চরিত্রান্তর – পর্ব ১ – জয়ন্ত সেন

8
37

তখনো ত্রিশার প্রানটা বেরইনি, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে । মাথার পেছন থেকে রক্ত গড়িয়ে মাটিতে মিশছে । ত্রিশার হাত দুটো দু-পাশে ছড়িয়ে । মুখ দিয়ে অস্ফুটে গোগানির শ্বব্দ বেরোচ্ছে, অসহ্য যন্ত্রনায় । শরীরটা থর-থর করে কাঁপছে । ছল্ছলে দুটো চোখ কালচে নীল তারা মাখা আকাশের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু কিছু নজরে আসছে না ওর । শুধু কানে শুনতে পাচ্ছে একটা আট বছরের ফ্রক পরা মেয়ের “মা মা “ করা আর্তনাদ । ফাকা ঘরে সেই আর্তনাদ সারা ঘরময় ঘুরে বেড়ায়, হয়তো আজও । সেই বাচ্চা মেয়েটার মা সিড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়েছে, রক্তার্ত তার শরীরও । তার মেয়ে সেই ছোট্ট-বেলার ত্রিশা ডাকছে কখন থেকে । সেই মা আর সাড়া দেয়নি ।
ত্রিশার মা মারা যাওয়ার কয়েকমাসের মধ্যেই বাড়িতে ত্রিশার নতুন মা এলো । আর এক বছরের মাথায় নতুন মায়ের কোলে ত্রিশার ভাই ।
সময় বয়ে যায় সময়ের মতোই । সময়ের স্বভাব তাই । পরিবর্তন, সময়ের ওটাই গড়িমা । সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয় সবকিছুরই । বয়স, চরিত্র, বিজ্ঞান । বয়স বেড়ে ফ্রক ছেড়ে ত্রিশা তখন সালোয়ার কামিজে । কিন্তু সেই বাড়তি বয়সের অভিজ্ঞতা শুধু তার মনের বিতিস্নাই বাড়িয়েছে । নতুন মা কোনদিনই তাকে স্কুলের জন্য টিফিন বাক্স ব্যাগে ভরে দিতো না, চুলে ফিতে বেঁধে দিতো না । স্কুল শেষে বাড়ি ফেরত মেয়েকে খাবার বার করে দিতো না । কখনও মন অস্থির হলে বুকের কাছে টেনে নিতো না ।
দিনের পর দিন ত্রিশা কখনো বুকে বালিশ চেপে, কখনো বাথরুমের জলের শব্দের আড়ালে নালিশ জমিয়ে এসেছে । সামান্য স্নেহ ভালবাসা, যেসব স্কুলের পাড়ার বাকি মেয়েদেরকে পেয়ে আসতে দেখেছে সেসব থেকে সেই কেনো বঞ্চিত রইলো । ভাইয়েরও তো সব আবদার পুরন হয়।
ত্রিশা বুঝেছে, সবাই নিজের কথাই চিন্তা করে । পিসি ত্রিশাকে মাঝেমধ্যে ঘুরতে নিয়ে যায়, কখনো নন্দন কখনো স্বভূমি । কেন ? অন্যান্য পুরুষদের সাথে সময় কাটানোর জন্য । ত্রিশা তো শুধুমাত্র অজুহাত মাত্র ।

সুতো-সেলাইয়ের কারবারকেই সাধারনত হুঁশিয়ারীর ব্যবসা বলা হয়ে থাকে। এক সময়ে বেশ ভালো রমরমা ছিল। তা সে কারবারে এখন অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রচুর আধুনিকতা চলে এসেছে। বন্ধ হয়েছে প্রচুর কারখানাও। ত্রিশার বাবার কারখানাটাও খুব একটা চলে না। ধার-বাকি অনেক হয়েগেছে। আর্থিক সংশয় বেশ ভালো মতো প্রভাব ফেলেছে তাদের সংসারে। ত্রিশাকে এসব কথা না জানালেও ত্রিশা বোঝে । বউয়ের কথা শুনে বাবা মারধোর করে মেয়েকে, যাতে রাতে বউয়ের পাশে শুতে পারে, কোনো মহাজন টাকার তাগাদা করতে আসলে বাড়তি বয়সি মেয়েকে সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে ‘বাবা বাড়ি নেই বলে দে’। আর মহাজন মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে, গাল টেপার বাহানায় বুকের কাছটা ছুঁয়ে ‘অমুক এসেছিল বলেদিস’ বলে ফিরে যায় । ত্রিশা সবই বোঝে । কাকিমা দেখাশোনা করে, যতটুকু আদর-যত্ন পায়, কাকিমার কাছেই। নিশ্চই তারও কোন স্বার্থ আছে । সবাই নিজের ভালো লাগাটা বুঝে নেয় । না পাওয়া গুলোকে নানা উপায়ে হাসিল করে । নয়তো বিকল্প কোন পথ বেছে নেয় । সুচিস্মিতা, ত্রিশার বাল্যবন্ধু । ওর বাবা নেই , মদের নেশা গিলে খেয়েছে । বড় একটা পুরোনো ফাটল ধরা বাড়িতে শুধু দুইজন মানুষ্ থাকে । মা আর মেয়ে । সংসারে অভাব । তাই হয়তো সত্তর দশকের হিপিনীদের মতো সুচিস্মিতা একাধিক পুরুষদের সাথে সম্পর্ক রেখে আর শরীরী ছোঁয়াছুয়ির বিনিময়ে নতুন নতুন দামী দামী মেকাপ কিট থেকে টপ, জীনস, ব্যাগ, জুতো, লেটেস্ট মোবাইল হাতিয়ে গটগট করে পারি দেয় শপিং-মলে । ডিনার সাড়ে বড় বড় রেস্টুরেন্টে । সেখানেই তার সুখ, তার সবকিছু পাওয়া ।
কথায় আছে, লোভে পাপ আর পাপে মৃত্যু । তাহলে কি যারা লোভ করে না তাদের মৃত্যু নেই ! লোভতো সবারই আছে । কেউ ভালো ভালো খাবো, কেউ ভালো ভালো পোশাক পরবো, কেউ আবার দূর পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে যাওয়ার অথবা নীল সাগরের তলার শান্ত দুনিয়ার রহস্যভেদের লোভ পোষে । আসলে লোভ না হলে সফল হওয়া যায় না । সফল মানুষকে কেউ ঘাটাতে চায় না । তাকে সবাই সমিহ করে, সে কি পথে সফল সেসব দেকতে যায় না কেউ আর ।
ডানলপের কোন এক হোটেলে এক সন্ধ্যেবেলায় পুলিশী হানায় ত্রিশার পিসি ধরা পরেছিলো পরপুরুষের সাথে নগ্ন অবস্থায় । সাড়া পাড়ায় ছি ছি পরে গেলো । নোংরা, চরিত্রহীন মহিলা আরো কতো কি । অপমান সহ্য না করতে পেরে স্বামী গলায় দড়ি দেয় । কারোর কিছু এলোগেলনা । কয়েকদিন বাদ সেই মহিলাই এক রাজনৈতিক দলের নেত্রী হয়ে চেয়ারে বসলো যখন সব যেনো হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল তার পায়ের নীচে । যারা যারা একসময় ছ্যা-ছ্যা করেছিল তারাই আজ আসুন ম্যাডাম বসুন ম্যাডাম করতে হাপায় না । জীবনে সফল ব্যাক্তি সূর্যের মতো, সবাই প্রনাম জানায় ।

মরণের আগে নাকি চোখের সামনে দিয়ে জীবনটা একবার ঘুরে যায়, ভালো-খারাপ, দোষ-গুণ মুহুর্তে নিজের বিবেকের কাছে প্রশ্ন-জবাবদিহীর খেলা হয়ে যায় । আমারও একবার মরণ এসেছিলো, আমিও দেখেছি ফ্ল্যাস-ব্যাকে আমার অতীতটাকে ।
অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে, ত্রিশা তখন দুইহাত সামনের দিকে তুলে বৃষ্টি ধরায় ব্যস্ত । সারা শরীর ভিজে, উজ্জল রং, বড় বড় চোখ, মুক্তর মত হাসি, উন্নত স্তন, যৌবনের ধারায় তখন পরিপূর্ণ । আকাশে মেঘ গর্জে উঠলো প্রচন্ড জোরে । ত্রিশা ভয়ে আমায় জড়িয়ে ধরলো । বুকের মধ্যে মাথা রেখে সেঁধিয়ে গেলো । আমি আরো আঁকড়ে ধরলাম, কন্ঠহার ছাড়া ত্রিশার সাড়া শরীর কতো নরম । ঠোঁটে ঠোঁট রেখে আশ্বস্ত করলাম ‘ভয় পেও না, আমি আছি তোমার সাথে, তোমার পাশে, সবসময়, সারাজীবন ।’
আমার বাবা একদিন বাড়ি থেকে বেরোলো, আর ফিরলো না । মা ছোটো বোনটাকে আমার কাছে রেখে সেলাইয়ের কারখানায় কাজ করতে যেত । বাস্তবটাকে সেইসময় থেকেই বাস্তবের মত করেই দেকতে শিখে গেছিলাম । বাস্তবটা আসলে খোলা নগ্ন বইয়ের খোলাম্কুচির মত উড়তে থাকা পাতা । যে যতোটা পার নিয়ে নাও । আর চিনতে শিখেছিলাম ছোটবেলায় শোনা রূপকথার গল্প গুলোর মাঝে বাস্তবের তফাৎ । রূপকথায় খিদিরপুর, সল্টলেক, সি.আর.এভিনিউ পায়ে হাটা পথ নেই । রাস্তার ধারে সস্তার হোটেলে যখন কোনো কর্মচারী বেলাশেষে বেঁচে যাওয়া ভাত আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিতে যায় তাকে কেউ বাধা দিয়ে বলে না, ‘ফেলেই যখন দিচ্ছো, আমায় দিয়ে দাও, বাড়িতে দুটো বাচ্চা আছে ।
সময় বদ্লে যায় তার নিজের মতই, আর সময়ের সাথে বদ্লে যায় সবকিছুই । সময় কখনো আমাদের সাথে চলে, কখনো বিপরীতে । ভালো থেকে খারাপ, খারাপ থেকে ভালো হওয়া, এসবই সময়চক্রের এক একটা অধ্যায় । একটা অন্ধকার ঘরে তিনটে প্রানের সংসারের দিনআনা দিন খাওয়া জীবনের কঠীন বাস্তবের পাশে বাস্তবের সুন্দর রূপও আছে । তফাৎ থাকলেও কখনো রূপকথার গল্পে গিয়ে আবার মেলে ।
যেমন, ত্রিশাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম । উচ্ছাস ভরা সুঠাম শরীর । বেয়াদপ চুলগুলো কপালের ওপর থেকে বারেবারে সরিয়ে নেয় । সেই মুক্তোর মত হাসি, যে হাসির জন্য জীবনের সবকিছু উজাড় করে দিতে পারতাম । যে হাসিতে দীর্ঘদিনের জমে থাকা সব রাগ-অভিমান, সব ক্লান্তি মুছে যেত । চায়ের দোকানের বেঞ্চের আড্ডা থেকে মনটা দৌড় দিল মেয়েটির পেছনে, সাথে নিয়ে গেল সমস্ত পাগলামীগুলো । পরে জেনেছিলাম মেয়েটির নাম ত্রিশা। তারপর ত্রিশা আমার হাত ধরে নিয়ে চললো পাহাড়ের কোন চুড়ায়, যেখানে এক সুন্দর বাগান আছে । সে বিশাল বাগান, নানা রঙের ফুলে সাজানো । কি মোলায়েম তার অনুভব । বাগানের ঠিক মাঝখানে একটা ছোট্ট ঘর, ওটা আমাদের ঘর । বাগানটাও আমাদেরই হাতে সাজানো ।

জীবনের প্রতি নালিশ ত্রিশার পেছন ছাড়ে না । অল্প বয়সে ভালো থাকার বিকল্প পথের পরিকল্পনায় রাত জাগা, বিয়ের পর অর্নবের সাথে অতৃপ্ত শরীর নিয়ে অসহ্যকর রাত জাগা । প্রতিবার শারীরিক সম্পর্কের সময় চূড়ান্ত ক্লাই্-ম্যাক্সের আগেই অর্নবের ভেঙ্গে পড়ায় ত্রিশাও ভেঙ্গে পড়ছিল ভেতর ভেতর । কিন্তু ত্রিশা কোনদিন অর্নবকে বুঝতে দেয়নি , অনেক কিছু হারাবার ভয় ছিল ।
খুব ধুমধাম করে বিয়ে হয়েছিল ত্রিশা অর্নবের । বেটে-খাটো, খুবই সাধারণ মতো শান্ত-স্বভাবের অর্নব । গুছিয়ে কথা বলে । তবু কথাবার্তার ভাজে বেশ দাপট আছে । অহঙ্কারী দাপট । হবে নাই কেন ! বড়লোক বাড়ির ছেলে, যাকে বলে সোনার চামচ নিয়ে জন্ম । মেধাবী ছাত্র, পড়াশোনাও বেশ দূর অব্দি । পারিবারিক ব্যাবসায় মাথা ঢুকিয়ে আরো প্রতিপত্তি বেড়েছে । জীবনে যেটা চেয়েছে পেয়েছে । কোন এক অনুষ্ঠানে ত্রিশাকে দেখে প্রেমে পড়ে যায় । উজাড় করে ভালবাসার সাথে একটা সিন্দুকের চাবিও ধরিয়ে দিল ত্রিশার হাতে । সেই সিন্দুক, যার মধ্যে রয়েছে প্রচুর টাকা-পয়সা, গয়না-গাটি, গাড়ি বাড়ি, উন্নত ভবিষ্যৎ । যেখানে সব সমস্যার সমাধান কেনা যায় অনায়াসে । সেখানে আর সেই পুরনো রং-দেয়াল চটা চার দেওয়ালের মধ্যের একঘেয়ে জীবন নেই। ত্রিশা সেসব হারাতে চাইছিল না কোনভাবেই ।
বিকল্প রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল ।

রাত তখন দুটো হবে। অনেক্ষন ধরে ল্যাপটপে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক-এ ত্রিশা জয়ন্তর প্রোফাইলটা ঘেঁটে চলেছে। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় একটা গেট-টুগেদার অনুষ্ঠান হয়েছিল সোমাদির বাড়িতে। সোমাদি ত্রিশার সৎ-ভাইকে প্রইভেট টিউশন দিত। ত্রিশাদের বাড়িতে পড়াতে আসত। এটা সেটা কথায় কথায় সোমাদির সাথে ত্রিশার ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যায়। দুজনেরই বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরেও এখনো যোগাযোগ রয়ে গেছে। একে অপরকে ব্যক্তিগত অনেক কথাই জানায়। রান্না-ঘরে সোমাদিকে সাহায্য করতে গিয়ে ত্রিশা গল্প জুড়ে দেয়। কথায় কথায় সোমা জানায় ত্রিশার খুড়তুতো বোন অনামিকাকে একদিন সোমা রাস্তায় দেখেছে। যদিও বা এই কথাতে অস্বাভাবিক কোনো ঘটনা ছিল না। ত্রিশার কাছে চাবুক মারার মত কথা যেটা তার পরে সোমা বলেছিল। অনামিকাকে দেখেছিলো জয়ন্তর সাথে। লম্বা- ছিপছিপে রোগা, কোনো এক রেস্টুরেন্টে কাজ করতো তখন, যখন জয়ন্ত ত্রিশার প্রেমিক ছিল। মনে মনে ” পাগল ছেলে ” বলে হেসে ওঠে ত্রিশা। মনে করে সেই ত্রিশাকে একটিবার দেখার জন্যে ঘন্টার পর ঘন্টা ত্রিশার বাড়ির জানলার উল্টোদিকে জয়ন্তর দাঁড়িয়ে থাকার কথা। সেই রাস্তায় কোনো এক ছেলের ত্রিশার প্রতি টিটকিরির পর জয়ন্তর সাথে তার হাতা-হাতির কথা, ছাদের ঘরে ত্রিশার মাংসপেশী তে উষ্ণ-আদরের কথা। কিন্তু ভালবাসা দিয়ে ভবিষ্যৎ হয়না বলেই মনে করে ত্রিশা। তবুও কখনো কখনো জয়ন্তর কথা ত্রিশার মনে পড়লেও পড়ে, একান্তে। আশ্চর্য, অনেকটা সময় কেটে গেছে, অনেক কিছুই পাল্টেছে ত্রিশার জীবনে, সেসব তো অনেক আগেই ফেলে এসেছে, তবুও কেন যে সোমাদির মুখে জয়ন্তর নামটা শুনে এরকম হলো ! যেন বস্তা ভরা কৌতুহলের জন্ম।জয়ন্ত এখন কি করে ? কেমন আছে ? তারও জীবনে নিশ্চই অনেক পরিবর্তন এসেছে, তার কি কোনো প্রেমিকা আছে ? ত্রিশার কথা কি তার মনে পড়ে ? ইত্যাদি ।

প্রোফাইল ঘেঁটে সেরকম কিছুই বুঝতে পারা যায়নি জয়ন্তর বর্তমান জীবন সম্পর্কে। রয়েছে কেত মেরে তোলা গোটা কয়েক ছবি আর প্রচুর কবিতা। ওগুলো নিশ্চই জয়ন্তরই লেখা। আগেও লিখতো। কয়েকটা পড়লো , ব্যার্থ প্রেম সংক্রান্ত। এই কবিতাটা বেশ লাগলো

“শরীরের অন্তর সৈকতে, দূরে এক জাহাজ দাঁড়িয়ে,

তোর চোখের কবিতায়, কাছে টানার হাত বাড়িয়ে,

অপেক্ষা, শুধু অপেক্ষা”

আবার ত্রিশার মনে প্রশ্ন এলো, ” এখনো কি ত্রিশাকে মনে মনে পুষে রেখেছে ?”

” হাউ আর ইউ ?”

অনেক্ষণ ভেবে ভেবে একটা মেসেজ করেই দিলো। রেপ্লাইও পেলো সাথে সাথে। ” আয়াম গুড, ইউ ? “

