Home / উপন্যাস / ধারাবাহিক উপন্যাসঃ মানবিক (পর্ব – দুই)

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ মানবিক (পর্ব – দুই)

ধারাবাহিক উপন্যাসঃ মানবিক
(পর্ব – দুই)

এই শোন তুমি রেস্ট নাও আমি আজ সকাল সকাল ফিরব , অফিস থেকে ফোন করব এফ আর সি এস ডঃ স্মিথ কে ,দেখি উনি কি সাজেস্ট করেন , এই সব হাঁতুরে ডাঃদের আমার একদম ভরসা হয় না জানো ? ও কে তুমি রেস্ট নাও আমি টয়লেট গেলাম । রান্নাঘরে চামেলী ধোওয়া পোঁছায় ব্যস্ত, হাত ,ওর মুখ হাত সমান তালে চলে,
“ভাবী উও সিক্যুরি কাকু আচ্ছা না আছে মা কসম হমি একরোজ উকে মারিয়ে দিব ” কেন ও আবার কি করল ?
হমি বললাম গেট খুলিয়ে দিন তো উ শালা হমার হাত পকড়ে নিল , বলে, ছোড়েবে না কি করবি ? “সত্যি ‘? অবাক পর্ণা ।
হাঁ ভাবী, মরদ জাত হে না তাকত দিখাতা হে,বললম, জুত্তা সে পিটব ছুর শাল .জুত্তা সে পিটব তব ছুড়িয়ে দিল , বলল , দেইখে লিবে
কি দেখবে উহ্ শালা ঝাড়ু সে মু কালা করিয়ে……..
থাম্ পিয়ারী , যা তেল গরম করে আমার মাথাটা ভাল করে ম্যাসাজ করে দে , ভীষণ মাথা ধরেছে রে , আভি আনছে ভাবীজি !
লনের বেগেনভেলিয়ায় চমৎকার কলি ধরেছে , গাছটাকে সুন্দর করে লতিয়ে বেধে দিতে হবে ,হালকা রোদ উঠেছে আজ , পাশের ফ্ল্যাটের ভেতরে দেখা যায় শিশুটির দৌড়,খুনসুটি , ওর মাও খেলে সাথে , গভর্নেস মেয়েটি খাবার বাটি নিয়ে দৌড়োয় ওর পেছনে ,শিশুটি মজা পেয়ে খিলখিল হাসিতে এঘর ওঘর দাপাদাপি করে, কি দুষ্টু কি মিষ্টি !!
অজান্তে পেটের তলদেশে হাত চলে পর্ণার । হাত জোড় করে ঠাকুরের উদ্দেশ্যে জানায়, তার স্বপ্নটিও যেন এমন সুন্দর হয় গরম তেল নিয়ে চামেলী কাছে বসে,এ লো ভাবী পিঠ ফিরে ব্যয়ঠ , ইত্তা খোব সুরত চুল বহুত আচ্ছা লাগতা, জানি তো মৃদু হেসে পর্ণার উত্তর। ইসলিয়ে সাব আপকা বহত প্যার করতা, হ্যায় না ভাবী ? তোকে ভী তোর মরদ প্যার করে না খুনসুটি ভাবীর। উ প্যার নাহি হমরা মুরাদ হে। বুঝিয়ে বল ।আরে সমঝা করো ভাবী জিন্দা রহনে কে লিয়ে গুজরানা হে । বাহ্ সুন্দর বলেছে চামেলী ,সত্যিই তো বেঁচে থাকার জন্য কত কিছু সহ্য করতে হয়,মানিয়ে নিতে হয় , বোধহয় জীবনটাই এমন।পর্ণা যোগ করে
আমার মরদ ভী প্যর করতা ! ইতনা প্যার কি জগমে অবতক কোই কিসিসে না কিয়ে হো ।সচ্ ভাবীজি ? বহত আচ্ছা হ্যায় সাব , আপকো কিতনা খয়াল রাখতা , অর মেরা মরদ দিখো ! উও ………………
উফ্ আবার শুরু করলি ? যা তো তুই যা আমি একাই পারবো দে বাটিটা রাগে বাটিটা টেনে নেয় পর্ণা । সরি ভাবি এই কান পাকাড়ছি, পাও পরছি , হমকো মারো বহত পিটো লেকিন ছোড়ো মত্ , বিখর যায়ে , মর যায়ে হম আরে পা ছাড় ওঠ , হয়েছে ! হুম ইত্তা পানি , আরে তুকে প্যার করি বলেতো …আভিতক রোতে , লো হমভি রো পরু ,হা হা হা হা জড়িয়ে ধরে পর্ণা পিয়ারীকে , দুজনাই বিদ্ধস্ত , ক্লান্ত, অবসন্ন ..অন্তরের অন্তস্থল থেকে চূরমার হয়ে যাওয়া অভিন্ন অস্তিত্ব , কে কাকে বুঝবে বা স্বান্তনা দেবে ! হয়তো সময় ,অখন্ড সময় !!
পাশের গ্রীলে দুটি শালিখের খুনসুটি , একটি আরেকটির মাথা খুটে দিচ্ছে , অপরটি ঠোটে ঠোট ঠেকিয়ে মাথাটাকে ওঠাচ্ছে নামাচ্ছে আর গোল হয়েপাঁক খাচ্ছে কি যেন বলেই চলেছে টুই টুই করে রাগী রাগী চোখে , হয়তো বলছে , কেন,কেন ওই ছোট্ট শালিখের সাথে এত ওড়াউড়ি ? হ্যাঁ ? মধুর আবেগে ভরে যায় মনটা পর্ণার , যাক্ তবে দিমানকে পথে ফেরানো গেছে ! ওর ভেতরের পশুত্বটার মৃত্যু হয়েছে তাহলে , আর দামী স্টার হোটেল নয়, কুৎসিত নরকগুলোর স্পর্শ নয় , নোংরা চুক্তি নয় কেবল খুশী আর খুশী ! কতদিন ধরে অপেক্ষার পর এই সেই কাংখিত দিন একান্ত মনের মত , বাঁচার মত , মাথা উঁচু করে দেখানোর মত । শরীর এলিয়ে গভীর দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে স্বস্তির , শান্তির, সুখের , সময়ের ঘরে ভগবানের অদৃশ্য খেলা হয়তো সময়ের অপেক্ষায় । বিকেলে চামেলী বাড়ী ফিরে দরজা খোলা দেখে অবাক হয় , জানলার পাশে কিছুক্ষণ কান পাতে, ও হরামখোর মুন্সী এসেছে , পাঁচ মাসের ভাড়া বাকী পরে গেছে , নিশ্চয়ই মরদটার কানে কুমতলব ঢালছে…………” বলছিলাম কি দুবেজির কোঠামে উ লেড়কী কো ভেজিয়ে দো, কুছু রুপিয়া উপিয়া নেহি লাগবে , হামি বুঝিয়ে লিবে ! মুন্সীর চকচকে লোভ । ” আরে চাচা উ শালা বিষ কেউটে আছে , ছাল খিচে লিবে, ও কাম তুমকো করনা হে” , মগনলালের ঘৃতাহুতি । খুব আস্তে ,” ঠিক হ্যায় আজ রাত তু উয় বুড্ঢীকো ঘর রহো , দেখতে হ্যায় শালীকো কিতনা তাকৎ “। মাথায় আকাশ ভেঙে পরে চামেলীর। প্রাণপন দৌড়তে থাকে ….ভাবিজীই একমাত্র সম্বল । ওকে হাঁফাতে দেখে পর্ণা অবাক , কি হল , হাঁপাচ্ছিস কেন ? ওর পায়ের কাছে বসে কান্নায় লুটিয়ে পড়ে চামেলী, ” আরে কি এমন হল বলবি তো ? নাহলে বুঝব কেমন করে , নিশ্চয়ই তোকে ধরে পিটেছে ? কেঁদে লুটিয়ে পরে ভাবীর পায়ের কাছে ” নেহি ভাবিজী উও হামিকো বেচ দিয়া, আজ রাত উ মকান মালিক হমরা ইজ্জত লুটনে আয়গা , হমকো বঁচাইলো ভাবী ,”অঝোরে কাঁদতে থাখে চামেলী । “কেন ” ? উসকো কিরায়া নাহি চুকয়া না , ও মুনসী বহত খতরনাক আছে , দুবেজীকো লেকে হমকো খা যায়গা ভাবী কুছ করো ।”এই কথা ? আমি ভাবলাম কি না কি । পার্স খুলে একগুচ্ছ নোট পিয়ারীকে দিয়ে বলল, আগে বলবি তো ” ! “আবেগে পর্ণার দুই পা জড়িয়ে ধরে পিয়ারী,”ভাবী তুম ভগওয়ান হো, ফরিস্তা হো হম তুমারা………….
” ঠিক আছে আরে পা ছাড় লাগছে , আগে ঘর যা, টাকাটা ছুড়ে দিবি মুনসীর মুখে বুঝলি , যা তারাতারি যা । চেয়ে থাকে চামেলীর গমন পথের দিকে। জলের রাজ্যে যেমন মাৎসন্যায়ের প্রাধান্য তেমনি মানব সমাজেও মনুষ্যন্যায় প্রচ্ছন্নভাবে চালু আছে। মাথায় আঘাত ! কোনমতে ছোট ছোট মানুষেরা উঠে দাঁড়ালেই ঠেলা মারা অথবা মাথায় মারার প্রচলিত প্রথার দৃষ্টান্ত আর কি । ‘ বিলকুল ভাবিজী ” হনহন করে ফেরার পথে আচমকা ধাক্কা লাগে এক আগন্তুকের সাথে মাটিতে পড়ে যায় পিয়ারী ছিটকে যায় ছোট্ট পার্স ,” সরি আমি খেয়াল করি নি অন্যমনস্ক ছিলাম, চামেলী তুমি ? কোথায় লেগেছে বল ? ইস্ আমি একটুও বুঝতে পারি নি! ” ওর ছেলেমানুষী দেখে হাসে চামেলী , “সচ্ ” ? ভাল লাগে ছেলেটিকে । দুবের একমাত্র ছেলে , বাপের বিপরীত চরিত্র , সাদাসিদা , মৃদুভাষী , সচ্চরিত্র শিক্ষিত যুবক, সাউথ থেকে সদ্য ফিরেছে এম বি এ করে কলকাতার একটি নামী চার্টার্ড ফার্মের উঁচু পোস্টে আছে । ” এ বাবু হমরা চোট ইধার হে দেখো , বলে বুকে হাত রাখে চামেলী , বহত দর্দ বাবুজী থোরা কম কর দো না ” ,আমার কাজ আছে হাত ছাড়ো কেউ দেখলে মুশকিল হবে, কি ছেলেমানুষী বায়না ” “নাহি ছোড়ে তো “? “মানে ” ? ” মানে তুম হমকো প্যার করো ” গরবর হয়ে যাবে রে চামেলী ” ” ও হম নাহি সমঝে , লো হম গির পরি , প্যারসে হমকো উঠাও ” আমার কাজ আছে ছাড়, জোর করে হাত ছেড়ে একপ্রকার দৌড়ে পালায় সুজন । হিহিহিহি , ভীতু কহিকা বাড়ীর সামনেই দেখা হয়ে যায় দুবের সঙ্গে , ” নমস্তে চাচাজী, লিজিয়ে আপকা কিরায়া, থোরা দু’চার দের হোনেসে বহত শর্মিন্দা হু ” ,” আরে ঠিক হ্যায় বহু , তুলোক তো মেরা আপনা হ্যায় , কোই বাত নেহি, কমপক্ষে চার পাঁচবার টাকাটা গুনে ধুতির খুঁটে শক্ত গিট্ দিয়ে বাড়ীমুখো রওনা হন দুবে । “আরে চাচা থোরা চা পিকে যাইয়ে ” ” নহি বহু তেরা ভাবী কা তবিয়ৎ আচ্ছা নাহি, দুসরা দিন পিয়েঙ্গে “” তুম খাড়ে খাড়ে ক্যা দেখতে ? ফির দারু পি? কোই কাম ধান্দা তো হ্যায় নাহি , যব দেখো শালা দারুমে , ” সমুখে নিজ আদমীকে মসকরা করতে দেখে মাথায় আগুন জ্বলে যায় চামেলীর, এলোমেলো ঘর দোর , বাজার হাট, খানা বনানা সবকুছ করনা পরতা । মাত্র বছর চার হল বিয়ে হয়েছে কি এমন বয়স ! ঢুকেই হাতে ঝাঁটা , খুন্তি । অথচ চাচা,চাচি ওকে রুপসী বলে, ভাবী বলে তুই খুব সুন্দর, শুধু ঘরের মরদটাই বুঝলো না,প্রথমে অবশ্য মরদটার কাম ছিল,প্যার ছিল… । চোখের কোন্ চিকচিক করে ওঠে অশ্রুকণা, মুখ ফিরিয়ে বলে,” ঠিক হ্যায় তু দারু পি, হমকো মত্ দেখ্ , যবতক জিন্দা হু ইয়ে জান তেরে লিয়ে , ইয়ে লো রুপয়ে যা দারু লেকে আ, যিত্তা চাহে , দিল ভরকে পি শালা, জরা হম ভি তো দেখে মেরা মরদ কিত্তা তাকৎবন্ হে , তু যা হররোজ পি,হরবক্ত “। ঝাঁটা হাতে ঘর দোর ঝাড় পোছ করতে থাকে পিয়ারী , পাশের ঘরের ছোট্ট মুনিয়া ওর কাছে আসে খেলা করতে , আপ্পু বলে ডাকে, ওকে সাজিয়ে দেয়,চুল বেঁধে দেয় , এ এক অন্যরকম আনন্দ ! ” মুনিয়া তু হমকো কিত্তা প্যর করিস ” ? বহত সারি আপ্পু , মাই সে জাদা ? ও তো হম নাহি জানত লেকিন তুম হমকো অচ্ছা আপ্পা হে । দেখ্ বেটা কোই চিজ্ কো তোড়ণা মত্ । কভি নাহি ,আপাদমস্তক মাথা নেড়ে মুনিয়ার সম্মতি। হমী উসওক্ত যব বুলা কিউরে তু আয়ে নাহি ? ও হ্যয় ক্য আপ্পু তু তো দলিদ্দল হো না, কোই টিভি, খিলোনা নাহি ,মাম্মি বোলে কি মাত যাও ।……… ইতনি সি বাত ? ঠিক হে তুম চলে যাও , আপ্পা উও টোস্টবালা বিকুট দো না ! নাহি হে, পৈসা নাহি, কন দেগা ? মাই সে মাঙ্গ লে । মুখ বেঁকিয়ে চলে যায় মুনিয়া , মুহূর্তে চামেলীর ঘরটা ফাঁকা হয়ে যায় , পাশে পেছন ফিরে বসে আছে মগনলাল , ধীরে ওর বাম কাঁধে হাত রাখে চামেলী , ” লে তু হমকো পিট্, বহত গন্দা বাত্ কি, ক্য করু বোল ? দুনিয়ামে হমরা হ্যয় কন্ ? তোর ভি কাম টা চলিয়ে গেল , হমলোগ খতম ….. উ বাত ছোড় পিয়ারী , আজ ভি উও আয়গা কাম কে বারে তু বাত করিয়ে লিস , উসিকো ট্রাক গাড়ী হে না চলানা পড়েগা ,সোচা থা তুঝকো নাই বতাকে …….আরে রাম রাম ফির তুকে ঝাড়ু সে পিটব । ও তো আচ্ছা বাত আছে , কিউ তু হমকো রুলাবে ? পিয়ারীর হাত ধরে উঠে দাঁড়ায় মগন , ” তুর ইত্তা গুস্সা হমরা আচ্ছা না লাগে , ” তো ক্য করু যব দেখো পিতে রহতে । ঠিক হে তু আজসে হমকো পিলা দো ! বহুদিন পর দু’জন দুজনের দিকে ফিরে চায় , তু কিত্তা দুবলা হো গই , ই কপড়া ভি পুরানা হই গেল…’তু ভি তো এক বুঢ্ঢা নিকলে রে ……. সাক্ষী রেখে বট গাছ বসার বেদী ওরা মিলিত হয় ।

About মল্লিকা রায়

মল্লিকা রায়
আমি মল্লিকা রায় ,উঃ ২৪ পরগণা জেলায় বারাসাত শহরের বাসিন্দা, ছোটবেলা থেকে নিছক আবেগের বশে লেখায় প্রবেশ। পাশে পড়াশুনা,জীবন-যাপন ও বিভিন্ন খ্যাতিমান কবি,সাহিত্যিকদের লেখায় আত্মনিবেদন।দীর্ঘকাল ধরে কিছু ছোট পত্র-পত্রিকায় সৌজন্যমূলক লেখায় আত্ম-প্রকাশ। পারিবারিক প্রেরণার উৎস মা, যার একাংশ জুড়ে আমার তার প্রতি প্রবল আকূতি রয়েছে, বিশেষত লেখার মূল সূত্র বিভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপটে মানুষের নানান প্রভেদ-বিভেদ, ঘাত-প্রতিঘাত প্রভৃতি আমায় লেখণী তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছে। বাংলা কবিতা আসরে প্রবেশ প্রায় ২০১৫ তে, এডমিন এবং অজস্র সহযোগী বন্ধুর সহযোগিতায় এ পর্য়ন্ত পৌঁছানো।

মন্তব্য করুন