বাদলের নিশি অবসানে মেঘ-আবরণ অপসারি

ওঠে যে সূর্য – প্রদীপ্ততর রূপ তার মনোহারী।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সিক্তশাখায় মেঘ-বাদলের ফাঁকে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বউ কথা কও’ পাপিয়া যখন ডাকে–

সে গান শোনায় মধুরতর গো সজল জলদচারী!

বর্ষায়-ধোয়া ফুলের সুষমা বর্ণিতে নাহি পারি!

 ​​​​ 

কান্নার চোখ-ভরা জল নিয়ে আসে শিশু অভিমানী,

হাসির বিজলি চমকি লুকায় তার কাছে লাজ মানি।

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কয়লার কালি মাখি যবে হিরা ওঠে,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ সে রূপ যেন গো বেশি করে চোখে ফোটে!

নীল নভো ঠোঁটে এক ফালি হাসি দ্বিতীয়ার চাঁদখানি

পূর্ণশশীর চেয়ে ভালো লাগে – কেন কেহ নাহি জানি!

 ​​​​ 

পথের সকল ধুলো কাদা মাখি যে শিশু ফেরে গো ঘরে,

সে কি গো পাইতে বেশি ভালোবাসা যত্ন জননী করে?

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মুছাবেন মাতা অঞ্চল দিয়া বলে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শিশুর নয়নে অকারণে বারি ঝলে?

ধরার আঁচলে পাথরের সাথে সোনা বাঁধা এক থরে,

বিষে নীল হয়ে আসে মণি – সে কি অধিক মূল্য তরে?

 ​​​​ 

ডুবে এক-গলা নয়নের জলে তবে কি কমল ফোটে?

মৃণাল-কাঁটার বেদনায় কি ও শতদল হয়ে ওঠে?

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ শত সুষমায় ফোটাবে বলিয়া কিরে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ মেঘ এত জল ঢালে কুসুমের শিরে?

দগ্ধ লোহায় না বিঁধিলে সুর ফোটে না কি বেণু-ঠোঁটে?

তত সুগন্ধ ওঠে চন্দনে যত ঘষে শিলাতটে!

 ​​​​ 

মুছাতে এল যে উৎপীড়িত এ নিখিলের আঁখিজল,

সে এল গো মাখি শুভ্র তনুতে বিষাদের পরিমল!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ অথবা সে চির-সুখ-দুখ-বৈরাগী

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আসিল হইয়া নিখিল-বেদনা-ভাগী!

জানে বনমাতা,​​ গন্ধে ও রূপে মাতাবে যে বনতল

সে ফুল-শিশুর শয়ন কেন গো কণ্টক-অঞ্চল!

 ​​​​ 

শুনে হাসি পায় এত শোকে হায়! বিশ্বের পিতা যার

হাবিব’ বন্ধু,​​ হারায়ে পিতায় সে এল ধরা মাঝার!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ খোদার লীলা সে চির-রহস্যময় –

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ বন্ধুর পথ এত বন্ধুর হয়!

আবির্ভাবের পূর্বে পিতৃহীন হয়ে – বার বার

ঘোষিল সে যেন,​​ আমি ভাই সাথি পিতাহীন সবাকার!

 

আলোকের শিশু এল গো জড়ায়ে আঁধার-উত্তরীয়

জানাতে যেন গো ‘বিষ-জর্জর,​​ এবার অমৃত পিয়ো!’

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তৃষ্ণাতুরের পিপাসা করিতে দূর

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ হৃদয় নিঙাড়ি রক্ত দেয় আঙুর!

শোক-ছলছল ধরায় কেমনে হাসি অমিয়

আসিবে সবার সকল ব্যথার ব্যথী বন্ধু ও প্রিয়!

 ​​​​ 

পূর্ণশশীরে হেরিয়া যখন সাগরে জোয়ার লাগে,

উথলায় জল তত কলকল যত আনন্দ জাগে!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ তেমনই পূর্ণশশীরে বক্ষে ধরি

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আমিনার’ চোখে শুধু জল ওঠে ভরি!

সুখের শোকের গঙ্গা-যমুনা বিষাদে ও অনুরাগে

বয়ে চলে,​​ যেন ‘দজ্‌লা’ ‘ফোরাত’ বসরা-কুসুম-বাগে!

 ​​​​ 

কাঁদিছে আমিনা,​​ হাসিছেন খোদা,‘ওরে ও অবুঝ মেয়ে,

ডুবিয়াছে চাঁদ উঠিয়াছে রবি বক্ষে দেখনা চেয়ে,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ভবনের স্নেহ কাড়িয়া কঠোর করে

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ ভুবনের প্রীতি আনিয়া দিয়াছি ওরে!

ঘর সে কি ধরে বিশ্ব যাহার আলোকে উঠিবে ছেয়ে?

নিখিল যাহার আত্মীয় – ভুলে রবে সে স্বজন পেয়ে?

 ​​​​ 

নীড় নহে তার – যে পাখি উদার অম্বরে গাবে গান,

কেবা তার পিতা কেবা তার মাতা,​​ সকলই তার সমান!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ নাহি দুখ সুখ আত্মীয়,​​ নাই গেহ,

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ একের মাঝারে সে যে গো সর্বদেহ,

এ নহে তোমার কুটির-প্রদীপ ভোরে যার অবসান,

রবি এ – জনমি পূর্ব-অচলে ঘোরে সারা আশমান!’

 ​​​​ 

সে বাণী যেন গো শুনিয়া আমিনা-জননী রহে অটল,

ক্ষণেক রাঙিয়া স্তব্ধ রহে গো যেমন পূর্বাচল!

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ কহিল জননী আপনার মনে মনে, -

 ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​ ​​​​ আমার দুলালে দিলাম সর্বজনে!’

থির হয়ে গেল পড়িতে পড়িতে কপোলে অশ্রুজল।

উদিল চিত্তে রাঙা রামধনু,​​ টুটিল শোক-বাদল!

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।