(০১)
চাচার জ্বালানি তত্ত্ব
-বিচিত্র কুমার
আমাদের গ্রামের সবচেয়ে অদ্ভুত মানুষ যদি কাউকে বলতে হয়, তবে সে নিঃসন্দেহে আমার চাচা—আব্দুল কাদের। তার জীবনের একটাই লক্ষ্য—যেভাবেই হোক জ্বালানি খরচ কমানো!
চাচা এমন একজন মানুষ, যিনি এক কিলোমিটার দূরে গেলে মনে করেন যেন তিনি আন্তর্জাতিক সফরে যাচ্ছেন। তাই তিনি সবকিছুতেই হিসাব করেন—তেল, গ্যাস, এমনকি হাঁটার শক্তিও!
একদিন বিকেলে আমি তার বাড়িতে গেলাম। দেখি, চাচা মাটিতে পাটি পেতে বসে একটা পুরনো খাতায় অঙ্ক কষছেন। পাশে ক্যালকুলেটর, আর মুখে গভীর চিন্তার ছাপ।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—“চাচা, কী হিসাব করছেন এত?”
চাচা গম্ভীর হয়ে বললেন,
—“জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছি—বিয়ে করব!”
আমি তো চমকে উঠলাম!
—“এই বয়সে?”
চাচা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বললেন,
—“বয়স না, বুদ্ধি বড় কথা। আমি হিসাব করে দেখেছি, বিয়ে করলে আমার জ্বালানি খরচ কমবে।”
আমি কৌতূহলী হয়ে বললাম,
—“বিয়ে করলে আবার জ্বালানি কমবে কীভাবে?”
চাচা খাতাটা সামনে এনে দেখালেন। বড় বড় করে লেখা—
‘চাচার জ্বালানি তত্ত্ব’
তিনি ব্যাখ্যা শুরু করলেন—
—“দেখ, যদি দূরের মেয়েকে বিয়ে করি, তাহলে বারবার যেতে হবে—শ্বশুরবাড়ি, বেড়ানো, খোঁজখবর—সব মিলিয়ে তেলের অপচয়! কিন্তু যদি নিজের এলাকাতেই বিয়ে করি, তাহলে হেঁটেই যাওয়া-আসা করা যাবে!”
আমি হাসি চেপে বললাম,
—“তাহলে প্রেম নয়, আপনার লক্ষ্য জ্বালানি সাশ্রয়?”
চাচা গর্ব করে বললেন,
—“ঠিক ধরেছিস! প্রেম পরে হবে, আগে সাশ্রয়!”
তারপর শুরু হলো চাচার বউ খোঁজার অভিযান। তবে শর্ত একটাই—
মেয়ে অবশ্যই কাছাকাছি থাকতে হবে!
চাচা বাড়ি বাড়ি ঘুরে প্রস্তাব দিতে লাগলেন।
এক বাড়িতে গিয়ে বললেন,
—“আপনার মেয়ে ভালো, কিন্তু আপনার বাড়ি ৬০০ মিটার দূরে। এত দূর গেলে আমার স্যান্ডেল ক্ষয় হবে!”
আরেক বাড়িতে গিয়ে বললেন,
—“মেয়ে সুন্দর, কিন্তু মাঝখানে কাঁচা রাস্তা—বর্ষায় কাদা হবে, হাঁটা কষ্টকর—এটা চলবে না!”
শেষমেশ পাশের বাড়ির রোকেয়াকে পছন্দ হলো। দূরত্ব মাত্র ৫০ মিটার!
চাচা খুশিতে ঘোষণা দিলেন,
—“এই বিয়েটাই চূড়ান্ত! বছরে অন্তত ১০ লিটার তেল বাঁচবে!”
বিয়ের দিনেও চাচার হিসাব বন্ধ হয়নি।
বরযাত্রী নেই—কারণ “অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত”।
গাড়ি নেই—কারণ “তেলের অপচয়”।
চাচা নিজেই হেঁটে গিয়ে বিয়ে করে এলেন!
বিয়ের পর কয়েকদিন সব ঠিকঠাকই চলছিল।
একদিন আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—“চাচা, আপনার জ্বালানি তত্ত্ব কেমন কাজ করছে?”
চাচা একটু চিন্তিত মুখে বললেন,
—“একটু সমস্যা হয়েছে…”
—“কী সমস্যা?”
চাচা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—“তোর চাচি রোজ তার মায়ের বাড়ি যায়—আর আমাকে সাথে নিয়ে যেতে হয়! এখন আগের চেয়ে বেশি হাঁটতে হচ্ছে!”