জয়ন্ত, লম্বা, ছিপছিপে রোগা, একমাথা চুল, পনিটেল করা, তামার মত গায়ের রং, থুতনির নীচে ছাগলের মত দাড়ি, ঘাড়ে গর্দানে উল্কি আঁকা । ভীষন রকম বেপরোয়া । নাও হতে পারে, কিন্তু সেটাই দেখিয়ে আসতে সফল । ভয় নেই, ঘেন্যা নেই । কলকাতার এক বারে সন্ধ্যেবেলায় গিটার বাজায় । তারপর নেশায় বুঁদ হয়ে পিশাচের মত ঘুরে বেড়ায় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় । দিনেরবেলা কোনো একটা কাজ করতো, সন্ধ্যেবেলা আরেকটা, বাকি সময়টা হোর্ডিং-বানানোর কাজ। সপ্তাহ শেষের দিনগুলোতে ইভেন্ট এর কাজ। তারও একটা স্বপ্ন ছিলো। ভেবেছিল সুর-সঙ্গীত নিয়ে জীবন কাটবে। পিঠে গিটার বেঁধে দেশ-বিদেশ ঘুরবে। তারে ঝংকার তুলে উপচে ওঠা ভীরের তালে গান গাইবে। তারপর লাফিয়ে পড়বে সেই ভীরের মাঝে। অনুভব করবে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষের হাত তাকে ছোবার জন্য পাগল হচ্ছে। কি রোমাঞ্চকর হতে পারে জীবনটা। তারপর নিজের ওপরেই হাসে। আর্থিক অনটনে পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনি আর। একটা বার-এ ওয়েটার হিসেবে কাজ পেয়েছিল।

একদিন ক্রিসমাসের মত বড় ওকেশনের দিনে, যে সময়ে বার গুলোতে বিশাল আকারে ভীর ঠেলা হয়। বিশাল বিজনেসের সময়। এরকম সময়ে বারের গিটারিস্ট-এর বাইক দুর্ঘটনা হয়। বারের আকর্ষন কমে যাবে, বিজনেসের এত বড় সুযোগে ঘ পড়তে বারের মালিকের মাথায় হাত। কেউ যেন জয়ন্ত আর তার গিটারের সম্পর্কের কথা মালিকের কানে তুলেছিল। এখন আর সে অবস্থা নেই জয়ন্তর। অনেক ভালো হয়ে গেছে।এক সময় “প্রেম”, “ভালবাসা” নামক বিষয় গুলো জয়ন্তর খুব প্রিয় ছিল। এখন তার অপমান হতে খুব ভালো লাগে। বলে, অপমানের জবাবে বিপরীত ব্যক্তিকে বাঁশ দিলে মনের মধ্যে কেমন নায়ক নায়ক ভাব গর্জে আসে।

আমার সাথে দেখা হয়েছিল প্রথম সেদিন। ফেব্রূয়ারী মাসের মাঝামাঝি দিন, শহর জুড়ে প্রেমদিবসের তোলপাড় চলছে । একটা ল্যাম্প-পোস্টের নীচে আমিও আমার প্রেমিকার অপেক্ষায় দাড়িয়ে ছিলাম । একটা প্রাইভেট-গাড়ি সামনে এসে দাড়ালো । উইন্ড-গ্লাসটা ধীরে ধীরে নেমে আসে, আর ভেতর থেকে আমার প্রেমিকার মুখটা বেরিয়ে আসে । একদলা থুতু আমার মুখের ওপর ছুড়ে আবার এগিয়ে যায় ।
সেই যে বাগিচা, পাহাড়ের ওপর সুন্দর করে সাজানো । পুড়ে গেল মুহুর্তে । আরো কিছুটা সময় নিয়ে বুঝলাম পা পিছলে গেছে অনেক আগেই, আর আমি খাদে পড়ছি । অন্ধকার চারিদিক, আর আমি পড়ছি । নিজেকে ধরার জন্য হাত-পা ছুড়ছি, কিছু পাচ্ছি না, উল্টে কেটে যাচ্ছে, ছড়ে যাচ্ছে । অসহ্য যন্ত্রনা করছে । দুটো হাটুর মাঝে মাথা ঢুকিয়ে কেঁদে কাটিয়েছি কতদিন হিসেব নেই । ‘ প্রশ্ন’, ‘যদি’ তাড়া করে বেড়াত দিনরাত । কখন যেন চোখ বুঝে এসেছে আমার । শুধু মনে আছে মাথার কাছে এক ছায়ামূর্তি দাড়িয়ে, জয়ন্ত । আর কিছু মনে নেই ।

উত্তর কলকাতার পৈত্রিক পুরোন তিনতলা বাড়িতে একাই থাকে । অনেকগুলো ঘরে তালা লাগানো। খোলা হয়না বহুদিন ধরে। একসময়ে মা-বোনকে নিয়ে একটা কোণের ঘরে থাকতো। বাকি বাড়ির সবটাই ভোগ করতো জয়ন্তর কাকা। ওই একখানি ঘর, আলো নেই, বাতাস আসে না, দুপুরের রোদ-আলো একখানি জানালা দিয়ে ঢুকতো যতটুকু। বহুবছর এভাবেই তিনটে প্রানের জীবন কেটেছে। তখন সবচেয়ে খুশির দিন হতো পাড়ার কালী পুজোর সময়। পাড়া সাজানো হতো, খুব ধুম করে, হরেক রঙের আলো লাগানো হতো, সারারাত সে আলো ঘরে ঢুকতে পারত।

সেসব অনেক বছর আগের কথা যদিও, জয়ন্তর কাকিমা সংসার ছেড়ে চলে গেছিলো অন্য আরেক লোকের হাত ধরে। কাকা যতই বজ্জাত লোক হোক না কেনো , স্ত্রীকে খুব ভালবাসতেন। ঘটনাটা সহ্য করতে পারেনি, মুষড়ে পড়েছিলেন। এক বছরের মাথায় ভারী কোনো অসুখে মারাও গেছিলো। তাদের একমাত্র ছেলেও বাড়ি ছেড়ে মামারবাড়ি চলে গেল। একমাত্র বোন পড়ালেখা শিখে চাকরি করে দিল্লীতে । মাকেও নিয়ে গেছে ।

জানলার বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে । ত্রিশা চোখ খুলে দেখে, জানলার একপারে নগ্ন অবস্থায় দাড়িয়ে জয়ন্ত সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছে । বিছানা ছেড়ে ত্রিশা উঠে যায় । জয়ন্তকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞাসা করে ” কি ভাবছো ?”

“কিছু না ।”

” তুমি আর অনামিকার সাথে কথা বোলো না কিন্তু। ওকে এড়িয়ে চলো। “

“কেনো ?”

” না, আমি চাই না। “

” আর আমি !! আমি কি চাই সে কথা কোনদিন ভেবেছো ! “

কথাগুলো বলতে বলতে ত্রিশার কপালে সিঁথির কাছটা আলতো করে আঙ্গুল বোলাতে থাকে। ত্রিশা জয়ন্তর বুকে আবার মাথা রাখে। বলে “কেনো এসব ভাবছ ? এখনতো আমি শুধু তোমার। তোমার আমার সম্পর্কের মধ্যে কি কোনো স্ট্যাম্প লাগাতেই হবে ? নাকি দরকার আছে ? “

সেই যে শোস্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে-এ জয়ন্তর সাথে ত্রিশার কথা শুরু হয়েছিল, ধীরে ধীরে ফোন কল, তারপর রোজকার চলার পথে টুকটাক দেখা করা থেকে আজ সেটা বিছানা অব্দি পৌঁছে গেছে।পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে একটু নতুন রং মাখিয়ে জয়ন্তকে সযত্নে পরিবেশন করতে খুবই সাধারনভাবে ও অনায়াসে জয়ন্ত ত্রিশার বশে চলে আসে।

জয়ন্ত ছন্দ কাটে “শরীরটাই যা বেঁচে আছে, সেটাই শুধু দেখেছিস ; ছেঁড়া-কাটা করবি আর কি! বাকিটাই বা আর কি রেখেছিস ?” ত্রিশা আবার জয়ন্তর ঠোঁটে ঠোঁট রাখে। বলে ‘চুপ কর ‘।

আগের অথবা পরের পর্ব পড়তেচরিত্রান্তর – পর্ব ২ – জয়ন্ত সেন >>

8 মন্তব্য