গল্পঃ ক্যাপ্টেন মোশা মামা
১৯৭৭ বা ১৯৭৮ সাল। তখন আমি কিশোর। আমরা বাংলাদেশের ঝালকাঠি শহরের কাপুড়িয়া পট্টি’র বাসায় থাকি। ছেলেবেলায় খরস্রোতা নদীর মতই আমি খুব দুরন্ত, দুর্বিনীত ও বেপরোয়া ছিলাম। মা একা আমাকে শাসন করে কুলিয়ে উঠতে পারতেন না। বাবা এসব বিষয়ে মাথা ঘামাতেন না কারন প্রশাসন বিভাগটা মায়ের অধীনে ছিলো। বাবার ডিপার্টমেন্ট শিক্ষা, অর্থ আর পররাষ্ট্র। মা’য়ের পক্ষে বড় ভাই মানে খলিল ভাই (বর্তমানে ডা. ছাত্তার পারভেজ) পুলিশিং করতেন। একবার মায়ের বুকুনি ও হাই ডোজের মার খেয়ে ক’দিন বাড়ী আসি নি। প্রতিবেশী সিগারেট অফিসে সবার সাথে হেসে খেলে, ক্যারামবোর্ড নিয়ে বেশ আছি। মোশা মামার সাথে ঘুড়ি ওড়াচ্ছি। তাদের চিলেকোঠায় আমি, বন্ধু সবুজ ও নান্না বেশ আছি।
একদিন আমাদের উদ্বোধন হাইস্কুল স্কুল মাঠে বিটিভিতে সাড়ে আটটায় নয়নমণি ছবি সিনেমা দেখাবে স্কুল কতৃপক্ষ। আমরা তিনজন দেখবো। ফিরতে রাত বারোটা পার হবে।
কবীর মামা বললেন
তোমাদের জন্য এতো রাতে কে গেট খোলা রাখবে?
নান্নাঃ আমাদের গেট লাগে না। পাইপ ও রেলিঙ বেয়ে ছাঁদে চিলেকোঠায় ঠিক চলে আসবো মামা।
যেই কথা সেই কাজ। সিনেমা দেখে গভীর রাতে চিলেকোঠায় এসে তিনজনে ঘুম দিলাম।
এদিকে মা সবকিছু শুনে ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে আছেন। সকাল ৯টায় আমি ঘুম থেকে উঠে তিন তলা বিশিষ্ট ছাঁদ থেকে নীচে আমাদের বাসার দিকে তাকাতেই মা কুকুর তাড়ানো লাঠি দেখিয়ে বললেন,
-তুই বেশী গেছোস । এই লাঠি আমি তোর পিঠে ভাংবো। খালি একবার বাড়িতে আয় ফাজিলের বাচ্চা!
আমি বড় সাইজের একটি ইটের টুকরো নিয়ে আমাদের ঘরে চিনের চালে ছুড়ে মারলাম। সেটা না-কি ভিতরে বোমার মত শব্দ হইছিল। ছোট বোনেরা বেশ ভয় পেয়ে হুড়াহুড়ি করে ঘরের বাহিরে চলে এসেছিলো।
ঘটনার পর মা আরো ক্ষিপ্ত মানে ঘিতে অগ্নিহুতি। তিনি আমাকে দস্যু ঘোষণা দিয়ে দ্রুত পাকড়াও করতে নির্দেশ দিয়েছেন মায়ের সেনাপতি খলিল ভাইকে। খলিল ভাই প্রতিবেশী মোশা মামার সাহায্য চাইলেন। মোশা মামা সকল দুষ্টদের শিরোমণি। এমন কি আমারও। তিনি স্কুলে স্কাউটস দলের ক্যাপ্টেনও ছিলেন। উভয় কারনে উনি তাঁর নামের আগে ক্যাপ্টেন শুনলে খুশীতে গদগদ হন।
আরো কয়েকজন মিলে বুড়ি মা সরকারি প্রাথমিক স্কুলের হাইবেঞ্চে বসে পরিকল্পনা করলেন আমাকে ধরার। আমাকে রাতে ধরা হবে তাই অপারেশনের নাম দিলেন ‘ডার্ক ডায়মন্ড’। মোশা মামা গম্ভীর হয়ে বললেন এই অপারেশন ‘ডার্ক ডায়মন্ড’ এর নেতৃত্ব দিবো আমি স্বয়ং, এই ক্যাপ্টেন মোশাররফ হোসেন মোশা। দলের বাকী সদস্যরা হাই বেঞ্চ থেকে নেমে মুষ্টিবদ্ধ হস্ত উত্তোলিত করে স্লোগান দিলো
ক্যাপ্টেন মোশা মামা, জিন্দাবাদ!
ক্যাপ্টেন মোশা মামা, জিন্দাবাদ!
মোশা মামা সেলুট গ্রহন করে বললেন
-নাউ ডেসপারস ইউ অল!
সবাই যে যার মত বাড়ী চলে গেলো।
খবরটা আমাদের কানে আসাতে আমি সাবধানে পদক্ষেপ ফেলছি। বন্ধু সবুজ, নান্না ও ইকবাল মোশা মামার দলের লোকদের উপর স্পায়িং করতে লাগলো। ওদের সব খবরাখবর আমি পেয়ে যেতাম। মা আমাকে ডাকু উপাধি দেয়ায় নিজেকে দস্যু বনহুর ভাবতে লাগলাম। কিছুদিন আগেই লঞ্চঘাটে রূপালী হলে দস্যু বনহুর ছায়াছবি দেখেছি আমি, সবুজ ও ইকবাল। সোহেল রানা, অঞ্জনা প্রমুখের ছবি। অঞ্জনার সেই গান, ” তুমি হলে তুমি দূর এলো কাছে” আজও কানে বাজে।
সেদিন ঐতিহাসিক অপারেশন ডার্ক ডায়মন্ড। চারিদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত ১১টায় সব দিক দিয়ে আমার পালাবার পথ বন্ধ । ওরা চিলে কোঠার দরজায় বার বার কড়া নাড়ছে।
অবশেষে মশা মামা ঘোষণা দিলেন
-আমি এক থেকে দশ পর্যন্ত গুনবো এর মধ্যে যদি দরজা না খুলিস তাহলে দরজা ভেঙে ঢুকে তোকে মেরে হাড্ডি ভেঙ্গে গুঁড়ো করে দেবো। আমি ভাবলাম
-ওরে বাবা, এ যে নাৎসি বাহিনী! সবুজ ও নান্না সমস্বরে বললো,
-তুই তাড়াতাড়ি পালা কাদের!
তৎক্ষনাৎ আমি সিগারেট অফিসের তিন তলার রেলিঙে ঝুলে লাফ দিয়ে দোতালার রেলিং আসলাম। ওদের টিনের সার্ভেন্ট ঘর পেরিয়ে একটি কাঁটাযুক্ত বরই গাছের আগায় চুপ করে বসে রইলাম। ঐ টিম আমাকে কোথাও না পেয়ে শেষমেশ এই বরই গাছের নীচে কুয়ার জলে হাত পা ধুচ্ছিল।
আমি উপর থেকে সব দেখছিলাম। হ্যাট পরিহিত মোশা মামা অস্থির পায়চারী করছেন। বুকে পেন্ডুলামের মত দুলছে বাইনোকুলার। অনেকটা সব্যসাচী সিনেমার বিকাশ রায়ের মত। মোশা মামার মুখ চুন। তিনি মুখ ভার করে বললেন
-আমার মিশন কখনো ফেল হয় না, নেভার এভার! বিষয়টি প্রেস্টিজ ইসু হয়ে গেছে। বয়েজ, তোমাদের হাত-পা ধুয়ে লাভ নাই। আমাদের অপারেশন ডার্ক ডায়মন্ড চলবে। টিল হি কট!
এতোক্ষণ অনেক কাঁটার আঘাত সয়েও চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু এদিকে সুগন্ধা নদীতে ডুবাডুবি খেলাতে আমার খুব কাশি পেয়েছিল। কিছুক্ষণ চেপেও রেখেছিলাম। ওরা বরই গাছের নীচ থেকে চলেও যাচ্ছিলো। তীরে এসে তরী ডুবিয়ে খক করে একটি কাশি দিয়ে ফেললাম। সাথে সাথে নাৎসি বাহিনীর মত ওরা দু-তিন দিক থেকে টর্চ মারতে লাগলো। আমার সহোদর খলিল ভাই বললেন
-ও এইখানেই আছে মোশা মামা! আশেপাশেই!
ক্যাপ্টেইন মোশা মামা গম্ভীর হয়ে বললেন
-ডোন্ট প্রডিউস এনি সাউন্ড। সে মুভ করবেই। তখন সাউণ্ড হবে। আর তখনই রেবিট কট ইন রেড হেন্ডেড হবে।
ওরা কথা বলতে বলতে আবার ঠিক আমার নীচে। মোশা মামার টর্চ চারিদিকে ঘুরে উলম্বভাবে একেবারে আমার মুখের উপর। তিনি বীরত্বপূর্ণ একটি হাসি দিয়ে একটা ভাব নিয়ে গম্ভীরভাবে বললেন
-কট!
