‘মানুষ’ হওয়া মানুষ – সৌম্য

0
59

‘শোভন শাকুর’- একজন ফিল্ম মেকারের নাম এরকম হলে কি কোন সমস্যা আছে? কেমন লাগবে নামটা? মোস্তফা সরোয়ার ফারুকি, আমিতাভ রেজা চৌধুরী এই নামগুলোর পরে এই নামটা কেমন লাগবে? না, দুই শব্দের ফিল্ম মেকারও তো আছেন । হুমায়ুন আহমেদ, তারেক মাসুদ । আর নাম নিয়ে এত ক্যাচাল কেন? সেক্সপিয়র তো বলেই গিয়েছেন, ‘What’s in a name? That which we call a rose, by another name would smell as sweet’

ভাবনা থেকে ডেকে তুলল আবদুল্লাহ, সিগারেটটা এগিয়ে দিয়ে বলে, নে ধর, কোথায় ডুবে ছিলি এতক্ষণ?

হাত বাড়িয়ে নিলাম, ছুউউত করে একটা টান দিলাম, ধোঁয়ার সাথে কিছু বাতাস ঢুকলে কলিজায় গিয়ে লাগে একদম । লাগল । চিন্তার ডালপালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল, ভাঁজ করে নিলাম ।

আবদুল্লাহকে বলি, কঠিন রাস্তা বুঝছিস । অভিতাভ রেজা যেভাবে উঠল, দ্বারে দ্বারে ঘুরে, টিভিসি, নাটক, তারপর এতদিন পরে এসে আয়নাবাজি । কঠিন রাস্তা বুঝছিস, কঠিন রাস্তা ।

কলেজ বিল্ডিঙয়ের বারান্দায় ঠেস দিয়ে বসে আবদুল্লাহ হুম বলে । বৃষ্টি থামার নাম নেই । অথচ আমাদের সিগারেটের যোগান শেষ । দোকানপাট কি এই বৃষ্টির রাতে খোলা পাওয়া যাবে? এগারটা বাজতে চলল । ঈদের সিজন, খোলা পাওয়া যেতেও পারে, বৃষ্টিটা কমুক ।
রাস্তা কঠিন না হলে কি জমে বল?-জিজ্ঞেস করি আবদুল্লাহকে ।

আবদুল্লাহ জবাব দেয়- কঠিন । কারন সবাই একা, কেউ থাকবে না রে পাশে, এমনকি আমিও না । একা, সবাই অনেক একা ।


যন্ত্রটার বুকের ভেতর এখন চার লিটার তেল । সেই তেল চার প্রকোষ্ঠ বিশিষ্ট একটি সিলিন্ডারে পুড়ে পুড়ে যন্ত্রটাকে এগিয়ে নিয়ে যায় । আমার ডান হাতে যন্ত্রের গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা । বৃষ্টিস্নাত রাস্তাটায় সাবধানে গতি বাড়াই । টিপ টিপ বৃষ্টি হিরের টুকরার মত মনে হয় হেডলাইটের আলোতে । আমার পেছনে বসে থাকে আবদুল্লাহ । যন্ত্র আপনাআপনি চলে, হাত পা তাদের ইচ্ছা মত ব্রেক করে, গতি বাড়ায়, ক্লাচ ধরে সতর্ক হয়, হাই লাইট আর লো লাইট ওঠানামা করে ।

প্রত্যেকটা দৃশ্যই ধারণযোগ্য মনে হয় । আয়তাকার পর্দায় যদি আনা যেত এই দৃশ্যগুলো । হুবহু । সবকিছুকেই কোন না কোন গল্পের দৃশ্যপট মনে হয় । এই যে বেজী টা রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে দৌড় দিল । ঐযে গাছটা নড়ে উঠল, ভারী কোন পাখি উড়ে গেল মাত্র । সবই ধারণযোগ্য, পর্দায় আসার যোগ্য । আসা উচিৎ ।

আজকে আমার একটা গল্প হতে যাচ্ছে । সম্ভবত ট্রাজেডি । সম্ভবত না, নিশ্চিত ট্রাজেডি । আজকে সম্ভবত আমার এক স্বত্বার মৃত্যু হতে যাচ্ছে । কত সিনেমার হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখেছি, কেঁদেছি বা কাঁদিনি । মন খারাপ থেকেছে, বিষন্ন লেগেছে । কিন্তু এই মন খারাপ থাকা বা বিষন্ন থাকার মাঝে একটা ভাল লাগা আছে । আজকে হয়ত সেই রকম একটা বিষন্নতায় মাখা ভালো লাগা সৃষ্টি হবে, নিজের গল্পে ।

মোটরসাইকেলটা ঘরের মধ্যে যথাসম্ভব কম শব্দ করে ঢুকিয়ে নিলাম । যন্ত্রটা আমার ঘরেই রাখি । না অতিরিক্ত প্রেম থেকে না, আমাদের অতো ঘর নেই । শব্দ কম হলেও শেষ রক্ষা হল না । আব্বা আম্মা দু জনই জেগে উঠলেন, নাকি জেগেই ছিলেন? সিগারেটের গন্ধ দূর করার জন্য আমি তাড়াতাড়ি বাথ রুমে প্রবেশ করলাম ।
সেখান থেকেই আব্বার গলা শোনা গেল, এলাকার অবস্থা ভাল না, এত রাইত পর্যন্ত বাইরে থাকা…

চার্লস বুকোওস্কির কবিতার একটা লাইন মনে পড়ে গেল-
“I have met some strange, wonderful people
one of whom
was
myself—someone my father never
knew.”

