গঙ্গা আমার মা – অমিতাভ দাশগুপ্ত

0
216

কবি আজকাল ভোরবেলা ওঠে
বাগবাজারের গঙ্গার ঘাঁটে যায়
পাশে বাঁ হাতের মতো স্ত্রী
কবির সারা শরীরে সার সার পিনিশ সালতি নৌকো
লঞ্চের ছুঁচলো সিটি
সমুদ্রগামী জাহাজের সুগ্মভীর ডাক
অথচ
পিত্তপ্রধান পায়ের পাতা সিঁড়ির প্রথম ধাপে পেতে
সে চুপচাপ বসে থাকে
আর
সমস্ত গঙ্গা যখন একটি আভূমিপ্রণতা নারী হয়ে
তাঁর রোগা পা ছুঁয়ে প্রণাম করে—
রাগী বাবার মতো সে গোড়ালি সরিয়ে নেয়।

সে জানে
তাঁর রাতজাগা পিঠে বর্শা হয়ে বিঁধে আছে
নিখাকি কলকাতার নিঃশ্বাস
কাজল, মদ আর রুপোর গঁদের ভেতর
আকন্ঠ ডুকে আছে মড়াপোড়ানো কলের চিমনি
জোব চার্নকের থ্যাঁৎলানো অহঙ্কার।

ওপারে বেলুড় মঠ দেখা যায়
কবির পাশে সারদামণির মতো বসে থাকে কবির স্ত্রী
কবির চোখের সামনে প্রতিদিন গলায় কলসি বেঁধে
গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পড়ে বারুইপুর হরিনাভি ভাটপাড়া
জলে মিশে একাকার
জোড়াসাঁকো হাড়কাটা

বাজে বলিবাদ্য বানফোঁড়ার বাজনা জয়জোকার
ডবকা দক্ষিণ থেকে হাজামজা উত্তরে
উড়ে আসে কালো নোটের বান্ডিল
কাগজের নৌকো
স্ফুরিত পরিসংখ্যান
অল-ক্লিয়ারের বিপ বিপ

আর কাশী মিত্তির নিমতলা রতনবাবুর ঘাটে ঘাটে
শেষবারের মতো
হাওয়ায় হাওয়ায় ডুক্রে ওঠে ভূপেন হাজারিকা—
গঙ্গা আমার মা…
গঙ্গা আমার মা… ।

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন