ভাটির দেশে ধনেশ্বর নামে এক সওদাগর ছিল। তার ছিল একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। মেয়েটির বয়স দশ বছর, নাম ছিল কাজলরেখা। মেয়েটি দেখতে ছিল খুবই সুন্দর, তার হাসিতে যেন হীরা-মতি জ্বলে। এমনি রূপ তার, ঠিক যেন বর্ষার পানিতে ভেসে থাকা পদ্মফুলের মতো। ছেলেটির বয়স ছিল চার বছর, ঠিক যেন রত্নে আকর তার রূপ। কিন্তু এই সুখ সওদাগরের কপালে বেশিদিন সইল না। সাধু ধনেশ্বর জুয়াতে সব হারিয়ে সম্বলহীন হল। তার যত হাতি-ঘোড়া, লোক-লস্কর ছিল তার কিছুই থাকল না। এদিকে কন্যা কাজলরেখার বিয়ের সময় উপস্থিত। বয়স তাঁর এগারো বছর, এখন যে বিয়ে না দিলেই নয়। কিন্তু জুয়ারী বাপের মেয়েকে কেউ বিয়ে করতে রাজি হলো না। এমনই এক সময়ে সওদাগরের পুরীতে এক সাধু এসে জুটল। সওদাগরের মুখে চিন্তার ছাপ দেখে সাধু সওদাগরকে একটি শুকপাখি ও একটি মূল্যবান আংটি দিয়ে বললেন, ” এই পাখির নাম ধর্মমতি শুক। তুমি যদি এই পাখির কথামতো চল তাহলে তোমার বাপের কালান্তের সমুদয় সম্পত্তি আবার ফিরে পাবে।” এই কথা শুনে সওদাগরের খুশি আর ধরে না। সে শুকপাখিটি নিজের কাছে রেখে দিল। সাধু বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। একদিন সওদাগর ধর্মমতি শুকপাখিকে জিজ্ঞেস করলেন, “বল পাখি, আমার দুঃখের দিন কবে ঘুচবে? আমার বংশের ছেলে মেয়ে দুটিরই বা কি হবে?” বলেই কাঁদতে লাগলেন। শুকপাখি অভয় দিয়ে বলল যে, “কেঁদো না সওদাগর, তোমার হাতের আংটিটা বাজারে বিক্রি করে আবার বাণিজ্য শুরু করো। তারপর কিছু মূলধন নিয়ে পুব দেশে যাও একবছরের মতো অর্থসম্পদ পাবে।” এই কথা শুনে সওদাগর সেই আংটিটা বাজারে বিক্রি করল। এরপর সে পুব দেশের দিকে একটি বাণিজ্য মেলা দিল। এভাবে সে আবার তার সহায় সম্বল ফিরে পেল। কিন্তু এতে করেও তার চিন্তা দূর হল না। কন্যা কাজলরেখার বয়স যে দিন দিন বেড়েই চলেছে। সাত পাঁচ ভেবে সওদাগর আবার শুকপাখির পরামর্শ চাইলেন। তবে এবার শুকপাখি যা বলল তা শুনে তো সওদাগরের চক্ষুস্থির। তার দুঃখের দিন বুঝি আবার ঘনিয়ে আসল। শুকপাখি বলল তার কন্যা কাজলরেখার বিয়ে দিতে হবে এক মরা স্বামীর সাথে। এজন্য তাকে বননিবাসে পাঠাতে হবে। মা মরা কাজলরেখার জন্য সওদাগর হায় হায় করে বিলাপ করতে লাগলেন। একদিন সওদাগর করলেন কি, বাণিজ্যে যাওয়ার ছল করে ডিঙি সাজিয়ে মেয়েকে নিয়ে রওয়ানা হলেন। উজান বেয়ে যেতে যেতে সামনে এক বনের ধারে সাধু ধনেশ্বরের নৌকা ভিড়ল। তিনি তার কন্যাকে নিয়ে বনের ভিতর যাত্রা করলেন। যেতে যেতে অনেক দূর গেলে কাজলরেখা মনে মনে কি যেন ভাবতে লাগলো, তার মনের মধ্যে অনেক দুঃখ হল। সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল যে, “বাবা, আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ?”
কিন্তু তার বাবার মুখে কথা যোগাল না। অনেক দূর যাওয়ার পর তারা একটি ভাঙ্গা বাসগৃহ খুঁজে পেল। ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। বাপ মেয়ে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে তারই সিঁড়ির উপর বসে পড়ল। দুপুরের তীব্র রোদে ও ক্ষুধায় কন্যা কাজলরেখা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ল। সওদাগর তার কন্যাকে বললেন, “তুমি এইখানে থাক, কাছেপিঠে কোথাও সুপেয় পানি আছে কিনা আমি দেখে আসি।” সওদাগর চলে গেলে তার কন্যা কাজলরেখা বাসগৃহটির চারিদিক ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল।