু জানাজানি হলে দোষটা আমি তোমার ঘাড়েই চাপাবো। তোমার চাকরী ও যাবে, কঠিণ শাস্তি ও পাবে।“
এরপর কয়েক রাতে তপন ঘরে এল।
মাস তিন চারেক এর পর জানা গেল জমিদার ঘরের বড় বৌ মা হতে চলেছেন। জমিদার বাড়ীতে এক আনন্দের লহরী খেলতে লাগলো। জমিদার দানধান করতে লাগলেন। তাঁর মনে হলো কার্ত্তিকের ইচ্ছায় এতদিন পরে তাঁর সন্তান হতে চলেছে। তিনি এ বছর আরো বড় করে কার্ত্তিক পূজো করবেন। বড়বৌ এর আদর যত্ন বেড়ে গেল। দুজন আয়াকে নিয়োগ করা হলো I যথা সময়ে তিনি এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিলেন। জমিদার বাড়ীতে সাতদিন ধরে উৎসব চললো।কার্ত্তিকের নাম অনুসারে তার নাম রাখা হলো স্কন্দাদিত্য। কেউ ঘুণাক্ষরে জানলো না এ জন্ম বৃত্তান্ত।
আপনারা বলবেন আপনি জানলেন কি করে ? আমার বাড়ী ছিল তপনের গ্রামে। সে আমার চেয়ে বয়সে সাত আঠ বছরের বড়। তপন খুব গরীব ছিল কিন্তু সে ছিল সৎ অমায়িক ও বিশ্বাসী। এই সব গুণের জন্য তাকে সকলে ভালোবাসতো। আমার সঙ্গে তার হৃদ্যতা ছিল। আমি দেখেছিলাম জমিদার বাড়ীতে নিয়োগ হওয়ার কিছু বছর পর থেকে তার অবস্থার উন্নতি হতে লাগলো। সে এ ব্যাপারে আমাকে কোনদিন কিছু বলে নি। কিন্তু বৃদ্ধকালে মৃত্যুকালীন সে শুধু আমাকে এ ঘটনাটা জানিয়ে গিয়েছিল। অতএব এখনো মহাভারতীয় যুগের নিয়োগ প্রথা প্রয়োগ করে সমাজে ক্ষেত্রজ সন্তানের জন্ম হয়। এখন এই প্রথার আরো আধুনিকীকরণ হচ্ছে। আপনারা জানেন স্পার্ম ব্যাঙ্ক গড়ে উঠচ্ছে।
“ যা নেই ভারতে তা নেই ভারতে”

মন্তব্য করুন