ভূদেবের ভুত – বিকাশ দাস

0
27

ভুত আছে কি না এই নিয়ে কোন বিতর্কে যেতে চাইনা। ছোটবেলা অনেক ভুতের গল্প শুনেছি। ভুতের নাম শুনলেই আমরা কিছু বন্ধুরা ভয়ে কুঁকড়ে যেতাম। গায়ের লোম খাড়া হয়ে যেতো। গলা শুকিয়ে যেতো। গা বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে যেতো তবু ভুতের গল্প শোনার ইচ্ছেটা থেকেই যেতো।
অলোকদার ভূত দেখার বা ভৌতিক অভিজ্ঞতার গল্পের কথা আমরা অনেক শুনেছি। আমাদের বন্ধুর মধ্যে ভূদেব সাঁতরা একমাত্র খুব সাহসী। কত লোকের মড়া পোড়ানোর সময় শ্মশানে ওর নিজের চোখে দেখার গল্প আমাদের এসে শোনাতো আর কথায় কথায় বলতো ভুত-ফুত বলে কিছু হয় না রে ওটা শুধু মনের ভুল।

ইদানীংকালে এই ধরণের আলোচনা কম হলেও ছ’মাসে ন’মাসে এক শনিবার আমরা সবাই ভূদেবের বাড়ি বা মলয়ের বাড়ি বা আমার বাড়ি হোক আমাদের আড্ডা বসতো। যে যার সংসার,ছেলেপুলে,চাকরি বাকরির কথা বলতে বলতে ভুতের প্রসঙ্গ উঠতো আর আমরা ভূদেবকে চেপে ধরতাম।
ভূদেবের গল্প শুনে ভুত আদৌ আছে কি না জানি না কিন্তু ভুতের অনুভূতি আমরা সত্যি উড়িয়ে দিতে পারতাম না ।

ভূদেব বলে উঠলো, শোন আজ তোদের একটা সত্যি ভুতের গল্প বলবো। বিশ্বাস করলে করিস, না করলে করিস না। কিন্তু ঘটনাটা এক্কেবারে সত্যি।
তোদের নিশ্চয় মনে আছে কৌশিক কাকু ও সোনালি কাকিমার কথা। আমরা বললাম হ্যাঁ মনে আছে।

একদিন জানিনা কি হয়েছে কৌশিক কাকুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তোরা সবাই জানিস কাকু কাকিমাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। কাকিমাকে সুখে রাখার জন্য কি না করতো। কাকিমা এক কাপড়ে ঘর পালিয়ে বিয়ে করেছিলো। পাড়ার কিছু লোক কাকুকে জরুকে গোলাম বলে ক্ষ্যাপাতো। আবার কেউ পাণ্ডিত্য ফলিয়ে ইংরেজিতে বলতো সত্যি কৌশিক যেন হেনপেকেড যার বাংলা তর্জমা দাঁড়ায় স্ত্রৈণ।

কৌশিক কাকু ঘরেই কোচিং টিউশন পড়িয়ে সংসার চলতো। আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো ছিলো না। ছেলেপুলেও হয়নি। কাকিমাও টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করে দু’চার টাকা রোজগার করতো।

