Skip to content

তিনটি অণুগল্প- বিচিত্র কুমার

(০১)
হেমন্তী ও রহস্যময় আয়না
-বিচিত্র কুমার

হেমন্তের বিকেলে সূর্য ডুবে যাচ্ছিল ধানের সোনালি গায়ে। হেমন্তী একা বসে ছিলো পুরোনো বাড়ির বারান্দায়—বাড়িটা তার দিদার ফেলে যাওয়া। ধুলো জমা ঘরে একদিন সে খুঁজে পেল এক অদ্ভুত আয়না—চৌকো, কালো কাঠের ফ্রেমে বাঁধানো, মাঝখানে হালকা নীল আলো যেন ঘুমিয়ে আছে।

প্রথম দিন সে মুখ দেখেছিল আয়নায়—কিন্তু প্রতিচ্ছবিতে নিজের মুখের পাশে দেখা গেল এক ছেলের মুখ। অচেনা, অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত মনে হয়। ছেলেটি নরম স্বরে বলেছিল, “তুমি কি এখনো আমাকে ভুলোনি, হেমন্তী?” ভয় আর কৌতূহল মিশে হেমন্তী চুপ করে গিয়েছিল।

প্রতিদিন বিকেলে সে আয়নার সামনে বসত। ছেলেটির নাম ছিল মেঘনাদ। সে বলত, সে এক হারানো সময়ের মানুষ—হেমন্তীর দিদার যৌবনের আঁধারে তার প্রেমিক ছিল। এক অসমাপ্ত ভালোবাসা আয়নার মধ্যে বন্দি হয়ে আছে যুগের পর যুগ।

একদিন হেমন্তী সাহস করে বলল, “যদি সত্যিই ভালোবাসো, তবে এসো এই জীবনে।” আয়নার ভেতর হালকা কুয়াশা ভেসে উঠল, ধানের মাঠের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল ঘরে। চোখ খুলে দেখে, আয়নাটা ফাঁকা—আর জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে এক মানুষ, ঠিক সেই মুখ, যাকে সে প্রতিদিন আয়নায় দেখত।

হেমন্তী থরথর হাতে বলল, “তুমি তো গল্পের মানুষ ছিলে…”
মেঘনাদ মৃদু হাসল, “ভালোবাসা কখনো কল্পনা থাকে না, হেমন্তী—যে মন ডাক দেয়, সময়ের দেয়ালও ভেঙে আসে।”

বাইরে হেমন্তের বাতাস বইছে—ধানের গন্ধে, প্রেমের গোপন জাদুতে—আর আয়নাটা নিঃশব্দে ঝলমল করছে, যেন এখনো কারো অপেক্ষায় আছে।

(০২)
ছায়ার রাজ্যের রাজপুত্র
-বিচিত্র কুমার

রাতের শেষ প্রহর। নিস্তব্ধ জঙ্গলের মধ্যে একাকী দাঁড়িয়ে আছে এক কুয়াশায় ঢাকা প্রাসাদ—যেখানে আলো পৌঁছায় না, শুধু ছায়ারা বসবাস করে। সেই প্রাসাদের রাজপুত্র—আরিয়ন। কেউ তাকে চোখে দেখে না, কেবল তার ছায়া দেখা যায় ঝাপসা চাঁদের আলোয়।

মানুষ বলে, আরিয়ন আসলে মৃত। কিন্তু প্রতি পূর্ণিমার রাতে সে জেগে ওঠে, ছায়াদের নিয়ে রাজ্য ঘুরে বেড়ায়, খুঁজে বেড়ায় তার হারানো আত্মা। বহু বছর আগে, এক জাদুকর তার জীবন আর ছায়া আলাদা করে দিয়েছিল—অমরত্বের বিনিময়ে। কিন্তু সে বুঝতে পারেনি, অমর ছায়ারাও নিঃসঙ্গ হয়।

একদিন এক মানবী এল প্রাসাদের দোরগোড়ায়। তার নাম এলারা। সে বলল, “আমি তোমার ছায়াকে দেখেছি নদীর জলে। সে কাঁদছিল।” আরিয়ন বিস্ময়ে তাকাল। কেউ আগে তার ছায়াকে দেখেছে—এমন কখনও হয়নি।

