শূদ্রের মাঝে জাগিছে রুদ্র – কাজী নজরুল ইসলাম

শূদ্রের মাঝে জাগিছে রুদ্র

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ব্যথা-অনিদ্র দেবতা।

শুনি নির্জিত কোটি দীন-মুখে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বজ্র-ঘোষ বারতা।

এ কী মহা দীন রূপ ধরি ফের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পথে পথে ভাঙা কুটিরে,

সবারে অন্ন বিলায়ে আপনি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মাগিছ ভিক্ষা-মুঠিরে॥

কৃষক হইয়া কর্ষিছ ভূমি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ জলে ভিজে রোদে পুড়িয়া,

পরবাসে তুলি হরের লক্ষ্মী

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আঁধারে মরিছ ঝুরিয়া।

শ্রমিক হইয়া খুঁড়িতেছ মাটি,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ হীরক মানিক আহরি

রাজার ভাঁড়ার করিছ পূর্ণ

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নিজে নিরন্ন বিহরি।

আপনার গায়ে লাগাইয়া ধূলি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নির্মল রাখ ধরণি,

সকলের বোঝা বহিবার লাগি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মুটে কুলি হলে আপনি।

সকলের তরে রচিয়া প্রাসাদ,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নগর বসায়ে কাননে,

রাজমিস্ত্রির রূপে ফের সাঁঝে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ চুন-বালি মাখা আননে।

কুটিরে তোমার জলে না প্রদীপ,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কাঁদে নিরন্ন পরিজন,

সকলের তরে রচি শুচি-বাস

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নিজে হলে তাঁতি বিবসন।

আপনি হইয়া অশুচি মেথর

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ রাখিতেছ শুচি ভুবনে,

না হতে প্রভাত রাজপথ-ধূলি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মার্জনা কর গোপনে!

সকল রুচি ও শুচিতা তেয়াগি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আবিলতা কাঁধে বহিয়া,

ফিরিছ দেবতা হাড়ি ডোম হয়ে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সকলের ঘৃণা সহিয়া।

দ্বারবান হয়ে রক্ষিছ দ্বার,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সেব পদ হয়ে সেবাদাস,

দেবতা হইয়া মানুষের সেবা

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ করিতেছ তুমি বারো মাস।

ভেবেছিলে বুঝি,​​ ছলের ঠাকুর,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মর্ত্যের অধিবাসী সব

তোমারে চিনিয়া এই রূপে রূপে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পূজিয়া করিবে পরাভব।

যত সেবা দাও,​​ তত করে ঘৃণা,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ দেখিতে দেখিতে চারি কাল।

হইল অন্ত,​​ ধূর্জটি তাই

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ খেপিয়ে উঠেছে জটাজাল?

ছিলে শূদ্রের শ্মশানে-মশানে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ রুদ্ররূপী হে মহাকাল,

খুলিয়া পড়েছে রাজার পুরীতে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নাগ-বন্ধন বাঘছাল!

 ​​​​ 

যমের বাহন মহিষ,​​ তোমার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বাহন বৃষভ লইয়া

প্রমথের দল ছিল এতদিন

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শান্ত কৃষক হইয়া;

তব ইঙ্গিতে খেপিয়া উঠেছে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আজি কি সকলে নিখিলে?

তোমার ললাট-অগ্নি দিয়া কি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ রাজার শাস্তি লিখিলে?

 ​​​​ 

নমো নমো নমঃ শূদ্ররূপী হে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ রুদ্র ভীষণ ভৈরব!

পূর্ণ করো গো পাপ ধরণির,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মহাপ্রলয়ের উৎসব।

সৃষ্টির কথা তুমি জান,​​ দেব!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ এ ভীষণ পাপ-ধরাতে

পারি না বাঁচিতে;​​ এর চেয়ে ঢের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ভালো তব হাতে মরাতে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।