বিবাহ

0
40

আমাদের সমাজের সবচেয়ে বহুল পরিচিত প্রথা হলো বিবাহ। বিবাহ এমন একটা চুক্তি বা সম্পর্ক যেখানে দুটি মানুষের মন মিলিত হয়। কিন্তু আমাদের সমাজে দুটি মন মিলেছে নাকি তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ছেলের ইনকাম কত, জায়গা জমি কতটুকু আছে, মেয়ের গায়ের রঙ কেমন, মেয়ে খাটো নাকি লম্বা, মেয়ের চুল কোমর পর্যন্ত পরে নাকি ইত্যাদি। বিয়ের জন্য মনের মিলের প্রয়োজন হয় না। ছেলের সামাজিক অবস্থান আর মেয়ের গড়ন সুন্দর হলেই হলো। কারণ আমাদের তথাকথিত ছেলের বাবা আর মায়ের বাবা তো ছেলে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছে না তারা তো ছেলের প্রতিপত্তির সাথে মেয়ের রূপের বিয়ে দিচ্ছে।
স্বর্ণকার যেমন করে খাঁটি সোনা কষ্টি পাথরে ঘষে ঘষে পরোখ করে, বিয়ের আগে তেমনি আমাদের বরপক্ষ মেয়ের সৌন্দর্য পরোখ করে নেয়। অনেকে তো মেয়ের মাথা থেকে ঘোমটা খুলে চুল কত ইঞ্চি তা ও মেপে দেখে। এতে আমাদের কন্যাপক্ষ সামান্যতম অপমানবোধ করে না। অপমানবোধ ই বা কেন করবে, বরপক্ষ মেয়ে নিবে একটু যাচাই করে দেখবে এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো যে, কন্যাপক্ষ ও তো তাদের কন্যা বরপক্ষকে দিচ্ছে তাহলে আমাদের বরের যাচাই কেন হবে না? আমরা আমাদের আদরের দুলালীকে যার হাতে তুলে দিচ্ছি সে খাঁটি নাকি অখাঁটি সেটা ও তো দেখতে হবে। কিন্তু এ কথা আমাদের মুরুব্বীদের বললে তারা বলে পুরুষ মানুষ তো সারাজীবন খাঁটি সোনা। তাদের পরোখ করার কী আছে।

আমাদের বরপক্ষ ও কন্যাপক্ষ এখন অনেক শিক্ষিত হয়ে গেছে। তারা এখন আর যৌতুক দাবি করে না আর যৌতুক দেয় ও না। তবে বিয়ের সময় বরের কাকা, মামা, প্রতিবেশী ভাবি ইশারা/ঈঙ্গিতে বলে দেয় যেন তাদের খাট/সোফা/ফ্রিজ/ আলমারি ইত্যাদি দেওয়া হয়। এগুলো তো যৌতুক না, এগুলো তো উপহার। এগুলো না দিলে তো বরপক্ষ অপমানবোধ করবে। মেয়ের বাবা মা মেয়ের সাথে কোন উপহার পাঠায় নি প্রতিবেশী ভাবীরা তো এগুলো নিয়ে উপহাস করবে।

এবার আসা যাক বিয়ের পরের ঘটনার দিকে। নতুন বউ ১৬ বছরের হোক বা ২০ বছরের, সে বাবার বাড়িতে কোনোদিন এক গ্লাস পানি নিয়ে খাক আর না খাক বিয়ের পর অবশ্যই তাকে রান্না করতে হবে, সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলতে হবে, নিজের কষ্ট হলেও কাউকে বলা যাবে না। কেননা বউদের তো কষ্ট হয় না। কষ্ট হওয়ার ই বা কি আছে বউ হয়েছে আর কাজ করতে পারবে না এ কেমন কথা। তাতে কি হয়েছে যে বউ মাত্র কিশোরী। ধরে নেয়া হয় বিয়ের সাথে সাথেই সে পরিপূর্ণা যুবতী ।

বিয়ের পর যদি মেয়ে স্বামীকে ছাড়া বাবার বাড়ি আসে তাহলে বাড়িতে হইচই পড়ে যায়। সবাই জানতে চায় সে বাড়িতে কেনো এসেছে। এত ঘন ঘন বাবার বাড়ি আসার কি আছে। মুহুর্তের মধ্যেই নিজের বাড়িটা পর হয়ে যায়। বিয়ের পর তো বাবার বাড়ি আসতে নেই। বাবার বাড়ি আসলে তো লোকে কানাঘুষা করবে। আর কখনো যদি বর শ্বশুরবাড়ি আসে তার জন্যও হইচই পরে যায়, তবে কারনটা ভিন্ন। আদরের জামাইকে জিজ্ঞাসা করা হয় তার জন্য কী রান্না করা হবে গরু নাকি খাসি?

বিয়ের পর যদি স্বামীর বাড়িতে মেয়ের সুখ না হয় তাহলে ছেলের বাড়ির সবাই বলে এতে মেয়ের ই দোষ। কারন ছেলের তো কোনো দোষ থাকতেই পারে না। আর মেয়ের বাড়ির সবাই মেয়ের কপালকে দোষ দিয়ে মেয়েকে বুঝিয়ে শুনিয়ে সংসার করতে পাঠাবে।আর ছেলে মেয়ে যদি ভালোবেসে বিয়ে করার পর সুখি না হতে পারে তাহলে সব দোষ হয় ভালোবাসার। ভালোবেসে বিয়ে না করলে অবশ্যই ছেলে মেয়ে সুখী হতো।কেননা এরেন্জ ম্যারেজে তো কখনো কেউ অসুখী হতে পারে না।

বাদ দেই এসব কথা। দিন বদলেছে। আমাদের উচিত এখন আমাদের নিজেদের বদলানো। বিয়ে কোনো কন্ট্রাক্ট নয়, এটা দুটো পরিবারের মিলন। মেয়ের সৌন্দর্য আর ছেলের টাকার উপর বিয়ের স্থায়িত্ব নির্ভর করে না। বিয়ের স্থায়িত্ব নির্ভর করে দুটি মনের মিলের উপর। সেটা এরেন্জড ম্যারেজের মাধ্যমে হোক বা লাভ ম্যারেজের মাধ্যমে। এখন সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর। শ্বশুর বাড়ীকে শ্বশুর বাড়ি মনে করলে কখনো কাঙ্ক্ষিত সুখ লাভ করা যাবে না। শ্বশুর বাড়ীকে যদি নিজের বাড়ি আর নতুন বউকে যদি মেয়ে ভাবা হয় তাহলেই স্বার্থক হবে বিবাহ।।।।।