তিনি এসেছেন ফিরে – শামসুর রাহমান

0
2

লতাগুল্ম, বাঁশঝাড়, বাবুই পাখির বাসা আর
মধুমতি নদীটির বুক থেকে বেদনাবিহ্বল
ধ্বনি উঠে মেঘমালা ছুঁয়ে
ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলায়।

এখন তো তিনি নেই, তবু সেই ধ্বনি আজ শুধু
তাঁরই কথা বলে;
মেঘনা নদীর মাঝি যখন নদীতে
ভাটিয়ালী সুর তোলে, তার
পালে লাগে দীর্ঘদেহী সেই পুরুষের দীর্ঘশ্বাস,
যখন কৃষক কাস্তে হাতে
ফসলের যৌবনের উদ্ভিন্ন উল্লাস দেখে মাতে,
তখন মহান সেই পুরুষের বিপুল আনন্দধ্বনি ঝরে
ফসলের মাঠে,
যখন কুমোর গড়ে মাটির কলস, ঘটিবাটি,
নানান পুতুল চাকা ঘোরাতে ঘোরাতে,
তখন সৃজনশিল্পে তার
জেগে ওঠে মহান নেতার স্বপ্নগুলি,
উচ্ছ্বসিত লাউডগা, কচুপাতা, কুয়োতলা, পোয়াতি
কুমোর বউ।

ওরা তাঁকে হত্যা ক’রে ভেবেছিল তিনি
সহজে হবেন লুপ্ত উর্ণাজাল আর ধোঁয়াশায়,
মাটি তাঁকে দেবে চাপা বিস্মৃতির জন্মান্ধ পাতালে-
কিন্তু তিনি আজ সগৌরবে
এসেছেন ফিরে দেশপ্রেমিকের দীপ্র উচ্চারণে,
সাধারণ মানুষের প্রখর চৈতন্যে,
শিল্পীর তুলিতে, গায়কের গানে, কবির ছন্দের
আন্দোলনে,
রৌদ্রঝলসিত পথে মহামিছিলের পুরোভাগে।

কবি শামসুর রাহমান – স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কবিতার উর্ধে উঠে নিজেকে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যার ফলে ১৯৯৯ সালে ইসলামী মৌলবাদী সংঘটন “হরকত উল্-জিহাদ-আল্-ইসলামী” তাঁকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে। সৌভাগ্যবশত তিনি বেঁচে যান। কবি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মামাবাড়ী, ঢাকার ৪৬নং মাহুতটুলিতে। পিতা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মাতা আমেনা বেগম। তাঁর পৈতৃক ভিটা, মেঘনা নদীর তীরে, নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার পাহাড়তলি গ্রামে অবস্থিত। ১৩ জন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। ১৮ বছর বয়স থেকে শুরু হয় তাঁর কবিতা রচনা। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রংন্থ “প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে” (১৯৬০)। কবির প্রাপ্ত সম্মান ও পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, আনন্দ পুরস্কার প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় বর্তমান বাংলাদেশ তার বিচিত্র ভাবনা, অনুভূতি, ও সমস্যাজটিল জীবনের একটি শক্তিশালী ভাষা খুঁজে পেয়েছে।