আমি আর হাসি থামাতে পারলাম না।
চাচার জ্বালানি তত্ত্ব শেষমেশ তাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করাল, যেখানে তেল না খরচ হলেও—পায়ের জ্বালানি দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে!
(০২)
ফ্যানের নিচে জীবন সংগ্রাম
-বিচিত্র কুমার
প্রচণ্ড গরমে আমাদের গ্রামের অবস্থা এমন যে, ঘরবাড়ি যেন চুলার ওপর বসানো হাঁড়ি! বাইরে বের হলে মনে হয় সূর্য সরাসরি মাথার ওপর বসে আছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের বাড়ির একমাত্র ভরসা হলো ছাদের পুরনো ফ্যান—“বাতাস বাবু”।
বাতাস বাবু খুবই মেজাজি। কখনো দ্রুত ঘোরে, আবার কখনো ধীরে ধীরে এমনভাবে ঘোরে যেন সে নিজেই ক্লান্ত। কিন্তু এই গরমে সে-ই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।
একদিন দুপুরে আমি ফ্যানের নিচে শুয়ে আছি, শরীর ঘামে ভিজে একাকার। হঠাৎ বুঝতে পারলাম ফ্যানের স্পিড কমে গেছে। বাতাসও যেন আর ঠিকমতো আসছে না। আমি চারদিকে তাকিয়ে রিমোট খুঁজতে লাগলাম।
কিন্তু রিমোট কোথাও নেই।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম,
—“রিমোটটা কে নিয়েছে?”
ছোট ভাই দৌড়ে এসে বলল,
—“আমি নেইনি!”
ঠিক তখনই চাচা এসে গম্ভীরভাবে বললেন,
—“রিমোট চুরি হয় না, এটা লুকিয়ে যায়।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
—“কিন্তু লুকালো কে?”
চাচা একটু থেমে রহস্যময় ভঙ্গিতে বললেন,
—“এই বাড়িতে একটা অদৃশ্য শক্তি কাজ করে…”
আমরা দুই ভাই ভয় পেয়ে গেলাম। হঠাৎ আমার চোখ পড়ল চাচার দিকে। দেখি, তার হাতের নিচে কিছু একটা লুকানো!
আমি বললাম,
—“চাচা, হাতটা একটু তুলবেন?”
চাচা হাত তুলতেই দেখা গেল—রিমোট!
চাচা একটু লজ্জা পেয়ে বললেন,
—“আমি এটা পাহারা দিচ্ছিলাম।”
আমি রিমোট নিয়ে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিলাম। ফ্যান জোরে ঘুরতে শুরু করল—“ঘুউউউর…”। ঠান্ডা বাতাসে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ ফ্যান থেমে গেল।
একটি “ঠক” শব্দ হলো।
আমরা তিনজন একসাথে চিৎকার করে উঠলাম।
চাচা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,
—“এটা ফ্যানের প্রতিবাদ!”
আমি অবাক হয়ে বললাম,
—“প্রতিবাদ মানে কী?”
চাচা গম্ভীরভাবে বললেন,
—“তুই হঠাৎ ফুল স্পিডে চালিয়েছিস, ফ্যান হয়তো বলছে—‘আমি কি রোবট?’”
ছোট ভাই জিজ্ঞেস করল,
—“এখন কী করা যায়?”
চাচা বললেন,
—“রিসেট করতে হবে!”
বলেই ফ্যানের সুইচ অফ করে আবার অন করলেন। ফ্যান আবার ধীরে ধীরে ঘুরতে শুরু করল। চাচা গর্ব করে বললেন,
—“দেখলি? আমি সমস্যা সমাধান করে দিলাম!”
ঠিক তখনই আবার বিদ্যুৎ চলে গেল। পুরো ঘর অন্ধকার হয়ে গেল। গরমে আমরা তিনজন হাঁপাতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর বিদ্যুৎ ফিরে এলো। ফ্যান আবার ঘুরতে শুরু করল। ঠান্ডা বাতাসে আমরা সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম।
চাচা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে আবেগ নিয়ে বললেন,
—“এই ফ্যানই আমাদের আসল বন্ধু।”
সেদিন আমরা বুঝতে পারলাম—এই তীব্র গরমে ফ্যান শুধু একটি যন্ত্র নয়, বরং আমাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী।
নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ
মোবাইলঃ 01739872753
https://www.facebook.com/profile.php?id=100014642137028&mibextid=ZbWKwL