Skip to content

বউয়ের সাথে প্রেম -বিচিত্র কুমার

রুদ্র আর সুমির বিয়ে ঠিক হয়েছে মাত্র দুই দিন। দুই পরিবারেই আনন্দের হাওয়া বইছে। সুমিদের বাড়িতে সন্ধ্যা হলেই তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বলে, শাঁখ বাজে, ধূপের গন্ধে উঠোন ভরে ওঠে। রুদ্রদের বাড়িতে ঠাকুরঘরে ঘণ্টা বাজিয়ে মা প্রার্থনা করেন—ঘরে যেন লক্ষ্মীর আগমন শুভ হয়।

কিন্তু এই পবিত্র পরিবেশের মাঝেই রুদ্রের মনে এক অদ্ভুত আক্ষেপ উঁকি দিল। জীবনে সে কোনোদিন প্রেম করেনি। বন্ধুরা যখন কলেজে গোলাপ দিত, প্রেমপত্র লিখত, সে তখন পরীক্ষার খাতা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। তাই বিয়ে ঠিক হওয়ার পর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজেকেই বলল, “জীবনে প্রেম করলাম না! এবার বউয়ের সাথেই প্রেম করবো। অফিসিয়াল, পবিত্র আর আজীবনের প্রেম।”

এদিকে সুমিও কম যায় না। বান্ধবীদের সে গোপনে জানিয়েছে, “আমি তো কোনোদিন প্রেম করিনি। এখন হবু স্বামীর সাথেই প্রেম শিখবো।” কথাটা বলার সময় তার গালে লাজুক হাসি ফুটে ওঠে।

বিয়ে ঠিক হওয়ার দ্বিতীয় দিনেই রুদ্র সাহস করে মেসেজ পাঠাল—“জয় শ্রীকৃষ্ণ… কেমন আছো?” এতক্ষণ ধরে টাইপ করে আবার ডিলিট করেছে, শেষে এইটুকুই পাঠাতে পেরেছে।

সুমি মেসেজ দেখে লজ্জায় লাল হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর লিখল—“রাধে রাধে… ভালো আছি। তুমি?”

এরপর দুজনেই একই অবস্থা। অনেক কথা মনে আসছে, কিন্তু লিখতে গেলে হাত কাঁপছে। রুদ্র সাহস করে লিখল, “তোমার কথা ভাবছিলাম।”

সুমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল, “এত তাড়াতাড়ি?”

রুদ্র গুলিয়ে গিয়ে লিখল, “মানে… ভবিষ্যৎ সংসারের কথা।”

সুমি হেসে ফোনটা বালিশে চাপা দিল। এটাই ছিল তাদের প্রেমের প্রথম অপ্রস্তুত মুহূর্ত।

রাতে প্রথম ফোনকল। দুজনেই চুপচাপ। রুদ্র বলল, “খেয়েছো?” সুমি বলল, “হ্যাঁ… তুমি?” তারপর নীরবতা। হঠাৎ রুদ্র বলল, “তোমার হাসিটা খুব সুন্দর।”

সুমি অবাক হয়ে বলল, “দেখলে কিভাবে?”

রুদ্র গম্ভীর গলায় বলল, “ভিডিও কলে তো দেখছি।”

সুমি তড়িঘড়ি করে ক্যামেরা অফ করে দিল। চুল এলোমেলো, কপালে তেল চকচক করছে। সে লজ্জায় বলল, “একটু দাঁড়াও!”

ওপাশে রুদ্র হাসতে হাসতে কাত। সেই হাসির মধ্যেই বরফ গলতে শুরু করল।

এরপর শুরু হলো নিয়মিত রাত জাগা কথা। তারা ঠিক করে, “আজ তাড়াতাড়ি ঘুমাবো।” কিন্তু কথা বলতে বলতে কখন যে রাত দুইটা বাজে, টেরই পায় না।

রুদ্র একদিন ইউটিউব দেখে শিখে এল রোমান্টিক লাইন। বলল, “তোমার চোখ দুটি যেন শারদীয় পূর্ণিমার চাঁদ।”

সুমি সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “নিজের লাইন?”

রুদ্র একটু চুপ করে বলল, “মানে… সামান্য সাহায্য নিয়েছি।”

সুমি হেসে বলল, “আমি-ও কিন্তু শিখেছি কিভাবে হবু স্বামীকে লজ্জা দিতে হয়।”

তারপর ধীরে লিখল, “তুমি না থাকলে মনটা খালি খালি লাগে।”

রুদ্র এতটাই অবাক হলো যে ফোন প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল।

একদিন রুদ্র ইচ্ছে করে মেসেজ দিল না। ভাবল, দেখি সুমি আগে খোঁজ নেয় কিনা। এক ঘণ্টা পর মেসেজ এলো—“আজ ঠাকুরঘরে তোমার জন্য প্রার্থনা করেছি।”

রুদ্রের মন ভরে গেল। তারপর আরেকটা মেসেজ—“আর ভগবানকে বলেছি, তুমি যেন আমাকে মেসেজ না দিয়ে থাকতে না পারো।”

রুদ্র সঙ্গে সঙ্গে লিখল, “আমি তো পরীক্ষা নিচ্ছিলাম।”
সুমি উত্তর দিল, “আমি পাশ করেছি?”

রুদ্র লিখল, “তুমি তো সরাসরি হৃদয়ে প্রথম হয়েছো।”

এক রাতে রুদ্র ধীরে বলল, “বিয়ের দিন যখন তোমার সিঁথিতে সিঁদুর পরাবো, তখন হয়তো হাত কাঁপবে।”

সুমি নরম স্বরে বলল, “কাঁপলে ঠিক করে দেবে। কারণ ওই সিঁদুরই হবে আমার সবচেয়ে বড় গর্ব।”

কথাগুলো শুনে রুদ্রের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল।

তারপর একদিন তারা দুজনেই স্বীকার করল—কেউ কোনোদিন কাউকে ‘ভালোবাসি’ বলেনি। একটু চুপ থেকে রুদ্র বলল, “তাহলে একসাথে বলি?”

দুজনেই একসাথে বলল, “ভালোবাসি।”

কথাটা বলার পর দুজনেই চুপ করে রইল। কিন্তু সেই নীরবতার ভেতরেই ছিল হাসি, লজ্জা, হৃদস্পন্দনের মিষ্টি শব্দ।

এভাবেই বিয়ে ঠিক হওয়ার মাত্র দুই দিন পর শুরু হয়েছিল রুদ্র আর সুমির প্রেম। তাদের প্রেমে ছিল না কোনো পুরনো অভিজ্ঞতা, ছিল না কোনো তুলনা। ছিল শুধু নতুন অনুভূতির কাঁপন, ঠাকুরঘরের প্রার্থনা, রাত জাগা ফোনকল আর একসাথে ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দেখার সাহস।

রুদ্র এখন প্রায়ই বলে, “প্রেম না করে বিয়ে করা খারাপ না। কারণ আমার প্রথম প্রেমটাই হলো আমার বউ।”

সুমি মুচকি হেসে উত্তর দেয়, “আর আমার প্রথম প্রেমিকটাই হলো আমার স্বামী।”

এভাবেই হাসি, লজ্জা, মিষ্টি অভিমান আর ভগবানের আশীর্বাদ নিয়ে শুরু হলো তাদের আজীবনের প্রেমকাহিনি।

নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ
মোবাইলঃ 01739872753

https://www.facebook.com/profile.php?id=100014642137028&mibextid=ZbWKwL

মন্তব্য করুন