বাংলা কবিতার পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে – বিকাশ দাস

0
40

ক – কথার
বি – বিশেষ
তা -তাৎপর্য
কথার বিশেষ তাৎপর্য অভিব্যক্ত করার সহজ উপায় কিছু সারিবদ্ধ শব্দের সুরেলা ঝংকার এবং সৃষ্টি হয় “কবিতা”।
কথার ছন্দে। ছন্দের অন্ত্যমিলনে। যাকে আমরা পদ্যকবিতা বলে জেনে এসেছি। ‘ছড়ায়’ বা ‘পদ্যে’ শ্রুতিমধুর করে তোলা হতো শব্দ ধ্বনির অন্তর্নিহিত বাক্যিলাপ।
ভাবনার খিদে বা জ্বালা মেটানোর একমাত্র সম্বল উপাদান শুধু কবিতা। প্রেম প্রকৃতির নিঃশব্দ বয়ান শব্দের আখরে বন্দী। সন্ধিতে সন্ধি। শারীরিক মননে আনন্দ।
আমাদের স্বীকার করতে হবে… মানুষ, ঈশ্বর সব তত্ত্বের ঊর্ধ্বে কবিতা। কবিতা বেঁচে থাকার আশ্রয়।
শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ যদি শব্দ হয় তাহলে তার আত্মা কবিতা।
কবিতা লেখার ধারার গুনবোধ সময়ের সাথে পরিবর্তন হচ্ছে আরও পরিবর্তন হবে সময়কালীন চাহিদার অনুযায়ী।
আমরা যাকে আধুনিক কবিতা বলে থাকি তা আক্ষরিক অর্থে গদ্যের গন্ধে গদ্যকবিতা বা গল্পকবিতা।
বহুযুগ থেকে এধারা চলে আসছে আরও নতুন নতুন ভাবে উজ্জীবিতও হচ্ছে।
আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা জীবনযাপন, প্রকৃতির রহস্য কবিতায় মেলে ধরার প্রবণতার সঙ্গে বর্তমান সমাজের রোজকার বাস্তব, রাজনীতির প্রতিফলন তুলে ধরাই কবিতার আধুনিক ভাবনাকে হৃদয়গ্রাহি করতে হবে। কবিতার শরীরে শব্দ মাত্রার স্হাপন বা লেখার স্টাইলে ও বর্ণের যথার্থ মর্যাদা রেখে। কবিতার ব্যাকারণ নিয়ে মাথা না ঘামিয়ে।
“বাংলা কবিতার পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে” এই ভাবে বললে যুক্তিসংগত হবে যে আমরা কবিতা লেখার প্রয়াস খামতিহীন হলেও এটা সঠিক আমাদেরই পিঠ ঠেকে গেছে দেওয়ালে, কবিতার নয়। কবিতা নিজের জায়গায় আজও স্থির ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
আমরা ইদানিং কবিতা পড়িনা বিশেষ করে অন্যের কবিতা। শিক্ষিত গণ্ডির বেড়া পেরিয়ে সেইভাবে কবিতার বিস্তৃত প্রচার এখনও হয়নি সর্বসাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে। ইদানিং কবিতার প্রকাশ ভঙ্গিতে বুদ্ধি ও বোধের অভাব বলে আমার ব্যক্তিগত অনুমান।
আমাদের লেখা কবিতা নিজেরাই নিজেদের পিঠে বয়ে নিয়ে চলেছি। আমাদের সৃষ্টি আমাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছি।
যদিও আমরা জানি, কবিতা পেট ভরানোর সংস্থান বা রোজগার নয়। কর্মসংস্থানের ব্যস্ততায় বেশির ভাগটা কাটাতে হয় সংসারের বৃত্তে। তবু কবিতা, শাশ্বত ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নয়।
কবিতাকে অন্তর দিয়ে না ভালোবাসলে কবিতার প্রসার হওয়া খুব দুষ্কর। মাতৃভাষার সাথে সাথে অন্য ভাষার কবিতা পড়ার রুচি রাখতে হবে। বাংলা কবিতার অনবদ্য অনুবাদ প্রয়োজন ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় আর পৌঁছে দিতে হবে ভিনদেশের সর্বসাধারণ মানুষের কাছে ।আঞ্চলিক ভাষাকে বেশি করে প্রাধন্য দিতে হবে। কবিতার দুর্বোধ্যতাকে অনুভব করতে হবে। কবিতার দর্শন করতে হবে ‘চিত্রময়রূপ’ যা পাঠক পাঠিকার দৃষ্টিতে ছবির মতো হয়ে ওঠে। তবেই জগত ব্যাপী কবিতা সমাদর পাবে।
তবেই আমাদের বাংলা কবিতা কতোটা সমৃদ্ধ বুঝতে পারবো। বর্তমান যুগ বিপুলভাবে যান্ত্রিকতার দিকে ঝুঁকে পড়লেও কবিতা নির্বাসিত হয়নি। সাধারণ মানুষের জীবনে আধুনিক বা উত্তরাধুনিক কবিতার ভুমিকার স্থান কতোটা সে বিতর্ক বরাবর থাকবে।
সবার কাছে বিনীত অনুরোধ আমারা মাতৃভাষায় কবিতা লিখি। অন্য ভাষার কবিতা সাগ্রহে পড়ি। বেশি করে বাংলা কবিতার অনুবাদ হোক। বাংলা কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিত করে যেতে হবে। নিত্য কালের বর্তমান পদচিহ্ন অনুসরণ করেই পরিশীলিত বাংলা কবিতার ভাষা।
তবেই বাংলা কবিতা বিশ্বের সাহিত্য দরবারে সহবাস পাবে । বাংলা কবিতার প্রাঞ্জলতা আরও জনপ্রিয় হবে। বাংলা সাহিত্যে কবিতা শিকড়ে শিকড়ে এক মহীরুহ শিখর হয়ে উঠবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

শেষপর্যন্ত দ্বন্দ্বের বিষয় হলেও জোর গলায় বলতে পারি, বাংলা কবিতার পিঠ দেওয়ালে ঠেকতে পারেনা যদি আমারা নিজেদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকতে না দেওয়ার সমবেতভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। বাংলা কবিতার বিপ্লবে নির্ভরযোগ্য হই। নিঃস্বার্থে জাগ্রত প্রতিবাদ জানাই।