এলারা বলল, “আমি চাই তোমাকে ফিরিয়ে আনতে আলোয়।”
আরিয়ন নরম স্বরে বলল, “তাহলে তোমাকেও আলো ছেড়ে ছায়ায় নামতে হবে।”

পরের ভোরে প্রাসাদের দরজা খুলে দেখা গেল—কুয়াশা মিলিয়ে গেছে। প্রাসাদটা ফাঁকা, শুধু দেয়ালে দুটি ছায়া একে অপরকে আঁকড়ে আছে।

লোকজন বলে, সেদিন থেকে “ছায়ার রাজ্যে” রাজপুত্র আরিয়নের কোনো হাহাকার নেই। কেবল প্রতি রাতে চাঁদের আলোয় দুটি ছায়া পাশাপাশি হাঁটে—একটা পুরুষের, একটা নারীর—যারা একে অপরের আলো আর অন্ধকারে হারিয়ে গিয়ে চিরন্তন হয়েছে।

(০৩)
চাঁদের রাজ্যের গোপন সিঁড়ি
-বিচিত্র কুমার

রাতের আকাশে সেদিন হঠাৎ এক অদ্ভুত আলো জ্বলে উঠেছিল। রৌদ্র নয়, চাঁদের নয়—কোনো অচেনা দীপ্তি। গ্রামটির নাম শান্তিপুর, কিন্তু সে রাতে শান্তি হারিয়ে ফেলেছিল গ্রামের এক কিশোরী—ঋতু।

ঋতুর ঘরের পেছনে পুরোনো কুয়ো, যেখানে কেউ যায় না। লোকজন বলে, সেখানে চাঁদের ছায়া পড়ে না কখনো। কিন্তু সেদিন কুয়োর তলায় যেন রুপোলি আলো নাচছিল। কৌতূহল দমন করতে না পেরে ঋতু কুয়োর ধারে গিয়ে তাকাতেই দেখল—আলোর ভেতর সিঁড়ি নেমে গেছে নিচের দিকে, অন্ধকার নয়, বরং আলোকময় গভীরতার দিকে।

সে নামল। প্রতিটি ধাপ যেন নরম চাঁদের ধূলিকণায় মোড়া। নিচে পৌঁছে ঋতু বিস্ময়ে হাঁ করে দেখল—এক রাজ্য! রুপালি নদী, নীলাভ গাছ, আর নক্ষত্রবীথিতে নাচছে সাদা পাখা-মানবেরা। এক রাজকন্যা তার দিকে এগিয়ে এলো। মুখে মৃদু হাসি—“তুমি সেই, যাকে আমরা অপেক্ষা করছিলাম। শত বছরে একবার পৃথিবী থেকে একজন আসে আমাদের গোপন সিঁড়ি বেয়ে।”

ঋতু জানতে পারল, চাঁদের রাজ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের ভুলে যাওয়া স্বপ্নের কারণে। রাজকন্যা তার হাতে দিল এক ছোট্ট পাথর—চাঁদের হৃদয়। “এটা পৃথিবীতে রেখে দিও, যেখানে কেউ এখনো স্বপ্ন দেখতে জানে,” বলেই রাজ্যটি মুছে যেতে লাগল রুপোলি কুয়াশায়।

চোখ খুলে ঋতু দেখল সে নিজের ঘরে, ভোরের আলো জানালায়। হাতের মুঠোয় সেই পাথরটা এখনো ঝলমল করছে—চাঁদের মতো নিঃশব্দে, স্বপ্নের মতো অমোচনীয়।

নামঃ বিচিত্র কুমার
গ্রামঃ খিহালী পশ্চিম পাড়া
পোস্টঃ আলতাফনগর
থানাঃ দুপচাঁচিয়া
জেলাঃ বগুড়া
দেশঃ বাংলাদেশ
মোবাইলঃ 01739872753

https://www.facebook.com/profile.php?id=100014642137028&mibextid=ZbWKwL

মন্তব্য করুন