Skip to content

একটি ভৌতিক ঘটনা – অর্ঘ্যদীপ চক্রবর্তী

অনেকদিন আগের কথা বলছি। তখন আমাদের গ্রাম এত উন্নত ছিল না যেমনটা এখন উন্নত হয়েছে।
যে সময়কার কথা বলছি তখন আমার বয়স বছর কুড়ি-একুশ হবে। আমি সবে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে বাড়িতেই বসে আছি। কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য চেষ্টা করছি।

তখন আমাদের গ্রামে বাড়ি বলতে ঐ কুড়ি-পঁচিশটা মতো ছিল। ভালো রাস্তাঘাট ছিল না। ভালো বাজার-হাট বসতো না। ভালো দোকানপাট ছিল না। আর স্কুল ছিল আমার বাড়ি থেকে তাও তিন-চার মাইল দূরে। সেরকম ডাক্তারখানাও ছিল না। তবে কয়েকজন ডাক্তার ছিলেন। কিন্তু তারা যে শহরের ডাক্তারদের মতো আরও ভালো চিকিৎসা করতে পারতেন সেরকম নয় — ঐ জ্বর, সর্দি কাশি, পেট ব্যথা, পায়ে ব্যথা, কোমরে ব্যথা ইত্যাদি হলে সারিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু তার চেয়েও জটিল কোনো শরীর খারাপ হলে শহরেই বাধ্য হয়ে যেতে হতো। আমাদের গ্রাম থেকে শহর তাও দশ-পনেরো মাইল দূরে।

সে যাই হোক আমার ঠাকুরদাদার একবার খুব শরীর খারাপ হয়েছিল। তার বয়স হয়েছিল তখন প্রায় সত্তর-পঁচাত্তর বছর। আর গ্রামের দিকে কোনো জটিল শরীর খারাপ হওয়া মানে সে এক ভয়াবহ ব্যাপার!
না আছে ভালো ডাক্তার, না আছে ভালো ডাক্তার-খানা, না আছে ভালো হাসপাতাল, অথবা স্বাস্থ্যকেন্দ্র… কিছুই সেরকম নেই।
আমরা ঠিক করেছিলাম ঠাকুরদাদাকে নিয়ে শহরে যাব। কোনো ভালো হাসপাতালে চিকিৎসা করাবো।

কিন্তু যে সময়কার কথা বলছি তখন আবার শ্রাবণ মাস। সারাদিন বৃষ্টি লেগেই আছে আর এরকম বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সঙ্গে করে রোগীকে নিয়ে যাতায়াত করা খুবই কঠিন ব্যাপার। সে রকম ভালো যানবাহনও নেই। ফলে অনেক অসুবিধা।

তো যাই হোক আমাদের গ্রামে যে কয়েকজন ডাক্তারবাবু ছিলেন তাঁদেরকেই বলা হলো। তারা এলেন। অনেক দেখলেন। চেষ্টা করলেন।
কিন্তু সেরকম ফল হল না।
আসলে তাঁরা ঠিকমতো বুঝতেই পারলেন না এটা কোন রোগ। এদিকে এই অজানা রোগের ফলে ঠাকুরদাদার খাওয়া কমে গেছে আর গায়ে সবসময়ে বেশ জ্বর থাকে!

আমার ঠাকুরদাদাকে আমাদের গ্রামের প্রায় সকল মানুষ সম্মান করতো, শ্রদ্ধা করতো কারণ তিনি তখনকার সময়ে সংস্কৃততে বি-এ পাস করা মানুষ ছিলেন।
গ্রামের মানুষদের বিপদে-আপদে অনেক সাহায্য করতেন। অনেক ভালো ভালো বুদ্ধি দিয়ে তাদেরকে সহযোগিতা করতেন। ফলে গ্রামের মানুষরাও অনেক উপকৃত হতো। তারা তাই ঠাকুরদাদাকে খুব ভালোবাসতো।
তো ঠাকুরদাদার এই শরীর খারাপের কথা শুনে বলতে গেলে সারা গ্রামের মানুষেরই মুখে চিন্তার ছাপ পড়ে গেছিল। তারা দেখতে আসতো। আমাদের বাড়িতে ভিড় জমে যেত।

