শুভংকর

বোকার মত বসে আছিস – গুণলি কি ঢেউ কটা,
এক ঢেউতে সাত পয়সা – হতিস রে কেউকেটা।
নদীর পাড়ে ভাইপো বসে – শুধান তারে কাকা,
ভাইপো বুকুন ভাবুক ভারী – সাত বছরের খোকা।

বোকার মত বসব কেন – যে নৌকোয় ইলিশ,
গুনছিলাম ত’ সেই নৌকোই-আঠারো,উনিশ, বিশ ।
কাকাটিও জবরদস্ত – নয়কো ছাড়ার পাত্র,
মন্দ নয় কাজটি মোটে – তবে প্রশ্ন একটি মাত্র।
কোন নৌকা ইলিশ ধরে, চিংড়ি কোথায় থাকে !
বলতে না পারলে কিন্তু গাঁট্টা খাবি টাকে।

যে নৌকোয় মেছোরা সব গামছা পরে মাথে,
সেই নৌকোয় ইলিশ থাকে-জবাব সাথে সাথে,
ইলিশরা সব উড়ুক্কু মাছ-লাফিয়ে ওরা ওঠে,
ধারওয়ালা পেটির ঘায়ে মাথা যে যায় কেটে,
তাইতো জেলের গামছা মাথে-আঘাত থেকে রক্ষা,
এমন করেই গুণি আমি ইলিশ মাছের নৌকা।

ভাইপোটির জবাব শুনে কাকা বেজায় খুশী,
তবে কেন তোর মুখে দেখতে নারি হাসি !
পৌনে তেরোর নামতা জানিস-শুধান তারে কাকা,
তেমন নামতা হয় নাকিগো-এবার অবাক খোকা।
তেরো বল, উনিশ বল-বলব এইক্ষণে,
কিন্তু পৌনে তেরোর নামতা-আচ্ছা বলত’ কে জানে !
কাকা তখন ভাইপোটির কানটি দিলেন মলে,
ঐ নামতাই বলতে হবে-নয়ত’ ফেলব জলে।

কি আর করা – ভাইপো তখন অতি কষ্টেসৃষ্টে,
পৌনে তেরোর ঘরে বুঝি আটকে আষ্টেপৃষ্ঠে।
এবার কাকা ঘাড়টি ধরে ভাইপোটিকে নিয়ে,
টানতে টানতে পড়লেন তার বাবার কাছে গিয়ে।
দাদা তোমার বুকুন এখন সাত বছরের ছেলে,
ওকে এবার ভরতি আমি করব পাঠশালে।
কলকাতায় নিয়ে যাব-থাকবে আমার সাথে,
তোমার কাছে এলেম দাদা মতটি কেবল নিতে।
ডাক্তারীর ছাত্র কাকা-কারমাইকেলে,
কলকাতায় বাসাবাড়ী-বৌবাজারের কোলে।

হাসালে ভাই ফণী তুমি – পড়ছ ডাক্তারী,
সারাটা দিনই ব্যাস্ত থাক-বই যা ভারী ভারী,
তার মধ্যে বুকুনকে দেখার সময় কোথা !
বুঝতে নারি তোমার কথার কোনোই মুণ্ডমাথা।
এখানেই বুকুন একটি আস্ত মৃগশাখা,
আর কলকাতায় গেলে ত’ গজিয়ে যাবে পাখা !
তা ছাড়া ও কিন্তু বেশ বোকাও আছে ,
শেষে কিনা শহরে গিয়ে পড়বে ট্রামের নীচে !

দাদার কথায় ভায়ের কিন্তু হেলদোলটি কোথা !
ভাইপোটিকে নিয়ে তিনি যাবেনই কলকাতা।
খাটো গলায় দাদাটিকে দিলেন কিছু শলা,
বাবা এবার নিমরাজী-মায়ের চোখে জ্বালা।
কিষাণগণ্জ থেকে খোকার কলকাতায় পাড়ি,
মায়ের কোল রইল পড়ে – দুচোখ জলে ভারি।

বাগবাজারের ঘাটে চলছে জেলের সাথে চুক্তি,
দাঁড়িয়ে আছেন আড়তদার-দেখলে আসে ভক্তি।
বাঘের মত চেহারা বটে-গলাটি বাজখাঁই,
ইলিশ নেব পাইকারী-দামটি শুনতে চাই।
নৌকো ঘাটে ভেড়ার সাথেই দরদস্তুর জোরে,
ফড়ে এবং আড়তদার-খুচরো ক্রেতা দূরে।
মণ পিছু দেড়শ থেকে হবেই নি কো কম,
বটে বটে – শুধাই তবে – দেখি কেমন দম !
ফড়ে আর আড়তদারের একটু চোখাচোখি,
আড়াই সেরি ইলিশের দামটা বল দেখি।

বুকুন নামে সেই ছেলেটি এখন কলকাতায়,
বৌবাজারে থাকে সে ছোটকাকার বাসায়।
মাঝে মাঝেই চলে আসে বাগবাজারের ঘাটে,
দেখতে থাকে কাণ্ড এসব-আজব ব্যাপার বটে।
তখনও সে বসেছিল চেয়ে নদীর পানে,
আড়তদারের প্রশ্নটি ধাক্কা দিল কানে।
মুখটি করে নিসপিস-উত্তর যে জানা,
চট করে বললে খোকন-নয় টাকা ছয় আনা।

ফড়ে আর আড়তদারের অবাক হবার পালা,
দুজনার মাঝে বুঝি নীরব কোন শলা।
এ আর এমন শক্ত কি – শুভংকরীর আর্যা,
ভালভাবেই জানা আছে-মণ,সেরের তরজা।
খোকার চোখে এবার যেন উজল হাসির ঝিলিক,
আড়তদার মানুষটিরও খুশী সমধিক।

শুধান তিনি বালকটিরে-কেমন গ্রাম্য গন্ধ,
বাপা বুঝি গ্রামের ছেলে-নেইতো কোনো সন্দ।
সে হোক, তুমি বুদ্ধিমান-কর কি পড়াশুনা !
কোথায় থাক-কাদের বাড়ী-জানতে ত’ নেই মানা।
অপরিচিত মানুষজনে আজ্ঞে সম্বোধন,
এসব কিন্তু ভালমতই জানত মোদের খোকন।
এদিকে এই আড়তদার খাটো ধুতি অংগে,
পকেটওয়ালা ফতুয়াটি মানিয়েছে বেশ সংগে,
তেলা মাথা,ঝোলা গোঁফ,ঘটি ভাষায় চোস্ত,
দেখেশুনে মনে ত’ হয় মানুষটি বেশ মস্ত।
এক কথায় ধরে নিলেন খোকন গ্রামের ছেলে,
ন টাকা নয়, নয় টাকা – উচ্চারণের ভুলে। আড়তদার কি হবেন তিনি-খোকার মনে ধোঁকা,
এইজন্যই তাকে বুঝি সবাই বলে বোকা।

দু:খ হলেও নিরুপায়-এবার বুকুন বলে,
আজ্ঞে,কলকাতায় নতুন তবে যাই ত’ পাঠশালে।
সামনে বছর দেব আমি বৃত্তি পরীক্ষা,
কাশী মিত্র বিদ্যালয়ে চলছে আমার শিক্ষা।
খানসামা ছকুর গলি-সেথায় বাসাবাড়ি,
কাকা আছেন-কারমাইকেলে পড়েন ডাক্তারী।
বটে বটে-ফতুয়াধারীর সে কি যে আনন্দ,
বর্ধনমশাই-প্রধান শিক্ষক-মানুষটি নন মন্দ।
বলবে তাঁরে আমার নাম-লাগবে না আর টাকা,
পড়াশুনা,খাতাবই-বিনি পয়সায় পাকা।
আজ্ঞে আপনার নামটি যদি – খোকা আমতা আমতা,
যেন সে বলছে আবার পৌনে তেরোর নামতা।

বলছ কি হে ছোকরা তুমি – ফড়ের হুহংকার,
স্যার আশুতোষ মুখার্জি – ভাইস চ্যান্সেলর।
সেটির আবার অর্থ কি – কেমন যেন ধন্ধ,
তবে আড়তদার নন যে তিনি-আর কিসের সন্দ !
মুখুজ্জে যখন তিনি-ব্রাহ্মণ ত’ বটে,
প্রণাম করে তাঁরে বুকুন বাড়ীর পানে ছোটে,
বিনি পয়সায় লেখাপড়া-খুশীর ত’ নেই শেষ,
ছোটকাকে এইক্ষণে যে দিতেই হবে সন্দেশ।
পিছন থেকে আশুবাবুর সে কি হাঁকডাক,
ও খোকন চললে কোথা-নামটা জানা থাক।
আমার নাম কেশব-শ্রী কেশব চন্দ্র নাগ,
পিছন থেকে ডাক দিলেও খোকার ত’ নেই রাগ।
অংকটাকে চালিয়ে যেও-তোমার কিন্তু হবে,
বাংলার বাঘ-কেশব নাগ-দেখা হল সেই কবে।
তবে কথাটি তাঁর সত্য হল-অংকে যাদুকর,
কেশব চন্দ্র নাগ ছিলেন বংগে শুভংকর।
গল্পটা ভাই লাগল কেমন-ভেবোনা সব সত্যি,
দাদুর কাছে শোনা-তখন ছিলেম একরত্তি।
কল্পনার রঙিন সুতায় তাঁর সে রূপকথা,
বিলিয়ে দিলেম সবার মাঝে ছন্দে ছড়ায় গাঁথা।
———————————————————