Home / অমিতাভ দাশগুপ্ত / ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ – কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত

ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ – কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত

ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!

চরায়-বড়ায় খই ফুটেছে তপ্ত খোলা
পাথর মাটি পাথর,
গোয়ালে গাই বিইয়েছে
তার দুধ বাঁটে নেই এক পো,
পুকুর-নদীর জল শুকিয়ে বাষ্প,
কোলে কলসি, কাঁখে কলসি কাতার কাতার
ছা বৌ জোয়ান মদ্দ ভাতার

চলছে চলছে—
এক মূকাভিনয়
তার খেজুরের মাথার ওপর খাঁড়ার মতো দাঁড়িয়ে দ্যাখে
অলপ্পেয়ে সময়।

ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!

লে লে ছে আনা লে যা লিবি ছে আনা
আমি রাজার ভাতিজা—এসেছি সদর থেকে
গাঁও বুড়ো থেকে ঘরের ঝিয়ারি,
বাল-বাচ্চাও শুধোয়—
তুমি কোঁচড়ো এনেছো কি ?
এনেছি—এনেছি প্রতিশ্রুতি।
আমি এনেছি টি আর, জি আর
সেচ প্রকল্প, সার, গোরু,
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।
এই আমিন, এদিকে এসো,
ওরা যা বলে, সবটা টোকো
খুব ভালো করে মাপো-জোকো
যত দাবি আছে মোটা সরু—
আমি ছ’হাজার নলকূপে
জলে নদী করে দেব মরু।

হাড়ের ওপর মাই কামড়ে
টিংটিঙে প্যাকাটি—
ফটো খিঁচুন প্রেস,
মজা পুকুরে পেট ফুলো ঢোল
শ্যামলী ধবলী—
ফটো খিঁচুন প্রেস.
এমন মাটি মায়ের আঁচল
এখন গর্ত-খোদল-ফাটল,
ছাতিফাটার মাঠ
হা হা খিদে দিচ্ছে ঝাঁট,
মুখে মুখোশ এঁটে নিস,
হিস্ হিস্ হিস্ হিস্
জমি-জিরেত জ্বালিয়ে
ধা ধা কালকেউটের বিষ।
হট্ যা হট্ টিয়ে টা
এই সিরিঙ্গী মেয়েটা

ওর মা মরেছে আটষট্টির বন্যায়
বাপ এ সনের খরায়,
ওকে ছুঁয়ো না ছুঁয়ো না ছিঃ
ও যে যমের অরুচি!

কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন 

About অমিতাভ দাশগুপ্ত

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

মন্তব্য করুন