ধারাবাহিক উপন্যাস – মানবিক (পঞ্চম পর্ব ) মল্লিকা রায়

0
97

মানবিকঃ

সুপার বলেছেন পেসেন্টের মেন্টাল ডিসঅর্ডার অথবা মেমরি লস হবার 95% চান্স এখন ওপরওলাই ভরসা , ” অত ভাববেন না মিঃ আম্বানী আমার ওপর ভরসা রাখুন ” । না ওর সুস্থতা নিয়ে ভাবছি , সবদিক ঠিকঠাক না থাকলে তো দুশ্চিন্তা ! লোকজন নেই । ” সব ঠিক হয়ে যাবে তবে কি ভবিতব্যের ওপরে তো কারোর হাত নেই , এখন অপেক্ষা ছাড়াতো আপনার কিছু করারও নেই ! খুব লস্ হয়ে যাবে আপনার ! ” মানে ? বুঝলাম না , ” না ঘাবড়াবেন না মি অম্বানী আমি আপনার ফিনান্সিয়াল প্রবলেমের কথা বলছিলাম! অযথা কিছু বাজে খরচা ! ” হা হা হাসালেন ডঃ স্মিথ , ড্যু য়্যু নো এ্যম আ চিপ একজিক্যুটিভ অফ এস.জি গ্রুপ অফ এসও এন্ড আই ভি ! হাউ রিডিক্যুালাস ” ! ও নো নো ডোন মাইন্ড মিঃ অম্বানী আমি কিন্তু আপনাকে হার্ট করতে চাই নি, বিলিভ মি ” ! ইটস ওকে ডঃ !
বেশ আমি আসি তাহলে বিকেলে এপয়েন্ট আছে কাল আসব , টেনশন করবেন না । বেড়িয়ে যায় ডঃ স্মিথ । বাড়ী ফেরে দিমান । সোফায় এলিয়ে দেয় বিদ্ধস্ত শরীর, অবসাদে চোখ ঢুলে আসে , টয়লেটে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে দু পেগ বিয়ার নিয়ে বসে । যাক্ একদিকে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল এব্যরশনের ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে । ভালোয় ভালোয় ওর ট্রিটমেন্টটা হয়ে গেলে নিশ্চিন্ত ! উহ্ ভগবান সব ভালোর জন্যই করেন , নইলে কি যে হত ! অদৃশ্যে ভগবানের উদ্দেশ্যে কৃতজ্ঞতা জানায় । বিকেল পাঁচটা । খিদেয় পেটে ছুঁচো ডাকছে , টেবিলে খাবার সাজানো, এই অবেলায় ভাত খেতে ভাল লাগছে না , দু’ পিস রুটি ,চিকেন আর স্যুপ খেয়ে কোনরকম পেট ঠান্ডা করে তারপর ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয়। ঘুম আসেনা কিছুতেই । মোবাইল অন করে হালকা গান চালিয়ে অযথা ঘুমের চেষ্টা , ক্রমে দু চোখের পাতায় নিদ্রা দেবীর কৃপা লাভ । নিস্তব্ধ চতুর্দিকে কেবল সারমেয়দের মেটিং উৎপাত । ভেসে উঠছে হাসপাতাল, কেবিন, পর্ণা , সুপার , ক্রমে অনিশ্চয়তা ,পর্ণার মুখটা ক্রমশ পাল্টে যাচ্ছে ভয়ংকর কুৎসিত শ্বাপদের মতো , বেড়িয়ে পরছে দু পাশের লম্বা দাঁতের তিখ্নতা , প্রকট দেখাচ্ছে ওর বিকৃত মুখটা , দাঁত মুখ খিঁচিয়ে এগিয়ে আসছে দীমানের দিকে, খল্ খল্ হাসিতে ফেটে যাচ্ছে চার দেওয়ালের নিস্তব্ধতা, কাছে আরও কাছে , অতর্কিতে দু’হাতে চেপে ধরেছে ওর গলা, অনেক চেষ্টা করেও ছাড়াতে পারছে না ওর চেপে বসা দু’ হাতের আঙুল , গোঙানির মত একটা আওয়াজ বেরিয়ে আসছে দীমানের মুখ থেকে,ছটফট করছে বিছানায় , খিল খিল উচ্চস্বরে হাসিতে ভেঙে যাচ্ছে আঁধারের নিস্তব্ধতা , তীব্র হচ্ছে গোঙানির আওয়াজ , বেশ কিছুক্ষণ ধ্বস্তা ধস্তির পর ঘুম ভেঙে হাঁফাতে থাকে দীমান , উঠে বসে লাইট অন করে , সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একশা , আচমকা দুঃস্বপ্নের ঘোরে কিছুটা নার্ভাস হয়ে সিগারেট ধরায় ,ফ্রিজ খুলে কয়েক পেগ বিয়ার ,পায়চারী করে কিছুক্ষণ তারপর বাকী রাতটা সোফায় হেলিয়েই