গ্রামের ডাক্তারবাবুরা তাও তিন-চার দিন ধরে অনেকরকম ভাবেই চেষ্টা করলেন। কিন্তু অবস্থার সেরকম উন্নতি হলো না।

চতুর্থ দিনের মাথায় ঘটলো ঘটনাটা। সময়টা বিকেলের শেষের দিক। বৃষ্টি এক নাগাড়ে পড়েই চলেছে। আমাদের তো মাটির বাড়ি। উঠোনে অনেক লোক বসে আছে। সবাই ঠাকুরদাদাকেই দেখছে। ঠাকুরদাদার শরীর খারাপের কথা শুনে অনেক লোকই দেখতে আসে তাঁকে — যেদিন থেকে তিনি অসুস্থ হয়েছেন সেদিন থেকে। তো সেদিনও অনেকেই উপস্থিত আছে। ঠাকুরদাদা কাঠের চেয়ারে বসে আছেন মাথা নিচু করে। শরীর তাঁর বেশ দুর্বল হয়ে গেছে।

হঠাৎ একটি লোক বাইরে থেকে এসে আমাদের উঠোনে উপস্থিত হলেন। তাঁকে আমরা গ্রামে এর আগে কখনও দেখিনি। তাঁর হাতে একটি চামড়ার ব্যাগ।
কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার এই যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে অথচ তাঁর সঙ্গে কোনো ছাতা নেই। তিনি যে বৃষ্টিতে ভেজেননি তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেল — তাঁর জামাকাপড় কোথাও ভিজে নেই বা তাঁর হাতে পায়ে কোথাও জলের চিহ্ন নেই। এমনকি মুখও বৃষ্টিতে ভেজেনি। সত্যিই অবাক কাণ্ড!
তাহলে কি তিনি গাড়িতে এসেছেন? কিন্তু বাইরে তো কোনো গাড়ি থামার শব্দ পাওয়া যায়নি।

তাঁকে দেখতে এমন — লম্বা-চওড়া, ফর্সা, মাথায় অল্প চুল আছে, গায়ে বাদামি রঙের সুতির জামা ও পরনে ধুতি। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মুখ লম্বাটে ধরনের। তবে মুখে কোনোদিনই মনে হয় হাসির রেখা ফুটে ওঠেনি — এতটাই গম্ভীর ও একপ্রকার বিরক্তিতে ভরা সে মুখ।

তাঁকে দেখে উঠোনের যেসব মানুষ বসেছিল তারা সবাই অবাক হয়ে গেল।
সত্যিই তারা এই মানুষটিকে আগে কখনও কোথাও দেখেনি।
ইনি কি তবে আকাশ থেকে চলে এলেন?

তিনি বললেন, “এই রোগের সমাধান একমাত্র আমিই করতে পারব। আপনারা দেখতে থাকুন এক ঘন্টার মধ্যেই ইনি(ঠাকুরদাদার দিকে ঈঙ্গিত করে) সুস্থ হয়ে উঠবেন।” বেশ কঠিন স্বরে বলে থামলেন।

প্রথমে তাঁকে আমাদের কারোরই ডাক্তার বলে মনে হয়নি। কে না জানি কোথা থেকে চলে এসে রোগ সারাতে লাগলেন — আর এইরকম গলার স্বর — মুখ সদাই গম্ভীর —- কিন্তু সাধারণত আমরা জানি ডাক্তার মানুষরা নম্র ভদ্র বিনয়ী ভাবে কথা বলেন।

যাইহোক, তিনি যখন রোগ সারাবেনই বলেছেন তাহলে অবশ্যই একজন ডাক্তার মানুষ। আমার বাড়ির মা, কাকিমারা চেয়ার এনে তাঁকে বসতেন দিলেন। জলখাবার খেতে দেয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন।
কিন্তু তিনি আবার সেই কঠিন স্বরে বললেন, “না আমি কিছুই খাব না। আমি শুধু ওনাকে রোগ থেকে মুক্তি করে দিয়ে চলে যাব।”

আমার বাবা বললেন, “আমরা তো কেউ আপনাকে বলিনি আমাদের বাড়িতে এমন রোগী আছে। তবে আপনি জানতে পারলেন কীভাবে?”
ডাক্তারবাবু আবার সেই একই স্বরে বললেন, “আমাকে বলতে হয় না আমি সবকিছুই জানতে পারি।”
তিনি তাঁর চটের ব্যাগ থেকে কী একটা ওষুধ বার করলেন — কালো শিশির মধ্যে ছিল — বড়ি মতো — সেটি জল দিয়ে ঠাকুরদাদাকে খেয়ে নিতে বললেন। আমার মা ঠাকুরদাদাকে জলের গ্লাস এগিয়ে দিলেন। ঠাকুরদাদা খেয়ে নিলেন।

প্রায় আধঘন্টা সবাই চুপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। উঠোন একদম শান্ত। বাইরে বৃষ্টি পড়ার শব্দ হচ্ছে। পরিবেশটা যেন এক প্রকার অপার্থিব হয়ে উঠেছে! ডাক্তার লোকটি ঠাকুরদাদার দিকে তাকিয়ে আছেন।

আরও আধঘন্টা পর ঠাকুরদাদা আস্তে আস্তে বললেন, “হ্যাঁ আমি এখন অনেকটাই ভালো হয়ে গেছি। ”
ঠাকুরদাদার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠেছে। আমার বাবা ঠাকুরদাদার গায়ে হাত দিয়ে দেখলেন জ্বর একদমই নেই।
ঠাকুরদাদা বললেন, (আমার মাকে উদ্দেশ্য করে) “বৌমা যাও তো কিছু খাবার নিয়ে আসো — কয়েকদিন ভালো ক’রে কিছু খাওয়া হয়নি।”

আমরা উঠোন শুদ্ধ লোক সবাই তো অবাক। যে মানুষটিকে আমাদের গ্ৰামের কোনো ডাক্তার সারাতে পারল না সেখানে এই মানুষটি কোথাও বলা নেই কওয়া নেই কোথা থেকে এসে — সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিলেন!

আমরা তাঁর নাম জানতে চাইলাম। তিনি বললেন (এবার রুক্ষ স্বরে), “আমার নাম জেনে আপনাদের লাভ নেই। আমাকে কোথাও খোঁজার চেষ্টা করবেন না। বিফল হবেন। এক সময় আমি ছিলাম।”

এই বলে তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে চলে গেলেন আর কোনো কথাই বললেন না। বাইরে তখন অন্ধকার নেমে এসেছে। কিন্তু বৃষ্টি হয়েই চলেছে।আমরা প্রায় সবাই তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। যেন মনে হ’ল লোকটি আমাদের বাড়ির বাইরে বেরিয়ে একপ্রকার অদৃশ্য হয়ে গেল। তিনি যে কোনদিকে গেলেন সেরকম বোঝা গেল না। লোকটি কি এই বৃষ্টির সঙ্গে মিশে গেল একেবারে? আমরা সবাই অবাক হয়ে গেলাম। এ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম।

তিনি চলে যাওয়ার পর আমার বাবা আমাদের সকলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “লোকটা ভালো ডাক্তার হতে পারে ঠিকই কিন্তু কথাবার্তা এত রুক্ষ প্রকৃতির ভাবা যায় না। আর শেষের দিকে কী যেন বললেন — একসময় আমি ছিলাম — মানে? উনি কি এখন নেই? তাহলে এখানে একটু আগে কে ছিল? — উনিই তো — তাহলে?”
আমাদের সকলের গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।

— অর্ঘ্যদীপ চক্রবর্তী
২/৩/২০২৬

মন্তব্য করুন