মহাভারতে আমরা কানীন সন্তানের সন্ধান পাই। অবিবাহিত বা কুমারী মাতার গর্ভে জাত সন্তানকে কানীন বলে। মহাভারতের দুটি চরিত্র সবচেয়ে বেশী পরিচিত ও আলোচিত। মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ বা বেদব্যাস বা সংক্ষেপে ব্যাস একজন ঋষি ছিলেন। ইনি বশিষ্ঠের প্রপৌত্র, শক্তির পৌত্র, পরাশরের পুত্র এবং শুকদেবের পিতা। বেদব্যাসের মা ছিলেন সত্যবতী, রাজা শান্তনুর ২য় স্ত্রী। পুরুবংশের রাজা উপরিচর বসুর স্খলিত শুক্র ব্রহ্মশাপে মৎসী রূপিণী অপ্সরা, অদ্রিকা নামে খেয়ে গর্ভবতী হন, এবং দশ মাস পরে ধীবরের জালে ধরা পড়েন। মৎসীর উদরে এক পুত্র ও কন্যা পেয়ে ধীবর রাজা উপরিচরের কাছে যায় এবং অপ্সরাও শাপমুক্ত হয় । উপরিচর পুত্রকে গ্রহণ করেন ও কন্যাকে ধীবরের হাতেই দান করেন । ধীবরের ঘরে পালিত হওয়ায় তার গায়ে তীব্র মাছের গন্ধ থাকার জন্য তাঁর নাম ছিল ‘মৎস্যগন্ধা’। পালকপিতার নির্দেশে তিনি যমুনার বুকে নৌকা চালানো আর জেলেনী হিসেবে কাজ করতেন। রাজা ও অপ্সরার মেয়ে বলে মৎস্যগন্ধা খুবই সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী হলেও তার গায়ে তীব্র মাছের গন্ধ থাকায় কেউ তার কাছে আসতে চাইত না। ধীরে ধীরে তিনি পূর্ণ যৌবনা হলেন। একদিন মৎস্যগন্ধার নৌকায় উঠলেন সৌমকান্তি বিখ্যাত মহর্ষি পরাশর। মৎস্যগন্ধা বুঝলেন এঁর দ্বারা তাঁর কার্যসিদ্ধি হবে। তাই মনে প্রানে সেবা করে ঋষিকে সন্তুষ্ট করেন। ঋষি তাঁর সৌন্দর্য ও সেবায় মোহিত হন ও মিলন অভিপ্রায় করেন ব্যক্ত করেন। ঋষির প্রস্তাব শুনে হরষিত কণ্যা সবিনয়ে বলেন “হে ঋষিবর, বর্ত্তমানে আমি কুমারী ও লোকলজ্জা ভয়ে মিলনে অপরাগ। তবে আমার কিছু শর্ত যদি পুরন করেন, আপনার ইচ্ছায় সমর্থন আমার আছে। শর্তগুলো হলো (১) আমাদের মিলন যেন কেউ দেখতে না পায়। (২) আমার গর্ভেতে যে সন্তান জন্ম নেবে, সে যেন বিশ্বখ্যাত ও কীর্তিমান হয় ও বিশ্বজন তার পূজা করে। (৩) তাকে আমি দশমাস গর্ভে ধারন করতে পারবো না তাই সঙ্গে সঙ্গে ভুমিষ্ঠ হয়। (৪( সেই সন্তান আপনাকে নিয়ে যেতে হবে। (৫) আমার কুমারীত্ব ও সৌন্দর্য যেন অটুট থাকে। (৬) আমার গায়ের গন্ধ যেন দুর হয়ে যায় (৭) ভবিষ্যতে আমি যেন রাজরাণী হই।“ কামার্ত ঋষি সকল শর্তে সম্মত হলেন ও তপবলে কুয়াশাছন্ন দ্বীপ সৃষ্টি করেন। সেখানেই বিষ্ণু অবতার ঋষি দ্বৈপায়ন জন্মান। তাঁর বরে কণ্যার গা হতে কস্তুরী গন্ধ নির্গত হতে আরম্ভ করলো। এই গন্ধ ছড়াতো যোজন বিস্তৃত তাই তাঁর নাম হলো যোজনগন্ধা। ছেলের গায়ের রঙ ঘোর কালো ও দ্বীপে জন্ম বলে তাঁর নাম হয়েছিল কৃষ্ণ দ্বৈপায়ণ অপর নাম বেদব্যাস এবং তিনিই মহাভারতের রচয়িতা। মায়ের কণ্যাকালে জন্ম বলে তিনি কানীন।