কাটিয়ে দেয় । উফ্ কি ভয়ংকর স্বপ্ন ! ভোর হতে আর কিছুক্ষণ বাকি , পাশের ফ্ল্যাট থেকে প্রভাতী সুর ভেসে আসছে ,” জড়িয়ে ধরেছি যারে সে আমার নয়………” , একটু একটু করে ভোরের আলো ফুটছে , ফ্রেশ হতে হবে । চামেলী ঢুকল , ” ই কা সাহাব ? কাল কা খানা টেবিল পে ওয়সা হি রহা ! ভাবি কা তবিয়ত……..” হ্যাঁ ও মেডিকেলে ভর্তি আছে , সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে ইনজিওরড ” কায়সে সাহাব ? হমি তো 4 বাজে গেট বন্ধ দেখকে সোচা কি ঘুমনে গয়ে হোঙ্গে । হায় রাম ইত্তা গরবর ক্যয়সে হুয়ে ? তুই তোর কাজ কর , কফি নিয়ে আয় ! আনছে সাহাব । ফোনে রিং , কান খাঁড়া হয় চামেলীর !
” না না যাস্ট দশটায় আসছি ডার্লিং , তুমি একটু ম্যনেজ করে নিও ,আমি মেডিকেল হয়ে আসব “। ভীষণ টায়ার্ড ডার্লিং , প্লিজ হেল্প মি ”
কফিমগ টেবিলে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে চামেলী। ” কি ব্যাপার ? কাজ নেই ? ” না সাহাব ,রান্না মসিনে পুছতা কা খানা বনায় “? খাবার বানানোর দরকার নেই , পর্ণা ফিরলে মাসিকে আসতে বল্ , তুই এসে ঘরদোর গুলো ঝাড়,পোছ করে দিস । আমি অফিস ক্যান্টিনে খেয়ে নেব ঠিক আছে ? ঠিক হে সাব ,জ্যয়সা আপকো মর্জি । লেকিন ভাবী আচ্ছা হ্যায় সাহাব ? হাঁ ভালো আছে ।দীমানের গাম্ভীর্যের কাছে পরাভূত হয়ে কাজে নিমগ্ন হয় চামেলী । ফের কলিং , পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে ওপাশের কন্ঠস্বর, ” তুমি ভুলে গেছ দীমান আজ ফার্স্ট আওয়ারে এজিকিউটিভ মিটিং , গেস্টরা আসছেন , তোমার থাকা একান্ত জরুরী ! একটু তারাতারি এটেন্ড কোর কেমন “? দু’ চোখ গড়িয়ে জল বেড়িয়ে আসে চামেলীর , ভাবিজীর অশুভ আশংকায় ছটফট করে মনটা , কোনদিন মুখ ফুটে নিজের কষ্টের কথা কারুকে বলেনি , সংসার প্রাঙ্গনের সমস্ত দুঃখটা একাই বহন করে গেছে । সাহাব স্নান পে গিয়া । মন লাগছে না, কোনরকম কাজ কাম সেরে নিচে স্যিকুরি চাচুই ভরসা , ” চাচু হমকো মাফ্ করিয়ে দো , ওদিন যো আপকো বোলা হমকো বুড়া লাগা , ” ও তো হমকো য়াদ নাহি লেকিন বাত কা “? ” চাচু ভাবীকো কা হুয়া ? সাহাব বোলা আসপতালমে হে , কল্ হম খা পিকে গয়ে লেকিন 4 বাজে আয়ে তো দেখে তালা লগা হে ,সোচা থোরা বাহার গয়ে হোঙ্গে লেকিন চাচু ই কায়সে হোল? “উ লড়কী ছাতপর গয়ে টংঙ্কো কি চাবী বন্ধ করনে সিঁড়ি সে গির পরে । তো হমরা কি কসুর হল? সবনে হমকো বোলা ,তুম খোদ কিউ নাহি গয়ে ? হম থোরি হি জানত উয় লড়কী গির যায়ে ” ? ” হে ভগওয়ান ! উপর সে গির গেল ? তব তো ভাবী বহত খতরে মে , কোই মুসিবত তো নাহি না? জানত হো উ সাহাব হে না আচ্ছা আদমী না আছে হম অপনে কান মে শুনে উও মরদ দুসরে ঔরত সে প্যারসে বাত্ কি, সব মরদ জাত্ শালা কুত্তা হে ” । কাহেরে ? ” কিউ কি এহি টাইমপে কোই প্যার ক্যয়সে করে ? ভগবানের উদ্দেশ্যে হাত জোড় করে প্রণাম করে , ভাবীকো বচাই লো ” । স্নানপর্ব সেরে ডঃ স্মিথকে কল দিমানের , ” ইয়েস ডঃ স্মিথ স্পিকিং “ডঃ আমার আজ জরুরী মিটিং পাঁচটার আগে কিছুতেই বেড়োতে পারবনা আপনি যদি একটু ম্যানেজ মানে যদি …………….”
” হ্যাঁ বুঝেছি , ঠিক আছে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন , কোন টেনশন নেবেন না , গোপাল এসে গেছে ওকে বরং পাঠিয়ে দেব, বাই ” পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে চামেলী । ভিজিটিং আওয়ার্সের দশ মিনিট আগে পৌঁছে প্রত্যুষ সোজা সুপারের ঘরে , ” আরে প্রত্যুষ সিট ডাউন প্লিজ্ , কি খবর বল “? স্যার কেসটা কেমন বুঝছেন ? এনিথিং সিরিয়াস ? হ্যাঁ অফ কোর্স সিরিয়াস ,মিসক্যারেজ , মাথার পেছনে আটটা স্টিচ্ বুঝতে পারছ , আমি চাইছি কেসটা তুমি হ্যান্ডেলিং করো , সেন্সটা আপ ডাউন করছে , প্রেসারটাও নরম্যাল নয় , সাংঘাতিক ইন্টারন্যাল ইনজিওরড ! ওকে এমারজেন্সির আই সি ইউ তে ট্রান্সফার করেছি । লেট উই সি !নাকে মুখে মাক্স ঢাকা রক্ত ও স্যালাইনে অর্ধমৃত পর্ণা , হার্টবিট আশাতীত কম , ওর মাথায় হাত রাখে প্রত্যুষ , হাত বোলায় কপালে , গালে । দু’ জনার কত সুৃর, কত গান স্তব্ধ হয়ে গেছে আজ ! সমুখে তারই এককালের মানসমূর্তি আজ নিথর , কয়েক ফোটা অশ্রু ঝড়ে পরে পর্ণার কপালে । ” কেমন বুঝছ প্রত্যুষ ” ? ইটস ওকে স্যার , আজই সেন্স ইমপ্রুভ করবে । বলছ ? ইয়েস স্যার । বেশ , তুমি কি এখানে কিছুক্ষণ থাকতে চাও ? আপনি ঠিক বলেছেন স্যার । বেশ , আমি কেবিনে আছি , ওকে স্যার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে সিক্সটিনের গোল্ডেন বয় ! দু হাতে বুকে জড়িয়ে ধরেন সুপার ডঃ চ্যটার্জী ,” “মাই বয় য়্যু আর সো লাকি , ডোন্ট আপসেট , আমি জানি তোমার হাতের যাদুতে পেসেন্টের পূর্ণজন্ম হয় ” । ” ওহ্ প্রত্যুষ ভাল হচ্ছে না কিন্তু ,” কেন আমি আবার কি করলাম ? করনি ? তুমি কিচ্ছু করোনি ? না । না ? না বললাম তো ।বললে ? হ্যাঁ বললাম ওটা তবে কার ? ডান কাঁধে প্রিয়াংকার কলেজ ব্যাগ ! লজ্জায় আড়ষ্ট প্রত্যুষের কথা এলোমেলো হয়ে যায়, না মানে , আমি ………. আর কত্ত মিথ্যে বলবে, প্রত্যুষ , আমি জানি তুমি ওকে ভীষণভাবে চাও শুধু চাওই না মনে প্রাণে ভালোবাসো , বল বাসোনা ? তাহলে আমায় কেন ঠকাচ্ছো বলতে পারো “? হ্যাঁ পারি একটু ক্যান্টিনের পেছন দিকটায় চলো সব বলছি ওরা সব হাঁ করে শুনছে । বেশ চল। সেই প্রথম প্রাণের সমস্ত শক্তি দিয়ে চুম্বন করেছিল পর্ণাকে । সেকশনের প্রায় অর্ধেক বন্ধুরা ধরে ফেলেছিল ওদের জুটিকে ! সে কি লজ্জা প্রায় দশদিন পরে কলেজে এসেছিল পর্ণা ! নিথর শরীরের দিকে চেয়ে মৃদু হাসে প্রত্যুষ ! ঠোটের ডান পাশটা সামান্য নড়ে উঠল যেন , দৃষ্টি স্থির হয় , হ্যাঁ কেঁপে উঠছে ঠোট, চোখের পাতায় কম্পন । জাগবে পর্ণা ! জাগতেই হবে অন্তত আমার জন্য, ওঠো পর্ণা অনেক ঘুমিয়েছ এবার এসো , হৃদয়ের দুয়ার খোলা এসে বন্ধ করো । দেওয়ালে স্লো ভয়েসে মুভি চলছে বিয়ের অনুষ্ঠাণ , লাইট, জনজোয়ার, সানাই,উলু,শঙ্খ ,বর বৌ হৈ হল্লা তার মধ্যে পুরোহিতের মন্ত্র পাঠ ,” যদিদং হৃদয়ং মম …….