মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল – কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত

মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
দুই ঠোঁট ছিঁড়ে নাও,
চোখের কোটর থেকে নীলপদ্ম তুলে নাও,
নিষিদ্ধ দেরাজ থেকে তুলে নাও বক্র ছুরি-ছররা-কার্তুজ।

মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
পিকাপে চকিত দেখা রূপস চিতার আলোড়ণে
তোমার শাড়ির ডোরা, হেডলাইট ছুটেছে অস্থির,
ভুটানি মদের গন্ধ খোলা চিলে,
তোমাকে চুম্বন করলে সমুদ্রের নীল জল ভয়ঙ্কর ফুঁসে ওঠে,
খাঁড়ির গর্জনে গ্রীবার সটান ভঙ্গি—
নাভির পাতালে তুমি প্রতি রাত্রে গুম করো একটি যুবক।

মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
চোখ দুটো দৃষ্টি রাখছে চোখের ওপর
হাত দুটো দৃষ্টি রাখছে হাতের ওপর
গোপন গহ্বর খুলে উবু হয়ে বের করো রেশমের ফাঁস
তুমি বিশালাক্ষী, তুমি মৃত্যু, নীলতারা,
হঠাৎ সশব্দে ফেটে বুক মুখ জ্বেলে দাও ঈর্ষার অ্যাসিডে!

মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
এত সরলতা
স্টোভের বুকের পরে নীল ফুল হয়ে বসে থাকা
লাল রিবনের ঘূর্ণি মহল্লায় মহল্লায় ছোরা-চালাচালি
করুণ শাখার মতো কৃশ হাত কতকাল ছুঁইনি তোমাকে
ঘুমের ভিতরে নির্বাসন-দণ্ড দিইনি তোমাকে
শুয়োরের গন্ধে ম ম শালবন—
খয়েরি ফিতার টানে ছুটে যায় লাটাগুড়ি, চালসা ফরেস্ট।
কিছুটা সময় আরো
রুদ্র সাগরের তেল হু হু করে জ্বলে যাচ্ছে
ত্যাপিটালে শব্দ তুলে কেটে যায় হাজার মাইল
স্টিয়ারিং জেদি ঘোড়া অবাধ্য গিয়ার-বাক্সো ব্রেক ধরছে না . . .

এই বেলা
টান টান উঠে এসো,
ঘন ঘন দন্তের পীড়নে
ওষ্ঠপুটে ফোটাও প্রবাল,
এই বেলা
ছোখ মুখ খুবলে নাও
.          ট্রিগারে তর্জনি রাখো জ্বালাও মাইন
কিছুটা সময় আরো
মধ্যরাত ছুঁতে আর সাত মাইল . . .
.             পাঁচ . . .
.                 চার . . .
.                     তিন . . .

কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন 

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন