কালো শাড়ি
আমি এখন গোয়াতে। গোয়া মানেই সবাই জানে সি বিচ, মেয়ে মানুষ, মদ আর ফুর্তি। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে তা নয়। জীবনে যখন ভাবলাম একটু সেটেল হয়েছি তখনই বিপর্যয় নেমে এলো। খুব কম মাইনেতে ই একটা চাকরি জোগাড় করে এলাম গোয়াতে। মা বাড়ি ফিরে যেতে বলছে বারে বারে। জাহাজে চাকুরী করতে আসে লোকে ,একটা আড়ম্বর পূর্ণ জীবন এর আশায়। কিন্তু আমার কপাল খারাপ। এটা সিপ ইয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা জাহাজ নুন্যতম সুবিধাটুকু নেই।
সাপকে আমি ভীষন ভয় পাই ।কিন্তু আমার খারাপ সময় সাথে , তখনই যেনো এই সাপ এর উপস্থিতি একটা রোজনামচা মতো হয়ে গেছে। মুম্বাইয়ে প্রথম স্টাফ হাউজ নামে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকে একটা নতুন অভিজ্ঞতা করেছিলাম। তখনও সাপের দর্শন পেয়েছিলাম ঐ ঘরে।এখানেও সাপের পিছনে পিছনে আলো নিয়ে ছোটাছুটি করতে হলো আমাকে। জানেন সাপ আছে শুনে পিসির বাড়ি যাওয়া বন্ধ করা ছেলে আমি। সাপুড়ে কিংবা চিড়িখানাতে সাপ দেখা অন্য ব্যাপার কিন্তু অন্ধকারে নাম গোত্র না জানা সাপের পিছু করা ভয়ঙ্কর ব্যাপার আমার কাছে।
যদিও দিন পোনেরো পর সমীর ভাইকে সাপটির ছবি দেখিয়ে নিজেকে বড়ো দোষী মনে হতে লাগলো। কারণ অকারনেই সাপটাকে মেরেছি। খাবারের খোঁজ আসা একটা নির্বিষ সাপ ওটা। ও সমীর ভাই পরিচয় করিয়ে দিই। ও রঙ্গিলা মুসলিম। ঠিক ধরেছেন। বাংলাদেশের থেকে পেটের দায়ে এসেছে এখানে।বাংলা কাজের ভাযা না তাই হিন্দি আর মারাঠাটা ভালোই শিখেছে ও। মুম্বাই এর ভাইদের দুনিয়াটা এখন ইসলামীরা নিয়ন্ত্রণ করে। ও চাইলেও ওখানে যোগ দিতে পারতো। কিন্তু ওয়লডিংএর কাজটা ও দেশেই শিখেছিলো, পেটে একটু বিদ্যাও ছিলো। তাই গোয়া ও গা ঢাকা দিয়েছে সাইড সুপার ভাইসার হিসাবে। অপরাধ ওর একটিই ওই সাপটার মতো ওও অনুপ্রবেশ কারি। NRC CAB চালু হলে ওর খবর আছে।
এবার আসি সাপটির কথায়। ওটা পাইথন বাচ্চা
বালায় বলে ময়াল সাপ।অজগর বা পাইথন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম সাপ। অজগরকে ময়াল নামেও ডাকা হয়। এরা বিষহীন আদিম সাপ। শিকারকে জোরে পেঁচিয়ে, এরা তার দম বন্ধ করে। এরা শীকারকে সাধারনত মাথার দিক থেকে আস্ত গিলে খাওয়া শুরু করে। কারণ, এতে শীকারের বাধা দেয়ার ক্ষমতা কমে যায়। শীকার হজম করতে তাদের কয়েকদিন সময় লাগে। তবে এরা মৃত প্রাণী খায়না।
এদের তাপরশ্মি দেখার বিশেষ তাপদৃষ্টি ইন্দ্রিয় আছে ।
সমীর ভাই কথায় আমাদের জাহাজে ঢোকা পাইথন এর বয়সটা খুব বেশি হলে এক মাস। যেদিন বৃষ্টি হয় সেইওর বাড়ি মানে ঘরে উঠানে কাছে একটা বড়ো পাইথন মাঝে মাঝে নেমে আসে। কোন দিন ওদের কোন ক্ষতি করে নি। সত্যি মানুষ বোধহয় সবচেয়ে ক্ষতিকর প্রানী। সমীর ভাই এর সাথে আলাপ হতে বুঝতে পারলাম, রঙ্গিলা মুসলিমরা অতোটা ও খারাপ হয়তো নয়। কিন্তু ও বিপদে পরবে হয়তো CAB এলে। ভেবে দেখুন যদি ঈশ্বর এই পৃথিবীর সৃষ্টি করে থাকেন তাহলে , সেতো কোন বডার টানে নি আকাশে। কিছু মানুষ, ধর্ম, জাত, ভাষা দিয়ে বিভাজন করেছে জমিটাকে নিজেদের স্বার্থে। তাই মানুষ সবচেয়ে বড় বিষধর।