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সাহস দিলাম নিজেকে, আজকে বলেই দেই, বলেই দেই যে, আমি শোভন শাকুর…
আম্মা ডাকল । বেরিয়ে এসে দেখি আম্মা ভাত বেরে বসে আছে, আব্বা টিভিতে সুবিধাজনক একটা খবরের চ্যানেল দেয়ার চেষ্টা করছে, খবর যেন খুবই গুরুত্বপূর্ণ!

বলে দিলাম আগে ভাগেই, বৃষ্টি ছিল তো, তার মধ্যে একজনের বাইক নষ্ট হল । এই জন্য দেরী ।
নাহ, ভালমানুষী ইমেজ টা ধরে রাখা খুব কঠিন । ধরে রাখার জন্য মাঝে মাঝে মিথ্যাবাদী হতে হয় ।

মেঝেতে কাঁথা বিছিয়ে বাবু মেরে বসে খাই আমরা । আমাদের অতো চেয়ার টেবিলও নেই । আমি খেতে থাকি, ভাতের প্রত্যেক টা দানাকেই যেন খুঁটে খুঁটে দেখি । আর আব্বা আম্মা আমাকে দেখেন, কিছু ঠাহর করতে পারেন না নিশ্চই । বা করতে চান না ।
ছোট বোনটা ঘুমায়, আম্মা আব্বাকে বলে, ভলিয়ম কমায় দেও ছ্যান ।
প্রাইভেট ভার্সিটির ছাত্র ছোট ভাই সোহেল পাশের রুমে ঘুমায় নাকি জেগে থাকে?

আম্মা অগত্যা জিজ্ঞেস করেন, এইটাই শ্যাষ?
-কি শ্যাষ?
আম্মা বলেন, এইটাই শ্যাষ সেমিস্টার না?

আমি হুম বলি । ভাত মাখাই, ব্রয়লার মুরগীর হাড়গুলা নরম, ভিতরে কি ক্যালসিয়াম? সিলিং ফ্যানটা বাতাসের সাথে কিছু শব্দও দেয় । দরকারি শব্দ । নইলে মাঝে মাঝে রুমটা বেশি নির্জন লাগত ।

আব্বা বলেন, মনির সাহেবের ছেলেটার হয়ে গেল, বাইশ হাজারে ঢুকল । না, তাও খারাপ কি? থাকপার জাগা দিছে, দুপ্রে খাওয়া দেয় । খারাপ কি?
‘অও’ বলি, পানি খাই, নলাটা বড় খেয়ে ফেলেছি, আটকে যেতে যেতে ভেতরে চলে গেল । এক টুকরা মাংস খাই, কলাভাজির এক টুকরা মুখে দিয়ে বলি, আমাদেরও ঐ রকম । বাইশ-পঁচিশ । এর বেশি দেয় না ।

আব্বা আম্মার মুখে আস্থা খেয়াল করি । এইবার তাদের দুঃখের দিন ঘুচলো বলে ।

আম্মা প্রচুর উৎসাহ নিয়ে বলেন- নেও আর কয়দিন, দুই বছরও লাগে না । সবুজরা তো ফ্লাট নাকি কিনল । এই আর কয়দিন, পোলারা ‘মানুষ’ হইয়া গেলে ঢাকায় যামুই । যাওয়াই লাগবে । এখন সোহেল টার দুই বছর গেলেই আমরা বাঁচি । প্রাইভেট ভার্সিটির কত রকম খরচ গোহ । আর পিচ্চিরে তোমরাই ‘মানুষ’ করতে পারবা । আমাদের আর চিন্তা নাই, নেও আর কয়টা দিন ।

টিনের চালে যখন বৃষ্টির ঝমঝম একটু কমে গেল, মফস্বলের রাস্তায় যখন রাতের কাজ শেষ করে হোটেলের মেসিয়ার গান গাইতে গাইতে বাড়ির উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো । তখন দরোজা টা আস্তে করে খুলে বের হলাম । কুকুরটা মাথা উঁচিয়ে চেনা গন্ধ পেল বোধহয় । আবার মাথা নামিয়ে নিল । ভেজা উঠোনে পা টিপে টিপে গেটের দিকে গেলাম, ছিটকানি খুলে বেরিয়ে গেলাম । একটু হাঁটতেই একটা চাতাল । সেখানে এক কোণায় একটা লাল আলো জ্বলে, আবার নিভে যায় । আবদুল্লাহ ।
কাছে যেতেই লাল আলো আমার দিকে বাড়িয়ে দেয় আবদুল্লাহ । ছুত করে একটা টান দেই । গালের পেশি শক্ত হয়ে আছে । টেনে শান্তি পাই না । আরও একটান দেই ।

আবদুল্লাহ মোবাইলে গেইম খেলে, সেই আলোতে মাখামাখি হয় ধোঁয়া আর আবদুল্লাহর মুখ । ধারণ করার মত দৃশ্য ।

শোভন শাকুর- নামটা দুই শব্দের হলেও কোন সমস্যা নেই । নামটা খুবই সাধারণ । এটা কোন ফিল্ম মেকারের নাম নয় । প্রতি বছর পাশ করে বেরিয়ে একটা ভাল চাকরি খোঁজে হাজার হাজার বাংলাদেশী ইঞ্জিনিয়ার । শোভন শাকুর এখন সেই সব চাকরী প্রত্যাশীদের একজনের নাম । ইঞ্জি. শোভন শাকুর – একজন ‘মানুষ’ হওয়া মানুষের নাম ।