হঠাৎ একদিন সোনালি কাকিমার ফোনঃ
– ভূদেব, তোমার কাকুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।
– কেন কাকিমা হঠাৎ কি হলো?
– এমন কিছু হয়নি। তিনদিন আগে একটু তক্কাতক্কি হয়।
– কি নিয়ে তক্কাতক্কি, কাকিমা।
– তুমি ত জানো আমাদের মধ্যে কথা কাটাকাটি অল্প বিস্তর ঝগড়াঝাঁটি নিত্য লেগেই থাকতো যা অভাবের সংসারে হয়ে থাকে।
– তার জন্য কাকু ঘর ছেড়ে চলে গেলো। বলা নেই কওয়া নেই দুম করে নিখোঁজ!
– সেটাই তো বুঝতে পারছিনা ভাই।
আমরা সবাই জানতাম সোনালি কাকিমা গরম কিছুতেই সহ্য করতে পারতো না । এ সি ছাড়া রাত্রে ঘুম হতো না। হাজার হোক বড় ঘরের মেয়ে।
পাঁচ বছর আগে কাকিমার বাবা স্প্লিট এসি ওদের বিবাহবার্ষিকীতে উপহার দিয়েছিলেন । কাকিমার বাবা নিজের লোক দিয়ে ওদের বেডরুমে ইন্সটলও করিয়ে দিয়েছিলেন। যাতে মেয়ে জামাই আরামে ঘুমোতে পারে।
কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলাম।
– তাহলে এমন কি হলো, কাকু …
– আসলে গত সপ্তাহ ধরে এসি খারাপ হয়ে পড়ে আছে। আমি বলেছিলাম মিস্ত্রি ডেকে ঠিক করাতে।
– কাকুর চলে যাওয়ার জন্য এ সির সাথে কি সম্পর্ক।
আমি আর কথা না বাড়িয়ে সোজা কাকিমার বাড়ি চলে গেলাম ব্যাপারটা বিশদ ভাবে জানার জন্য।
বলো কাকিমা কি হয়েছে? কবে থেকে কাকু নিখোঁজ।
কাকিমার চোখ থেকে অনর্গল জল গড়িয়ে পড়ছিল। গলা শুকিয়ে কাঠ। বলল তিনদিন হয়ে গেছে। কোন খোঁজ খবর নেই।
মাসের শেষে ইলেকট্রিক বিল আসলে আমাদের মধ্যে এই নিয়ে রাগারাগি হতো। কথায় কথায় আমাকে শুনতে হতো। এতো টাকার বিল কে জমা দেবে? তোমার বাবা! আমিও বলতাম। দ্যাখো, বাবা তুলে কথা বলো না। তুমিও তো এ সি চালিয়ে আরামে ঘুমোও। এটা কেন ভুলে যাচ্ছ।
– তা ভুলেনি, সোনালি। আমি তো আর সোনা ইনকাম করিনা। এতো খরচ আমি আর চালাতে পারছিনা।
– তোমার তো আমার বাবার থেকে সাহায্য নিলে তোমার সম্মানে লাগে।
– তুমি সব জেনেশুনে আমার কাছে এসেছিলে। আমি বলেছিলাম তোমাকে আমার অভাব আপন করে নিতে হবে।
– আমাকে খোঁটা দিচ্ছ? আমি যখন থাকবো না তখন বুঝবে।
– এ পাড়ায় কার বাড়িতে এসি আছে বলত? তোমারই এতো গরম আর কারোর এতো গরম লাগে না। বর্ষায় বর্ষা, গরমে গরম আর শীতে শীত থাকবে এটাই তো প্রকৃতির নিয়ম।
– জানি গো জানি ।
এমনিতে সংসার চলে না তারপর আকাশ-ছোঁয়া খরচ ইলেকট্রিক বিল। বছরের এক বার দুবার ঠিক ঠাক সার্ভিস দেওয়ার জন্য আলাদা খরচ।
কাকিমার একই কথা তুমি আমাকে ভালোবাসো। এইটুকু আমার জন্য কষ্ট করতে পারবেনা । আমিও তো সেলাই করে কিছু সংসারে দেওয়ার চেষ্টা করি। করি না বলো?
এমনি অনেক বার রাগ করে চলে গেছে আবার রাতে বাড়িও ফিরে এসে বলত সত্যি আমার ভুল হয়ে গেছে। রাগ করো না সোনালি।