আপনারা চেনেন ফুর্তিবাজ গোয়াকে। আমি চিনি এক অন্য গোয়াকে একা একন্তে থাকা এক গোয়া। দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটুকরো সমুদ্র ঢুকে পড়েছে। সকালটা এখানে সুন্দর, কিন্তু তা দেখার সময় কোথায়, সমুদ্র এখানে কথা বলে, একটা শঙ্খচিল উরন্ত অবস্থায় আপনার কুশল সংবাদ নেয়, আজানা পাখি গান করে। কিন্তু হাতুড়ি শব্দে হারিয়ে যায় সব কিছু। যান্ত্রিক জীবনে দিনে কয়েকটি বার প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলে একটুখানি শান্তি পাই। আমার আবার প্রিয়জনদের সংখ্যা একটু কম, শুধু মা। কিন্তু কয়েকদিন ধরে তাকে কল করতে ইচ্ছে করছে না। খালি এক কথা ঘেনোর ঘেনোর। বাবা আমার সাথে খুব একটা কথা বলে না। তার সব স্বপ্ন ভেঙে দিয়েছি। তবে সে আমাকে ভালোবাসে। সে বলতে শুরু করেছে , ” জীবন টা আগে , টাকা পরে।” কল কেটে দিলাম। মন খারাপ বেশিই চ্যাচামি করে ফেলেছি। আসলে আমি ওতো ভিতরে ভিতরে হতাশ। বড়ো সস্তায় বিক্রি। করছি আমার শ্রম। আচ্ছা আরোতো দুশো মানুষ এখানে কাজ করছে, আমার চেয়ে অনেক কম মাইনেতে ও। তাহলে চুক্তি স্বাক্ষর করে চাকুরী অতো সহজে ছাড়তে পারবো নাকি।
” দুই পেক মারলেই ঠিক হয়ে যাবে।” ওরা বললো।
আমি বললাম ” জানোতো ওটা আমার চলে না। চললো না বরং , ঐ ওয়াটার ফল টায়, যেখানে ময়লা গুলো ঝুলন্ত অবস্থায় মাছ ধরছে।”
সমীর বললো” পাগল হলে নাকি, এখন ফরেস্টের গার্ড নামতে দেবে না জলে। আর স্নান করা বাহানায় অনেক কাছে গিয়ে দেখেছিলাম, আর ঐ video টা করেছিলাম। আর ওতে ঝুঁকি আছে, তুমি নতুন লোক বস। বরং সি বিচ চললো, একটা বিয়ার খেয়ে মন ফ্রেস হয়ে যাবে।”
রাতে ফোন করতে মা খুব খুশি। মা আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করছে। সংসার খরচা বাঁচানো সাথে সাথে আয় করছে , শাড়ি বিক্রি করে। অথচ নিজের জন্য কোনো দামি শাড়ি কেনে না। এ বছর আমরা শাড়ি কিনে দেবো বলেছি। ভাইএর বৌ রূপা ওদের পচ্ছন্দ মতো একটা দামী শাড়ি দিয়েছে। আমি নিজে ইন্টারনেট দেখে একটা শাড়ি পচ্ছন্দ করে ছবি পাঠাবো বলেছিলাম। সন্ধ্যায় আজ পাঠালাম আমার পছন্দের শাড়ি নমুনা।
মা বললো ” আমি কালো শাড়ি পরবো কি বলিছিস তুই, আমাকে মানবে? এ বয়সে!”
আমি বললাম” বয়স হয়েছে তোমার আর কতো, মানাবে ঠিক , দেখো কিনে পাড়তো একবার , আমার ইচ্ছা টা রাখো না ।”
মা বললো ” একটা কথা জিজ্ঞেস করবো , বললবি?”
বললাম ” বললো”
মা বললো ” টুবাই বললো তুই যে ছবিটা পাঠিয়েছিস গোয়াতে তোলা?”
আমি বললাম ” হুঁ ,”
মা বললো ” মৌপ্রিয়ার সাথে :”তোর কথা হয়েছে? তোদের কি মিটমাট হলো?”
আমি বললাম ” নেটওয়ার্ক নেই কথা বুঝতে পারছি না , রাখলাম।”
গোয়ার বিচ নির্লজ্জ মতো উল্লঙ্গ, তবে সন্ধ্যায় কালো অন্ধকার যখন তাকে ঢেকে দিতে যাবে, তখনই গুন গুন রবীন্দ্র সংগীত ভেসে এলো কানে, মদ্যপ অবস্থায় থাকলেও রবীন্দ্র সংগীত রস আস্বাদন করতে পারবো না এমন, নেশা করি না। সন্ধ্যা হল, রূপকথার মতো লাগছিলো , DSLটা ব্যবহার করতে ভুললাম না। কিন্তু কখনো ভাবিনি ছবিতে বন্দী হয়ে যাচ্ছে, আমার হারিয়ে যাওয়া প্রেম। কালো শাড়ি হারিয়ে গেলো অন্ধকারে। কালো রঙটা তো আমার প্রিয় কখনোই নয়। নীল রং আমার প্রিয় , আকাশের রঙ নীল বলে নয়, শুনেছি মৃত্যুর রঙ নাকি নীল। কিন্তু আজকাল কালো রং টাই প্রিয়। আসলে মরতে চাই না । আরো, কালো অন্ধকারে কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়তে চাই, একটু বিশ্রাম চাই একটু। তাই কালো রঙ টা আজকাল ভালো লাগে। কালো শাড়ি পরে মেয়েটি খুব সুন্দর ছিলো। একটা কবিতা ও লিখলাম তাকে নিয়ে। কিন্ত তার আভিমানেটা আমার খুব চেনা। তাকে ডেকে ডেকে আমি ক্লান্ত।
তাই কালো আঁচলে মুখ ঢাকে দিয়ো মা আমার তুমি যখন, আমি ঘুমিয়ে পড়বো। কোন রঙীন স্বপ্ন দেখা যেনো ঘুম না ভাঙে হঠাৎ করে।