এই মাতোয়ালা রাইত – শামসুর রাহমান

0
1

হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের
লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি
মাগীর চক্ষুর কাজলের টান এই মাতোয়ালা
রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন
আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান
আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিনে বান্ধা পাও

আবে, কোন্ মামদির পো সামনে খাড়ায়? যা কিনার,
দেহস না হপায় রাস্তায় আমি নামছি, লৌড় দে;
না অইলে হোগায় লাথ্থি খাবি, চটকানা গালে।
গতরের বিটায় চেরাগ জ্বলতাছে বেশুমার।

আমারে হগলে কয় মইফার পোলা, জুম্মনের
বাপ, হস্না বানুর খসম, কয় সুবরাতি মিস্ত্রি।
বেহায়া গলির চাম্পা চুমাচাট্টি দিয়া কয়, ‘তুমি
ব্যাপারী মনের মানু আমার, দিলের হকদার।’

আমার গলায় কার গীত হুনি ঠাণ্ডা আঁসুভরা?
আসলে কেউগা আমি? কোন্হানতে আইছি হালায়
দাগাবাজ দুনিয়ায়? কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ?
চুড়িহাট্টা, চান খাঁর পুল, চকবাজার, আশক
জমাদার লেইন, বংশাল; যেহানেই মকানের
ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল
মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ,
যেমুন আধলি একখান খুব দূর জামানার।

আমার হাতের তালু জবর বেগানা লাগে আর
আমার কইলজাখান, মনে অয়, আরেক মানুর
গতরের বিতরে ফাল পাড়ে; একটুকু চৈন নাই
মনে, দিল জিঞ্জিরার জংলা, বিরান দালান। জানে
হায়বৎ জহরিলা কেঁকড়ার মতন হাঁটা-ফিরা
করে আর রাইতে এমুনবি অয় নিজেরেও বড়
ডর লাগে, মনে অয় যেমুন আমিবি জমিনের
তলা থন উইঠা আইছি বহুত জমানা বাদ।

এ-কার মৈয়ত যায় আন্ধার রাইতে? কোন ব্যাটা
বিবি-বাচ্চা ফালাইয়া বেহুদা চিত্তর অইয়া আছে
একলা কাঠের খাটে বেফিকির, নোওয়াব যেমুন?
বুঝছোনি হউরের পো, এলা আজরাইল আইলে
আমিবি হান্দামু হ্যাষে আন্ধার কব্বরে। তয় মিয়া
আমার জেবের বিতরের লোটের মতই হাচা মৌত।

এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে
গোলাব ফুলের বাস, মাঠার মতন চান্নি দিলে
নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ
মাইয়া, গহীন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর
আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ, ঝুম
কাওয়ালীর তান, পৈখ সুনসান বানায় ইয়াদ।
এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া
মৌত তক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই।

তামাম দালান কোঠা, রাস্তার কিনার, মজিদের
মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের
পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির-
হগলই খোওয়াব লাগে আর এই বান্দাবি খোওয়াব!

কবি শামসুর রাহমান – স্বাধীন বাংলাদেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি কবিতার উর্ধে উঠে নিজেকে একজন ধর্মনিরপেক্ষ মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, যার ফলে ১৯৯৯ সালে ইসলামী মৌলবাদী সংঘটন “হরকত উল্-জিহাদ-আল্-ইসলামী” তাঁকে হত্যার চেষ্টা পর্যন্ত করে। সৌভাগ্যবশত তিনি বেঁচে যান। কবি জন্মগ্রহণ করেন তাঁর মামাবাড়ী, ঢাকার ৪৬নং মাহুতটুলিতে। পিতা মুখলেসুর রহমান চৌধুরী ও মাতা আমেনা বেগম। তাঁর পৈতৃক ভিটা, মেঘনা নদীর তীরে, নরসিংদী জেলার রায়পুর থানার পাহাড়তলি গ্রামে অবস্থিত। ১৩ জন ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ। ১৮ বছর বয়স থেকে শুরু হয় তাঁর কবিতা রচনা। তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রংন্থ “প্রথম গান দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে” (১৯৬০)। কবির প্রাপ্ত সম্মান ও পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক, স্বাধীনতা পদক, আনন্দ পুরস্কার প্রভৃতি। তাঁর কবিতায় বর্তমান বাংলাদেশ তার বিচিত্র ভাবনা, অনুভূতি, ও সমস্যাজটিল জীবনের একটি শক্তিশালী ভাষা খুঁজে পেয়েছে।