(কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘খাঁচার পাখি’ শীর্ষক করুণ কবিতাটি পড়িয়া)

কে ভাই তুমি সজল গলায়

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গাইলে গজল আপশোশের?

ফাগুন-বনের নিবল আগুন,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ লাগল সেথা ছাপ পোষের।

 

দরদ-ভেজা কান্না-কাতর

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ছিন্ন তোমার স্বর শুনে

ইরান মুলুক বিরান হল

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ এমন বাহার-মরশুমে।

 

সিস্তানের ওই গুল-বাগিচা

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গুলিস্তান আর বোস্তানে

সোস্ত হয়ে দখিন হাওয়া

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কাঁদল সে আপশোশ-তানে।

 

এ কোন যিগর -পস্তানি সুর?

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মস্তানি সব ফুল-বালা

ঝুরল,​​ তাদের নাজুক বুকে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বাজল ব্যথার শূল-জ্বালা।

 

আবছা মনে পড়ছে,​​ যে দিন

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শিরাজ -বাগের গুল ভুলি

শ্যামল মেয়ের সোহাগ-শ্যামার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শ্যাম হলে ভাই বুলবুলি, –

 

কালো মেয়ের কাজল চোখের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পাগল চাওয়ার ইঙ্গিতে

মস্ত্ হয়ে কাঁকন চুড়ির

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কিঙ্কিণি রিন ঝিন গীতে।

 

নাচলে দেদার দাদরা তালে,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কারফাতে,​​ সরফর্দাতে, –

হাঠাৎ তোমার কাঁপল গলা

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ খাঁচার পাখি’ ‘গর্বাতে’।

 

চৈতালিতে বৈকালি সুর

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গাইলে, “নিজের নই মালিক,

আফ্‌সে মরি আপশোশে আহ্,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আপ-সে বন্দী বৈতালিক।

 

কাঁদায় সদাই ঘেরা-টোপের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আঁধার ধাঁধায়,​​ তায় একা,

ব্যথার ডালি একলা সাজাই,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সাথির আমার নাই দেখা।

 

অসাড় জীবন,​​ ঝাপসা দুচোখ

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ খাঁচার জীবন একটানা।”

অশ্রু আসে,​​ আর কেন ভাই,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ব্যথার ঘায়ে ঘা হানা?

 

খুব জানি ভাই,​​ ব্যর্থ জীবন

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ডুবায় যারা সংগীতেই,

মরম-ব্যথা বুঝতে তাদের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ দিল-দরদি সঙ্গী নেই।

 

জানতে কে চায় গানের পাখি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বিপুল ব্যথার বুক ভরাট,

সবার যখন নওরাতি,​​ হায়,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মোদের তখন দুঃখ-রাত!

 

ওদের সাথি,​​ মোদের রাতি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শয়ন আনে নয়ন-জল;

গান গেয়ে ভাই ঘামলে কপাল

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মুছতে সে ঘাম নাই অঞ্চল।

 

তাই ভাবি আজ কোন দরদে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ পিষছে তোমার কলজে-তল?

কার অভাব আজ বাজছে বুকে,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কলজে চুঁয়ে গলছে জল!

 

কাতর হয়ে পাথর-বুকে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বয় যবে ক্ষীর-সুরধুনী,

হোক তা সুধা,​​ খুব জানি ভাই,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সে সুধা ভরপুর-খুনই।

 

আজ যে তোমার আঁকা-আঁশু

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কণ্ঠ ছিঁড়ে উছলে যায় –

কতই ব্যথায়,​​ ভাবতে যে তা

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ জান ওঠে ভাই কচলে হায়!

 

বসন্ত তো কতই এল,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গেল খাঁচার পাশ দিয়ে,

এল অনেক আশ নিয়ে,​​ শেষ

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ গেল দীঘল-শ্বাস নিয়ে।

 

অনেক শারাব খারাব হল,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ অনেক সাকির ভাঙল বুক!

আজ এল কোন দীপান্বিতা?

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কার শরমে রাঙল মুখ?

 

কোন দরদি ফিরল?​​ পেলে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কোন হারা-বুক আলিঙ্গন?

আজ যে তোমার হিয়ার রঙে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ উঠল রেঙে ডালিম-বন!

 

যিগর-ছেঁড়া দিগর তোমার

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আজ কি এল ঘর ফিরে?

তাই কি এমন কাশ ফুটেছে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তোমার ব্যথার চর ফিরে?

 

নীড়ের পাখি ম্লান চোখে চায়,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শুনছে তোমার ছিন্ন সুর;

বেলা-শেষের তান ধরেছে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ যখন তোমার দিন দুপুর!

 

মুক্ত আমি পথিক-পাখি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আনন্দ-গান গাই পথের,

কান্না-হাসির বহ্নি-ঘাতের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বক্ষে আমার চিহ্ন ঢের​​ ;

 

বীণ ছাড়া মোর একলা পথের

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ প্রাণের দোসর অধিক নাই,

কান্না শুনে হাসি আমি,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আঘাত আমার পথিক-ভাই।

 

বেদনা-ব্যথা নিত্য সাথি, –

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তবু ভাই ওই সিক্ত সুর,

দুচোখ পুরে অশ্রু আনে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ উদাস করে চিত্ত-পুর!

 

ঝাপসা তোমার দুচোখ শুনে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সুরাখ হল কলজেতে,

নীল পাথারের সাঁতার পানি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ লাখ চোখে ভাই গলছে যে!

 

বাদশা-কবি! সালাম জানায়

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ভক্ত তোমার অ-কবি,

কইতে গিয়ে অশ্রুতে মোর

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কথা ডুবে যায় সবই!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।