সাথে সাথে আমার বুকটি ধক করে উঠলো। পাঁচটি মাথা থেকে পাঁচ জোড়া চোখের টর্চ আমার মুখের উপর পড়লো। আমি পরাজিত জাপানি সৈনিকের মত চুপচাপ বসে আছি। কোন কথা বলছি না। মামা বার বার বলছেন
-নেমে আয় শাখামৃগ! নেমে আয় রাসভ! তোকে শেষবারের মত বলছি; নেমে আয় বলছি কাদের।
আমিঃ মামা, আপনি মীরজাফর! তাই গুরু হয়েও আমাকে মা’য়ের কাছে ধরিয়ে দিচ্ছেন!
মোশা মামাঃ ওসব বলে আমাকে অপারেশনাল দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করা যাবে না।
আমিঃ আপনার ঘু্ড়ির সুতা কে মেজে দেয়? কে ক্যারামবোর্ড খেলার পার্টনার হয়ে জিতিয়ে দেয়? কে ভর-দুপুরে ক্যারাম খেলার জন্য বরিক এসিড কিনে দেয়?
মোশা মামাঃ আচ্ছা আচ্ছা, তুই নেমে আয় বাপ। এই মোশাররফ হোসেন মোশা কথা দিচ্ছে তোকে আপায় একটি ফুলের টোকাও দিবে না।
এরপর আমি গাছ বেয়ে নেমে আসলাম।
মোশা মামাঃ হ্যান্ডস আপ!
আমি দু’হাত উপরে তুললাম।
মোশা মামাঃ মুভ ফরোয়ার্ড!
এভাবে ওরা বীর বেশে আমাকে বিধস্ত আসামী হিসাবে নিয়ে চললো। আমার কাছে মনে হলো আমি ফাঁসীর মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাকে মায়ের সামনে হাজির করা মাত্র আমি হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিলাম। মা আমাকে দেখামাত্র ধরতে যাবেন এমন সময় মোশা মামা বললেন
-ডোন্ট টাচ হিম সিস্টার। একটি শর্ত আছে।
মাঃ কি শর্ত?
মোশা মামাঃ ওকে কোন রকম আঘাত করা যাবে না। তবে ওকে আপনি যতখুশি তত ভদ্র ভাষায় গালিগালাজ করতে পারবেন। বাট ডোন্ট টাচ হিম। এই শর্তে সে আত্মসমর্পণ করেছে। As per The Geneva Conventions of 1949, I’ve to keep his rights.
মাঃ আচ্ছা আচ্ছা ওকে মারবো না। বকাও দিবো না।
মা আমার দিকে তাকিয়ে বললেন
-এই গোছলে যা বান্দর! আমি ভাত বাড়ছি!
আমি গোসলখানা থেকে বের হয়ে দেখি চায়ের কাপে বীরত্বপূর্ণ ঝড় বইছে আমাকে পাকড়াও করার।
সেদিনের সেই ‘ডার্ক ডায়মন্ড’ অপারেশন এখনো মনে হলে হাসি পায়, কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও যেন নরম একটা সুরও বাজে। মোশা মামার সেই বীরত্ব, খলিল ভাইয়ের কঠোরতা, আর মায়ের রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অগাধ মমতা—সব মিলিয়ে যেন আমার শৈশবের এক অমূল্য অধ্যায়।
মায়ের সেই লাঠি কখনোই আমার পিঠে পড়েনি, কিন্তু তাঁর ভালোবাসার ছায়া আজও আমাকে আগলে রেখেছে। আর মোশা মামা? তিনি শুধু এক ‘ক্যাপ্টেন’ নন, আমার শৈশবের এক অবিচ্ছেদ্য নায়ক।
আজ জীবনের বহু বাঁক পেরিয়ে দাঁড়িয়ে বুঝি—সেদিনের সেই দস্যুপনা, সেই পালিয়ে বেড়ানো, সেই ধরা পড়া—সবই ছিল ভালোবাসার এক অভিনব রূপ।
যে ভালোবাসা শাসন করে, ধাওয়া করে, আবার শেষমেশ বুকে টেনে নেয়।
ক্যাপ্টেন মোশা মামা আজ কোথায় জানি না। হয়তো তিনি সেই আগের স্বভাবেই আছেন, কিন্তু তার সেই দৃপ্ত কণ্ঠ আজও কানে ভাসে—
“কট!”
ক্যাপ্টেন মোশা মামা
আমার জীবনের বাঁকে বাঁকে
এ কে সরকার শাওন
কবি ও কথাসাহিত্যিক