এবারে কর্ণের কথা বলি। কুন্তীভোজের রাজকুমারী কুন্তী যৌবনকালে দুর্বাসা মুনির কাছে আশীর্বাদরূপে পুত্রেষ্ঠী মন্ত্র লাভ করেন৷ কুমারী অবস্থায় একদিন কুন্তী কৌতূহলবশত মন্ত্রবলে সূর্যদেবতাকে আহ্বান করেন। সূর্য উপস্থিত হলে ভীত কুন্তী তাকে অজ্ঞানতাবশত এই কাজ করেছেন বলে বলেন, কিন্তু, মন্ত্রের সম্মান রক্ষার্থে সূর্যদেবের আশীর্বাদে কবচকুণ্ডলসহ কর্ণের জন্ম হয়৷ বিবাহের পূর্বে কর্ণের জন্ম হওয়ায় কুন্তী লোকনিন্দার ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন৷ সমাজে নিজের সম্মান রক্ষার তাগিদে তিনি শিশুপুত্রকে একটি বেতের পেটিকাতে শুইয়ে নদীতে ভাসিয়ে দেন৷ ভীষ্মের রথের সারথী অধিরথ ও তার স্ত্রী রাধা দেবী তাঁকে উদ্ধার করেন৷ তারা কর্ণকে পুত্রস্নেহে পালন করতে থাকে এবং তাঁর নাম হয় বসু্ষেন। কর্ণকে ‘রাধেয়’ ও” সুতপুত্র” নামেও ডাকা হয়ে থাকেন । তাই কর্ণ কানীন। এখনো সমাজে কানীন সন্তানদের দেখা যায়।
এবারে বর্ত্তমান সময়ের এক কানীন সন্তানের ঘটনা বলি। মেদিনীপুর জেলায় “সামন্তদীঘি” বলে এক গ্রাম আছে। কোনো এক সময়ে এক সামন্তরাজা এখানে বিরাট একটি দীঘি খনন করেন। এই দীঘি দৈর্ঘে প্রায় অর্ধ মাইল ও প্রস্থে তার অর্ধেক। এই দীঘির খোঁড়া কিছু জমা মাটিতে দীঘির দক্ষিণে এক গ্রাম গড়ে উঠেছিল। এই গ্রামের নাম সামন্তদীঘি।
পুকুর খোঁড়ার সময় সেখানে থেকে পুরাকালের একটি কালো পাথরের সুন্দর ভাস্কর্যের বিষ্ণু মূর্তি পাওয়া গেছিল। সামন্তরাজা এই মূর্তির জন্য দীঘির পূর্বধারে এক মন্দির তৈরী করে দিয়ে ছিলেন। গ্রামের এক ব্রাহ্মণ পরিবার বংশপরম্পরায় বিগ্রহ পূজা করতেন। এখন যিনি মন্দিরে পূজা করেন তিনি দরিদ্র হলেও ধার্মিক, সৎ ও বড়ই অমায়িক। তাঁর কোনো সন্তান ছিল না। তিনি খুব ভোরে উঠে স্নান করে মন্দিরে যান ও মন্দির চত্তর পরিষ্কার করার পর সূর্য পূর্ব আকাশে দেখা দেন। তারপর ফুল সংগ্রহ করে মালা গাঁথেন ও ভক্তি ভরে পূজো করেন। প্রত্যেকদিন ঠাকুরের কাছে প্রার্থনা করেন “ হে ঠাকুর আমার একটা বংশধর দাও নাহলে তোমার সেবা কে করবে, প্রভূ ?”
এইভাবে দিন এগোতে লাগলো। একদিন শীতের রাতে এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। নিত্য দিনের মতো ব্রাহ্মণ ঠাকুর ভোরে মন্দিরে গেছেন। গর্ভগৃহের দরজা খুলতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখেন দরজার সামনে ফুলের মতো ফুটফুটে এক সদাজাত শিশু শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ কেঁদে কেঁদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। এ দৃশ্য দেখে তিনি অস্থির হয়ে গেলেন। শিশুটি কি কিছু খেয়েছে ? তিনি মন্দিরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে শিশুটির মা বাবার খোঁজ করলেন কিন্তু অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলেন না। তিনি মন্দিরে ফিরে এসে দেখেন শিশুটি নেতিয়ে পড়ে আছে। তিনি বুঝলেন শিশুটির খাওয়ার দরকার। “প্রভূ তোমার কি লীলা;” তিনি শিশুকে কোলে নিয়ে দৌড়ালেন বাড়ী দিকে। বাড়ী গিয়ে গৃহিনীকে দিয়ে বললেন “ গিন্নি, ঠাকুর কাকে দিয়েছেন দেখ।“
“ওমা কি সুন্দর; কার মেয়ে গো?”
“ পরে সব বলবো, এখন এর খাওয়ার ব্যবস্থা কর।“
ততক্ষণে গ্রামে ঘটনাটা রটে গেছে। দলে দলে আবালবৃদ্ধবনিতা ব্রাহ্মণের বাড়ী হাজির হতে লাগলো। একমাস ধরে গ্রামশুদ্ধ লোক চারদিকে সন্ধান করেও কোনো খবর পেল না। মেয়েটি ব্রাহ্মণের বাড়ীতে পালিত হতে লাগলো। মেয়েটি যে কানীনী সেটা অনেক পরে জানা গেয়েছিল।
ব্রাহ্মণ খুব খুশি। তাকে আদর যত্ন আদর ভালোবাসায় বড় করে তুলতে লাগলেন। নারায়নের সামনে থেকে পাওয়া গিয়েছিল বলে তার নাম রাখা হলো লক্ষ্মী। চাঁদের অমাবস্যার পর থেকে পূর্ণিমায় গিয়ে ১৬ কলা পূর্ণ হয় , লক্ষ্মীও সেইভাবে বাড়তে লাগলো। ক্রমে ক্রমে তার সৌন্দর্য, মাধুর্য, দয়াশীলতা ও মমতা ইত্যাদি গুণাবলী পরিস্ফুট হতে লাগলো। মেয়েটি একটু বড় হলে সে পিতার সাথে মন্দিরে যেতে আরম্ভ করলো। পিতার কাজে সাহাষ্য করতো। ফুল তুলতো, মালা গাঁথতো, গান করতো এবং ফাঁকে একাগ্র চিত্তে লেখাপড়া করতো। সে বাংলায় রামায়ণ, মহাভারত, উপনিষদ ও গীতা পড়তে লাগলো। এরপর থেকে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটতে শুরু হলো। ক্রমাগত ভক্তসংখ্যা বাড়তে লাগলো। দুর দুর গ্রাম থেকে ভক্তরা আসতে লাগলো। মন্দিরের আয় বাড়তে লাগলো। লক্ষ্মী আর একটু বড় হলে মন্দিরে সন্ধ্যায় ভজন গাইতে শুরু করলো। সন্ধ্যায় আস্তে আস্তে ভক্ত জড়ো হতে আরম্ভ করলো। সকাল সন্ধ্যায় ভক্তের সমাগমে মন্দির প্রাঙ্গনে অনেক দোকানও গড়ে উঠলো। মন্দিরের আয় বাড়তে লাগলো। লক্ষ্মী দুপুরে সমাগত ভক্তের নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা করে। গ্রামের গরীব ও দুঃখীদের খাবার ও অন্যান্য ভাবে সাহায্য করতে লাগলো। ভজনের কথাও সে নিজেই রচনা করতো। তার মধুর ব্যবহার ও মিষ্টি ভজনের জন্য সকলের প্রিয় ছিল। এইভাবে বছরের পর বছর যেতে লাগলো। লক্ষ্মীর বয়স পনের ষোল হলো, একদিন ব্রাহ্মণ মেয়েকে বললেল “ মা তোমার তো বিয়ের বয়স হলো, আমি সুযোগ্য পত্রের সন্ধান করি। তোমার কি মত ?” মেয়ের উওর শুনে ব্রাহ্মণ থ।
মেয়ে বললো “ আমার বিয়ে তো হয়ে গেছে, বাবা।
“ তোমার বিয়ে হয়ে গেল আর আমি জানলাম না “
“ আপনি কি করে জানবেন ? মন্দিরে নারায়েণের সঙ্গে আমার বিয়ে হয়ে গেছে।“
ব্রাহ্মণ এই কথা শুনে তাঁর মনে একটি গভীর ভয় মিশ্রিত শ্র্দ্ধা দেখা গেল। তিনি কাউকে কিছু না বলে চুপ করে থাকলেন। দিনে দিনে মন্দিরের কথা প্রসার হতে লাগলো। লক্ষ্মীর বয়স যখন সাতাশ আঠাশ একদিন সকালে এক সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ তার বিবাহিত মেয়েকে নিয়ে মন্দিরে এলেন। বিবাহিত মহিলা হাউ মাউ করে কান্নার সাথে লক্ষ্মীকে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকেন “ তুই আমার মেয়ে রে ;”
সমবেত লোকজন বিস্ময়ে হতবাক। তারা বৃদ্ধ ভদ্রলোককে ধরলেন ঘটনাটা জানাতে।
ভদ্রলোক বলতে আরম্ভ করলেন “ আমার বাড়ী এখান দশ বারো মাইল দুরে। আমার অবস্থা মোটামুটি ভালো।মেয়ের বয়স যখন ষোল সতের হবে, ওর মায়ের কাছে শুনলাম যে মেয়ে মা হতে চলেছে। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। গিন্নি আরও জানলেন যে মেয়ের গ্রামের এক ছেলের ভালোবাসা ছিল। বদনামের ভয়ে মেয়েকে রাতারাতি গোপনে কলকাতায় পাঠিয়ে দিলাম। বাচ্চা জন্মানোর দিন তাকে কলকাতা থেকে নিয়ে এসে আমি সেই রাতে এই মন্দিরে রেখে গিয়েছিলাম। এই কথা আমি ছাড়া আর কেউ জানে না এবং গোপনে সব খবর নিতাম। আমার মেয়ের বিয়ে কলকাতায় বিয়ে হয়ে যায়। বাড়ীতে মেয়েকে না এনে কলকাতা গিয়ে দেখা করে আসতাম। মেয়ের কোনো সন্তানাদি হয় নি। এই কয়েকদিন হলো আমার বাড়ীতে এসে সন্তান নেই বলে কান্নাকাটি করছিল বলে আমি ঘটনাটা বললাম। মেয়ে এখানে আসবে বলে জেদ ধরলে নিয়ে এলাম।“
মহিলা লক্ষ্মীকে ধরে কেঁদেই চলেছে। বলছে “ চল মা, তুই আমার সঙ্গে চল। তোকে আমরা সব ভালোবাসা দিয়ে রাখবো।“
লক্ষ্মী বলে “ মা, আমি জানি না কে আমার বাবা মা। শৈশব থেকে আমি এখানে বড় হয়েছি। এখানকার সকলের সঙ্গে এক ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে। এদের ছেড়ে আমি রাজপ্রাসাদেও যাব না। বিশেষত নারায়ণকে ছেড়ে যেতেই পারবো না।“
************