ফল্গুনদীর ধারা – ৩য় পর্ব – স্বপন চক্রবর্তী

ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্যারকে চিরবিদায় জানিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াবো এমন সময় সহকারী প্রধান শিক্ষক মহাশয় নীললোহিত মৈত্রের সঙ্গে দেখা। দেখলাম তিনি হন্তদন্ত হয়ে আমাদের দিকেই আসছেন। তিনি আমাকে বললেন-স্বপন, তুই এসেছিস ! ও, দেখছি বাবা মা সবাই আছেন। খুব ভাল হয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে বললেন-কাল রাত্রে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে স্বপন, যার সঙ্গে তোর নামটাও আশ্চর্যজনক ভাবে জড়িয়ে গেছে। বাবা জিজ্ঞাসা করলেন- কি হয়েছে মাস্টারমশাই। বাবু ত’ কাল সবসময় বাড়িতেই ছিল। লোহিত স্যার হাসলেন-না না, সেসব কিছু না। তারপর তিনি যা বললেন তার মর্মার্থ হল এই – গত রাত্রে হেড স্যার ক্লাস নাইনের খাতা দেখছিলেন আর সেই সময় নীললোহিত স্যার তাঁর পাশেই ছিলেন। হেড স্যার তাঁর সামনেই একপ্রকার মৃত্যুমুখে ঢলে পড়েন। শেষ খাতাদুটি ছিল আমারই যেগুলি তিনি একেবারে শেষেই দেখবেন বলে মনস্থ করেছিলেন। আর ঐ খাতাদুটি দেখা হয়ে যাবার পরে তাঁর সঙ্গে হেডস্যারের আমার সম্বন্ধে কিছু আলোচনাও হয়। স্যার নাকি আমার লেখায় খুব খুশী হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এর খানিক পরে হঠাৎই তাঁর বুকে যন্ত্রণা শুরু হয় এবং কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাঁর হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া চিরকালের মত স্তব্ধ হয়ে যায়।

তবে এরপর তিনি যা বললেন তা সত্যই বিষ্ময়কর। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে নীললোহিত স্যার যখন পরীক্ষার খাতাগুলি গুছিয়ে রাখছিলেন তখন নাকি তন্নতন্ন করে খুঁজেও আমার খাতাদুটি পাননি। অথচ আজ সকালে দেখেন সব খাতার উপরে আমার খাতাদুটি সযত্নে রাখা আছে । এটা কি করে সম্ভব হল তিনি তা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছেন না। কারণ খাতাগুলি তিনি হেডস্যারের বাড়ি থেকে খামে ভরে গতকাল রাত্রেই নিজের কাছে নিয়ে এসে আলমারীতে চাবি বন্ধ করে রেখে দিয়েছিলেন। রাখবার সময়ও তিনি কিন্তু আমার খাতা দুটির হদিশ পাননি । একে হেডস্যারের আকষ্মিক মৃত্যু আর তার ওপর আমার খাতা দুটি নিখোঁজ, সব মিলিয়ে দুশ্চিন্তায় নীললোহিত স্যারের বয়স নাকি একরাত্রেই অনেকটা বেড়ে গেছে। অথচ আজ সকালে আলমারী খুলে মোড়কের মধ্যে খাতাদুটি দেখে তিনি ত’ হতবাক। কে রাখল, কখন রাখল আর কিভাবেই বা রাখল-এসব প্রশ্নের কোনো উত্তরই তাঁর কাছে ছিল না। আর আলমারীর চাবি ত’ সারারাত তাঁর কাছেই ছিল। শুধু তাই নয়, খাতাদুটিতে হেডস্যারের হাতের লেখায় লাল কালিতে এমন কিছু মন্তব্য রয়েছে যা নাকি তিনি গতরাত্রে খাতা দেখার সময় নীললোহিত স্যারের সামনে কখনোই লেখেননি। সেই মন্তব্যগুলিই বা স্যার কখন লিখলেন ! এমন অনেক প্রশ্নই সহকারী প্রধানশিক্ষকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এসব প্রশ্নের একটা উত্তর ত’ আমাদের কাছে অবশ্যই ছিল। কিন্তু সে উত্তর কতটা গ্রহণযোগ্য তথা বিশ্বাসযোগ্য হত সে সম্বন্ধে আমাদের মনে একটা সন্দেহ ছিল। তাই গতরাত্রের কথা আমরা কারোকে জানানোর প্রয়োজন মনে করিনি। নীললোহিত স্যারের কথায় আমরা সকলে যারপরনাই বিষ্ময়ের ভান করেছিলাম। আজ প্রায় পন্চাশ বছর বাদে এই ঘটনার কথা তোমাদেরকে জানিয়ে মনটা অনেক হাল্কা হল।

কালের নিয়মে সবকিছুই এগিয়ে চলে। প্রয়াত হেডস্যার শশীশেখর চট্টোপাধ্যায়ের স্থলাভিষিক্ত হলেন নীললোহিত স্যার। তবে সাময়িক ভাবে। বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হল।অবশ্য দুএকটা দিন দেরিতে। যথারীতি আমি ইংরাজীতে প্রথম পত্রে ৮৭ ও দ্বিতীয় পত্রে ৮৯ পেলাম। তখন বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরে ছাত্রদের পরীক্ষার খাতা দেখতে দেওয়া হত। আমি যেন দেখলাম আমার ইংরেজী খাতাদুটিতে সেই রাত্রে আমার সামনে হেডস্যার যে সব মন্তব্যগুলি লিখেছিলেন সেগুলি যেন আরও ঊজ্জ্বল হয়ে উঠেছে আর তার মধ্যে স্যার বুঝি তাঁর সেই রাশভারী চেহারাটিতে মূর্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলছেন-কি রে স্বপন, কি ভাবছিস ! সামনে বছর কিন্তু নব্বইএর বেশী পেতে হবে। হেডস্যারের কথা আমি রাখতে পেরেছিলাম। পরবর্তী পরীক্ষাগুলির প্রতিটিতেই ইংরেজীতে আমি নব্বইএর উর্ধ্বে নম্বর রাখতে পেরেছিলাম।

আজও যখন কোন হিমশীতল বর্ষণমুখর রাত্রে ঘরে একাকী বসে থাকি তখন সেদিন রাত্রের সেই ঘটনার ইতিবৃত্ত মানসপটে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে । আপাতদৃষ্টিতে কঠোর কিন্তু কোমল একটি মানুষ মৃত্যুর পরেও কিভাবে তাঁর প্রিয় ছাত্রের জন্য স্নেহের দরজা খুলে দিয়েছিলেন তা ভাবলে আজও চোখে জল এসে যায়। যেন মনে হয় কেউ দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলছেন-দরজাটা খুলবেন দয়া করে। আমি হেডস্যার শশীশেখর বলছি।