বৌয়ের সাজে পর্ণা আর প্রত্যুষের হাত বেঁধে দিচ্ছেন পুরোহিত , কুন্ডলী পাঁকানো যজ্ঞের ধোঁওয়ায় দুজন হাসতে হাসতে মিলিয়ে যাচ্ছে দুজনের মধ্যে । ” পেসেন্টের জ্ঞান ফিরেছে স্যর ” ওকে , আমি দেখছি । চোখের পাতা নড়ছে,ঠোটে মৃদু কম্পন , ” নার্স বি রেডি , স্লোলি মুখের মাক্সটা সরান , হার্টবিট চেক করুন , প্রেসার নোট করুন, ক্যুইক । ওকে স্যর, এভরিথিং নর্মাল স্যার শুধু হার্টবিট কিছুটা হাই । চোখ খুলেছে পর্ণা , চেয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে, ঠোট সামান্য নড়ছে , পাশে বসে প্রত্যুষ এলোমেলো চুলগুলো খুব যত্ন করে সরিয়ে দেয় কপাল থেকে । একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে পর্ণা ওর দিকে । ” চিনতে পারছ আমায় “? চোখের দু’ পাশে জল গড়িয়ে পরে । বলতো আমি কে ? বল । শুষ্ক ঠোটে মৃদু হেসে চোখ নামালে প্রত্যুষ ওর হাতে হাত রাখে , ” কি হল বল আমি কে নইলে কিন্তু …………” প্র…ত্যু….ষ । খুব আস্তে থেমে থেমে বলে পর্ণা ! খুব কষ্ট হচ্ছে না ? আর ভয় নেই । এবার আমরা ফিরব । যাক্ ভয় থেকে মুক্তি পাওয়া গেল তাহলে ,মেন্টাল ডিসর্ডার অথবা মেমরী লসের দুশ্চিন্তা আপাতত মিটল । চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে , প্রত্যুষ জানে এ কান্নার কোন স্বান্তনা হয় না । ফোনে রিং ,” বলুন দীমানবাবু , হ্যাঁ এইমাত্র ওর জ্ঞান ফিরেছে তবে পালস্ খুব স্লো , না ভয়ের কোন কারণ নেই উনি আমায় আইডেন্টিফাই করতে পেরেছেন , ওকে বাই ” ।ডান হাতটা ওর হাতের পরে রাখে পর্ণা , ” এস আমার পর্ণা , এবার এসো , আমায় সামলাও , বড় ক্লান্ত আমি ।

মল্লিকা রায়
আমি মল্লিকা রায় ,উঃ ২৪ পরগণা জেলায় বারাসাত শহরের বাসিন্দা, ছোটবেলা থেকে নিছক আবেগের বশে লেখায় প্রবেশ। পাশে পড়াশুনা,জীবন-যাপন ও বিভিন্ন খ্যাতিমান কবি,সাহিত্যিকদের লেখায় আত্মনিবেদন।দীর্ঘকাল ধরে কিছু ছোট পত্র-পত্রিকায় সৌজন্যমূলক লেখায় আত্ম-প্রকাশ। পারিবারিক প্রেরণার উৎস মা, যার একাংশ জুড়ে আমার তার প্রতি প্রবল আকূতি রয়েছে, বিশেষত লেখার মূল সূত্র বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের নানান প্রভেদ-বিভেদ, ঘাত-প্রতিঘাত প্রভৃতি আমায় লেখণী তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলা কবিতা আসরে প্রবেশ প্রায় ২০১৫ তে, এডমিন এবং অজস্র সহযোগী বন্ধুর সহযোগিতায় এ পর্য়ন্ত পৌঁছানো।