এসো স্পর্শ করো – কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত

0
340

.            এসো।
.            ছোঁও।
সম্পূর্ণ পাথর হয়ে গেছি কিনা, দ্যাখো।
পাথরের বুক থেকে মাংস নাও,
পাঁজরের রিডে রিডে চাপ দাও দশটি আঙুলে,
.            আমাকে বাজাও তুমি
.            বিঠোফেন-বালিকার হাত,
.            বলো—
.            আমি প্রত্ন নই,
.            নই অন্ধ, জমাট খনিজ,
.            বলো—সব শেষ নয়,
এখনও আমার কিছু সম্ভাবনা আছে।

টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
.         মেটেনি কুসুম।
ভুল চাওয়া নিয়ে গেছে ভুল সিন্ধু পারে।
সেখানে মুখোশ, পরচুলো
বালির সাদায় ওড়ে দূরতম হাসির মতন,
গাঢ় শোচনার রঙে সন্ধ্যা নামে,
ডেকে ওঠে হাড়গিলে, অসুখী শকুন—
টিলার ওপরে হা হা সূর্যাস্ত দেখার সাধ
.        মেটেনি কুসুম।

.          দ্যাখো,
কতখানি দীন হয়ে গেছি আশায় আশায়
.         কত বেশি পেতে চেয়ে
নিজেকে ভেঙেছি অন্ধ, ভ্রুক্ষেপবিহীন,
ছেঁড়া শিমুলের আঁশে উড়িয়েছি সর্বস্ব আমার,
.         ‘দাও’ ‘দাও’ হাহাকারে
কখন উঠেছে জেগে বৈজুনাথ—প্রধান চণ্ডাল ;
.         সুনীলে পাতালে
.         এখন যে দিকে চাও
ব্যথিত প্রশ্নের হাড়, করোটি, কংকাল!

.           মকরবাহিনী-জলে
পোশাক ভাসিয়ে আজ এসে দাঁড়িয়েছি—
.           স্পর্শ করো,
অগ্নিতে সঁপেছি স্বাহা, অহংকার,
.           রাখো, ভাঙো মারো,
তুলনামূলক প্রেমে সারারাত জেগে থাক
.           আমাদের কাঠ ও করাত,
.           আমাকে বাজাও তুমি
.           বিঠোফেন-বালিকার হাত।

কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন 

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন