মেছোভূত-বিপ্লব শীল

0
16

?
গা ছমছমে ভরা আষাঢ় মাস। সারাক্ষণ শুধু মেঘ ঝমঝমে বৃষ্টি আর আমনের ক্ষেত ভরা গ্যাঁ-গুঁ ব্যাঙের ডাক। জল থৈ-থৈ মাঠ-ঘাট-নদী-নালা-পুকুর। চারিদিকে শুধু ঝোপঝাড় আর জঙ্গলময় বৃষ্টি ভেজা নিস্তব্ধ নিঝুম সবুজ অরণ্য। কী অদ্ভুত ভয়ানক সুন্দর মেঘলাকাজলবর্ণা প্রকৃতি। এমনই এক বৃষ্টি মুখর সন্ধ্যায় নৃপেনদার সাথে আমার ষষ্ঠীতলা বাজারে দেখা। নৃপেনদা একটা মুদিখানা দোকানে বাজার করছিল আর আমি উক্ত দোকানেই এসেছিলাম আমাদের পাইকারি চাল, ডাল, তেল, নুনের ব্যবসার বকেয়া পেমেন্ট কালেকশন করতে।
অনেক দিন পর নৃপেনদার সাক্ষাৎ পেয়ে আমি মনে-মনে ঠিক যেন বানভাসি গেঁয়ো নদীর মতো আপ্লুত অভিভূত হয়ে উঠলাম। বললাম, “কী ব্যাপর নৃপেনদা ? কী খবর ? কেমন আছো ?”
নৃপেনদা রিখটার‍ স্কেলে অল্প মাত্রায় হওয়ে যাওয়া ভূমিকম্পের মতো নড়েচড়ে বলল, “এই তো ভালো ! তুমি কেমন ?”
“এই… কোনোরকম; চলে যাচ্ছে। তারপর ? মাছ ধরছ তো এবছর ?”
“না। রাজমিস্ত্রির কাজ করছি।”
আমি আচমকা ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতন বিস্মিত হয়ে বললাম, “যা ! আমি ভাবলাম নৌকোয় করে একদিন রাত্রি বেলা তোমার সাথে নদী ভ্রমণ করব।”
নৃপেনদা বাতাসের মতো থেমে গিয়ে বলল, “তা বেশ তো। আজই চলো।”
আমি খুশিতে মনে-মনে নাগরদোলা হয়ে উঠলাম। তারপর সদ্য ফুটে ওঠা ফুলের মতো প্রসন্ন হয়ে বললাম, “আজই ! চলো। তা কখন বেরোবে ?”
“তোমার কাজ হয়ে গেছে ?”
“হ্যাঁ। এই দোকানের পেমেন্টটা কালেকশন করলেই হয়ে যাবে।”
“তাহলে তুমি বাড়ি থেকে খেয়ে এসো। আমিও বাজারটা দিয়েই খেয়ে আসছি। এখনই যাব। দেখো—তুমি আবার ভয় পেয়ো না যেন।”
“আরে না-না। ‘ডারকে আগে জিত হে !’ তুমি আছো না সাথে।”
নৃপেনদা খুব ভালো ছেলে। পুঁথিগত বিদ্যার নিরিখে অশিক্ষিত-মূর্খ; কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হি ইস আ রিয়েলি জিনিয়াস গাই। বন্দুকের গুলির মত তীব্র বিচক্ষণ, মেশিনের মতো অসাধারণ অসামান্য বুদ্ধিমান, মহাকাশের মতো অসীম জ্ঞানী আর সূর্যের মতো দুরন্ত সাহসী।
রাত্রি তখন আটা বাজে। আমি সকাল-সকাল ডিনার সেরে সাইকেল নিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। ষষ্ঠীতলা বাজারে এসে চৌ-রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি। কিছুক্ষণের মধ্যে নৃপেদাও একটা খ্যাপলা জাল আর খালই নিয়ে চলে এলো। দু’জনে মিলে সাইকেলে চড়ে মীর্জাপুরের ইট বাঁধানো কাঁচা রাস্তা ধরে চললাম গোটপাড়ার দিকে। খানিকটা পথ যেতেই একটা পোড়ো ইটখোলার পাশে একেবারে রাস্তার ধারে তিনটি বিশাল বড়-বড় রাক্ষুসে তেঁতুল গাছ। সবাই বলে এই গাছ গুলিতে নাকি তিন জন প্রেতাত্মা থাকে। দু’জন মহিলা ও একজন পুরুষ এই গাছ গুলিতেই গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে ছিল। মৃত্যুর পর থেকে তাঁদের আত্মা নাকি ভয়ানক আকৃতির এই তেঁতুল গাছ গুলিতেই থাকে।
কালো কুচকুচে আলকাতরার মতো অন্ধকার। চারিদিকে শুধু পোকামাকড়ের বিটকেলে-বিদঘুটে ডাক। মাঝেমধ্যে দু’এক ফোটা ফিসফাস করে বৃষ্টিও পড়ছে। আকশের বুক ফেটে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘন-ঘন। যেন আসমানি মেঘেদের পাড়ায় ধপ করে আগুন লাগিয়েই নিভিয়ে দিচ্ছে কেউ। এরই মাঝে নৃপেনদা সাইকেলের প্যাডেল করে চলেছে ক্রমশ আর আমি পেছনের কেরিয়ালের উপর বসে আছি ভয়ে গুটিসুটি হয়ে। খালই থেকে পচা মাছের আঁশটে গন্ধও বেরোচ্ছে ভনভন করে। শুনেছি ভুতেরা নাকি মাছের আঁশটে গন্ধে ভীষণ ভাবে প্রভাবিত হয়ে ওঠে। অকস্মাৎ তেঁতুল গাছের ডালপালা গুলো কেমন যেন সনসন করে ঝড়ের মতো উথাল-পাতাল করে উঠল। শীতের অনার্দ্র বায়ুর মতো আমার গলাটা কেমন যেন শুখিয়ে এলো।
আমি ঝমঝম করে আসা এক পশলা বৃষ্টির মতো তাড়াতাড়ি নৃপেনদাকে বললাম, “নৃপেনদা, জোরে সাইকেল চালাও।”
নৃপেনদা প্যান্টে লাগা ধুলোর অনুরূপ আমাকে বিদ্রূপ করে বলল, “হোই ! এখনই এতো ভয় পাচ্ছ; তাহলে গঙ্গায় গিয়ে কী করবে ?”
আমি জান জটে আটকে যাওয়া গাড়ির মতো পাশ কাটিয়ে বললাম, “না। মানে… তেঁতুল গাছের পাতা গুলো কেমন যেন নড়ে উঠল তো, তাই।”
“ও কিছু না। রাত চরা পাখি-টাখি আছে মনে হয়।”
কথাটা আমার মনের কানে ভোর বেলায় মোরগ ডাকের মতো শোনাল; আর ভয় নেই; যেন একটু পরেই সকাল হবে।
দেখতে-দেখতে পৌছে গেলাম গোটপাড়া সারিগঙ্গার তীরে। মোরগ তো দূরের কথা, মাঝেমাঝে বাচ্চা কান্নার মতো শকুনের ডাক শোনা যাচ্ছে দূর থেকে বহু দূরে। বুঝলাম—সবে তো শুরু; রাত্রি এখনও বাকি।
চারিদিকে শুধু জলে ডোবা বিস্তীর্ণ বেলাভূমি আর পাটের জমি। তারই মাঝখান দিয়ে কুলু-কুলু বয়ে চলেছে মূল নদীর থেকে ভূতাত্ত্বিক কারণে বিচ্ছিন্ন এই অশ্বখুরাকৃতি হ্রদ খানি। ডাক নাম সারিগঙ্গা। আমাদের পাড়ার প্রায় সকল পূর্ববঙ্গীয় জেলেরাই এই হ্রদে বর্ষার মরশুমে ভেসাল পেতে মাছ ধরে।
পূর্ববঙ্গীয় জেলেদের মধ্যে প্রচলিত একটি আঞ্চলিক শব্দ ভেসাল এক প্রকারের পূর্ববঙ্গীয় মাছ ধরার পদ্ধতি বিশেষ। বাঁশ ও জালের সমন্বয়ে তৈরি এক প্রকারের কল। যার মাঝ খানটা দু’টো বড়-বড় দাঁড়িবাঁশ দিয়ে আনুমানিক প্রায় ৬০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে ইংরাজি হরফ V আকৃতিযুক্তাকারে জোড়া লাগানো এবং সমস্ত V আকৃতি অংশটি গাবজলে রাঙানো নাইলনের জাল দ্বারা নীচের দিকে চাঁদোয়ার মতো ঝোলানো কিছুটা যেন উল্ট মেলানো অর্ধ-ছাতার মতো সুন্দর ভাবে পরিবেষ্টিত। মাছ ধরার সময় যেটি জলের মধ্যে অর্ধ-নিমজ্জিতাবস্থায় নামানো থাকে এবং চাঁদোয়া অনুরূপ নাইলনের জালটি সম্পূর্ণ-নিমজ্জিতাবস্থায়। এভাবে কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর V আকৃতির কোন অর্থাৎ দাঁড়িবাঁশ দু’টির সংযোগ স্থলটি প্রথমে হাত দিয়ে উপর থেকে নীচের দিকে টেনে নামিয়ে তারপর ঢেঁকিকলের মতো তার উপর পা দিয়ে চাপ দিয়ে ধীরে-ধীরে তা জাল শুদ্ধ আকাশের দিকে খাঁড়া করে জল থেকে জাল উপরের দিকে টেনে এনে ভেসাল সংলগ্ন আপার মধ্যে ধৃত মাছ গুলিকে ফেলা হয়। এরপর জাল থেকে মাছ সংগ্রহ করা হয়ে গেলে পুনরায় জালটি জলের নীচে সম্পূর্ণ-নিমজ্জিতাবস্থায় ফেলে দেওয়া হয় এবং জালসংযুক্ত V আকৃতি বিশিষ্ট দাঁড়িবাঁশ দু’টি অর্ধ-নিমজ্জিতাবস্থায় নামিয়ে রাখা হয়। এই ভাবে প্রসেসটি সারা দিন-রাত যাবত চলতে থাকে এবং সমগ্র প্রক্রিয়াটি অপারেট করার জন্য প্রতিটা ভেসাল পিছু দু’জন করে লোক থাকে। যারা অলটারনেটিভ মোশনে কাজ করে এবং প্রতিটি ভেসালে কাবারি ও ত্রিপল দিয়ে তৈরি ছই অর্থাৎ চালা বিশিষ্ট একটি করে নৌকা থাকে। যে নৌকা গুলিতে একজন করে ব্যক্তি ছইয়ের মধ্যে শুয়ে বিশ্রাম নেয় এবং অপর জন ভেসালের উপর উঠে বসে মাছ ধরে।
এবার আপা প্রসঙ্গে ছোট্ট একটু ইনট্রডাকশন দিই। ভেসালের বাঁ দিকে সংযুক্তাবস্থায় থাকে এটি। যার মধ্যে ধৃত মাছ গুলিকে জিইয়ে রাখা হয়। এটি বেশ বড় আকৃতির একটি বস্তার মতো জাল ও বাঁশের তৈরি মৎস্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা। হাত তিনেক মত জলের উপর রেখে যার বাকি অংশটা জলের নীচে নিমজ্জিত রাখা হয়। এটিকেই পূর্ববঙ্গীয় জেলেদের আঞ্চলিক ভাষায় আপা বলে।
এদিকে আমরা তখন আমাদের পাশের বাড়ির জ্যাঠাদের ভেসালের কাছাকাছি। জ্যাঠাদের ভেসালটি একেবারে বাঁধের পাশেই কাছাড়ের নীচে। দেখতে পেলাম জ্যাঠা একটি মশাল জ্বালিয়ে ভেসালের উপর চুপ করে বসে মাছ ধরছে।
নৃপেনদা আমার সাইকেলটা বাঁধের উপর কাছেই একটি গাছের গায়ে হেলিয়ে তালা আটকে চাবিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিল। আমার এই প্রতিবেশী জ্যাঠা আবার নৃপেনদার পিসেমশায় হয়। তাই জ্যাঠাকে উদ্দেশ্য করে উচ্চস্বরে সে হাঁক দিল, “ও জামাই !”
জ্যাঠা কেমন যেন অল্প আলোয় লুকিয়ে-লুকিয়ে উত্তর দিল, “কে ? নৃপেন নাকি ?”
“হ্যাঁ। চিনতে পারছ না ? নৌকা নিয়ে এসো; যাব।”
“এখন ? এত রাতে কী করতে এসেছিস ?”
“ঘুরতে। এসো… তাড়াতাড়ি।”
“আরেকটু আগিয়ে যা। দেখ পরিমলের নৌকা আছে।”
কথা মতো আমরা আর একটু সামনের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম ডাঙায় একটি নৌক বাঁধা আছে। সম্ভবত এটাই পরিমলের নৌকা। আমরা আর বেশি কিছু না ভেবে উঠে পড়লাম ধীরে সুস্থে আলগোছে। আমি নৌকার পাটাতনের উপর বসে থাকলাম আর নৃপেনদা আগায় বসে বৈঠা বইতে লাগল। ধীরে-ধীরে নৌকা এগিয়ে চলল জ্যাঠাদের ভেসালের দিকে।
কাছে আসতেই জ্যাঠা গোয়েন্দাদের মতো জিজ্ঞাস করল, “কোথায় যাবি ?”
নৃপেনদা অল্প বাতাসের মতো আলগোছে উত্তর দিল, “এই তো বিপ্লবকে নিয়ে একটু খেয়া ঘাটের দিক থেকে ঘুরে আসি।”
জ্যাঠা প্রচণ্ড গরমে অসোয়াস্তি হয়ে ওঠার মতো কেমন যেন অসন্তুষ্ট হয়ে বলে উঠল, “যাবি যা। আবার দেখিস, গঙ্গায় কিন্তু একটা জিনিস আছে। সাবধানে ঘোরা ফেরা করিস।”
“জিনিস ? কী জিনিস ?”
“ভূত ! ভূত আছে কিন্তু। সবার ভেসাল থেকে মাছ খেয়ে নিচ্ছে।”
“তুমি দেখেছ ?”
“ও জিনিস আবার দেখা যায় নাকি ! যখন আসে, পালিয়ে যাই ডাঙার দিকে।”
“কী করে বোঝো তুমি, যে ভূত এসেছে ?”
“ছোট বাচ্চাদের মতো একনাগাড়ে কান্না করে আর মাঝে-মাঝে ভয়ঙ্কর-বিদঘুটে সব আওয়াজ করে। আমরা কান্নার আওয়াজ পেলেই ভেসাল থেকে সরে যাই। তারপর আপায় আর একটা মাছও থাকে না; সব ভূতে খেয়ে নেয়। কী যে ক’রি ! এ আমাদের প্রতিদিনকার সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
“ভূত-ভূত-ভূত; এ তো দেখছি মেছোভূত !”
হ্রদটির চারিদিকে যেন অন্ধকারের মতো ভয় জমে মেঘ করেছে ঘনঘোর। এমতাবস্থায় আমি নিশ্বাস-প্রশ্বাসের হাঁসফাঁস শব্দটুকু পর্যন্ত বুকের মধ্যে লুকিয়ে রেখে বললাম, “নৃপেনদা ! কী হবে এখন ?”
নৃপেনদা যেন আমাকে ধুলোর মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “হুর পাগল ! কী আবার হবে ! চলো আজ ভূত দেখব দু’জনে মিলে। বেশ মজা হবে; একদম জমে যাবে। কী বলো ?”
আমি রেডিওতে না ধরতে চাওয়া চ্যানেলের মতো একটু কেমন যেন এড়িয়ে গিয়ে বললাম, “হ্যাঁ… সে তো বুঝলাম; কিন্তু ভুত বলে কথা।”
“দূরছাই ! বাদ দাও তো ! আজ ভূতের একদিন কি আমার একদিন ! চলো… ” এই বলে নৃপেনদা বৈঠা বইতে লাগল।
স্রোতের অনুকূলে আমরা বেখেয়ালি মনের মতো ভেসে চললাম দূর থেকে বহু দূরে। সমস্ত হ্রদ খানি জুড়ে চারিদিকে শুধু দাউ-দাউ করে মশাল জ্বলছে। অন্ধের মতো ঘনঘোর আষাঢ়ে অন্ধকারে দূর থেকে সে গুলো যেন আকাশ ভরা তারার মতো জ্বল-জ্বল করছে। অকস্মাৎ আমাদের বেমক্কা নজরে এলো—বহু দূর থেকে একটি নৌকা স্রোতের উজানে আমাদের দিকেই ধেয়ে আসছে।
এরপর নৌকাটি কিছুটা আমাদের নৌকার কাছাকাছি আসতেই নৌকার মাঝি সহসা আমাদের প্রশ্ন করল, “কে আসে ওটা নৌকা নিয়ে ?”
নৃপেনদা স্বচ্ছ জলের মতো উত্তর দিল, “আমি নৃপেন।”
তারপর ট্রেনের মতো ব্রেক ক’ষে জিজ্ঞাস করল, “কে ? কমল না ?”
“হ্যাঁ। তোর সাথে ওটা কে ?”
“বিপ্লব।”
“ও। তা তোরা এ দিকে কোথায় যাচ্ছিস ?”
“এই বিপ্লবকে নিয়ে একটু নদী ভ্রমণ করছি।”
কমলদা এবারে একটু গরম তাওয়ায় ছ্যাঁকা লাগার মতো করে বলল, “তুই কি কিছু শুনিস নি নাকি ?”
নৃপেনদা চোখের পলক ফেলে কেমন যেন চোর-পুলিশ খেলার মতো লুকোছাপা করে উত্তর দিল, “হ্যাঁ। শুনলাম তো একটু একটু।”
“তাহলে যে ! ভূতটা কিন্তু এখন আমার ভেসালে মাছ খেতে উঠেছে। আমি ভূতের কান্নার আওয়াজ শুনেই আগে-ভাগে পালিয়ে এলাম। তোরা আর ওদিকে যাস না। ফিরে চল শিগগিরি; নইলে ঘোর বিপদ।”
আমি ঘটাত করে একটা মস্ত বড় ঢোক গিলে বললাম, “ও নৃপেনদা ফিরে চলো। আর দরকার নেই। অ্যাডভেঞ্চার পর্দায় এখানেই যবনিকা টেনে দাও।” কিন্তু নৃপেনদা কারও কথা শুনল না। সেই আগবাড়িয়ে চলল ভূত দেখতে।
নতুন জলের স্রোতে নৌকা সাঁই-সাঁই করে ছুটে চলেছে। এপারে তাল, খেজুর, আতা আর পিটুলির বন। ওপারে দিগন্তপ্রসারী গভীর জঙ্গলের অনুরূপ উঁচু-উঁচু পাটের জমি আর উলুবন। হঠাৎ যেন দূর থেকে বেতারযন্ত্রে আকাশবাণী মৈত্রীর মতো আট হাজার পাঁচশ ছয় দশমিক শূন্য নয় মেগা হারজে সাইরেন বেজে উঠল ঘ্যানঘেনিয়ে। দূরে কোথাও একটা বাচ্চা কান্না করছে তার মাকে হারিয়ে। আমরা শব্দভেদী বানের মতো ধেয়ে গেলাম কমলদার ভেসালের কাছে। ভূত তো দূরে কথা একটা মশা পর্যন্ত নেই সেখানে। কিন্তু অদ্ভুত একটা ব্যাপার—নৃপেনদা এদিক-ওদিক কোনও কিছু না দেখতে পেয়ে কমলদার ভেসালের আপায় নজর দিতেই দেখতে পেল—সেখানে একটা মাছও নেই। তবে কি কমলদার কথাই সত্যি—ভূতে সব মাছ খেয়ে গেল !
আমরা কোনও কিছুর উত্তর না পেয়ে পুনরায় ফিরে এলাম জ্যাঠার কাছে। জ্যাঠা তখন ভেসালের উপর উঠে চুপ করে বসে আছে আর কমলদা জ্যাঠার ভেসালের কাছেই নিজের নৌকাটা ভিড়িয়ে পাটাতনের উপর ভয়ে জড়পুত্তলী হয়ে বসে-বসে বিড়ি ফোঁকাচ্ছে আর জ্যাঠার বড় ছেলে চিরুদা তাদের নৌকার ছইয়ের নীচে ঘুমাচ্ছে। এমতাবস্থায় আবারও সেই বাচ্চা কান্নার ভয়ঙ্কর হরর সাউন্ডএফেক্ট। দেখতে-দেখতে মুহূর্তের মধ্যে চিরুদা সহ জ্যাঠা ও কমলদা তাদের নিজের-নিজের নৌকা নিয়ে যে যার মতো পালিয়েছে। কেউ কোত্থাও নেই; সবাই ভূতের মতো ভেনিস। শুধু নৃপেনদা আর আমি দু’জনে মিলে ভূতের কান্না শুনছি।
নৃপেনদাকে আমি বারবার বললাম এখান থেকে থেকে পালিয়ে যেতে; কিন্ত সে আমার কথা কিছুতেই শুনল না। সেই পাথরের মতো যেন জলের উপর খানিকটা জেগে থাকল ভূতের অপেক্ষা করে। নৃপেনদাও নড়ে না আর ভূতও আসে না জোড় করে। শুধু একনাগাড়ে ভয়ঙ্কর সেই বাচ্চা গোঙানোর আওয়াজ আর বিটকেলে-বিদঘুটে সব ডাক।
এমতাবস্থায় নৃপেনদার কি মনে হল, সে ভেসাল থেকে একটু দূরবর্তী স্থানে ঘুরঘুট্টি অন্ধকারের মধ্যে নৌকা নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকল।
ভেসালে তখনও কেরোসিনের মশাল দাউ-দাউ করে জ্বলছে। তাই দূরের অন্ধকার থেকে পাকা হলুদ রৌদ্রের মতো সবকিছুই স্বচ্ছ সোনালি জলের ন্যায় ঝলমল করতে দেখা যাচ্ছে সেখানে; কিন্তু ভৌতিক নিয়মের কারণে আলো থেকে অন্ধকারকে দেখা যাচ্ছে না কিছুতেই।
এমতাবস্থায় হঠাৎই আমাদের দুরবিনের মতো নজরে এল—কেউ যেন চাদর মুড়ি দিয়ে ছোট্ট একটা ডোঙা নিয়ে বাচ্চা শিশুর কান্নার মতো একনাগাড়ে গোঙাতে-গোঙাতে ভেসালের দিকে এগিয়ে আসছে। আমি তো ”উড়ি বাবা” বলে হাত-পা জড়পুত্তলী করে শিউরে উঠলাম।
এরপর আমরা দু’জনে মিলে কেমন যেন অদ্ভুতুড়ে একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম। নৃপেনদা ঠিক যেন বোমকেশ বক্সীর মতো আমাকে বলল, “বিপ্লব, তুমি লক্ষ্য করেছ—ভূতটা কিন্তু মাছ গুলো না খেয়ে, সে গুলোকে আপা থেকে খালইয়ের মধ্যে তুলে নিচ্ছে।”
আমি বেশ কিছুটা সন্দিগ্ধ মনে মন্তব্য করলাম, “কিন্তু নৃপেনদা, ভূতেরা আবার খালই কোথা থেকে পাবে !”
“একদম সঠিক জায়গাটা ধরেছ বিপ্লব—ভূতেরা আবার খালই কোথা থেকে পাবে !”
বলতে-বলতেই তৎক্ষণাৎ নৌকা বেয়ে ভূতের সামনে উপস্থিত। ভূতটা তো আমাদের দেখে নাকে-নাকে হও-মাও করে তেড়ে এলো। আমি ব্যাপার-স্যাপার দেখে ভয়ে থত্থর করে কাঁপতে শুরু করলাম; কিন্তু নৃপেনদা বিন্দুমাত্রও ভয় না পেয়ে অকস্মাৎ নিজের দু’হাতে শক্ত করে ধরে রাখা বৈঠাটা দিয়ে ভূতের পিঠ সই করে সপাটে বাড়ি। ভূত ডোঙা থেকে ছিটকে পড়ে জলের মধ্যে হাবুডুবু খেতে লাগল।
নৃপেনদা ধোনির মত ব্যাটের পরিবর্তে বৈঠা উঁচিয়ে গর্জন করে বলে উঠল, “বল ব্যাটা তুই কে; নইলে এখুনি মেরে ছাতু করে ফেলব।”
ভূতটা কোনরকমে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে বলল, “দাদা, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি ভূত নই; আমার নাম হরু। আমি ভূতের ভয় দেখিয়ে সবার ভেসাল থেকে মাছ চুরি করি। আমাকে ছেড়ে দাও।”
অন্যদিক থেকে ভূতের এমন করুন আর্তনাদ শুনে চিরুদা, জ্যাঠা ও কমলদা নিজেদের নৌকা নিয়ে হুড়মুড় করে ছুটে এলো।
নৃপেনদা পুনরায় গর্জন করে বলল,”বল—আর কোনও দিন ভূত সেজে মাছ চুরি করবি, বল ?”
“না দাদা, আমাকে ছেড়ে দাও। আমি আর কোনও দিনও এমন কাজ করব না। দয়া করে আমাকে ছেড়ে দাও। তোমার পায়ে পড়ছি। আমাকে ছেড়ে দাও।”
নৃপেনদা এবারে একটু ঝরের মতো শান্ত হয়ে বলল, “ঠিক আছে। আজকে যার-যার মাছ চুরি করেছিস, তাদের সবার মাছ ফিরিয়ে দিবি চল আর তোর ভূত সেজে নাটক করার গল্পটাও সবার কাছে স্বীকার করবি।”
কথা মতো এই মেছোচোরটা তৎক্ষণাৎ জ্যাঠা ও কমলদার ভেসাল থেকে চুরি করা আজকের সমস্ত মাছ তাদেরকে চুপচাপ মাথা নিচু করে ফিরিয়ে দেয় এবং নিজের সমস্ত ভূতুড়ে কীর্তিকাহিনীর কথা বেল্লিকের মতো স্বীকার করে।
এরপর পুনরায় আরেকবার গোটা সারিগঙ্গাটা সাঁই-সাঁই করে ঘুরে বেড়িয়ে, এখানে-ওখানে খেপলায় করে মাছ ধরে রাত্রি বেলার শেষ প্রহরে সেই সাইকেল ঠেলে দু’জনে মিলে গোয়েন্দাদের মতো বুক ফুলিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
সত্যি ! এতো ভয়, এতো রোমাঞ্চ আর আনন্দ জীবনে একসাথে এর আগে আমি কখনও পাইনি।
?
A Modern Bengali Adventure Story by: Biplab Sil, Contact: +91 9332850378, +91 6295184079, E-mail: [email protected], [email protected], Address ~ Village: Rajapur, P.O.+P.S.: Nakashipara, Pin No.: 741126, District: Nadia.