তোমার কাকু ঘরে ফিরছে না দেখে সবাইকে বললাম। কেউ তেমন খবর দিতে পারলো না। দু’দিন হয়ে গেলো তাই তোমাকে ফোন করলাম।
এতোদিন হয়ে গেলো অথচ কাকু বাড়ি ফিরলো না। কাকুর ফিরে না আসাতে আমি ও বেশ ভয় পেয়ে গেলাম । মনে মনে ভাবলাম কাকু আবার কাকিমার চাপে পড়ে আত্মহত্যা করলো না ত? কাকু আবার যা সেন্টিমেন্টাল।
অগত্যা পাড়ার কয়েকজন মিলে আমরা লোকাল থানাতে ডাইরি করলাম। অফিসার বললেন একটা ছবি দিয়ে যান। আমরা খোঁজ পেলেই জানাবো।
এক সপ্তাহ হয়ে গেলো কোন খবর না পাওয়াতে আমি কাকিমাকে নিয়ে থানায় গেলাম কিছু জানা গেলো কি না। আমাদের দেখেই অফিসার বলে উঠলেন ভালোই হয়েছে আপনারা এসেছেন। আমি এক্ষুনি আপনাদের খবর পাঠাচ্ছিলাম। আজ কিছু এক্সিডেন্ট কেস মেডিকাল কলেজে এসেছে। ব্যাখ্যা শুনে ইনার ছবির সাথে কিছুটা মিল পাচ্ছি।

অফিসার আমাদের সঙ্গে করে মেডিকাল কলেজে নিয়ে গেলেন একেবারে সোজা হসপিটালের মর্গে।
তখন ভর দুপুর। বাইরে চড়া রোদ্দুর । প্রচণ্ড গরম লূ বইছে । সোনালি কাকিমা ঘেমে একাকার। আমরা মর্গে ঢুকলাম। মর্গের ভেতরে অল্প আলো ঠিক করে কিছু দেখা যাচ্ছিলো না। একটা স্পট লাইট জ্বলে উঠতেই দেখতে পেলাম ধবধবে সাদা কাপড়ে সারা শরীর ঢাকা ক’জন মর্গের মেঝেতে পড়ে আছে।
অফিসার বললেন দেখুন এর মধ্যে কেউ কি না। আমি প্রথম জনের মুখের থেকে চাদর সরাতেই দেখতে পেলাম কৌশিক কাকুর মুখ। সারা কপালে কালশিটের গভীর দাগ। দু’চোখ শান্তির ঘুমে লীন। কোথাও কষ্টের লেশমাত্র নেই।
কাকিমা অঝোরে কেঁদে যাচ্ছিলো। কাকিমাকে সামলানো যাচ্ছিলো না। আমি কাকিমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম আর কি করবে বলো। আমাদের হাতে আর কিছু নেই। কাকিমা কাকুর কাছেই দাঁড়িয়ে ছিলো। বাকি ফরম্যালিটির জন্য আমি মর্গের সদর দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। যেতে যেতে শুনতে পেলাম কাকুর গলা…
– কি সোনালি? চলে যাচ্ছো যে? এখানে এসো। দ্যাখো কি ঠাণ্ডা। কোন গরমের উচ্চবাচ্য নেই। চলে এসো। আমার পাশে শুয়ে পড়। খুব আরাম পাবে। ঘর ভর্তি ঠাণ্ডা। কষ্টের ছিটেপোঁটা নেই।
আমি পিছন ফিরে দেখলাম সোনালি কাকিমা নেই। শুধু এক রমণীর ছায়া কাকুর পাশে দাঁড়িয়ে।
আমার বৌ চা আর গরম গরম তেলে ভাজা নিয়ে এসে বললো বাইরে প্রবল বৃষ্টি থেকে থেকে বিদ্যুৎ চমাকাচ্ছে। অন্ধকারে কাউকে চিনতে পারছিনা। আলো জ্বালিয়ে নিতে পার তো!
আমিও দেখলাম ভূদেবের গল্প শুনতে শুনতে সত্যিই আমরা অন্ধকারে কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছিলাম না।