এই স্পার্টাকাস-রাত – অমিতাভ দাশগুপ্ত

আজ রাতে
.          যখন চারপাশ সুনসান,
মশারির অনের নিচু থেকে
.                  অম্লজান টানার শব্দ,
গলি-উপগলি-কানাগলির শিরায়, টানেলে
.                                     ঝুপঝাপ অন্ধকার,
গাড়িবারান্দার নীচে
.                     ঘর-ছুট্ মানুষ আর আকাশের
অশ্রুর লবণ মিলে-মিশে একাকার,
.                           শ্যামবাজারের পঞ্চমুখী মোহনায়
নেতাজী সুভাষচন্দ্রের ঘোড়ার লেজের ওপর
.                           ঘনঘন ছিপ্ টি মারছে বিদ্যুৎ
বেশ্যার থালার ওপর
.                    মাংসভুক পুলিশের থাবা,
শ্মশানে-শ্মশানে
চিতার আগুনের চারপাশে
গোল হয়ে বসে থাকা মানুষজনের
হাতে হাতে ভোলাবাবার ধোঁয়াটে প্রসাদ,
তিন ইঁটের উনুনে
টগবগ শাকপাতায় ত্রিনয়ন রেখে
ফুটপাথের অন্নপূর্ণা,
তাকে ঘিরে
.            কয়েকটি হাভাতে-জাতকের ছায়া
পাতালের দরজায় ঘাতক,
হাসপাতালের দরজায় মরণ . . .
ঠিক তখনই
.           আমি তোমাকে এই চিঠি লিখতে বসেছি,
জুলিয়াস সিজার!
তোমাকে তিনবার মুকুট সাধা হয়েছিল।
তিনবার তুমি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলে।
কাস্ কা, ব্রুটাস, অ্যান্টনিদের ভীড় থেকে
নিজেকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে
এক গোলার্ধ থেকে আরেক গোলার্ধ
.                                 তোমার পায়ের শব্দ,
আগুনের কপাট-খোলা সব কটি চুল্লি
এখন তোমার হাঁ-মুখ,
আকাশ-প্রেমিক সোনালি অ্যাপার্টমেন্ট-এর মাথায়
জ্বল জ্বল তোমার লাল চোখ,

চিমনির ধোঁয়ায়
গঙ্গার জলে
বেবিফুডহীন শিশুদিবসের কালো আকাশে
তোমার নিশ্বাসের বিষ,
কলকাতার প্রতিটি মানুষের
ঘাড়ের ওপর
.              নেকড়ের মত গড়িয়ে ওঠা তোমার উল্লাস
আমার হাতে তুলে নিয়েছি
এই একাঘ্ন
এই ক্ষমাহীন কলম
যা দিয়ে আজ রাতে
আমি তোমাকে চিঠি লিখতে বসেছি,
.                             জুলিয়াস সিজার!

তোমার শববাহকেরা
অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
পরম অধীরতায়
পাথুরে রাস্তায় জুতোর নালের শব্দ তুলছে,
কালো কাপড়
তোমাকে ঢেকে দেবে বলে
অতিকায় ডানা মেলে
.                  ছটফট করছে হাওয়ায় হাওয়ায়,
হাজা-মজা মানুষের
হাতে হাতে উঠে আসছে
.                     প্রত্নের পাথর,
কুষ্ঠরোগীর শক্ত মুঠি
.              পাল্টে যাচ্ছে গ্রেনেডে,
তোমার মধ্যরাতের সুরায়
মিশে যাচ্ছে
নিহত ভূমিপুত্রের বুক ভেঙে উঠে আসা
.                                        আর্সেনিক,
তোমার প্রিয় গোলাপের পাপড়ির আড়ালে
অপেক্ষায় স্থির বজ্রকীট,
ভিখারি ক্রীতদাস ধর্ষিতা কিশোরী
অপমানিত বিদূষকদের
চোখ
আর আমার চিঠির প্রতিটি অক্ষর
নিবু নিবু লণ্ঠনের আলোয়
তোমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে
কত কল্পান্তের শেষে
টেনে নিয়ে এসেছে আজ এই রাতে
বলির বাজনায় ঝা ঝা মশানভাঙার মাটিতে।

এই স্পার্টাকাস-রাত
আর এই একাঘ্নী চিঠি
তোমার শববাহকদের সঙ্গে
শেষবারের মতো
কিছু জরুরি কথাবার্তা সেরে নিচ্ছে,
.                    জুলিয়াস সিজার!

কবি অমিতাভ দাশগুপ্তের কবিতার পাতাঃ এখানে ক্লিক করুন 

কবি অমিতাভ দাশগুপ্ত – জন্মগ্রহণ করেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে। ফরিদপুরের ঈশান স্কুলে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৪৪ সালে কবিকে কলকাতার “টাউন স্কুলে” ভর্তি করে দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তিনি স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে আই.এ. পাশকরেন এবং ১৯৫৪ সালে সিটি কলেজে ভর্তি হন। এই সময়ে তিনি, কলকাতায়, ক্রিকেটার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ১৯৫৬ সালে তিনি রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। এই সময়ে তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যতা গ্রহণ করেন এবং কারাবরণ করেন। আজীবন তিনি এই পার্টিরই (C.P.I.) সদস্য থেকে গিয়েছিলেন। “দেশ” পত্রিকায় তাঁর কবিতা সর্বপ্রথম ছাপা হয়। তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শেষ উপন্যাস “হলুদ নদী সবুজ বন” লিখতে সাহায্য করেছিলেন। এই সময়ে মানিকবাবুর শারীরিক অবস্থা এমন ছিল যে তিনি নিজে লিখতে পারছিলেন না। ১৯৫৭ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন এবং অনুরাধা দেবীর সঙ্গে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন। এরপর তিনি জলপাইগুড়িতে গিয়ে আনন্দচন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন এবং সেখানকার চা-শ্রমিকদের বামপন্ঙী আন্দোলনে যোগদান করতে উদ্বুদ্ধ করেন। ১৯৬৮ সালে আবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৬৯ সালে তিনি কলকাতার সেন্ট পল কলেজে অধ্যাপনার কাজে যুক্ত হন এবং কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র “কালান্তর” পত্রিকার সম্পাদক মণ্ডলীতে যোগ দিয়ে কাজ করা শুরু করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি “পরিচয়” পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিযুক্ত হন। বিভিন্ন সময়ে এই কবি বিবিধ সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। আকাশবাণীর সুবর্ণ জয়ন্তীর জাতীয় কবি সম্মেলনে, তিনি নির্বাচিত কবি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গকে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। ১৯৭৯ সালে কবিতার উত্কর্ষের জন্য ভূষিত হয়েছিলেন নক্ষত্র পুরস্কার এবং প্রসাদ পুরস্কারে। ১৫ই অগাস্ট ১৯৯৪ তে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের বিরুদ্ধে অযোদ্ধায় গিয়ে কবি তাঁর কবিতা পাঠ করে এসেছিলেন। “আমার নীরবতা আমার ভাষা” কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৯৯ সালে পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রবীন্দ্র পুরস্কার।

দয়া করে মন্তব্য করুন

দয়া করে মন্তব্য করুন
দয়া করে আপনার নাম লিখুন