রানিগঞ্জের অর্জুনপটির বাঁকে

 ​​ ​​ ​​​​ যেখান দিয়ে নিতুই সাঁঝে ঝাঁকে ঝাঁকে

রাজার বাঁধে জল নিতে যায় শহুরে বউ কলস কাঁখে –

 ​​ ​​ ​​​​ সেই সে বাঁকের শেষে

 ​​ ​​ ​​​​ তিন দিক হতে তিনটে রাস্তা এসে

ত্রিবেণির ত্রিধারার মতো গেছে একেই মিশে।

 ​​ ​​ ​​​​ তেমাথার সেই ‘দেখাশুনা’ স্থলে

 ​​ ​​ ​​​​ বিরাট একটা নিম্ব গাছের তলে,

জটওয়ালা সে সন্ন্যাসীদের জটলা বাঁধত সেথা,

গাঁজার ধুঁয়ায় পথের লোকের আঁতে হত ব্যাথা।

 ​​ ​​ ​​​​ বাবাজিদের ‘ধুনি’ দেওয়ার তাপে –

 ​​ ​​ ​​​​ না সে তপের প্রতাপে –

 ​​ ​​ ​​​​ গাছে মোটেই ছিল নাকো পাতা,

উলঙ্গ এক প্রেত সে যেন কঙ্কালসার তুলেছিল মাথা।

 ​​ ​​ ​​​​ ভুলে যাওয়ার সে কোন নিশিভোর,

আজান’ যখন শহুরেদের ভাঙলে ঘুমের ঘোর,

 ​​ ​​ ​​​​ অবাক হয়ে দেখলে সবাই চেয়ে,

শুকনো নিমের গাছটা গেছে ফলে-ফুলে ছেয়ে!

 ​​ ​​ ​​​​ বাবাজিরাও তল্পি বেঁধে রাতেই

সটকেছেন সব;​​ বোধ হয় পড়েছিলেন বেজায় কাতেই।

 ​​​​ 

 ​​ ​​ ​​​​ অত ভোরেও হোথা

হট্টগোলের লাগল একটা বিষম জনতা।

 ​​ ​​ ​​​​ কিন্তু দেখে লাগল সবার তাক,

একোন মহাব্যাধিগ্রস্ত অবধূত নির্বাক?

 ​​ ​​ ​​​​ সে কী ভীষণ মূর্তি!

ঈষৎ তার এক চাহনিতে থেমে গেল গোলমাল সব স্ফূর্তি।

 ​​ ​​ ​​​​ জট-পাকানো বিপুল জটা,

মেদিনী-চুম্বিত শ্মশ্রু,​​ গুম্ফগুলো কটা,

সে এক যেন জটিলতার সৃষ্টি –

অনায়াসে সইতে পারে ঝড় ঝঞ্ঝা বৃষ্টি।

 

পা দুটো তার বেজায় খাটো – বিঘত খানিক মোটে,

দন্ত-প্রাচীর লঙ্ঘি অধর ছুঁতেই পায় না ঠোঁটে,

 ​​ ​​ ​​​​ চক্ষু ডাগর,​​ নাকটা বেজায় খাঁদা,

মস্ত দুটো লোহার শিকল দিয়ে

 ​​ ​​ ​​​​ হাত দুটো তার সব সময়ই বাঁধা,

ভাষাটা তার এতই বাধো-বাধো,

কইলে কথা বোঝাই যায় না আদৌ।

 ​​ ​​ ​​​​ ও পথ বেয়ে যেতে

 ​​ ​​ ​​​​ দুষ্টু ছেলে যা-তা দেয় খেতে,

ফকিরও সে এমনই সোজা নেবেই তা মুখ পেতে

 ​​ ​​ ​​​​ বিষ হোক চাই অমৃত হোক।

 ​​ ​​ ​​​​ দেখে অবাক লোক!

 ​​ ​​ ​​​​ শহরে সে কতই কানাঘুষি, -

কেউ বলে, ‘চাঁদ তল্পি বাঁধো,​​ তুমি শুধুই ভুসি।‘

কেউ বলে, ‘ভাই,​​ কাজ কী বকাবকির?

 ​​ ​​ ​​​​ হতেও পারে জবরদস্ত ফকির!’

এই রকম নানান কথা বলে যার যা খুশি!

 ​​ ​​ ​​​​ মৌন ফকির হাসে মুচকি হাসি।

 ​​​​ 

*  ​​ ​​ ​​ ​​​​ *  ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ *

 ​​​​ 

 ​​ ​​ ​​​​ দেখতে দেখতে এমনি করে

নিম গাছটার দুবার পাতা গেল ঝরে।

 ​​ ​​ ​​​​ ফকির তেমনি থাকে, -

​​ হঠাৎ সেদিন সেই পথেরই বাঁকে

নিশি – ভোরেই

বোঝাই গোরুর গাড়ি হেঁকে যাচ্ছিল খুব জোরেই

​​ খোট্টা গাড়োয়ান

 ​​ ​​ ​​​​ ভৈরবীতে গেয়ে গজল-গান।

হোহো’ করে হঠাৎ ফকির উঠল বিষম হেসে।

 ​​ ​​ ​​​​ গাড়ি-সুদ্ধ দামড়া বলদ চমকে উঠে এসে

 ​​ ​​ ​​​​ পড়ল হঠাৎ ফকিরেরই ঘাড়ে,

চাকা দুটো চলে গেল একেবারে বুকের হাড়ে,

 ​​ ​​ ​​​​ মড়মড়িয়ে উঠল পাঁজর যত! –

 ​​ ​​ ​​​​ গাড়োয়ান তো বুদ্ধিহত

খ্যাপার মতো ছুটোছুটি করছে থতমত!

 ​​ ​​ ​​​​ পুলিশ ছিল কাছেই

গাড়োয়ানেরে ধরে বাঁধলে ওই নিম্ব গাছেই।

 ​​ ​​ ​​​​ লাগল হুড়োহুড়ি –

তেমন ভোরেও লোক জমল সারাটা পথ জুড়ি।

 ​​ ​​ ​​​​ রক্তাক্ত সে চূর্ণ বক্ষে বদ্ধ দুটি হাত

থুয়ে ফকির পড়ছে শুধু কোরানের আয়াত,

হয়নি মুখে আদৌ ব্যাথার কোমল কিরণ-পাত,

 ​​ ​​ ​​​​ স্নিগ্ধ দীপ্তি সে কোন জ্যোতির আলোয়

ফেললে ছেয়ে বাইরের সব কুৎসিত আর কালোয়,

সে কোন দেশের আনন্দ-গীত বাজল তারই কানে,

 ​​ ​​ ​​​​ সেই-ই জানে, -

শিশুর মতো উঠল হেসে চেয়ে শূন্য পানে।

 ​​ ​​ ​​​​ ধ্যানমগ্ন ফকির হঠাৎ চমকে উঠে চায়,

 ​​ ​​ ​​​​ কুণ্ঠিত সে গাড়িওয়ালা গাছে বাঁধা,​​ হায়!

 ​​ ​​ ​​​​ প্রহার-ক্ষতে রক্ত বয়ে যায়!

 ​​ ​​ ​​​​ আকুল কণ্ঠে উঠল ফকির কেঁদে, -

ও গো,​​ আমার মুক্তিদাতায় কে রেখেছে বেঁধে?

 ​​ ​​ ​​​​ এ কোন জনার ফন্দি, -

বাঁধন যে মোর খুলে দিলে তায় করেছে বন্দি?

ভোরের সারা আকাশ-আলো ব্যেপে

 ​​ ​​ ​​​​ উঠল কেঁপে কেঁপে

দরবেশের সে ব্যাকুল বাণী অমৃত-নিষ্যন্দী!

চিরবদ্ধ হাতের শিকল অমনি গেল খুলে,

 ​​ ​​ ​​​​ ঝুলি হতে দশটি টাকা তুলে

লাল-পাগড়ির হাতে গুঁজে বললে, ‘শুনো ভাই,

 ​​ ​​ ​​​​ কোনো দোষ এর নাই,

 ​​ ​​ ​​​​ নির্দোষ এ অবোধ গাড়োয়ান,

এ মলে যে মরবে সাথে তিনটি ছোট্ট জান!’

নিমের ডালে হাজার পাখি উঠল গেয়ে গান!

 ​​ ​​ ​​​​ পায়ে ধরে কেঁদে পুলিশ কয়,

 ​​ ​​ ​​​​ এও কখনও হয়?

 ​​ ​​ ​​​​ ও গো সাধু,​​ অর্থ-লালসায়

আমি শুধু হব কি আজ বঞ্চিত দয়ায়?

 ​​ ​​ ​​​​ তা হবে না কভু,

পরশমণির বিনিময়ে পাথর নেব প্রভু?’

 ​​ ​​ ​​​​ বুক বেয়ে তার ঝরে অশ্রুনীর –

 ​​ ​​ ​​​​ দু-হাত ধরে তুলে তায় ফকির

বলে, ‘বাবা,​​ মোছ এ অশ্রুলোর,

 ​​ ​​ ​​​​ মুক্তি হবে তোর।

 ​​ ​​ ​​​​ ওই যে মুদ্রাগুলি

 ​​ ​​ ​​​​ গাড়োয়ানে দে তুলি!’ –

 ​​ ​​ ​​​​ নিম্ব গাছের সকল পাতা

ঝরঝরিয়ে পড়ল ঝরে – আর হল না কথা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।