Skip to content

শৃঙ্খলিত কোকিলের গান— আমিনুল ইসলাম

(Man is born free but everywhere he is in chain—Rousseau)

উপচে-পড়া সবুজের শিহর ছুঁয়ে
স্রোতের সেতারে আঙুল দিয়ে
দিনরাত মগ্ন
সমতট ঘরানার খেয়ালি রূপকার ষড়ঋতু।
বটপাতায় বেজে ওঠা প্রান্তরের সুর
আর বাতাসের যুগল বন্দিশে
নীল-সামিয়ানার নিচে মুখরিত-
অগণিত শ্রোতা ও সমঝদার।
আর লালনের সুরকণিকা রক্তে নিয়ে
ওয়াঁ ওয়াঁ শব্দে এই প্রকৃতির মঞ্চে
আমার আবির্ভাব
সহজিয়া সংগীতের মুখপাত্র-
সবুজ ঘরানার নতুন শিশু।

তালপাতায় মুখরিত বেজেছে শৈশব
রাখালের বাঁশরিতে লাউয়ের ডগার মতন
নেচেছে কৈশোর।
আর মাঝিদের গানে স্বপ্নের তরঙ্গচূড়ায়
পালের নৌকার মতো যৌবনের নাচানাচি
কতদিন তীরে বসে দেখেছে জেলেরা!
কখনো-বা বাউলের একতারার সুরে
ভোঁ-কাটা ঘুড্ডি হয়ে উড়ে গেছে মন।

অথচ আজ কোলাহলে বন্দি এ আমি!
মাতাল ষাঁড়ের শিঙে লন্ডভন্ড মঞ্চ
নিষাদকন্যার প্রসারিত হাত
আমার গলা জড়িয়ে টানে
মৃত্যুর মহড়া চালায় দুবেলা।
উষার আলোকে বন্দনামুখর
প্র্রভাতসংগীতে ভরে ওঠে মন
পক্ষপুটটা কাঁপিয়ে নড়ে ওঠে ডানা
দোলা লাগে পিঞ্জিরারও গায়ে।

সহসায় গানভঙ্গ, বিপন্ন আর্তস্বর আকাশে!
বৃত্তাবদ্ধ সিংহের তেজস্বিতার মতো
ট্যাংকবেষ্টিত আরাফাতের দেশপ্রেমের মতো
আমাকে পোড়ায় আমারই পথরুদ্ধ সুরের আগুন ।

নিশুতিরাতের দূর নীলিমায় নক্ষত্রের চোখে জ্বলে
ভেঙে যাওয়া উৎসবের আলো,
মাঝির গানের মতন ইথারের ঢেউয়ে বাজে
গাঙ পেরিয়ে চলে-যাওয়া অগ্রজের গলা;
আর এক অস্বীকারের পাখি ফলন্ত শাখায় বসে
অনুজদের কানে তোলে গোড়াবৈরী গান!
আমি নভোমুখী হতে গেলে অমনি টান পড়ে সুতোয়
কাপুরুষের তরবারির মতো নুয়ে আসে মাথা
দখলদারিত্বের তখতে আসীন মহাতুচ্ছতার পায়ে!

দ্যাখো, টমটমের অশ্বের মতো আমার চোখের দু’পাশ
অন্ধ ঠুলিতে বাঁধা;
আর সেই কখন থেকে আমার হাতে
রাজাজ্ঞার মতো ধরিয়ে দেয়া এক অদ্ভুত সিলেবাস!
এর প্রতিটি বর্ণ আমার চেনা
এর প্রতিটি শব্দের শব্দার্থ আমার জানা;
অথচ এই সুর নিবিড়রাতের বিনম্রনদীর বয়ে যাওয়া নয়;
এই বাণী নীরব বৃক্ষরাজির না-বলা-কথার কোনো অনুবাদ নয়;
এই ডাক চৈত্ররাতে কেঁদে কেঁদে
ছিন্নমূল বেদনায় বাঁশের ভিটা খুঁজে-ফেরাও নয়।
তবে আমি কার গান গাবো?
আমি কার কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে উচ্চকিত হবো কোরাসে?

আমার বিশ্বাসের গায়ে ভয়ংকর কৃষ্ণলেবেল!
আমার অবিশ্বাসের গায়ে জোরজুলুমের হাত!
আমার আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে অজস্র গোলার ঘা!
আমার মুগ্ধবাতায়নে টিকটিকির নির্ঘুম চোখ!

আমার প্রার্থনার ভাষা কুণ্ঠিত;
আমার আপত্তির ভাষা নিষিদ্ধ;
আমার স্বপ্নের ভাষা
ক্রীতদাসের চোখের মতো এলোমেলো;
আমি বনসাইয়ের মতো;
আমি তোতাপাখির মতো;
আমি পার্কের খালের মতো;

আমি ব্যাধের মেয়ের খাঁচায় সখের লাভবার্ড
যে হারিয়ে ফেলেছে নিজের সবুজ অরণ্য
আর অবারিত আকাশের মঞ্চ
বিজ্ঞাপিত খুদকুঁড়োর বিভ্রান্ত কোলাহলে।

মন্তব্য করুন