বুধুয়ার পাখি – অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

জানো এটা কার বাড়ি? শহুরে বাবুরা ছিল কাল,
ভীষণ শ্যাওলা এসে আজ তার জানালা দেয়াল
ঢেকে গেছে, যেন ওর ভয়ানক বেড়ে গেছে দেনা,
তাই কোনো পাখিও বসে না!
এর চেয়ে আমাদের কুঁড়েঘর ঢের ভালো, ঢের
দলে-দলে নীল পাখি নিকোনো নরম উঠোনের
ধান খায়, ধান খেয়ে যাবে—
বুধুয়া অবাক হয়ে ভাবে |

এবার রিখিয়া ছেড়ে বাবুডির মাঠে
বুধুয়া অবাক হয়ে হাঁটে,
দেহাতি পথের নাম ভুলে
হঠাৎ পাহাড়ে উঠে পাহাড়ের মতো মুখ তুলে
ভাবে : ওটা কার বাড়ি, কার অত নীল,
আমার ঘরের চেয়ে আরো ভালো, আরো
নিকোনো উঠোন তার, পাখিবসা বিরাট পাঁচিল!
ওখানে আমিও যাব, কে আমায় নিয়ে যেতে পারো?

এইভাবে প্রতিদিন বুধুয়ার ডাকে
কানায় কানায় আলো পথের কলসে ভরা থাকে,
ঝাঁকে-ঝাঁকে পাখি আসে, কেউ তার দিদি, কেউ মাসি,
রুপোলি ডানায় যারা নিয়ে যায় বুধুয়ার হাসি ||

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত (৬ অক্টোবর ১৯৩৩ — ১৭ নভেম্বর ২০২০) একজন বিশিষ্ট বাঙালি কবি ও চিন্তাশীল প্রাবন্ধিক। রচনার প্রাচুর্য এবং বৈচিত্র্যে,মনীষা এবং সংবেদনশীলতায় তিনি বাংলাসাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তিনি ২০টিরও বেশি কবিতার বই লিখেছেন , বাংলা এবং সাঁওতালী কবিতা ও নাটক ইংরেজি এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেছেন, এবং জার্মান ও ফরাসি সাহিত্য থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তিনি বেশ কয়েকটি বই প্রবন্ধের প্রকাশ করেছেন। তাঁর স্বতন্ত্র গদ্যশৈলীর জন্য তিনি সুপরিচিত।কবি অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতীতে পড়াশোনা করেছেন, ও তারপরে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে, প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়েন এবং অবশেষে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ভারতীয় কবিতায় গীতি নিয়ে তাঁর পড়াশুনার জন্য পিএইচডিপ্রাপ্ত হন। তিনি লিটল ম্যাগাজিনসমূহের সাথে ভীষণভাবে যুক্ত হয়ে মূল জার্মান কাজগুলিকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করতে থাকেন।লেখালেখির সূচনাকাল থেকেই তাঁর কবিতায় কথোপকথনে এক নিজেস্ব আদল | রচনার প্রাচুর্য এবং বৈচিত্রে, মনীষা এবং সংবেদনশীলতায় তিনি আজ বাংলা সাহিত্যের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব | তাঁর ছন্দনৈপূণ্য এবং ভাষার কারুকার্য যেমন তাঁর কাব্য- অবয়বকে একটি স্বকীয়তা দিয়েছে, তেমনই বৈদগ্ধ্য, বিশ্বমনস্কতা কাব্য জগতকে দিয়েছে বিশালতা এবং নান্দনিক সৌন্দর্য |"যৌবনবাউল" (১৯৫৯), "রক্তাক্ত ঝরোখা" (১৯৬৯), "ছৌ-কাবুকির মুখোস" (১৯৭৩), "গিলোটিনে আলপনা" (১৯৭৭), "দেবীকে স্নানঘরে নগ্ন দেখে" (১৯৮৩), "মরমী করাত" (১৯৯০) প্রভৃতি তাঁর কাব্যগ্রন্থের মধ্যে অন্যতম | "সোফোক্লিসের আন্তিগোনে" (১৯৬৩) এবং জার্মান ভাষা থেকে অনুবাদ "প্রেমে পরবাসে" (১৯৮৩), "হাইনের কবিতা", "অঙ্গীকারের কবিতা" (১৯৭৭) তাঁর ভাষান্তর কুশলতার জন্য স্মরণীয় | তাঁর গদ্য রচনার মধ্যে "শিল্পিত স্বভাব" (১৯৬৯), "স্থির বিষয়ের দিকে" (১৯৭৬) বিশেষ উল্লেখযোগ্য | ইংরেজী এবং জার্মান ভাষাতেও তাঁর একাধিক গ্রন্থ আছে |নানা সময়ে নানা পুরস্কারে কবি ভূষিত হয়েছেন | পেয়েছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুধা বসু পুরস্কার (১৯৮৩), জার্মানির শ্রেষ্ঠ গ্যোয়েটে পুরস্কার (১৯৮৫), আনন্দ পুরস্কার (১৯৮৫), রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৮৭) | "মরমী করাত" কাব্যগ্রন্থের জন্য পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার (১৯৯২) |

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন