দেবীমাতা নাগরাণী – আব্দুল মান্নান মল্লিক

0
47

দেবীমাতা নাগরাণী

আব্দুল মান্নান মল্লিক

দুখিনী মায়ের মূলধন বলতে একটিমাত্র সন্তান দুখন। দেড় বছর বয়সে দুখনকে রেখে বাবা মারা যান। দুখনের মা ছাড়া পৃথিবীতে আপন জন বলতে আর কেউ ছিলনা। মা বিনুকা এ-বাড়ি সে-বাড়ি কাজ করে কোনোরকমে চালে ডালে সংসার চালাত। এইভাবে অনেক কষ্টসহিষ্ণুতায় দুখনকে বড় করে তুলেছে। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে মা বিনুকা ক্ষীণ দেহে আগের মতো কাজও করতে পারে না। অনর্থক ভেবে বিনুকাকে আর কেউ কাজে নিতে চাইনা। সংসার আর চলেনা। এদিক সেদিক করে কোনোদিন হয়ত একবেলা খাবার জুটত, আবার এমন দিন আসত যে, না খেয়েও দিন কেটে যেত। মায়ের প্রাণ, তাই নিজের ভাগের খাবারটা লুকিয়ে রেখে পরে দুখনকে খাইয়ে দিত। দুখন মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই মা বলত, এইতো বাবা, এইমাত্র খেলাম। এইভাবে অতি কষ্টে সংসার চলতে থাকে।
মায়ের এই দুঃখ দুর্দশার কথা ভেবে দুখন মনেমনে ঠিক করলো, কাঠুরিয়া পাড়ার ছেলেদের সঙ্গে জঙ্গলে যাবে কাঠ কাটতে।
জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করলে যে পয়সা পাওয়া যাবে, তাতে আমাদের দুটো পেট বেশ চলে যাবে।
মাকে কিছু না বলে দুখন কাঠুরিয়া পাড়ার ছেলেদেরকে বলল, আগামীতে তোরা যেদিন কাঠ কাটতে যাবি, আমাকে শুদ্ধ সঙ্গে নিস। শুনে ছেলেরা খুব খুশি হল, বলল তুই আমাদের সঙ্গে যাবি? বাঃ তাহলে তো খুব ভালোই হবে।
দুখন বলল কি আর করি ভাই, কিছুতো একটা করতে হবে। তা নাহলে আমরা না খেয়ে মরে যাবো। মা আর খাটতে পারেনা, তাই কেউ কাজেও নিতে চাইনা। আমার মতো ছেলে ঘরে থাকতে মায়ের এই কষ্ট কি করে সহ্য করি বল! ছেলেদের মধ্যে থেকে একজন বলল ঠিক আছে দুখন, তুই কিছু ভাবিস না। তুই ও যাবি আমাদের সঙ্গে । আমরা প্রতিদিন ভোরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়, যত কাঠ সংগ্রহ করি বাজারে বিক্রি করে সন্ধ্যার আগে আগেই বাড়ি ফিরে আসি। তুই শুধু সঙ্গে নিস একটা কুঠার আর রশি তাহলেই হবে।
দুখন বলল ভাইরে, এদিক সেদিক করে হয়ত রশি একটা জোগাড় করতে পারবো, কিন্ত কুঠার কোথায় পাবো ?
একজন বললো, দুখন তুই ভাবিস নারে। আমার বাড়িতে একটা খয়ে যাওয়া কুঠার পড়ে আছে, ওটা দিয়েই কিছুদিন চালিয়ে নে, পরে কাঠ বিক্রি করে একটা ভালোমতো বানিয়ে নিস। আর হাঁ, প্রথমদিন তোকে আমরা ভোরবেলাতে ডেকে নিয়ে যাবো। তারপর থেকে তুই নিজেই চলে আসবি কানাই এর বাড়ির সামনে। আমরা সবাই ওখানেই জমায়েত হয়। তারপর বেরিয়ে পড়ি।
কথা সম্পূর্ণ করে যে যার মতো চলে গেল।
দুখন মনেমনে চিন্তা করতে করতে বাড়ির দিকে পা বাড়াতে থাকে। মা আমাকে একদণ্ড চোখের আড়াল হতে দেয়না, মাকে রাজি করাতে পারব তো? না! যে ভাবেই হোক, মাকে রাজি করাতেই হবে।
মায়ের কাছে প্রস্তাবটা শুরু করব কি করে। ভাবতে ভাবতে দুখন বাড়ি পৌছলে দেখে মা পথ চেয়ে বসে আছে।
দুখন বলল মা, তুমি বুঝি আমার জন্য চিন্তা করছিলে।
মা বলে, কেন করব না বাবা, তুই ছাড়া এ জগতে আমার বলতে আর কে আছে বল?
দুখন বলে মা, তুমি অনর্থক আমার জন্য আর ভেবো না। দেখছ না, আমি এখন কত্ত বড় হয়েছি।
তুমি আর কিচ্ছু ভাববে না। দেখবে এবার থেকে আমাদের আর কোনো দুঃখ থাকবেনা।
ছেলের মুখে হঠাৎ এই কথা শুনে মা হতভম্ব হয়ে বলল, বলছিস কি দুখন।
দুখন বলল হাঁ মা সত্যিই তাই। এইমাত্র কাঠুরিয়া পাড়া থেকে ফিরছি। ওখানকার ছেলেদের সঙ্গে কথাও পাকা করে এসেছি। ওদের সঙ্গে ধন্বন্তরি জঙ্গলে যাব কাঠ কাটতে। জঙ্গল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে যে পয়সা পাবো তাতে আমাদের বেশ চলে যাবে।
বিনুকা কিছু না বলে চুপ থাকে। ভাবতে থাকে একদিকে সংসারের হাল, আর একদিকে ছেলেকে জঙ্গলে পাঠিয়ে ছেলের জীবনকে বাজি ধরা।
টপটপ করে অশ্রু বেয়ে দু ফোটা জল মাটিতে পড়ে। ধীরেধীরে মুখ তুলে ছেলের দিকে চেয়ে বললো, এত অল্প বয়সে তোকে জঙ্গলে ছেড়ে, আমি কি করে নিশ্চিন্তাই বাড়িতে বসে থাকি বল।
দুখন বলল, কাঠুরিয়া পাড়ার ছেলেরা সঙ্গে করে নিয়ে যাবে, দেখবে ভোরবেলাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো, ঠিক সন্ধের আগে আগেই বাড়ি ফিরবো।
কি আর করবে, অভাবের সংসারের কাছে বাধ্য হয়ে বিনুকাকে পরাজয় স্বীকার করতে হল।
দুখন পাশের বাড়ি থেকে একটা রশি জোগাড় করে প্রস্তুত হয়ে গেল।
রাত্রিবেলায় শোবার আগে মায়ের চোখে জল দেখে দুখন বলে মা, তুমি কাঁদছ? হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে বলল, কেঁদো না মা, একদিন না একদিন আমাদের এই দুঃখের অবসান হবেই হবে।
বিনুকা বললো শুয়ে পড় বাবা রাত্রি ঢের হয়েছে। ভোরে আবার উঠতে হবে।
সারা রাত্রি বিনুকার চোখে ঘুম নাই। ভোরে দুখনকে ঘুম থেকে উঠিয়ে দিয়ে বাসি পান্তা যা ছিল খেতে দিল, সঙ্গে দিল খুদের ছাতু আর আঁখের গুড়।
কিছুক্ষণ পরেই কাঠুরিয়া পাড়ার ছেলেরা এসে দুখনকে ডেকে নিয়ে গেল। বিনুকা অপলকে রাস্তার দিকে চেয়ে রইলো। দুখন চোখের আড়াল হলে বিনুকা ছলছল জল চোখে অবসন্ন পদক্ষেপে ঘরে ফিরে।
এক সময় ছেলেরা সব কুঠার আর রশিতে ধন্বন্তরি জঙ্গলে পৌঁছে গেল। সবকিছু দুখনকে শিখিয়ে দিল, আর এও বলে দিল, কাঠ সংগ্রহ করে সবাই আবার এখানেই জমায়েত হবে।
কথামত এক একজন এক একদিকে চলে গেল কাঠ সংগ্রহ করতে।
কুঠার হাতে দুখন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যেতে যেতে এক বিষধর গোখরো সাপ ছোবল মারলো দুখনের পায়ে হাঁটুর নিচে। দুখন বিষের যন্ত্রণায় ছটফট করে আর চিৎকার করতে থাকে। এই গভীর জঙ্গলে কেউ শুনতে পেলনা তার চিৎকার। বিষের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে এক সময় ঢলে পড়লো দুখন মৃত্যুর কোলে।
হেন অবস্থায় কতক্ষণ দুখন ছিল কেউ জানলো না।
চোখ খুলতেই দুখন দেখে, মাথার কাছে বসে আছে এক অপূর্ব সুন্দরি রমণী।
দুখন বলে, কেগো তুমি! দেখোনা আমাকে, এক বিষধর সাপে আমার হাঁটুর নিচে কামড় দিয়েছে। বাড়িতে আমার মা একা, নিজের বলতে আমি ছাড়া তার আর কেউ নাইগো। আমি যদি মরে যায় মাকে দেখার মতো আর কেউ নাই।
দুখনের মুখে দুঃখ দুর্দশা সবকিছু শুনে রমণী বলল, ভয় নাই খোকা আর কোনো ভয় নাই। তুই তো মরেই ছিলি। আমিই তোকে বাঁচিয়েছি। দেখবি সেই সাপ?
কইরে আমার নাগমণি, বলে ডাকতেই আস্ত সেই সাপ সামনে হাজির হল। দুখন চিৎকার করে বলল হাঁগো হাঁ, এইতো সেই সাপ। এই সাপটাই আমাকে কামড়িয়েছে।
রমণী বলল খোকা, তুই যেমন এক মায়ের সন্তান, তেমনি এই নাগমণি ও আমার সন্তান।
তোকে আমি বর দিলাম, আজীবন কাল কোনোদিন আর কোনো সাপ তোকে ছোবল দিবে না। সাপ হবে আজ থেকে তোর হুকুমের গোলাম। যা বলবি সাপ তাই শুনবে।
কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর রমণী আবার বলল, খোকা আমার সাথে যাবি?
দুখন বলল না গো না, জঙ্গল থেকে কাঠ নিয়ে গিয়ে বাজারে বিক্রি করব, তবেই মায়ের মুখে দু-মুঠো অন্ন তুলে দিতে পারবো।
মায়ের প্রতি এত মায়া! শুনে রমণী দুখনের প্রতি খুব তুষ্ট হল।
রমণী নিজের হাত হতে একটি স্বর্ণ মুদ্রিত কঙ্কণ খুলে দুখনের হাতে দিয়ে বলল, এই নে, এটা বাজারে বিক্রি করে যা পয়সা পাবি, তোদের মা ছেলের বহুদিন চলে যাবে।
দুখন বলল তুমি কে গো, তুমি তো আমার কেউ হওনা, তবে এত দামি কঙ্কণ আমাকে দিচ্ছ কেন?
রমণী বলল, ওরে আমি যে তোর আর এক মা। শুধু একবার আমাকে মা বলে ডাক খোকা।
রমণীর কথা শুনে দুখণের চোখে জল এসে গেল।
দুখন আর স্থির থাকতে না পেরে, ছুটে গিয়ে রমণীর গলা জড়িয়ে ধরে মা,মা বলে কান্না করতে থাকে। একটু শান্ত হওয়ার পর রমণী বলল, আজ থেকে আমি তোর নাগরাণী মা।
এই জঙ্গলে আমি মাঝে মাঝে আসি। আমার কথা তোর মাকে ছাড়া কাউকে বলবি না। মন যেদিন চাইবে আমার সঙ্গে দেখা করতে এই জঙ্গলে চলে আসবি। তুই যেদিন আসবি আমি ঠিক বুঝতে পারবো। যদি আসতে যেতে পথ হারিয়ে ফেলিস, আমাকে স্মরণ করবি, দেখতে পাবি একটি স্বর্ণনাগ। সে তোকে পথ চিনিয়ে নিয়ে যাবে আসবে। আর তাছাড়া অদৃশ্য হয়ে আমি সব সময় তোর সঙ্গে আছি। কোনোদিন কেউ তোর ক্ষতি করতে পারবে না।
যা খোকা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যা। বাড়িতে হয়তো তোর মা কান্নাকাটি করবে। কঙ্কণটা সাবধানে রাখিস কিন্তু। রাস্তায় কাউকে দেখাবি না।
নাগরাণী মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে দুখন পথ হাঁটতে শুরু করলো। বেশ কিছুটা পথ অতিক্রম করার পর, দুখন থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। পথ আগলে বসে আছে এক বিশাল বাঘ। দুখন ভয়ে কাঁপতে থাকে আর ভাবতে থাকে, বাড়ি ফিরে হয়তো মায়ের সঙ্গে আর কোনোদিন দেখা হবে না।
দুখন নাগরাণী মাকে স্মরণ করতেই এক বিশাল আকারের ময়াল সাপ এসে বাঘটাকে পেঁচিয়ে ধরে হাড়গোড় মড়মড় করে পিষে দিয়ে জঙ্গলের ভিতর কোথায় হারিয়ে গেল। বাঘ কিছুক্ষণ ছটফট করার পর, মরে পড়ে রইলো। দুখনের বুঝতে আর বাকি রইল না। নাগরাণী মাকে দূর থেকেই শত প্রণাম জানালো।
দুখন আবার পথ হাঁটতে শুরু করে। এদিকে কাঠুরিয়া পাড়ার ছেলেরা দুখনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। আজকেই দুখন নতুন এসেছে জঙ্গলে। তাই সবাই বেশ দুশ্চিন্তা করছিল। দূর থেকে দুখনকে দেখতে পেয়ে সবাই স্বস্তির আশ্বাস পেল।
খালি হাতে দুখনকে আসতে দেখে সবাই অবাক। এতক্ষণ কোথায় ছিল দুখন?
কাছে আসতেই সবাই বলল কিরে দুখন, এত দেরি করে ফিরছিস যে, আবার খালি হাতে। এত বড় জঙ্গলে কোথাও কাঠ খুজে পেলি না?
উত্তরে দুখন বলল, ভাইরে জঙ্গলে বিশাল এক সাপ দেখে ভয়ে কাঠ কাটতে পারিনি, তারপর পথ হারিয়েছিলাম, এদিক সেদিক করে অনেক কষ্টে ফিরে আসছি।
যদিও ছেলেবেলা থেকেই দুখনের মিথ্যা বলার অভ্যাস ছিলনা। নাগরাণী মায়ের কথা রাখতেই দুখন আজ প্রথম মিথ্যা বলল।
দুখন মিথ্যা বলার জন্য মনেমনে বেশ কষ্ট পেল।
আবার ভাবতে থাকে, নাগরাণী মা সবার অলক্ষ্যে থেকে মানুষের উপকার করতে চাই। সে নিজেকে কখনো প্রকাশ করতে চায়না।
তাই-
হেনকালে মিথ্যায়,
দোষের কিছু নাই।
মনেমনে ভেবে দুখন নিজেকে শান্ত করে।
একজন বলল যাজ্ঞে, যা হবার হয়েছে, চল বাজারে কাঠ বিক্রি করে আবার বাড়ি ফিরতে হবে।
দল বেধে সবাই কাঠ বিক্রি করতে বাজারে গেল। দুখনের কাছে কাঠ ছিলনা, তাই দুখন বাড়ি ফিরে এলো।
দূর থেকে মা ছেলেকে দেখতে পেয়ে খুব খুশি হল, সূর্য তখন প্রায় ডুবুডুবু।
মা দুখনকে কাঠ বিক্রির কথা কিছু জিজ্ঞাসা করল না। জঙ্গল থেকে দুখন ফিরে এসেছে এই মায়ের কাছে যথেষ্ট ।
অল্প চারটে খুদ হাঁড়ির তলায় পড়ে ছিল। তাই দিয়ে বিনুকা জাউ রান্না করে রেখেছিল।
দুখন স্নান করে আসতেই বিনুকা দুখনকে খেতে দিল।
রাত্রিতে শুতে যাওয়ার আগে দুখন মায়ের সঙ্গে গল্প করতে করতে বলল, মা আজ তোমাকে অতি মূল্যবান একটি জিনিস দেখাব। কাউকে বল না, বলে দুখন সেই স্বর্ণ মুদ্রিত কঙ্কণ মায়ের হাতে দিয়ে বলল, মা এটার মূল্য অনেক। এটা বিক্রি করলে আমাদের খাওয়া পরার আর অভাব থাকবেনা। মা নির্বাক দুখনের মুখের দিকে চেয়ে রইল।
দুখন বলল অমন করে কি দেখছ মা? এটা দিয়েছে আমার নাগরাণী মা।
বিনুকা অবাক হয়ে বলল , নাগরাণী মা!
দুখন মায়ের কাছে নাগরাণী মায়ের সমস্ত ঘটনা খুলে বলে। শুনে বিনুকা ভীষণ খুশি। মনেমনে ভাবতে থাকে, শুনেছি নাগদ্বীপের দেবীমাতা নাগরাণীর নাম। সেই দেবী নয়তো? বিনুকার মনের সন্দেহ মনেই থেকে গেল। দুখনকে অতশত ভেঙে আর কিছু বলল না।
পরের দিন দুখন স্বর্ণ মুদ্রিত কঙ্কণটি বাজারে বিক্রি করে অনেক টাকা পেল। বিনুকার সংসারে আর অভাব রইল না। সংসার বেশ ভালোই চলতে থাকে।
দুখন দু-চার দিনের মতো, নাগরাণী মায়ের দেশে যাবে মনস্থির করলো। দুখনের মা বাধা দিয়ে বলে, কোথায় তার দেশ, কোথায় পাবি তার দেখা, তার কি ঠিক আছে?
দুখন বলল মা, তুমি অনর্থক চিন্তা করনা। নাগরাণী মা তো সবার অলক্ষ্যে আমার সঙ্গেই আছে।
আমি যদি কোথাও বিপদে পড়ি, নাগরাণী মা আমাকে উদ্ধার করবে।
কি আর করবে, অগত্যা বিনুকা দুখনের কাথায় সাঁই দিল।
সংসারে যাবতীয় যা কিছু মায়ের প্রয়োজনে লাগে, সব কেনাকাটা করে দুখন আবার বেরিয়ে পড়লো নাগরাণী মায়ের উদ্দেশ্যে। এক সময় ধন্বন্তরি জঙ্গলে পৌঁছে গেল। চেনা সেই রাস্তা ধরে চলতে চলতে, সামনে চতুর্দিকে রাস্তা বেরিয়ে গেছে। কোন্ রাস্তা ধরে যাবে দুখন কিছুতেই মনে করতে পারছেনা। বেশ চিন্তাই পড়ে গেল। পরক্ষণেই ভাবল নাগরাণী মায়ের কথা। নাগরাণী মাকে স্মরণ করতেই, উজ্জ্বল সোনালি বর্ণের একটি সাপ এসে দুখনের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। দুখন বুঝে গেল, এ সেই সাপ, যে সাপের কথা নাগরাণী মা বলেছিল।
এরই নাম স্বর্ণনাগ। সাপ আগে আগে চলতে থাকে, দুখনও সাপের পিছন পিছন চলতে থাকে। এক সময় সাপ দুখনকে নাগরাণী মায়ের কাছে পৌঁছে দিল। নাগরাণী মা স্বর্ণনাগকে বুকে তুলে একটি চুমা দিয়ে ছেড়ে দিল। স্বর্ণনাগ আবার জঙ্গলের মধ্যে চলে গেল।
নাগরাণী মা আমার দিকে চেয়ে বলল, আমি জনতাম খোকা তুই আসবি। এবার তাহলে চল আমার সঙ্গে?
কোথায় যাব নাগরাণী মা?
নাগদ্বীপে।
সে কোথায় গো?
চল্ আমার সঙ্গে , দেখ্বি সেখানে নাগমণীরাজ আছে।
দুখন নাগরাণী মায়ের কথায় রাজি হয়ে গেল।
নাগরাণী মা দুখনের চোখে একটি লাল রঙের রুমাল বেঁধে দিতেই দুখনকে জোর একটা ঝাঁকুনি দিয়ে সর্বাঙ্গে কম্পন শুরু হল। কিছুকাল পর কম্পন বন্ধ হয়ে গেল। নাগরাণী মা রুমাল খুলে দিল। কি আশ্চর্য! কোথায় থেকে কোথায় আসলো দুখন, কিছু বুঝতেই পারলো না। যেদিকে তাকাই চোখ ঝলসে যায়। এখানে মণি সেখানে মণি, শুধুই মণি আর মণি। এটাই বুঝি নাগদ্বীপ।
দুখন খুব আনন্দ উপভোগ করে আর ভাবতে থাকে সে যেন আজ এক নুতুন জগতে পদার্পণ করেছে।
দ্বীপটিতে বিশাল বিশাল বিষধর সাপ, তাই বুঝি দ্বীপটির নাম নাগদ্বীপ। বিভিন্ন প্রজাতির সাপের মধ্যে কারও কারও মাথায় মণি জ্বলজ্বল করে চমক দিচ্ছে। সমস্ত সাপ দুখনের চারিপাশ ঘিরে দুখনকে প্রণাম জানাই। কিছুক্ষণ পরে ছুটে আসে এক বিশাল আকারে সাপ। অন্যান্য সাপের সাথে এর যে কতটা পার্থক্য বেশ ভালোভাবে বুঝা যায়। মাথায় এক বড় আকারের মণি,তাকাতেই চোখ ধাঁধানো আভা সূর্য প্রভার মতো ছিটকে আসছে। মণির পিছনে এক নীল চক্র। শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে খেলছে।
তাকে আসতে দেখে অন্যান্য সমস্ত সাপ তার আসার সুবিধা মতো রাস্তা করে দিল।
খুব নম্রতার সাথে এসে দুখনকে প্রণাম জানালো ।
কুণ্ঠাবোধে চুপ হয়ে দুখনের দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মা নাগরাণী বলল, খোকা তোকে যার কথা বলছিলাম, এই হচ্ছে সেই নাগমণীরাজ।
দুখন সমাদরে নাগমণীরাজের প্রণাম গ্রহণ করল।
একটা কালো বর্ণের সাপ, দেখে মনে হয় জল থেকে উঠে আসছে। তার মুখে ছিল একটি গোলাকৃতি ফলবিশেষ। খাদ্যবস্তু বলেই মনে হয়। সেটা নাগরাণী মায়ের হাতে দিল। নাগরাণী মা ফলটি দুখনকে দিয়ে বলল, এই ফলটি ছাড়িয়ে ওর বীজগুলো খেয়ে নে খোকা। বুঝতে পারছি তোর খুব খিদে পেয়েছে।
দুখন মনেমনে ভাবল, আমার যে খিদে পেয়েছে এইটুকু একটা ফলে কি হবে?
নাগরাণী মা বুঝতে পেরে দুখনকে বলল, খোকা তুই ভাবিস না। এই ফল এখানে ছাড়া বিশ্বে আর কোথাও পাওয়া যায়না। ফলটি খেতেও খুব সুস্বাদু। তৃপ্তি সহকারে খাওয়া যায়। একবার খাওয়ার পরে, এক সপ্তাহ অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যায়। আর কিছু খেতে লাগেনা।
নাগরাণী মায়ের কথায় দুখন ফল ছাড়িয়ে
বীজ বার করে খেতে খেতে বলে, সত্যিই নাগরাণী মা, পৃথিবীতে এর আগে আমি কখনো এমন সুস্বাদু কিছু খাইনি।
শুনে নাগরাণী মা বলল, মা মণষা পৃথিবীতে আবির্ভূত হওয়ার পরে, এই নাগদ্বীপটিকে বসবাসের উপযোগী মনে করে বেছে নিয়েছিলেন। এখান থেকেই যেখানে ইচ্ছা পরিভ্রমণ করতেন। মা মণষা দেবীর সুবিধার্থে মাহাদেব এই নাগদ্বীপটিকে এত সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে স্বর্গবাসী দেবী ফুলমতীকে নাগদ্বীপে পাঠানো হয়, নাগদ্বীপের সমস্ত কিছুর পরিচর্যার জন্য।
দুখন বলে নাগরাণী মা, তাহলে এখানে কোথায় দেবীমাতা ফুলমতী?
খোকা আমিই সেই স্বর্গের দেবী ফুলমতী,নাগদ্বীপের দেবী নাগরাণী।
অনেক অনেক অঞ্চলে দেবী নাগরাণী নামেই মূর্তি স্থাপন করে আমার নামে ঘোঁট করে পূজা হয়। দিনেদিনে দিকে দিকে আজও প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
নাগরাণী মায়ের কাছে বিভিন্ন রকম অলৌকিক কাহিনী কথা শুনতে শুনতে দিন তিনেক কেটে গেল। দুখনকে এবার বাড়ি ফিরতে হবে। মাকে বাড়িতে একা ছেড়ে এসেছে।
নাগরাণী মা দুখনের মনোবাঞ্ছা বুঝতে পেরে দুখনের বাড়ি ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে লাগলো।
দুখনের হাতে তিনটে মণি দিয়ে বললো, এই উজ্জ্বল সবুজ মণিটা বাজারে বিক্রি করে দিবি। এটার নাম ঐশ্বর্য মণি। এর মূল্য অনেক। সাত রাজার ধন সম। তুই বিশাল ধনসম্পত্তির মালিক ও মানসম্মানের অধিকারী হবি। তোর কথার কেউ অজর আপত্তি করবেনা। যাকে যেটা বলবি, সে তাই করবে।
উজ্জ্বল সোনালি মণির কাজ হল ব্যাধিগ্রস্ত কাউকে স্পর্শ করলে সম্পূর্ণ রোগ নিরাময় হয়ে যাবে। এটার নাম মুক্তোমণি।
আর এই যে মণিটা দেখছিস খোকা, এর নাম জোহরচোরা। এর কাজ হল সাপে কাটা মৃতকে বাঁচিয়ে তুলবে। তবে কিছু বিধিনিয়ম আছে। এই মণিটা শ্বেতপাথরে ঘর্ষণ দিলেই যে সাপে কেটেছে, সেই সাপ যেখানেই থাকুক, সে ছুটে এসে নিজের বিষ নিজেই তুলে নিয়ে ফিরে যাবে। সাবধান, ওই সাপকে যদি নিরাপদে ফিরে যেতে কেউ বাধা দেয়, সে ও তার বংশধর ভীষণ বিপদ সম্মুখীন হবে।
আর হাঁ খোকা, এই মুক্তো আর জোহরচোরা এই দুটো মণিই একমাত্র তোর হাতে ছাড়া অন্যের হাতে কোনো কাজ করবে না।
নাগরাণী মা দুখনকে সবকিছু শিখিয়ে দিয়ে সেই লাল রুমালটা আবার দুখনের চোখে বেঁধে দিল। কিছুক্ষণ পর রুমাল খুলে দিতেই দুখন দেখে ধন্বন্তরি জঙ্গলে পৌছে গেছে। নাগরাণী মা তখনও সঙ্গেই ছিল। নাগরাণী মা বলল, খোকা যখন মন চাইবে আমার সঙ্গে দেখা করতে আমাকে স্মরণ করবি, আমি যেখানেই থাকি না কেন সঙ্গে সঙ্গে তোর কাছে পৌছে যাবো।
দুখন নাগরাণী মায়ের গলা জড়িয়ে কান্নাকাটির পর অবশেষে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল।
এক সময় দুখন বাড়ি পৌঁছিয়ে দেখে,মায়ের চোখে জল। দুখন হাত দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে, মা আর কেঁদোনা, তোমাকে ছেড়ে আর আমি কোনোদিন কোত্থাও যাবনা। শুনে মা শান্ত হল।
মায়ের কাছ ছাড়া হয়ে ছিল কিনা, তাই দুখন মা যেখানে যায় পিছন ছাড়েনা।
মায়ের কাছে নাগরাণী মায়ের গল্প দুখনের সারা রাত্রিতেও ফুরাতে চাইনা। ছেলের মুখে সব শুনে বিনুকার আর বুঝতে বাকি রইলো না। ভাবতে থাকে, তাহলে সত্যিই আমাদের উপর স্বয়ং নাগদ্বীপের দেবী মায়ের দয়া পড়েছে।
পরের দিন দুখন বেরিয়ে পড়ে ঐশ্বর্য মণি বিক্রি করতে। দুই-তিনদিন ঘোরাঘুরি করেও বিক্রি করতে না পেরে নিরাশ হয়ে ফিরে আসে। কারণ, এই মণির ন্যায্য মূল্য দিয়ে ক্রয় করার মতো সমর্থ কারও ছিলনা। এমন কি অর্ধেক মূল্যেও না। দুখনের কাছে এই মহামূল্যবান ঐশ্বর্য মণির খবর চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
কেশরধামের রাজা ছিলেন ঋষিকাঞ্চন। তিনি সুখের রাজত্বে রাজত্ব করতেন। আজ পর্যন্ত কেউ দুঃখের অভিযোগ নিয়ে রাজার কাছে নালিশ জানাই নি।
পরস্পরের মাধ্যমে ঐশ্বর্য মণির কথাটা এই রাজার কানে পৌছয়।
রাজা ঋষিকাঞ্চন শ্বেত হস্তির পিঠে চেপে খোজে খোজে দুখনের কাছে উপস্থিত হয়। শ্বেত হস্তির পিঠের উপর রাজবেশে বসে এক মহাপুরুষ, পিছনে ঘোড়ায় চেপে অনেক লোকলস্কর দেখে দুখন ভয় পেয়ে নির্বাক দাঁড়িয়ে।
রাজা ঋষিকাঞ্চন নম্রতায় ধীরে ধীরে শ্বেত হস্তির পিঠ থেকে নেমে দুখনকে জিজ্ঞাসা করে, তুমিই কি বিনুকা পুত্র দুখন?
হাঁ, আমিই সেই দুখন।
রাজা ঋষিকাঞ্চন নিজের পরিচয় দিয়ে দুখনকে বলল, হে ভাগ্যবান বালক আজ আমি তোমার কাছে ভিক্ষার হাত বাড়িয়ে বড় আশা নিয়ে তোমার কাছে উপনীত হয়েছি। নিরাশ করে ফিরিয়ে দিওনা।
অমন করে লজ্জা দিবেন না মহারাজ। বলুন আপনার জন্য আমি কি করতে পারি?
ওহে বালক, আমি জানি তোমার কাছে সাত রাজার ধন, মহা মূল্যবান ঐশ্বর্য মণি আছে। ওটা কি বিক্রি করতে চাও?
এক কথায় দুখন রাজি হয়ে যায়। রাজা বললেন, এর ন্যায্য মূল্য দেওয়ার মতো সমর্থ আমার নাই। তাই আমি আমার রাজত্বের এক তৃতীয়াংশ দিয়ে ঐশ্বর্য মণিটা ক্রয় করতে চাই।
এক মণির এত দাম! শুনে দুখন একেবারে থ! কোনোরকমে নিজেকে সামাল দিয়ে রাজাকে বলল, মহারাজ আপনার কথায় আমি একমত, তবে আমারও তো আপনার কাছে কিছু চাওয়ার থাকতে পারে? বল বালক শীঘ্র বল, আর কি চাও তুমি?
দুখন বলে, ওই মণি আমাকে মা নাগরাণী দিয়েছে, তাই আমি চাই বেশ জাঁকজমক করে দেবীমাতা নাগরাণীর পূজা প্রচলন করতে।
রাজা ঋষিকাঞ্চন শুনে খুব খুশি হলেন।
রাজা তার রাজত্বের এক তৃতীয়াংশ রাজত্ব দুখনের নামে দস্তখত করে দিয়ে ঐশ্বর্য মণি হস্তান্তর করে নিয়ে চলে গেলেন।
রাজা ঋষিকাঞ্চন কথামত কেশরধামে প্রতি বছর বেশ জাঁকজমক করে দেবীমাতা নাগরাণীর পূজা উৎসব পালন করেন।
দুখন এখন প্রচুর ধনসম্পদ ও প্রতিপত্তির মালিক। অনেক অনেক জায়গাতে দেবীমাতা নাগরাণীর নামে পূজা মণ্ডপ তৈরি করেছে এই দুখন। অনেক দূরদূরান্ত থেকে রুগী আসে দুখনের কাছে ও সুস্থ হয়ে তারা বাড়ি ফিরে যায়। প্রচুর সাপে কাটা মৃতকে দুখন জীবন দান করেছে । তার মূল্যস্বরূপ তারা দেবীমাতা নাগরাণীর পূজা উৎসব পালন করে আসছে।
সেই থেকে আজও জাঁকজমক সহকারে দেবীমাতা নাগরাণীর পূজা উৎসব প্রচলন হয়ে আসছে। ক্রমে ক্রমে আজও প্রসার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
( জয় দেবীমাতা নাগরাণীর জয় )
[ বিশেষ দ্রষ্টব্য : গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক অবলম্বনে লিখা ]